Home » সাহিত্য » কবিতা » ডাকঘরহীন দেশ এক

ডাকঘরহীন দেশ এক

Share Button

মিডিয়া খবর :-

ডাকঘরহীন দেশ এক

মূলঃ আগা শাহিদ আলী
তর্জমাঃ আজফার হোসেন

[আগা শাহিদ আলী (১৯৪৯—২০০১) কাশ্মীরি কবি। এবং আমার প্রিয় কবি। তাঁর যে কবিতাটি অনুবাদ করেছি এখানে, তা তিনি ইংরেজিতে লিখেছিলেন। অনুবাদে বাংলা ভাষার দাবি মেটাতে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অতিরিক্ত শব্দ জুড়ে দিতে হয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্তবকের লাইন-সংখ্যাও সামান্য বাড়াতে হয়েছে। আর এখানে-সেখানে খানিকটা ভাবানুবাদেরও আশ্রয় নিতে হয়েছে, তবে কবিতার মূল বক্তব্য, কাঠামো ও স্পিরিটকে মোটেই ক্ষুন্ন করে নয়। – আজফার হোসেন]


আবারো ফিরেছি এই দেশে
যেখানে দেখলাম সমাহিত হয়েছে মিনার এক।
কেউ একজন সরষের তেলে ভিজিয়ে নেয় কাদা–দিয়ে–তৈরি
বাতিটার শলতে, প্রতিটি রাতে তার পদক্ষেপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে
গ্রহের ওপর আঁচড়ে লেখা বার্তা সব পড়ে নেয়ার জন্য।
তার আঙুলের ছাপ বাতিল করে দেয় ব্যাংকের স্ট্যাম্পগুলো
অভিশপ্ত ঠিকানা–লেখা চিঠিগুলোর সেই মহাফেজখানায়ঃ
প্রতিটি বাড়ি মাটির গর্ভে বিলীন কিংবা ফাঁকা।

ফাঁকা? কারণ কতশত মানুষ পালিয়েছে, গেছে চলে
আর শরণার্থী হয়েছে সেখানে, সমতলগুলোতে,
যেখানে পাহাড়গুলোকে কাঁচে বদলিয়ে নেয়ার জন্য
তারা ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ঝরাবে চূড়ান্ত শিশির। তারা দেখবে
আমাদেরকে তাদের ভেতর দিয়েই—দেখবে কি হন্যে হয়ে আমরা
তাদের ঘরবাড়ি কবর দিয়েছি আগুন থেকে তাদের বাঁচাবার জন্য,
যে-আগুন দেয়ালের মত ধসে পড়ে। সৈন্যরা তাকে আলোকিত রাখে,
শাণিত করে অগ্নিশিখা, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয় আমাদের পৃথিবী
আকস্মিক শুকনো কাগজে আর আঠায়

সোনায় খচিত যা, পুড়ে ছাই। যখন মুয়াজ্জিন মরে গেলেন,
প্রতিটি ডাক তখন নগর থেকে ছিনতাই হলো, পাতার মত
এলোমেলো হয়ে উড়ে গেল ঘরবাড়ি, শুধু আগুনে ঝলসে যাওয়ার জন্য।
এখন প্রতিটি রাতে আমরা কবর দেই আমাদেরই ঘরবাড়ি—
তাদেরগুলোও, যেগুলো বিরান পড়ে ছিল।
আমরা বিশ্বস্ত। তাদের দরজায় ঝুলিয়ে রাখি ফুলের মালা।
আরও বিশ্বস্ত, প্রতিটি রাতে আগুন আবারও দেয়াল হয়
আর আমরা অন্বেষণ করি অন্ধকার যখন সে ভেঙ্গে পড়ে।


“আমরা রয়েছি আগুনের ভেতরে, খুঁজি অন্ধকার,”
রাস্তায় পড়ে–থাকা একটা কার্ড বলে উঠেঃ “আমি হতে চাই
সেই জন যে রক্ত ঝরায়। তোমার হাতকে ভেজাবার জন্য।
কিংবা আমারটা রেখে দেবো ঠাণ্ডায়, যতক্ষণ না বৃষ্টি
কালিতে রূপান্তরিত হয়, আর যতক্ষণ না আমার আঙ্গুলগুলো,
যন্ত্রণার ধারালো কিনারে, সিলগালা হয়ে বাতিল করে স্ট্যাম্পগুলো”।
রে পাগল পথপ্রদর্শক! পথ–হারানো মানুষেরা এভাবেই কথা বলে।
নাছোড়বান্দা হয়ে একটা দেশকে ভুতের মত ধেয়ে চলে তখনই
যখন সে দেশ কেবলই ছাই। ভুতুড়ে হৃদয়,

দোয়া কর সে যেন বেঁচে থাকে। বৃষ্টিতে ফিরে এসেছি
তাকে দেখব বলে, জানতে চাইব কেন সে কখনও চিঠি লেখেনি,
সঙ্গে এনেছি কিছু টাকা, নরম পশমের আঁকাবাঁকা নকশাকাটা
ঝকঝকে মুদ্রা, নতুন স্ট্যাম্প কিনব বলে, যা এর মধ্যেই দুর্লভ, খালি,
যার উপর কোনো জাতির নাম লেখা নেই। বাতি ছাড়াই তাকে খুঁজে ফিরি
অবলুপ্ত আর ফাঁকা বাড়িতে–বাড়িতে। হয়ত সে বেঁচে আছে,
খুলছে ধোঁয়ার দরজাগুলো, অন্ধকারে তার নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হচ্ছে
ছাইয়ের মত গানের এক ধুয়াঃ

“সব শেষ, অবশিষ্ট নেই কিছুই”।
নৈঃশব্দকে জোর করে আয়না বানিয়ে সেখানে নিশানার জন্য
তার কণ্ঠস্বরকে দেখে নিতে চাই। তরঙ্গায়িত হয়ে ধেয়ে চলেছে আগুন,
পার হব কি সেই নদী? প্রতিটি ডাকঘর বন্ধ, তক্তা দিয়ে ঢাকা।
তাহলে কে পৌঁছে দেবে নরম পোশাকের আঁকাবাঁকা প্যাটার্নে কাটা
পশুর চামড়া যাতে ফুটবে হরফ? তাহলে কে পৌঁছে দেবে আমার সংবাদ
জেলখানায়–জেলখানায়? কেবল নৈঃশব্দ্য পারে তাকে লেখা আমার চিঠিগুলোর
গতিচিহ্ন অনুসরণ করতে। কিংবা মৃত এক অফিসে গাঢ় আরশিগুলো।


হারানো মানুষের আস্ত মানচিত্রটাই বাতির আলোর তায়ে জ্বলে উঠবে।
মুয়াজ্জিনের মৃত্যুর পর থেকে আমিই আগলে রেখেছি মিনারটা।
এসো, তাড়াতাড়ি এসো, আমি তো বেঁচে আছি; আলোর বিপরীতে
দেখি প্রায় এক ‘পেইজলি’, মাঝেমাঝে সাদা, তারপর কালো।
আঠালো তরলে তার পিঠ–ধোয়া এখনও রয়েছে ভেজা
হেমন্তের চূড়ান্ত দেশে যখন সে ফুটে উঠে—
“কিনে ফেলো এটা, মাত্র একবারই দিয়ে থাকি এটা, রাতের বেলায়,
আমি খুন হওয়ার আগে, আমার কণ্ঠস্বর বাতিল হওয়ার আগে, এসো এসো।“

এই অন্ধকার বৃষ্টিতে বিশ্বাস রাখো, ভুতুড়ে হৃদয়,

এটাই তোমার যন্ত্রণা। অনুভব করো। তুমি অবশ্যই অনুভব করবে এটা।
“কিছুই থাকবে না, সব শেষ”।
আমি তার কণ্ঠস্বরকে দেখি আবারওঃ “এটা হলো শব্দের মন্দির এক।
আমাকে লেখা তোমার চিঠিগুলো সব পাবে এখানে। আর তোমাকে লেখা
আমার চিঠিগুলোও। তাড়াতাড়ি এসো আর খুলে ফেলো এই গায়েব–হওয়া খামগুলো“। আর আমি পৌঁছে যাই মিনারেঃ
আমি আছি আগুনের ভিতরে। আমি খুঁজে পেয়েছি অন্ধকার।
এটাই তোমার যন্ত্রণা। একে অবশ্যই অনুভব করবে তুমি। অনুভব কর,
রে পরাণ, বিশ্বস্ত থাকো তার উন্মাদ ধুয়ার প্রতি—
কেননা কাদায় তৈরি বাতিটার শলতে ভিজিয়েছে সে,
প্রতিটি রাতে জ্বালিয়েছে তাকে, যখন তার পদক্ষেপ সিঁড়ি মাড়িয়ে
পড়ে নিয়েছে গ্রহের উপরে আঁচড়ে লেখা বার্তা সব।
তার হাতগুলো সিল হয়ে বাতিল করেছিল স্ট্যাম্পগুলো।
এটাই হলো সংরক্ষণাগার। আমি খুঁজে পেয়েছি তার কণ্ঠস্বরের
অবশিষ্ট, খুঁজে পেয়েছি আকাংখার সেই মানচিত্র যার কোনো সীমা নাই।


পড়ি সেগুলো, প্রেমিক–প্রেমিকার চিঠি, উন্মাদ চিঠিগুলো,
আর পড়ি তাকে লেখা আমারটাও, যার কোনো উত্তর আসেনি।
আমি বাতি জ্বালাই, উত্তর পাঠাই, ডাকি প্রার্থনায়
বধির পৃথিবীগুলোকে সব মহাদেশ জুড়ে। আর আমার আর্তনাদ
হয়ে উঠে অসংখ্য ক্রন্দন; শেষ–হয়ে–আসা, প্রায় শেষ–হয়ে–আসা
পৃথিবীর কাছে পাঠানো স্তব্ধ–মৃত চিঠিগুলোর মত কান্না কান্না কান্না।
বৃষ্টির বিশাল প্যাকেটে–প্যাকেটে ভর্তি হয়ে আমার শব্দগুলো
চলে যায়, সেখানে যায়, ঠিকানায়–ঠিকানায়, সাগরের ওপারে।

এই মুহূর্তে যখন লিখছি তখন বৃষ্টি হচ্ছে। আমার কোনো প্রার্থনা নেই।
এ কেবলই এক চিৎকার, ভেতরে ধরে–রাখা; তারা তো আমরাই! আমরাই!
যাদের চিঠি কেবল কান্না আর কান্না, যা দেহের মত ভেঙ্গে পড়ে কয়েদখানায়।
এখন প্রতি রাতে মিনারের সিঁড়ি বেয়ে উঠি। উন্মাদ ছায়া–পরিলেখ,
মেঘেদের ছুঁড়ে দেই কাশ্মীরি ‘পেইজলি’। হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা এরকমই হয়ঃ
তারা বাতাসকে ঘুষ দেয় একটা সকালের জন্য, এই তাদের গোপন
মতলব।

কিন্তু এখানে কোনো সূর্য নেই। কোনো সূর্য নেই।
তাহলে দয়াহীন হও তুমি, যাকে বাঁচাতে পারিনি—
তোমার সমস্ত কান্না আমাকে পাঠিয়ে দাও, যদি সম্ভব এই পথেঃ
আমি এক কারাবাসীর বেশ কিছু প্রেমের চিঠি খুঁজে পেয়েছি—
তার একটার শুরুঃ “এই শব্দগুলো হয়ত তোমার কাছে কখনও পৌঁছাবে না”।
আরেকটার শেষঃ “তোমার স্পর্শ ছাড়া আমার চামড়া শিশিরের মত গলে যাচ্ছে”।
আর আমি উত্তরে বলতে চাইঃ আমি অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চাই।
এ ছাড়া আমার অন্য কি বলার আছে?

এই মুহূর্তে যখন লিখছি তখন বৃষ্টি হচ্ছে।
পাগল পরাণ রে মোর, তুই সাহসী হ।

Image result for kashmir

Check Also

moon

তুমি যে আছো বলেই-এ এস মাহমুদ খান

মিডিয়া খবর:-      -:এ এস মাহমুদ খান:- তুমি যে আছো বলেই জোনাকি জ্বালে বাতি …

তাহলে আবার ভয় কিসের !

মিডিয়া খবর:- আমার বিয়েটা প্রেম করে বিয়ে। লদকা লদকি টাইপ প্রেম না, ঝগড়ুটে প্রেম ! …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares