Home » প্রোফাইল » হুমায়ুন আজাদ: নিঃশব্দ প্রস্থানের দশ বছর
Humayun-Azad

হুমায়ুন আজাদ: নিঃশব্দ প্রস্থানের দশ বছর

Share Button

ঢাকা:-

-: বিপুল হাসান :-

হুমায়ুন আজাদ, বাংলাদেশের এমন একজন সাহিত্যিক যিনি তার লেখায় শ্রদ্ধা-আবেগ-প্রথার চেয়ে যুক্তিকেই মূল্য দিয়েছেন। এ জন্যই বোধকরি যুক্তিহীন আক্রোশের শিকার হওয়ার পর বড় অভিমানে প্রিয় স্বদেশ থেকে বহুদূরে একাকী মৃত্যুকে তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন। বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ আজ থেকে নয়বছর আগে ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট জার্মানির মিউনিখ শহরে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে ঐ বছর ২৭ ফেব্রয়ারি হুমায়ুন আজাদ একুশে বই মেলায় উগ্র মৌলবাদীদের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। সেই ভয়াবহ পাশবিক হামলার ক্ষত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে বহন করে যেতে হয়েছে।Humayun-Azad.jpg1 

বাংলাদেশে সাহিত্যে হুমায়ূন আজাদই ছিলেন একমাত্র বীরপুরুষ যিনি মনেপ্রাণে সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠেছিলেন প্রথাবিরোধী। তার সমস্ত বই, প্রবন্ধ, কবিতা সৃষ্টি হয়েছে প্রথাকে অস্বীকার করে। তার প্রবচনগুচ্ছ এদেশের যুক্তিবাদী পাঠক সমাজকে করে তুলে সচেতন, আর যুক্তিহীন ভন্ডদের করে তুলে ক্রুদ্ধ। ড. হুমায়ূন আজাদ ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি সবচেয়ে বেশি আক্রমন করেছিলেন বাঙালিকে। এর স্বপক্ষে তার জবাব ছিল, তিনি এই গোত্রেরই মানুষ, তাই এ জাতির কাছে তার প্রত্যাশা অনেক; কিন্তু যখন দেখেন বাঙালি অনিবার্যভাবে পতনকেই বেছে নিচ্ছে তখন তিনি তার সমালোচনা করেন। একটি বিশুদ্ধ পবিত্র বাঙলাদেশ চেয়েছিলেন তিনি, যে দেশে কোন স্বাধীনতা বিরোধী থাকবে না। ধর্মব্যবসায়ীরা ফতোয়া দেবে না, যে দেশে ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না সেই দেশটিতে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মৌলবাদীরা স্বপ্নকে সত্যি হতে দেয়নি। তাকে হত্যার মধ্য দিযে, মৌলবাদীরা প্রমাণ করল এদেশে তারা যা চায় তাই হয়। তাই মুক্তচিন্তার সব পাঠকই বিশ্বাস করে হুমায়ূন আজাদের মৃত্যু কোন আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড

হুমায়ুন আজাদের জন্ম মুন্সিগঞ্জের রাঢ়িখাল গ্রামে। জন্ম তারিখ ১৩৫৪ সালের ১৪ বৈশাখ, ইংরেজি ১৯৪৭ -এর ২৮এপ্রিল। তার আসল নাম হুমায়ুন কবীর, লেখার জন্য নাম বদল করেন, পরে শপথ পত্রের মাধ্যমে স্থায়ী করে নেন। তারা ছিলেন তিন ভাই দুই বোন। ছোটবেলা থেকে বই পড়া ছিল তার নেশা। টুকটাক লিখতেন ছোটবেলা থেকেই। হুমায়ুন আজাদের শৈশবের পড়ার ঘরের সামনে ছিল একটি কদম গাছ। বর্ষায় ফুল ফুটে ওটি রুপসী হয়ে উঠতো। এইট নাইনে পড়ার সময এটিকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন। যাতে কোন কাহিনী ছিল না, ছিল শুধু রুপের বর্ণনা। প্রথম পড়া উপন্যাস আনোয়ারা। যে দুটি উপন্যাস পাগল হযে পড়েছিলেন সে দুটি হলো শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ ও দত্তা। রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা থেকে মুখস্থ করেছিলেন অজস্র কবিতা। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় কবিতা লেখার শুরু, কিন্তু প্রথম ছাপা হয়েছিল গদ্য -কচিকাচার আসরে। কচুরিফুল ছিল তার চোখে সবচেযে সুন্দর ফুল, বর্ষায় পুঁটি মাছের রুপালী ঝিলিক তার চোখে ছিল অপরুপ সৌন্দর্য। ক্লাস এইটে উঠে প্রথম বিড়ি খাওয়ার অভিজ্ঞতা। ছেলেবেলা থেকেই তিনি বড় হয়ে উঠেছেন শক্তিমানদের মূল্য না দিয়ে, হয়ে উঠেছিলেন প্রথা বিরোধী। ছোট বেলা থেকেই তিনি সৌন্দর্যকে উপভোগ করেছেন, তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে কিশোর কবির দৃষ্টিতে। ক্লাস টেনে উঠে তিনি প্রথম হয়েছিলেন, এটি ছিল তার কাছে একটি সাড়া জাগানো ঘটনা।

মেট্রিক পরীক্ষায় সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে ২১তম হয়েছিলেন। একটিই বোর্ড ছিল তখন “ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড”। তার পর অনিচ্ছায় ঢাকা কলেজ, বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি যদিও শওকত ওসমান ছাড়া আর কোন শিক্ষকই দাগ কাটতে পারেননি তার মনে। জীবনের সবচেয়ে খারাপ ফল ছিল এটাই দ্বিতীয় শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা।

এরপর ১৯৬৪ সালে ভর্তি হন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায়। অনার্সে হুমায়ুন আজাদ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে এমএ’তেও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময়টাতে এ সময় লিখেছেন প্রচুর গদ্য ও পদ্য। ভুগেছেন নিঃসঙ্গতায়, কামনায়, ডুবেছেন জ্ঞানে ও শিল্পকলায়। ১৯৬৯ সালেরই আগষ্ট মাসে যোগ দেন চট্টগ্রাম সরকারি মহাবিদ্যালয়ে। ১৯৭০-এ ফেব্রুয়ারিতে যোগ দান করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসাবে, ডিসেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে। ১৯৭৩-এ কমনওয়েলথ বৃত্তি পেয়ে চলে যান এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচ.ডি করার জন্য। এ বছরেই প্রকাশ পায় তার কবিতার বই “অলৌকিক ইষ্টিমার”। ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন সহপাঠী লতিফা কোহিনূরকে, টেলিফোনে। ১৯৭৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন Pronominalization in Bengali অভিসন্ধর্বটির জন্য। ১৯৭৭ থেকে তিনি পুরোপুরি প্রবেশ করেন লেখালেখির জগতে।

হুমায়ুন আজাদের মধ্যে ছিল বহুমাত্রিক সত্তা এবং প্রতিটি সত্তাই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তিনি ভাষা বিজ্ঞানী, ভাষা বিজ্ঞানের মতো দূরুহ কাজটি তিনি করেন অবলিলায় আবার একই সাথে কবিতা সাহিত্য, উপন্যাস লিখেন অনায়াসে। প্রতিটিতেই রয়েছে সৃজনশীলতা ও মননশীলতা । খন তিনি কবিতা বা উপন্যাস লিখেন তখন তার মধ্যে শিল্পীসত্তা প্রকট আর যখন তিনি প্রবন্ধ লেখেন তখন মননশীলতা প্রবল।

হুমায়ুন আজাদ মূলত একজন কবি ছিলেন, যদিও তিনি সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন সফলভাবে, কিন্তু তাঁর কবি সত্ত্বাটি কখনো তাকে ত্যাগ করেনি। তাঁর লেখাগুলো বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যায় তিনি অতিমাত্রায় শব্দ সচেতন যা একজন কবির অনিবার্যগুণ। তাই তিনি শব্দকেই বেছে নিHumayun-Azad.jpg2য়েছিল অব্যর্থ অস্ত্র হিসাবে এবং এখানেও তিনি সফল পুরো মাত্রায়। বিজ্ঞানের যুগে মধ্যযুগীয় বিশ্বাস, রীতি সংস্কার, প্রথা, ট্যাবু ইত্যাদিকে হুমায়ূন আজাদ প্রচন্ডভাবে আক্রমন করেছেন তার কবিত্বময় ভাষায়, ভন্ডদের দাড় করিয়েছেন যুক্তির কাঠগড়ায়। ৫৮ বছর বয়সে ক্লান্তিহীনভাবে তিনি সৃষ্টি করেছেন ৬০টির বেশি গ্রন্থ যার কোনটিও অগুরুত্বপূর্ণ নয়। মৃত্যু এসে সহসা এই মানুষটির সৃষ্টিশীলতার গতিপথ রুদ্ধ করে দিল।

হুমায়ুন আজাদ এদেশের প্রথম সাহিত্যিক যিনি প্রাণ দিয়েছেন একটি রাষ্ট্রীয় অধিকারের জন্য সেটি হলো, মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কতটা সুপরিকল্পিত উপায়ে, একজন সাহিত্যিককে এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া যায় তার ইতিহাস বোধ হয় বর্তমান সভ্যতায় বিরল।  হুমায়ূন আজাদের উপন্যাস “পাক সার জমিন সাদ বাদ”, প্রকাশের পর থেকেই যেখানে পত্রিকায়, মিছিলে মিটিং এ এমনকি সংসদে দাড়িয়ে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হচিছল। তিনি নিজেও এ বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। সেই উদ্বেগই সত্যে পরিণত হলে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এ দিন সন্ধ্যায় একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর মৌলবাদীরা তার উপর অতর্কিত আক্রমন করে। মারাত্মকভাবে জখম করে এই মুক্তচিন্তার লেখককে। গুরুতর অবস্থায় তাকে সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সরকার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে পাঠায়।

হামলার ৪/৫ বছর পর জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ নামের ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান হুমায়ুন আজাদ এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করেছিলেন।

হুমায়ুন আজাদ উন্নত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ৈ দেশে ফিরে আসার পরও মৌলবাদীরা তার পিছু ছাড়ে নি। তাকে টেলিফোনে, উড়ো চিঠির মাধ্যমে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে। এই মানসিক অশান্তির নিয়ে হুমায়ূন আজাদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীকে খোলা চিঠি লেখেন। কিন্তু কেউ-ই তার গুরুত্ব দেন নি।

আক্রান্ত হওয়ার বছর দুয়েক আগে জার্মান সরকারের কাছে সেদেশের কবি হাইনরিশ হাইনের ওপর গবেষণা করার জন্য একটি আবেদন জানিয়েছিলেন হুমায়ূন আজাদ। এই অস্বস্তিকর সময়ে জার্মান সরকার তার রিচার্সের জন্য অনুমোদন দেয়। ২০০৪-এর ৭ আগস্ট গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানি যান। ১১ আগস্ট রাতে জার্মান কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের দেওয়া একটি পার্টি থেকে ভালোভাবেই নিজের ফ্ল্যাটে ফিরেন। এ রাতেই কোনো একসময় হুমায়ুন আজাদ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। ১২ আগস্ট ভোরে ফ্ল্যাটের নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর জার্মান সরকারের তত্ত্বাবধানে মিউনিখে তার এপার্টমেন্টে পাওয়া সব জিনিসপত্র ঢাকায় তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই জিনিসপত্রের ভেতরেই পাওয়া যায় তার হাতের লেখা তিনটি চিঠি। চিঠি তিনটি আলাদা তিনটি পোস্ট কার্ডে লিখেছেন বড় মেয়ে মৌলিকে, ছোট মেয়ে স্মিতাকে এবং একমাত্র ছেলে অনন্য আজাদকে। অনুমান করা হয়, ওই লেখার অক্ষরগুলোই ছিল তার জীবনের শেষ লেখা।

হুমায়ুন আজাদ নেই; আমরা যারা আছি, এটুকু আশা নিয়ে আছি : তাঁর মৃত্যু এক ধরনের পুনর্জন্মের গান। তিনি উদাহরণ হয়ে আছেন নির্ভীক শহীদের, আত্মত্যাগকারী, মৃত্যুকে মহিমা দানকারী, প্রতিবাদী এক মহাপুরুষ হিসেবে।

হুমায়ুন আজাদের কিছু গ্রন্থ :

* অলৌকিক ইষ্টিমার
* লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী
* জ্বলো চিতাবাস
* শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা
* Pronominalization in Bengali
* বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র
* বাক্যতত্ত্ব
* সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। ফুলের গন্ধে ঘুম আসেন।
* যতোই গভীরে যাই মধু মতোই উপরে যাই নীল।
* কতোনদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী।
* ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল
* আমাদের শহরে একদল দেবদূত।
* আমার অবিশ্বাস
* সীমাবদ্ধতার সূত্র।
* নারী।
* দ্বিতীয় লিঙ্গ।
* ধর্মান্তভূতির উপকথা ও অন্যান্য।
* আধার ও আধেয়।
* আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম।
* মানুষ হিসাবে আমার অপরাধ সমূহ।
* শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার।
* সবকিছুর ভেঙ্গে পড়ে।
* কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ।

(গ্রন্থ তালিকা অসম্পূর্ণ)

সূত্র : প্রতিমুহূর্ত ডটকম

Check Also

jafor iqbal hero

নায়ক জাফর ইকবাল শুভ জন্মদিন

মিডিয়া খবর :- শুভ জন্মদিন আমাদের নায়ক (জাফর ইকবাল). আশির দশকের রূপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা …

s-m-solaiman-1

থিয়েটারের স্বজন এস এম সোলায়মান

মিডিয়া খবর:-        -: কাজী শিলা :- এস এম সোলায়মান থিয়েটারের আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares