Home » সঙ্গীত » কেন নিষিদ্ধ নয় ‘ঠোট ফর ভোট‘..বঙ্গবাসীর প্রতিবন্ধী বোধ
thot-for

কেন নিষিদ্ধ নয় ‘ঠোট ফর ভোট‘..বঙ্গবাসীর প্রতিবন্ধী বোধ

Share Button

মিডিয়া খবর :-       -: তির্থক আহসান রুবেল :-

শুন্য দশকের মাঝামাঝি প্রায়। একজন গায়ক গেয়ে বসলেন, ‘আমি গাইলে নচির মতো লাগে, আকবর কিশোর/ তাই আকবর প্রতিভাবান আর আমি হলাম চোর। ‘চল পালাই এ্যলবাম দিয়ে আমার সাথেthot-f পরিচয়। অনেকদিন পর ফোনে আলাপ। জীবনের অন্যতম বিব্রতকর এবং অপমানজনক অভিজ্ঞতা। তার প্রায় এক দশক পর দেশাত্ববোধের লড়াইয়ে সামনাসামনি পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। মূল্যবোধ, বিবেক, পরিবর্তন, মাতৃভুমি, হাহাকার, প্রেম, বেদনা সবকিছুতে অদ্ভুত মিল। দুজন হয়ে গেলাম হঠাৎ হঠাৎ আলাপ হওয়া সহযোদ্ধা বন্ধু।

একটা সময় এই তল্লাটে অনেক গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান নিষিদ্ধ হয়েছিল। নিষিদ্ধের তালিকায় সিনেমাও ছিল। নিষিদ্ধ হওয়া বেশীরভাগ শিল্প-সাহিত্যের এই উপাদানগুলোর উপর খড়গ নেমেছিল মূলত রাজনৈতিক রক্তচক্ষুর। তবে কখনো কখনো খড়গটা সামনে এসেছিল অশ্লিলতার নামে, কখনোবা ধর্মের নামে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যায়, প্রায় সব কিছুর পেছনেই মূলত ছিল রাজনীতি। এই রাজনীতি বলতে শুধুমাত্র দলগত শ্লোগান নির্ভর রাজনীতি নয়। এটা সমাজের উঁচু শ্রেণীর সাথে নীচু শ্রেণীর লড়াই, তথাকথিত রাজনীতিকের নামে লুটের বনাম অধিকার আদায়ের যোদ্ধা শ্রেণীর লড়াই। কখনোবা প্রচলিত অপ সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই, কখনো মৌলবাদের বিরুদ্ধে কখনোবা অপ পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নারীকে তার সঠিক অবস্থান বুঝিয়ে দেয়ার লড়াই। আর এই লড়াইগুলো থামিয়ে দিতেই, নানা নামে নানারূপে নেমে এসেছিল নিষিদ্ধের খড়গ। বর্তমানে শুধুমাত্র ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং মৌলবাদের সাথে আপোষের ফলশ্রুতিতে বা একদমই নষ্ট রাজনীতির হোতারা স্বার্থে আঘাত লাগলে বায়বীয় কারণ দেখিয়ে টুকটাক টিকিয়ে রেখেছে ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটা।

thot-for--voteসে সময়গুলো আসলেই বর্তমান শতগুণ বেশী তথ্য প্রযুক্তির শক্তিশালী সময়ের তুলনায় বেশী আধুনিক ছিল। একজন খেটে খাওয়া মজুর থেকে শুরু করে গ্রামের মুদি দোকানদার, গৃহবধু থেকে সাইড সিতি করা কেরানী বাবু, একজন শিক্ষক থেকে একজন বিপ্লবী, একজন ছাত্র থেকে অক্ষর জ্ঞানহীন মূর্খ কৃষক সবার বোধ, জ্ঞান, মনস্তাত্তিকগত দার্শনিক জ্ঞান সবই ছিল প্রখর। ফলে একটা গান কিংবা কবিতা অথবা উপন্যাসের বক্তব্য বর্তমানের মতো তাদের মাথার উপর দিয়ে যেত না। বরং গেথে যেত ভাবনার কোষে কোষে। ফলে বিরহে কাঁদতো, বিল্পবে জাগ্রত হতো, ক্রোধে উন্মত্ত হতো। সে সময় প্রতিকী উপস্থাপনও কারো মগজ এড়িয়ে যেত না। অথচ এখন সরাসরি বলা হলেও কেউ বোঝে না, কেউ শোনে না, কেউ দেখে না। কারণ বোধের সেই জায়গাটা ভোতা হয়ে গেছে। সে সময়ের একজন মুঠে শ্রমিক বা কৃষকের চেয়েও বর্তমানের অনেক বেশী ডিগ্রীধারী শিক্ষিত জনগণ বা প্রযুক্তির মাধ্যমে যখন তখন জ্ঞান অর্জন করার ক্ষমতা সম্পন্ন প্রজন্ম কোনভাবেই বেশী শিক্ষিত নয় মানসিকভাবে। কারণ এখন আর নাটক, গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস তাদের স্পর্শ করে না। ভাবনার এতটুকু জায়গা দখল করে না বিবেকের দংশন।

কিছুদিন আগে প্রীতমের একটি গান মিউজিক ভিডিও সহ প্রকাশ পেয়েছে। আমার বন্ধুবর প্রীতম আহমেদের গান ‘ভোট ফর ঠোট’ গানটা সাইবার দুনিয়ায় তুমুল আলোচিত। গানটা সবার ভাল লেগেছে। মিউজিক ভিডিওটা সবার কাছে গরম লেগেছে। আবারো বলছি, গরম লেগেছে। আবার কেউ কেউ গানের অশ্লীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, প্রীতম বিক্রি হয়ে গেছে প্রচলিত ধারার কাছে। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য তিনি এমন একটি মিউজিক ভিডিও বানিয়েছেন। বঙ্গবাসীর মতামত আর আলোচনা দেখে আমি হাসি। বাধভাঙ্গা হাসি যেন থামতেই চায় না। এই thot-for-vote-1একটি গানের জন্য হয় প্রীতমের কাটতি বেড়ে যেত নতুবা গানটি নিষিদ্ধ হতো। কোনটাই হয়নি। কারণ আমাদের বর্তমান মনস্তাত্তিক জায়গাটা প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে। আমরা বাইরের খোলসে আটকে গেছি। ভেতরের দর্শনটা, বক্তব্যটা আমাদের মর্মে পৌঁছতে পারছে না। বর্তমানে আমরা ডিগ্রী সার্টিফিকেট পাচ্ছি। কিন্তু মননের দিক থেকে অশিক্ষিতই রয়ে যাচ্ছি। ‘মার্কা যদি হয় তোর লাল টুকটুকে ঠোট/ একা আমি দিতে রাজি ১৬ কোটি ভোট/ অবিশ্বাসের এই আকালে সবাই দেয় চোট/ তোর আর আমার ঠোটই গড়বে প্রেমের মহাজোট…’ এমন একটি কথায় গানটি শুরু হয়েছে। আমরা দেখেছি ঠোট, লাল টুকটুকে ঠোট। বুঝিইনি গানটির বক্তব্য কি! আর বুঝিনি বলেই গানটি এখনো নিষিদ্ধ হয়নি। গানটির ভিডিওটিকে শুধুমাত্র অশ্লীলতার দোহাই দিয়েই নিষিদ্ধ করা যায় যখন তখন। তবে সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দূর্বৃত্তায়ণ রাজনীতির বলি সামনে না এনে আনতে হবে অশ্লীলতার দোহাই।

 ঠোট মানে প্রতিশ্রুতি। গানের দৃশ্যায়নে দেখা যায় খুব সুন্দর করে সাজানো আকর্ষণীয়, আবেদনময়ী এক নারীর ঠোট। অর্থাৎ ভোটের আগে এরকম আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতির মুলা আমাদের সামনে তুলে ধরেন আমাদের রাজনীতিকরা। তারপর পরই শুরু হয় নানা গাণিতিক হিসাব নিকাশ। যা চরম বেহেয়ামীর সাথে পাল্লা দিয়ে প্রকাশ্যে চালায় দেনদরবার। সবাই চায় শুধুমাত্র ক্ষমতা, যা তাকে ভাল রাখবে, বিনোদিত করবে। তারপর সব ভুলে একদিন এমন একজনের সাথে জোট বাধেন, যিনি সরকার বদলালেও জোট বদলাবেন না বলে প্রতিশ্রতি দেন প্রতিবার। কিন্তু নিয়ম মেনে প্রতিবারই তিনি ডিগবাজি মারেন ক্ষমতার সাথে থাকতে। তারপর একজন ভিনদেশী, যিনি এই অসভ্য নৃত্যেকে (রাজনৈতিক দলগুলোর রাষ্ট্রদূত প্রীতি) চালু রাখতে ডিজে মিউজিক চালু রাখেন এবং জানতে চান (প্রতিবাদীদের কাছে) কি রে পাগলা! কি সব ফালতু প্যাচাল পারছিস! অসভ্য গালি দিয়ে বলে, কি বলিস এসব ভোট-জোট-জোট-ভোট কিছুই তো বুঝিনা। অথচ ঠিকই তারা নাচনে বুড়ির জন্য ডুগডুগি বাজিয়ে যাচ্ছেন। তারপর একদিন আমাদের মহান রাজনীতিকরা তাদের খেয়াল খুশিমতো চালাতে থাকেন তাদের কর্মযজ্ঞ। বলা যায়, ক্ষমতার স্বার্থে স্বৈরাচারের সাথে জোটবদ্ধ হবার নগ্ন প্রতিযোগীতাকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সাথে নির্বাচনে পরাজিত হবার পর পরই অতি পরিচিত সব অভিযোগ আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে মিথ্যাচারকেই সামনে আনা হয়েছে। অথচ আমাদের বর্তমান বঙ্গবাসীর বেশীরভাগ না বুঝেছে গানের কথা, না বুঝেছে ভিডিওটির মর্ম। দর্শকরা দেখেছে মডেলের শরীরের ভাজ, আঁকা ঠোট। শুনেছে একটি হাই বিটের গান। মানুষের মাঝে যেমন গানটির কোন প্রতিফলন ঘটেনি, ঠিক তেমনি রাজনীতিকরাও বুঝেনি যে, তাদের কাছা ধরে টান দেয়া হয়েছে গানটিতে। অনেকটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন নিয়ে সাম্প্রতিক নির্মিত একটি ভারতীয় সিনেমা দেখার সময় এদেশের দর্শকরা বঙ্গনারীর ধর্ষণ দৃশ্যে শীষ-হুইসাল বাজিয়ে যেমন উল্লাস প্রকাশ করেছিল বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে ধর্ষণের বিনোদন নিতে। সবাই গানটা থেকে বিনোদন নিয়েছে। একটা গানের ভেতরের মর্ম বোঝার মতো যোগ্যতাও আমরা এখন হারিয়েছে। ফলে একটা শিল্প বা সাহিত্য এখন আর জাগ্রত করে না বিবেককে। অন্যদিকে ভিডিওটি বের হবার পর পরই গানের মডেল সিনেমার অফার পান একাধিক। কিন্তু প্রীতমের এ্যলবামটি সিডি হিসেবে বের হয় না। আমাদের মহান রাজনীতিবিদদের প্রতি এমন অবজ্ঞা ও স্যটায়ার প্রকাশের জন্য কিন্তু উচিত গানটাকে নিষিদ্ধ করা। তবে উসিলা হিসেবে নিতে হবে, অশ্লীল মিউজিক ভিডিও প্রদর্শনীকে।thot-for-vhot-3

 এই গানটির সব আবেদন ইউটিউবেই শেষ। মানুষ প্রীতমকে ডাকবে না মঞ্চে এসে গানটা গাইতে। প্রীতম তার গান দিয়ে কিছু প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল সব সময়। ছিল প্রেম, ছিল দ্রোহ। কিন্তু আমরা বুঝিই না। সে চেয়েছিল জেগে উঠুক বিবেক। কিন্তু সে দরজা তো বন্ধ প্রজন্ম ধরেই। ফলে প্রীতম নচিকেতার সাথে তুলনাটা পছন্দ না করলেও, নচিকেতার ‘হাওয়া বদল’ এ্যলবামের একটা গানের কয়েকটা লাইন তাকে উৎসর্গ করতে চাই:

আমি অনেককে দিই জলাঞ্জলি, অনেক কিছুই ধরি

সবাই বলে অকাজ, আমি অন্ধের দেশে চশমা বিক্রি করি

…….

সবাই যখন নীরব, আমি একা চিৎকার করি

তোমরাই বলো অকাজ, আমি অন্ধের দেশে চশমা বিক্রি করি

……

তোমরা জানতে চাইবে এতে আমার কিসে লাভ

হয়ত আমি বলবো এটা আমার স্বভাব

আমি উজান স্রোতে কাটব সাতার, ছেড়ে সোনার তরী

মরাই বলো অকাজ, আমি অন্ধের দেশে চশমা বিক্রি করি

 লেখক: মিডিয়াকর্মী

 

গানটির ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Check Also

Samina-Monir

দুলাভাই জিন্দাবাদ ছবির গানে সামিনা চৌধুরী-মনির খান

মিডিয়া খবর:- গুণী নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত নতুন ছবি ‘দুলাভাই জিন্দাবাদ ছবির জন্য দীর্ঘদিন …

Abul-Hayat-Rifa

মিউজিক ভিডিওর মডেল আবুল হায়াত

মিডিয়া খবর:- মিউজিক ভিডিওর মডেল হলেন আবুল হায়াত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares