Home » চলচ্চিত্র » বিষয়: পিঁপড়া বিদ্যা
pipra-bidya-a

বিষয়: পিঁপড়া বিদ্যা

Share Button

মিডিয়া খবর :-               -: সেজুল হোসেন :-sejul-hossain

আন্দ্রেই তারকোভস্কি আমার প্রিয় পরিচালক। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট পরিচালকদের একজন। দশ বছর বয়সের একটি শিশুর যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে তার `ইভানস চাইল্ডহুড` ঘৃণা, বীরত্ব আর উন্মাদনার এক অসামান্য সৃষ্টি। দ্য মিরর, দ্য স্যাক্রিফাইস, নষ্টালজিয়া যারা দেখেছেন তারা জানেন এবং টের পান তারকোভস্কি সিনেমায় কি ভাবে কোন পদ্ধতিতে, কি বলতে চান। তার কাছে চলচ্চিত্র যতটা না পেশাদার কাজ ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল নৈতিক কাজ। বিশ্বাস করতেন- শিল্প হচ্ছে মানুষের কাছে জীবনের মুখোমুখি হওয়ার একটা উপায়। আর শিল্প কর্ম হলো সত্য সম্পর্কে শিল্পীর নিজস্ব ধারণার অন্তরঙ্গ প্রকাশ। সিনেমার লক্ষ্য ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা সম্পর্কেও তার বক্তব্য ছিল খুবই পরিস্কার।

শুধু তারকোভস্কিই নয় পৃথিবী বিখ্যাত অন্য অনেক চিত্র পরিচালকের নির্মাণ ও সিনেমা চিন্তা পড়ে আমার ধারণা-
দৃশ্য ও শব্দের মাধ্যমে নিজস্ব চিন্তাধারাকে তুলে ধরার মাধ্যম সিনেমা। ঐতিহাসিকভাবে মুল্য আছে এমন সংকট ও সংকট থেকে উত্তরণের ইশারাও রচনা করে সিনেমা। একজন চলচ্চিত্র পরিচালক তার জীবন দর্শন থেকে যা কিছু গ্রহন-বর্জন করেন তা প্রকাশ করেন সিনেমার গল্পে ।

সিনেমার দর্শক দুই প্রকার- একদল ভাবতে চায়, বিষয়ের গভীরে ডুবে আবার ভাসতে চায়। অন্যদল, শুধু আনন্দের জন্য সিনেমা দেখেন।
দর্শককে মাথায় রেখে তাই সিনেমাও তৈরী হয় দুই প্রকারে- যেখানে নাচ, গান, প্রেম-প্রীতি, স্নেহ-ভালবাসাকে গুরুত্ব দিয়ে একদল বানান ক্যালকুলেটিভ সিনেমা। আর অন্যদল বানান উপলব্ধি থেকে যা ভাবনার অতলে ভাসায়।
কেউ কেউ আবার এই দুইরকমকে মাথায় রেখেই সিনেমা বানান।এটা অনস্বীকার্য, বাংলাদেশে সেই দলের অগ্রভাগে হাঁটছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ।

মুক্তির আগে পিঁপড়া বিদ্যার অনেক পুরস্কার প্রাপ্তির খবর এসেছে। মুক্তির পরের খবর হলো-সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছে ছবিটি। এই রকম একটা বড় খবর খুব একটা আওয়াজ তোলেনি। সবাই সিনেমা দেখা আর দেখার-চেষ্টা নিয়ে ব্যস্ত।

পিঁপড়া বিদ্যা ফেসবুক এর যে পরিমান জায়গা নিয়েছে সমপরিমান জায়গা অন্য কোনও বাংলা সিনেমা এর আগে নিয়েছে কিনা সন্দেহ। [ যারা পিঁপড়া বিদ্যাকে সিনেমা মানতে নারাজ, পিঁপড়া বিদ্যাকে বাংলা সিনেমা গন্য করে কথাটা শুরু করায় অপরাধ করেছি মনে করলে মাফ চাই দোয়াও চাই ]

স্বীকার করতেই হবে এ যাবত কালে যে সকল নির্মাণ ফারুকীর হাত দিয়ে বাজারে এসেছে কোনও প্রডাকশনেই এতো সাড়া মেলেনি। এতো পোস্টে ট্যাগ হননি ফারুকী আগে। প্রতিক্রিয়া লিখে ডিরেক্টরকে ট্যাগ করার মধ্য দিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা একটা বড় কারন হয়তোবা। তো, এতো বেশি ট্যাগ মানেই বহু বেশি মানুষকে ছুঁয়ে গেছে কাজ, এটাও একটা বড় কারন। এটা শুভ লক্ষণ। মানুষ দলেবলে হলে যাচ্ছে। একা একাও যাচ্ছে। পিঁপড়া বিদ্যা দেখছে আর ফিরে এসে ঘরে মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখছে অনুভুতি, বলছে বাহ বাহ। বাংলাদেশে মৃত প্রায় সিনেমা হলের প্রাণ সঞ্চারণে এই বাহবা খুব দরকার।

অনেকেই পিঁপড়া বিদ্যা দেখে সামজিক মাধ্যমে অনুভুতি লিখতে গিয়ে একটা বড়ো ভুল করছেন। তারা অনেকটা স্যাটায়ার ভঙ্গিতে বলছেন- বিএফডিসিতে নির্মিত সিনেমার গতবাঁধা সিকোয়েন্স, ডায়লগ, মারামারি না থাকার কারণে পিঁপড়াবিদ্যা সিনেমা হয়ে ওঠেনি। এটা বলে মূলত তারা উপহাস করছেন তাদেরকেই যারা পিঁপড়াবিদ্যাকে সিনেমা মানতে নারাজ। অন্য পক্ষ সিরিয়াসলিই বলছেন- পিঁপড়াবিদ্যা সিনেমা হয়ে ওঠেনি।
ভক্তদের সিনেমা হয়ে ওঠেনির অর্থ: `হয়েছে` আর অন্যদের হয়ে উঠেনির অর্থ `হয়ে উঠেনি`। একই কথার বিপরীতমুখী অর্থ দিয়ে যেসকল মুল্যায়ন পত্র ফেসবুকে ছাপা হচ্ছে তা দেখে প্রশ্ন জাগে-যারা পিঁপড়াবিদ্যাকে সিনেমা বলতে নারাজ তাদের মাপকাটি বিএফডিসির সিনেমা? তাদের বলার বিষয় ও জাজমেন্ট এঙ্গেল ভিন্নওতো হতে পারে। নিশ্চিত না হয়ে পছন্দ না করাদের বিএফডিসি সিনেমা প্রেমিক বানিয়ে দেয়া কি ঠিক হচ্ছে? (বিএফডিসি মানেই খারাপ কিছু?)
বরং চলুন, তাদের কথাও শুনি। তারা কেন এটাকে সিনেমা বলছেন না, কি ব্যাখ্যা আছে সেটাও শুনি। সেই ব্যাখ্যা পছন্দ হলে ছবিয়ালে শেয়ার হোক। পছন্দ না হলেও হইতে পারে শেয়ার। আলোচনার বিষয়তো পিঁপড়াবিদ্যা। আলোচনা মনের মতো না হোক, প্রচারনাতো? প্রচারতো ভালো। বেশি কানে পৌছে। মানুষ তখন কানে ধরে চোখ সহ হলে যায়। যাবার আগে বন্ধুকে বলে যায় যাচ্ছি। সেই বন্ধুও উত্তরে বলে যাবো বলে ভাবছি। দেখবো বলে ভাবছি।

পিঁপড়া বিদ্যা দেখার আগে পিঁপড়া বিদ্যা দেখে আসা লোকজনের মন্তব্য পড়েছি বেশ কয়েকরাত। কেউ কেউ এমনও বিষয় লিখেছেন সিনেমাটি দেখার পর সেই বিষয়ের সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি। যেমন একজন লিখলেন `নিজের অস্তিত্বের দিকে খেয়াল না রেখে আন্দাজে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছের ভেলা নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে চাওয়া মূর্খ আমরা অনেকেই। সেই মূর্খতার পরিণাম কতো ভয়াবহ হতে পারে, সিনেমায় এভাবে খুব কমই দেখেছি আমরা।` পিঁপড়াবদ্যার কোন সিকোয়েন্স বা কোন অংশটি এই বক্তব্য ধারণ করছে সেটা খুঁজে পেলাম না।; যা হোক বেশি ইমোশনাল হয়ে গেলে কল্পনায়ও গল্পের ইমপ্রোভাইজেশন হয়, হয়তো।

পিঁপড়া বিদ্যা দেখেছি। অনেকগুলো গল্প নিয়ে এগুতে শুরু করেছিল। মিঠুর জীবন যুদ্ধ, চাকরী চেষ্টা ও তার অসহায় পরিবার, এমএমএল কোম্পানি, ধান্ধা-পতন। চাকরী-চাকরী খেলা, ‘গোপন’ ভিডিও, ফাঁস ভয়, ব্ল্যাকমেল চেষ্টা-মৃত্যুভয়, বিমুর্ত অনুশোচনা ইত্যাদি।
চিপাচাপায় বেশ কিছু সমস্যা, অসংগতি আছে। যেমন নায়িকার প্রেমিক খুঁজে পেল পালিয়ে থাকা মিঠুকে। সে মিঠুর ছবি তুললো। মিঠু তাকে প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলার কথা। যেহেতু মিঠুর দেখে ফেলা ভিডিওতে প্রেমিকটি ছিল। মিঠু কেন চিনলনা? নায়িকার প্রেমিককে ভিডিও ফাঁসের ভয় স্পর্শ করেনি মোটেও, বরং তাকে মাঝে মাঝে এ নিয়ে হাস্যরস তৈরী করতে দেখা গেছে। ভিডিও ফাঁস এর ভয় থেকে ঝাঁকুনি দেবার মতো কোনও মোচড় আসেনি গল্পে। নায়িকাকে বিভিন্ন জায়গায় শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। যেটুকু ভয় ও চিন্তা তাকে পেয়েছিল সেটা থেকে গল্প অন্য দিকে মোড় নিয়ে দর্শককে নাড়া দিতে পারতো। পিঁপড়াবিদ্যা অনেকগুলি গল্প নিয়ে এগালেও আলো ফেলা হয়েছে গোপন ভিডিও ক্লিপ জনিত বিপন্নতার ওপর। এর ফলে পুরোপুরি আকার পায়নি অন্য গল্পগুলো যা লেপ্টে ছিল পুরো সিনেমায়। আর এটা আমার মুর্খতাও হতে পারে যে, নামকরনের স্বার্থকতা পায়নি কোনও ভাবেই।

মুগ্ধ হবার মতো, আনন্দ নেয়ার মতো অনেক সিকোয়েন্স ছিল, ডায়লগ ছিল। কিছু দৃশ্য চোখে লেগে থাকার মতো। যেমন- নায়িকাকে মুঠোফোন ফেরত দিতে প্রথমবার তার বাসায় যায় মিঠু। এ দৃশ্যটি মিঠুর দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকবার দেখি। একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ মুগ্ধতা দিয়েছে। তাছাড়া মিঠু যখন নায়িকার ডাইনিং টেবিলে বসে শুন্য পাত্রে খাবার খায় সেতো এক অসাধারণ দৃশ্য, পানি খাবার ভঙ্গিতে শুন্য গ্লাসে চুমুক দেয়া অদ্ভুদ এক রিনরিনে অনুভুতি জাগায়। পলায়নপর মিঠুর পরিত্যাক্ত ট্রেন এর কামরায় পা ফসকে নিচে পড়ে যাওয়াটাও দারুন ভাবনা উদ্রেকী। একমাত্র গানটা ভালো লেগেছে। তাছাড়া সিনেমার ফ্রেম, শট্‌, সিকোয়েন্স ও প্রেজেন্টেশন্‌ ভালো লেগেছে।
পিঁপড়াবিদ্যা অনেকগুলো সামাজিক ও মনস্তাত্বিক সংকট নিয়ে টুকরো টুকরো গল্প ‍বুনন করলেও সংকট থেকে উত্তরণের ইশারা তৈরী করতে পারেনি। (ইশারা তৈরী করাটা কি জরুরী?)

শেষ করতে চাই একটা আশাব্যাঞ্জক স্ট্যটাস দিয়ে। লিখেছেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী। স্ট্যটাসে বর্ণিত স্বপ্ন ও আশাবাদ এর সাথে আমার গভীর সম্পর্ক আছে।

জ্যাঁ লুক গদারের একটা কথা পরেছিলাম, “ I make films as a critical essay” . ইদানিং আমরা অনেক সিনেমা আশেপাশে দেখি, দেখি কিছু কাচাঁ সিনেমা, কিছু ব্যায়বহুল আত্মপ্রেমের সিনেমা, কিছু আবার অতি পাকা ঘুম আসা সিনেমা। এই সব সিনেমার মাঝে নিজের গল্পটা বলে উঠা যেন একটা লড়াই এর মতো। আজকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পিপড়াবিদ্যা দেখে আমরা এই লড়াইটা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেয়েছি। তাই সরয়ার ভাইকে এই যুদ্ধে সেনাপতি মেনে সব বন্ধু চলচ্চিত্রকাদের নিয়ে যুদ্ধে নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে পিঁপড়াবিদ্যা কোথায় থাকবে সেটা ভবিষ্যৎ বলে দিবে, কিন্তু এই মুহুর্তে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অঁতর সিনেমা এই সময় আমাদের মাঝে হাজির করাতে একটা লম্বা স্যালুট দিতে চাই। আর অপেক্ষা আর বুকভরা আশা নিয়ে বসে থাকি আরও এক সৈনিক অনিমেষ আইচ এর “জিরো ডিগ্রি’ দেখার জন্য। সবই চলুন আমরা আমাদের গল্প বলি।.

Check Also

nuru miah o tar beauty driver

নুরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার

মিডিয়া খবর :- গত ২৪ জানুয়ারি কোনও কর্তন ছাড়াই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় …

tanha, shuva

ভাল থেকো চলচিত্রের পোস্টার প্রকাশ

মিডিয়া খবর:- প্রকাশ হল জাকির হোসেন রাজুর নির্মিতব্য চলচিত্রের পোস্টার। জাকির হোসেন রাজুর নির্মাণে আসছে নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares