Home » নিবন্ধ » ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবনা
fol-webd-8

ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবনা

Share Button

সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবনা

এস.এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন

১ম পর্ব-

নিজভূমে বাঙালি জাতি আপন অস্তিত্ব রক্ষায় সহস্র বছরের সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সৃষ্টি করেছে নিজস্ব সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার হিসাবে আমরা আজ বলতে পারি বাঙলা নাটক পশ্চিমা বিশ্বের চাপিয়ে দেয়া কোন শিল্পাঙ্গিক নয়। বাঙলা নাটকের রয়েছে কাল পরম্পরায় নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্য যা পূর্ব পুরুষের করণে করণে পর্যায়ক্রমে বিস্তার লাভ করেছে। বলা বাহুল্য স্বতন্ত্র বাঙলানাটকের এই আঙ্গিক ঐতিহ্যবাহীনাট্য হিসেবে পরিচিত। যদিও ঔপনিবেশিক একটি শব্দ দিয়ে আমরা অনেকেই ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যকে চিহ্নিত করতে চাই যে কারণে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে আমরা বলি ‘লোকনাটক’ বা ‘লোকনাট্য’। কিন্তু আমরা মনে করি ‘লোকনাটক’ বা ‘লোকনাট্য’ এই শিরোনাম ঔপনিবেশিক অভিধা। তাই আমরা আমাদের এই হাজার বছরের সংস্কৃতির ছায়ায় লালিত নাট্যনমুনাগুলোকে ‘ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্য’ বলে উল্লেখ করতে আগ্রহী। সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নাট্যধারা। সংলাপ, গীত, নৃত্য, বর্ণনা সম্বলিত এই নাট্যধারা আমাদের ঐতিহ্যে বাহন এবং একই সাথে তা স্বকীয় চেতনায় আধুনিকও বটে।

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রদর্শনী প্রত্যক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণ পূর্বক আমরা এই বোধে উপনিত হতে পারি যে, ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের আঙ্গিক, পরিবেশনারীতি ও কলা কৌশল যদি আজকের প্রেক্ষাপটে নাগরিক থিয়েটার চর্চায় প্রয়োগ করা যায় তাহলে বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তার স্বকীয় চেতনা ও ঐতিহ্যধারায়। এই সূত্রে আলোচনার শুরুতেই আমরা সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চা এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের আঙ্গিক, প্রয়োগশৈলী এবং প্রয়োগরীতির ক্ষেত্রে সংকট সম্ভাবনা বিচার বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এবং একই সাথে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে বাঙালির স্বকীয় নন্দনজাত ভাবনা এবং ভাব ও রসবোধ থেকে উদ্ভূত ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্য বিকাশ লাভ করেছে। বংশ পরম্পরায় কখনোবা গুরু পরম্পরায় পূর্ব পুরুষের উত্তরাধিকার হিসেবে সমকালীননাট্য পিপাসুগণ ঐতিহ্যবাহী নাটককে ধারণ ও লালন করে চলেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এরকম একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হওয়া সত্ত্বেও আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের ধারাবাহিক বিবর্তন, বিকাশ এবং বিস্তার বিভিন্ন সময় ব্যাহত হয়েছে। তাই আধুনিক থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের সফল প্রয়োগ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখনও নাগরিক থিয়েটার চর্চায় ব্যাপকভাবে প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

আমরা জানি, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় স্থানের নাট্যতাত্ত্বিকগণ সংলাপকে নাটকের একটি আবশ্যকীয় উপাদান হিসাবে গণ্য করেছেণ। গ্রীক দার্শনিক ও নন্দনতাত্ত্বিক এরিস্টটল ট্রাজিডির একটি আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে সংলাপের কথা বলেছিলেন। আবার আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বাচিক অভিনয়ের কথা বলেছে। অর্থাৎ সংলাপ বা কথা বা বক্তব্য নাটকের একটি আবশ্যকীয় উপাদান। আজকের আধুনিক তথা নাগরিকথিয়েটারে এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্য সকল ক্ষেত্রেই আমরা দেখি সংলাপের অস্তিত্ব। কিন্তু আধুনিক থিয়েটারের সাথে ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের সংলাপ প্রণয়ন এবং প্রক্ষেপণে রয়েছে অনেক পার্থক্য। আমরা দেখি ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের কোন কোন পালায় বা নাট্যের লিখিত পান্ডুলিপি থাকলেও অনেক নাট্যে লিখিত কোন পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না। আসরে আসরে ভক্ত দর্শক শ্রোতার সম্মুখে অভিনেতা- অভিনেত্রীগণ কাহিনীর বিস্তার ঘটিয়ে সংলাপ প্রক্ষেপণ করেন। কখনো প্রমট মাস্টার তাৎক্ষণিকভাবে সংলাপ উদ্ভাবন করে অভিনেতা- অভিনেত্রীদের ধরিয়ে দেন। ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের সংলাপে দেখি আমরা আঞ্চলিকতার প্রভাব, উচ্চারণে স্বকীয় ভঙ্গির প্রভাব এবং প্রজেকশনের ক্ষেত্রেও নানাবিধ সুর-ছন্দ এবং ঝোকের প্রভাব। নাটকের এই সংলাপ নাগরিক থিয়েটার কর্মীদের মত মুখস্থ করে তা দর্শকের সামনে প্রক্ষেপণ করা হয় না। ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের সংলাপ যেন অভিনেতা-অভিনেত্রীর স্বতঃস্ফুর্ত শিল্প প্রকাশের ভঙ্গি হয়ে ওঠে। ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের একজন অভিনেতা স্বতন্ত্র শিল্প সত্ত্বায় প্রস্ফুটিত হয়ে তিনি স্বতস্ফুর্ত ভাবে কণ্ঠ দিয়ে নিৎসৃত করেন সুধাময় সংলাপ যা ভক্ত রসিক জনের কাছে এক অন্য রকম রস সঞ্চার করে।

ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গীতধর্মীতা। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহের সাথে এই গীতধর্মী এবং তৎমানস কাঠামো আছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে। বাঙালির নাট্যকলার প্রায় সকল পালাই গীত নির্ভর। উল্লেখ্য বাঙলা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী নাট্যের আঙ্গিককে গান বলা হয়ে থাকে। যেমন যাত্রাকে বলা হয় যাত্রাগান, কবিগান, গাজীর গান, অষ্টক গান, জারিগান, কিচ্ছাগান। কখনো কখনো আমরা ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের বিভিন্ন আঙ্গিককে শুধুমাত্র গান বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখানে গান অর্থ আসলে পালা নাট্য। আমরা বলতে পারি গানের আধিক্য বেশি থাকে বলেই এই ধরণের অভিনয় ক্রিয়াকে গান কলে অভিহিত করার রীতি প্রচলিত হয়েছিল। এখানে গানে গানে উক্তি-প্রত্যুক্তি মূলক সংলাপ থাকে, থাকে গানে গানে গল্প বর্ণনা করা।  (চলবে)

Check Also

Bangladesh

উদ্ভট হালচাল !

মিডিয়া খবর:- একটা মেয়ে শারীরিকভাবে ধর্ষিতা হয় একবার। কিন্তু ধর্ষিতা মেয়েটা সেটা প্রকাশ করলে কিংবা …

lalon

লালন মরলো জল পিপাসায়

মিডিয়া খবর :-    – কাজী চপল ভারতীয়  উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্বিক সাধক ফকির লালন শাহ। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares