Home » প্রোফাইল » শাহ আবদুল করিম : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা
shah abdul karim

শাহ আবদুল করিম : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

Share Button

মিডিয়া খবর:-      -: সুমনকুমার দাশ:-

বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম  এর ৫ম প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। 

১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯। রোদঝলমলে সকাল। হঠাৎ শুনলাম বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম আর নেই। চোখের পলকে যেন রং-রূপ-রস-গন্ধে ভরা জীবনটা হয়ে গেল বর্ণহীন, ফিকে। পৃথিবী যেন স্তব্ধ মনে হলো। এই সাধকের জীবন ও দর্শনে আমি বহুকাল বাঁধা পড়ে আছি। সেই বন্ধন থেকে জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত বোধেরÑশাহ আবদুল করিম মরতে পারেন না।
যে বাঁধনে শাহ আবদুল করিম আমাকে বেঁধেছিলেন, সেই একই বাঁধনে বাঁধা পড়েছিলেন শত-সহস্র মানুষ। মৃত্যুর পর যখন তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় সিলেটের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে, তখন হাজারো বাউল-অনুরাগী ভিড় জমিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে কাঁদতে পারিনি আমি। গলার কাছে দলা পাকিয়ে ছিল গুমোটবাঁধা কান্নার বাষ্প। আমি কোথায়-কার কাছে যাব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনে আছে, কেউ একজন আমাকে টেনে নিয়েছিলেন বুকে। অঝরে কেঁদেছিলাম আমি। সংবিত্ ফিরে পেলাম যখন, তখন দেখি অপেক্ষমাণ হাজারো বাউল-অনুরাগী দুপুরের কড়কড়ে রোদে দরদর করে ঘামছেন। কারও কারও ঘাম আর অশ্র“তে একাকার হয়ে গেছে পুরো মুখায়ব।Shah-abdul-ka
করিমের অন্যতম প্রিয় দুই শিষ্য আবদুর রহমান ও রণেশ ঠাকুরের নেতৃত্বে বাউলেরা শহিদবেদিতে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে খালি গলায় গাইছিলেনÑ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু ছেড়ে যাইবায় যদি…’। আবেগপ্রিয় লোকজন এ গান শুনে কান্না সামলাতে পারেননি। অঝরে যেন শ্রাবণের বৃষ্টি নেমেছিল সবার চোখ থেকে। কাউকে ভালোবেসে হারানোর কষ্ট সেদিনই প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম।
সেই ছোটোবেলা থেকে আবদুল করিমের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। যখন স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করি, তখন সুরে-বেসুরে দলবেঁধে বন্ধুরা গাইতাম ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’সহ তাঁর লেখা কত শত গানের পঙ্ক্তি। করিমের গানে এভাবেই নিমজ্জিত হয়েছিলাম। তিনি ছিলেন আমাদের পাশের উপজেলা দিরাইয়ের উজানধল গ্রামের বাসিন্দা। ফলে গানের আসর কিংবা চলতে-ফিরতে তাঁর সঙ্গে প্রায়শই দেখা হতো। কিন্তু ঘনিষ্ঠতাটা হয়ে উঠছিল না। পরে যখন স্কুল পাস করে নিজ জেলা সুনামগঞ্জ ছেড়ে সিলেটের নামকরা কলেজে ভর্তি হই, তখন মানুষের মুখে মুখে শাহ আবদুল করিমের নাম অনন্য মর্যাদায় উচ্চারিত হতে শুনি।
সুনামগঞ্জের বাইরে এত এত মানুষ শাহ আবদুল করিমকে ভালোবাসে, সেটা লক্ষ করে উদ্বেলিত হয়েছিলাম। আমি তখন নিজেকে তাঁর এলাকার মানুষ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেছি। ধীরে ধীরে তাঁর গান নিয়ে পঠনপাঠন বাড়িয়ে দিলাম। একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হলো। এই সম্পর্ক একসময় ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিল। সেই ঘনিষ্ঠতা ও ভালোলাগা থেকেই তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে একের পর এক গ্রন্থ রচনা করি। এভাবেই করিমের জীবন ও সংগীতের সঙ্গে নিজেকে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধে ফেলি। করিমের বাউলগানের বিপুল সৃষ্টির মায়ামোহে পড়েই জড়িয়ে পড়ি বাউলগানের শুলুক সন্ধানে।
শাহ আবদুল করিম ছিলেন বাংলা বাউলগানের সর্বশেষ কিংবদন্তিতুল্য মহাজন। তাঁর লেখা ও সুর করা অন্তত শতাধিক গান বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুখে মুখে ফেরে। প্রায় পাঁচ শতাধিক গানের রচয়িতা এই নমস্য বাউলসাধক ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি জন্মগ্রহণ করেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় ১২ বছর বয়সেই গ্রামের মোড়ল বাড়িতে রাখালবালক হিসেবে চাকরি নেন। গরু রাখালির ফাঁকে ফাঁকে বাউলগানে আকৃষ্ট হয়ে সে পথেই জড়িয়ে যান। এরপর কেবলই ইতিহাস। গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে রাখালবালক থেকে ‘বাউলসম্রাট’ অভিধায় ভূষিত হয়েছেন। পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক : লোকসংস্কৃতি গবেষক-কবি-প্রাবন্ধিক।

Check Also

jafor iqbal hero

নায়ক জাফর ইকবাল শুভ জন্মদিন

মিডিয়া খবর :- শুভ জন্মদিন আমাদের নায়ক (জাফর ইকবাল). আশির দশকের রূপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা …

s-m-solaiman-1

থিয়েটারের স্বজন এস এম সোলায়মান

মিডিয়া খবর:-        -: কাজী শিলা :- এস এম সোলায়মান থিয়েটারের আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares