Home » টিভি নাটক » এভাবে চললে বাকি দর্শকও হারাব
TV-PLAY

এভাবে চললে বাকি দর্শকও হারাব

Share Button

ঢাকা:-

-: আফজাল হোসেন মুন্না :-

ঈদ এলেই নানা আয়োজনে মুখরিত হয়ে উঠে দেশি বিদেশি বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। এসব আয়োজনের মধ্যে টিভি নাটক ও টেলিফিল্মগুলোর দর্শকপ্রিয়তাই বোধহয় বেশি। তাই ঈদ আয়োজনে দর্শকরা টিভি পর্দায় একটু আলাদা কিছু-ই  আশা করেন। সারা বছর যা পাওয়া যায় না এমন কিছু। তাই নাটক টেলিফিল্মগুলোকে সমালোচনার সম্মুখিন হতে হয়। 
প্রথমেই যে ব্যপারটা লক্ষ্যনীয় তা হচ্ছে, প্রতিবার ঈদের পরে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা এবং সমালোচনাগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, বাংলা টিভি নাটকের মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে বলেই বেশিরভাগ মানুষ মনে করছেন। ব্যাপারটা ভেবে দেখার যথেষ্ঠ দাবী রাখে।
গত চার বছরের ঈদের টিভি নাটক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিভিন্ন চ্যানেলে ঈদের অনুষ্ঠান চলে ৬-৭ দিন। তবে এসব অনুষ্ঠান কতটুকু দর্শক চাহিদা আর ব্যবসাসফল তা অবশ্য আলাদা বিষয়। সপ্তাহ জুড়ে এ আয়োজন নিয়ে প্রতিটি টিভি চ্যানেলের কর্তাদের দাবী তারা প্রতিটি অনুষ্ঠানই সবোর্চ্চ মান রাখার চেষ্টা করেছে। তাই যদি হয় তবে এত অভিযোগ কেন? বিশেষ করে টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম নিয়ে। 

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ চ্যানেলে-ই এই ৬-৭ দিনে খুব ভালো মানের নাটক/টেলিফিল্ম দৈনিক প্রচার করে কমপক্ষে ৬-৭টি। কিংবা প্রত্যেকটি টিভি চ্যানেলই প্রতিদিন অন্তত একটা করে মানসম্মত ও দর্শকপ্রিয় নাটক/টেলিফিল্ম প্রচার করে। কিন্তু বাদ বাকি নাটক/টেলিফিল্মগুলো বিভিন্ন ধরনের হয়, যার দর্শক ভিন্ন ভিন্ন রুচির। স্বাভাবিকভাবেই এক শ্রেণীর দর্শক এসব নাটক/টেলিফিল্ম গ্রহন করে অন্য শ্রেণী করে না। এছাড়াও আরেক ধরনের নাটক/টেলিফিল্ম প্রচারিত হয় যা, কোনো মহলেই প্রশংসা পায় না। এবার আসি এবারের ঈদ প্রসঙ্গে।

উপরোক্ত ফর্মুলা মেনেই এ বছরও প্রতিটা চ্যানেলে ৭-৮টি করে টিভি নাটক/টেলিফিল্ম প্রচারিত হয়েছে। যা সর্বমহলে প্রশংসা পেয়েছে। কিছু নাটক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এক শ্রেণীর দর্শকের কাছে। আবার এমন কিছু টিভি নাটক/টেলিফিল্ম প্রচারিত হয়েছে যা দেখে সাধারণ দর্শক থেকে সমালোচক, সবার-ই প্রশ্ন বিশেষ দিনে এত নিম্নমানের টিভি নাটক প্রচার হয় কিভাবে?

ভালো মানের দশটি চ্যানেলে দৈনিক একটা করেও ভালো মানের টিভি নাটক প্রচার হলে ধরে নেয়া যেতে পারে এই ঈদে ভালো টিভি নাটক/টেলিফিল্ম এর সংখ্যা ৭০টি। যদিও আমরা সবাই জানি, এ সংখ্যাটা আরো কম। প্রশ্ন এই টিভি নাটক/টেলিফিল্মের বৈশিষ্ট্যগুলো কি ছিল? তারকা নির্মাতা নাকি বহু তারকার সমাবেশ?

আমার মতে, প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গুছিয়ে গল্প বলার আলাদা ঢং এবং ভালো নির্মান। আমরা যারা কথায় কথায় সব গেল গেল বলে রব তুলি, তাদের জন্য বলি এই ঈদে অসাধারণ কিছু কাজ হয়েছে, যেগুলোর গল্প, গল্প বলার ধরন, আধুনিক সিনেমাটোগ্রাফী, লাইটিং প্রভৃতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ভালো কাজগুলো এসেছে নতুন পুরোনো সবার হাত থেকেই। এমনকি অনেক দর্শকেও আক্ষেপ করতে দেখেছি এই বলে যে, এই টেলিফিল্মটি টিভির জন্য না বানিয়ে অনায়েসে বড় পর্দার জন্য বানানো যেত। 

এ বছর সাইলেন্ট মুভি (টেলিফিল্ম) হয়েছে, প্যারালাল টাইম, প্যারালাল স্টোরী টেলিং হয়েছে, অসাধারণ থ্রিলার হয়েছে, কিছু কাজে নয়া ফিল্মের প্রভাব দেখা গেছে। নির্মাতারা গল্প বলেছেন সৎ ও সাহসীকতার সঙ্গে। কিছু প্রোডাকশনে সিনেমেটোগ্রাফী, কালার গ্রেডিং হয়েছে একেবারে আন্তর্জাতিক মানের। কিছু পরিচালক তার কাজে দেখিয়েছেন ভালো ফিল্ম উপহার দেওয়ার সম্ভাবনা।

এবার আসি দ্বিতীর ধরনের কাজগুলোর ব্যাপারে। এই শ্রেনীর কাজগুলো সমালোচকদের মনে না ধরলেও বিভিন্ন শ্রেণীর দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। এর কারণ কখনো বহু তারকার উপস্থিতি, কখনো তা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের গল্প আবার কখনো বা হাস্যরসটাই প্রধান।

এবার আসি তৃতীয় ধরনের নাটক/টেলিফিল্ম প্রসঙ্গে। এই ধরনের নাটক নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোতে। প্রশ্ন উঠেছে এই নাটক/টেলিফিল্মের পেছনের মানুষ ও চ্যানেল কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাও দর্শকদের করেছেন হতাশ। প্রশ্ন জাগে কেন এমন হলো!
 
এই সমালোচিত নাটক/টেলিফিল্মগুলোর বড় একটি অংশ প্রচার হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানী বা এজেন্সির আর্থিক অনুকুলে। দেখে মনে হয়েছে, বিজ্ঞাপনের ভেতর বিজ্ঞাপন চলছে। সেই সঙ্গে আছে সময় বা চরিত্রকে কদর্যভাবে উপস্থাপন করার প্রবনতা। এমনকি কিছু নাটক/টেলিফিল্ম নতুন প্রজন্মকে করেছে প্রশ্নের সম্মুখীন। কারণটা খুব স্বাভাবিক। একটি সৃজনশীল কাজে ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থে বিজ্ঞাপন প্রচার করাকে বড় করে দেখলে এবং কাজটাকে নিজেদের মতো ম্যানুপুলেট করলে সেটা সৌন্দর্য হারাবেই। এতে হয়তোবা দর্শক সংশ্লিষ্ট নির্মাতার উপর থেকে বিশ্বাস হারাবে। যার ফলে পরবতীর্তে দর্শক স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। 

এই নাটক/টেলিফিল্মগুলোর অভিনেতা অভিনেত্রীদের দেখে মনে হয়েছে একজন আরেকজনের চাইতে খারাপ অভিনয় করার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। মনে হয়েছে, বিকৃত বাংলা উচ্চারণই স্মার্টনেস! খুব অনায়াসে গল্পের গরু গাছে উঠছে আর নামছে। এটা অভিনয় বা বাস্তবতা নয়, হাস্যকর ন্যাকামিটাই এই নির্মানগুলোর অলংকরণ। কিছু প্রোডাকশন দেখে মনে হয়, নিছক শুটিং শুটিং খেলা চলছে!
এছাড়াও বেশ কিছু মানহীন নাটক/টেলিফিল্ম প্রচার হয়েছে, যার দায়ভার সরাসরি চ্যানেল কর্তৃপক্ষের উপরই বর্তায়। প্রশ্ন জাগে এই মানহীন নাটক/টেলিফিল্মগুলোর বৈশিষ্ট কি ছিল?ন প্রথমেই বলা যায়, অতি দুর্বল গল্প, নির্মান শৈলী, সম্পাদনা ও অভিনয়। এগুলোর মান নিয়ে সাধারণ দর্শকরাও বিরক্ত। প্রতি ঈদে এত এত সমালোচনা ও লেখালিখি হবার পরেও এই ধরনের কাজগুলো প্রচার হয় কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায়!

ভালো মন্দ মিলিয়ে এবারের ঈদে প্রধান অভিযোগ দীর্ঘ বিজ্ঞাপন বিরতী। একটা ৪৩ মিনিটের নাটক দেখতে গিয়ে বিজ্ঞাপন বিরতীতে কিছু দর্শক গল্প থেকেই মনোযোগ হারিয়েছে, আর কিছু দর্শক চ্যানেল বদলে ফেলেছে। অভিযোগ আছে নাটকের দৈর্ঘ্যের চাইতে বিজ্ঞাপনের দৈর্ঘ্য বেশি ছিল। নির্মাতারা প্রতিবার চুপ থাকলেও এবার অনেকেই এই ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছে, তাদের নাটকের দৈর্ঘ্য ৫-১০ মিনিটের মতো চ্যানেল থেকেই কমিয়ে দেয়া হয়েছে পরিচালকে না জানিয়ে-ই। একটা সৃষ্টিকর্মকে ছাটার অধিকার কারো নাই, একমাত্র নির্মাতা ছাড়া বা তার অনুমতি ছাড়া। এই বোধটুকু পর্যন্ত হারিয়েছে কিছু টিভি চ্যানেল।

কিছু নির্মাতা নাটক না বানানোর ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছেন। কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন,  বিজ্ঞাপনচিত্র বানাতে। কেউ বা ফিল্ম তৈরিতে ব্যস্ত। একদিকে আমাদের দর্শকের অনুপাতে চ্যানেল বেশি হওয়ায় কমেছে বিজ্ঞাপন রেট, কমেছে নাটকের বাজেট। কেউ কেউ বানিয়ে যাচ্ছেন নিজের পকেটের টাকা গচ্ছা দিয়ে। এই অবস্থায় যদি দর্শককে ‘বিজ্ঞাপনের ফাঁকে নাটক’ দেখতে হয়, সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নাটক/টেলিফিল্মের দর্শক আরো কমে যাবে। বাড়বে বিদেশি চ্যানেলের দর্শক। এই মহা সত্য বার বার বলার পরেও চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার নিয়েই বেশি ব্যস্ত!

এই বলে শেষ করতে চাই, চ্যানেল কর্তৃপক্ষ শুধু বিশেষ দিন নয় বছরের বাকি দিনগুলোতেও নাটক/টেলিফিল্ম বাছাই এর ব্যপারে আরো যত্নশীল হবেন। ভালো চ্যানেলগুলো যৌথভাবে বিজ্ঞাপন রেট বাড়িয়ে বিজ্ঞাপনের সংখ্যা কমিয়ে আনবেন নয়তো অনেক ভালো কাজ থেকেও দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিবে। 

এছাড়া ভালো কাজের ক্ষেত্রে বাজেট হচ্ছে বড় অন্তরায়। নিয়মিত ভালো নির্মাণ চাইলে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বাজেটের ব্যাপারে কিছুটা উদার হবেন এমনটাই প্রত্যাশা। সেই সঙ্গে নির্মাতারা কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়ে, নিজের মতো করে গল্প বলবেন। আমার বিশ্বাস, যারা সময়ের স্রোতে গা না ভাসিয়ে প্রভাবমুক্ত থেকে নিজের মতো কাজ করতে পারবে, তারাই একদিন বাংলা চলচ্চিত্রকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবে।

পুনশ্চ : প্রিয় পাঠক, শেষ করার আগে আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। আমি সাধারণত বিশেষ দিবসের জন্য নির্মানে আগ্রহী নই। কারণ আমার ধারণা মানুষ ওই সময় যথেষ্ট স্থির থাকেন না। গল্পে অমোনযোগী থাকেন। একবার পহেলা বৈশাখে আমার টেলিফিল্ম অন এয়ার হলো। ৭০ মিনিটের প্রোডাকশনে ৭৪ মিনিট বিজ্ঞাপন দেখানো হলো। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম একজন দর্শকও টেলিফিল্মটি দেখেনি। ফেসবুকে, মোবাইলে ম্যাসেজ আসতে থাকল আমি মনে মনে হাসলাম। একেকজন না দেখেই আমাকে খুশি করার জন্য পাঠাচ্ছে হয়তো! পরের সপ্তাহের শুরুতে আর শেষে দুইজন অপরিচিতা দেখা করলেন। গল্পে মিল হলো না কেন এ নিয়ে তাদের মহা অভিযোগ! আমার সন্দেহ রয়েই গেল। আমি খুটিয়ে খুটিয়ে গল্পের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্ন করলাম। তারা ঠিকঠাক উত্তর দিলেন। আমি অবাক হলাম ৭৪ মিনিটের বিজ্ঞাপন সহ্য করেও ৭০ মিনিটের টেলিফিল্ম দেখার দর্শক আছে!

চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ এখনো অনেক মানুষ বিদেশী চ্যানেলের ভিড়ে বাংলা টিভি নাটক-টেলিফিল্ম বিজ্ঞাপনের যন্ত্রনা সহ্য করেও দেখে। কিন্তু এভাবে চললে এই দর্শকটাও আমরা হারাব। দর্শকদের এমনভাবে কোণঠাসা করবেন না, যাতে তারা বিদেশী চ্যানেলে আরো ঝুঁকে পড়ে।

লেখক : টিভি নাটক নির্মাতা ও চলচ্চিত্র কর্মী।

(কৃতজ্ঞতায়- রাইজিংবিডি)

– See more at: http://www.risingbd.com/detailsnews.php?nssl=2ffa4f0ce849ecc17cddde7b441c8037#sthash.ZY5Y2QDV.dpuf

Check Also

monpura

টিভি পর্দায় আবারও চঞ্চল চৌধুরী ও ফারহানা মিলি

মিডিয়া খবর:- আবারও একসঙ্গে অভিনয় করছেন মনপুরা’ জুটি চঞ্চল চৌধুরী ও ফারহানা মিলি । নাটকের …

Litu-anam-chadni

লিটু আনাম-চাঁদনীর টিভি নাটক মায়াজাল

মিডিয়া খবর:- মায়াজাল নাটকে জুটিবদ্ধ হলেন লিটু আনাম ও চাঁদনী। লিখেছেন মোহাম্মদ নোমান। আজ বৃহস্পতিবার রাত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares