Home » প্রোফাইল » কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল: একজন মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্যজন
kazi-shaheed-hossain-dulal

কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল: একজন মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্যজন

Share Button

মিডিয়া খবর:-         -: কুমার প্রীতীশ বল:-

‘কোন শহরে বাড়ি তোমার কোন শহরে ঘর
কি নাম তোমার মাতা পিতা কি নামটি তোমার
ও কি নারে।।’
আমি আজ এক মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্যজনের কথা লিখতে বসেছি, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের দিনক্ষণ লাগে না, লাগে না আলাপের কোনো সূত্রধর। তাঁর সঙ্গে রাতের পর রাত কথা বললেও কথা ফুরায় না। দিনের পর দিন হাঁটলেও পথ শেষ হয় না। আমি আজ সেই মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল-এর কথা লিখতে বসেছি। আমি এক কিংবদন্তির কথা জানাতে চাইছি।
মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল-এর নাম উচ্চারিত হলেই কানের ভেতর দিয়ে একেবারে আমার মরমে পৌঁছে যাই তাঁর একটা উক্তি-আমি তো পা ফাটা গ্রামের মানুষ। কথাটা মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল ভুল বলেন না। লোকসংস্কৃতির প্রতি এমন একনিষ্ঠ নাট্যজন আমি কম পেয়েছি। উত্তরের লোকসংস্কৃতি বিষয়ে লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল-এর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এতই বিশাল যে, তাঁর  সঙ্গে উত্তরের মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকনাট্য বিষয়ে যতবারই আড্ডা দিতে বসেছি, শুরুটা থাকলেও শেষ কখনও পাইনি।  আড্ডাবাজ লোকটাকে এ বিষয়ে কথা বলতে, এ বিষয়ে কথা শুনতে এবং পথ চলতে কখনও ক্লান্ত হতেও দেখিনি।
বিগত ৩০ বছর উত্তর জনপদের গ্রাম থেকে গ্রামে পা ফাটা মানুষগুলোর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল বাংলার লোকায়ত শিল্পচৈতন্যকে করতলগত করেছেন। বাংলা, বাঙালির লোক সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধান করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি হয়ে যান বিশাল বাংলার লোকমানুষের, লোকায়ত সংস্কৃতির অন্তর্গত। তাই তাঁকে বড় বেশি বেমানান মনে হয়, রাজধানীর আলোকজ্জ্বল রঙ্গমঞ্চে। পুঠিয়ার চার আনি রাজার বিশাল দিঘীর শান বাঁধানো ঘাটে তিনি মহারাজা। উত্তরের লোক সংস্কৃতির প্রধান সেনাপতি।
কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল বাংলা, বাঙালির মৃত্তিকা সংলগ্ন লোকায়ত সংস্কৃতিকে বাঙালির জীবনের অভিন্ন সত্তা হিসাবে দেখেছেন। তাই তিনি বিবেচনায় রাখেন বাঙালির বার মাসের তের পার্বণকে। তাঁর ভাষায়-‘বাঙালি জীবনে এই পার্বণগুলো অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।’ বাঙালির এসব পার্বণকে লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল বলেন, লোকাচার। তাঁর মতে, বাঙালির জীবন লোকাচারে পূর্ণ। তাঁর কাছে এসবই আমাদের লোকসংস্কৃতির অংশ। আমাদের জীবনেরই একটি অধ্যায়। নাগরিক মানুষ এখানে খুঁজে বেড়ায় সংস্কার; আরও রূঢ়ভাবে কু যোগ করে বললে কু-সংস্কার।  আমরা এসবে আস্থা রাখতে পারি না বলেই তবে  কি আকাশ সংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করে রাখে? আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রাখে হতাশা আর অতৃপ্তি? এখানে এসেই তাঁর কাছে হেরে যাই আমরা নাগরিক মানুষ? এখানেই লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল অনেক বড় হয়ে দেখা দেন আমার সমুখে, আমাদের সমুখে। তিনি আমাকে, আমাদেরকে নতুন বোধের দীক্ষা দেন।
প্রায় তিন দশক কাল লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল চারণ গায়কদের সঙ্গী হয়ে লোকায়ত শিল্প সাধনায় ব্রত আছেন। তাঁর এই চারণরা আপাদমস্তক বাঙালি। এই বাঙালির অন্তর তেরশত নদী বিধৌত সোঁদামাটির গন্ধে মোহিত।  তাঁর এই বাঙালি প্রাণহীন শহরের কাঁচের দেওয়ালের ঘেরাটোপে আবদ্ধ নাগরিক চেহারার পোষাকী মানুষ না। তাঁরা চারণ, তাঁরা পা ফাটা গোত্রের মানুষ। তাঁরা মাটি কর্ষণ করেন, তাঁরা সংস্কৃতি চর্চাও করেন। আমাদের কাছে তাঁরা নিরক্ষর। কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল-এর কাছে তাঁরা স্বশিক্ষিত। কাজী দুলাল কিংবা তাঁর পা ফাটা গোত্রের মানুষগুলো মাক্সের ভাষায়, লুম্পেন বা সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর না। এঁরা মৃত্তিকা সংলগ্ন আমাদেরই লোকসংস্কৃতির সোপান। তাঁরা সেই সোপান রচনা করে তাঁদেরই বটতলা, আটতলা, চৌচালা, দোচালা অথবা নদীর পাড়ে। তাঁরা দিনে সূর্যালোকে মাটি কর্ষণ করে সোনা ফলায়, রাতে এক তারা দোতারা হাতে বাউল গান করে। হাটে হাটে বনজ ঔষধী বিক্রি করে, রাতে কিচ্ছা গান করে। এখানে নিত্যানন্দ আর সাজ্জাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। আশরাফ আলীর মনসার গানে অনীল চৌধুরী ফুঁপিয়ে উঠেন। রেখারাণীর ‘মহাপ্রভু নীলাচলে’ পালা শুনে হোসেন মৌলভি কান্নাকাটি করে। কোনোদিন পাঠশালার বারান্দায় না হেঁটেও মাতৃগর্ভে সন্তানের বিজ্ঞানভিত্তিক বিকাশের ব্যাখ্যা দিয়ে জহির উদ্দিন পালান দেহতত্ত্বের গান বাঁধেন। লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল এঁদের ভেতর দিয়ে গোটা পৃথিবীকে দেখেন। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত নাগরিকদেরও দেখার চোখ ফুটান।
লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল আমাদের কাছে যখন মনসা মঙ্গলের কথা বলেন, তখন তিনি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের চারণ কবিদের গীতি রূপটি একত্রিত করেই বলেন। এ সময় তিনি চারণ গায়কদের এসকল লোকজ উপাদানের মাহাত্ম্য বিশ্লেষণের সময়ে সমাজ জীবনে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া লোকায়ত সংস্কৃতির প্রভাবকেও তুলে ধরতে ভুল করেন না। তাতে শ্রোতা হিসাবে উত্তর জনপদের পথে প্রান্তরে না ঘুরেও সম্পূর্ণের স্বাদ পাই। লোকসংস্কৃতিকে পথচ্যুত করার নগ্ন ষড়যন্ত্রের ইংগিত পেয়ে    যাই বটে। কিন্তু লোক মানুষের  প্রিয় লোকসংস্কৃতি বাস্তুহারা হতে দেখেও আমরা লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল-এর ন্যায় আর্তনাদ করি না। আজকাল অবশ্য আমরা নাগরিক মানুষরা আর কোনোকিছুতেই রিএক্ট করি না।
লোক-সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ ভূমি আমাদের এই তের শত নদী বিধৌত বাংলাদেশ। বিশাল বাংলার কোনো পল্লী ঘরে কোনো তৃষ্ণার্ত পথিক এক ঘটি জল চাইলে গৃহবাসী তাঁকে জলের সঙ্গে এক ডালা মুড়ি বা খৈ এর সাথে  একটি  পেড়া বা গুড় খেতে দেবে। বাঙালির এই উদার আথিতিয়তা নাগরিক মানুষের কাছে কোনো মূল্য না থাকলেও কাজী দুলালের কাছে এ্টাই হলো শ্বাশত বাংলাদেশ। অন্যসবই কৃত্রিম। লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল এই কৃত্রিমতার বেড়াজাল ছিন্ন করে সমুখের পানে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী পথিক। তাই তিনি উৎকণ্ঠচিত্তে আওয়াজ তুলেন,পলান দার বয়স ৭০ অতিক্রম করেছে। তাঁর অবর্তমানে হারিয়ে যাবে যুগীপর্ব গান। যুগীপর্ব গানের কোনো পাণ্ডুলিপি নেই। ইমান যাত্রা ৩০ বছর ধরে পরিবেশিত হয়। কিন্তু এর কোনো পাণ্ডুলিপি নেই। পুঠিয়ার বিখ্যাত মিছিল গান ১৯৪৭ এর পরে আর চিত্রায়িত হয়নি। দু-একজন যারা আছেন তাঁরা আর চর্চা করেন না। এসবের পৃষ্ঠপোষক নেই। পৃষ্ঠপোষক দরকার। এক্ষণে আমার মনে পড়ে যায়, গ্রাম থিয়েটারের লোক নাট্য উৎসবের কথা। অনেকের সরব নিরব সহযোগিতা থাকলেও প্রধান কাণ্ডারি তো হলেন লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল।
পুঠিয়ায় কোনো এক লোক নাট্য উৎসবে দেখলাম- শঙ্খ ঘোষের পংক্তি নিজের মতো করে বদলে নিয়ে যদি বলি, উৎসব ঢেকে গেছে গরু মার্কা ঢেউ টিনের বিজ্ঞাপনে। আমি কিছুটা আহত  বোধ করলাম। তারপর লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল-এর সঙ্গে  প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক জনাব আবদুর রবের যোগাযোগ করিয়ে দিই। প্রশিকা পরের বছরের  লোক নাট্য উৎসবে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। তখন আমি দেখেছি, তাঁকে অনেক বাধার প্রাচীর ডিঙাতে হয়েছে। কাজী দুলালকে অনেক বন্ধু, স্বজনের সমালোচনা হজম করতে হয়েছে। তিনি অবিচল থেকে প্রশিকার প্রসারিত হাতকে ধরতে নিজের হাতটা বাড়িয়েছিলেন। পরে অবশ্য এও দেখেছি, সমালোচকরাও তাঁর সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন। এমন অনেক উদাহরণ আছে। শুধু  এদের কথা বলি কেন? এমনও তো আছেন, তাঁর আকর ব্যবহার করে বিশ্বসভায় নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।
লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল সবই করেছেন লোকসংস্কৃতির চাকাটাকে চলমান রাখতে। সবই করেছেন আকাশ সংস্কৃতির বেনোজলে লোকসংস্কৃতির পবনটিতে শক্ত  পাল তুলতে। কতটুকু সফল হয়েছেন সময় তা উত্তর দেবে। তবে আজ, লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলালের জীবনের চলমান রেলগাড়ি ৫০তম জন্ম জয়ন্তি উদযাপন লগ্নে একথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, বিলুপ্তির পথে লোকসংস্কৃতির অনুসন্ধানে কিংবা সংরক্ষণে এমন অনেক চড়াই উৎড়াই অতিক্রম করে তিনি পথিকৃতের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বিগত ৩০বছর ধরে বাংলা, বাঙালির লোকসংস্কৃতির আল পথ ধরে কখনও একা, কখনও সঙ্গীসহ হাঁটতে হাঁটতে আজ অবশ্যই রাজপথ লোকনাট্যজন কাজী সাঈদ হোসেন দুলালকে হাতছানি দিয়ে ডাক দেয়। সে ডাকে তিনি সাড়া দেবেন কি দেবেন না তা একান্ত তাঁর অভিরুচি।

Check Also

jafor iqbal hero

নায়ক জাফর ইকবাল শুভ জন্মদিন

মিডিয়া খবর :- শুভ জন্মদিন আমাদের নায়ক (জাফর ইকবাল). আশির দশকের রূপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা …

s-m-solaiman-1

থিয়েটারের স্বজন এস এম সোলায়মান

মিডিয়া খবর:-        -: কাজী শিলা :- এস এম সোলায়মান থিয়েটারের আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares