Home » নিউজ » চিত্রায় নৌকাবাইচ

চিত্রায় নৌকাবাইচ

Share Button

মিডিয়া খবর :-

সুলতান বেঁচে থাকতেও তার জন্মদিন উপলক্ষে চিত্রা নদীতে চলতো নৌকাবাইচ। প্রায় ২৭ বছর ধরে চলে আসা চিত্রার নৌকাবাইচ এখন নড়াইলের সেরা উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারের সুলতান উৎসবের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হলো বাইচ। বাইচ উপলক্ষে  নড়াইলের আশপাশের যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট থেকে এসেছেন দর্শকরা আত্মীয়বাড়ি বেড়াতে। এবারের বাইচ ঈদের পরে হওয়ায় উৎসব যেন আরও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। নৌকাবাইচ দেখতে আসা মাঝবয়সী গুলশান আরা জানালেন তার অভিব্যক্তি। বললেন, ‘সুলতান দাদু বেঁচে থাকতে তার বজরায় করে নৌকাবাইচ দেখেছি। আজ দাদু নেই কিন্তু আমাদের কাছে এই নৌকাবাইচ ঈদের থেকেও বেশি আনন্দের। এ যেন নড়াইলবাসীর এক মিলন মেলা।

কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৯৩তম জন্মজয়ন্তী উদযাপনের অংশ হিসেবে বিকেলে চিত্রা নদীতে এ বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর আড়াইটায় নারীদের পাঁচটি নৌকা ছেড়ে প্রথমে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এখানে অংশ নেয় জলকুমারী, জলকবুতর, জলকন্যা, কপোত-কপোতী আর কথাকলি।

এরা এসেছিল   তুলারামপুর, গোয়াখোলা, আর যশোরে এগারখান থেকে। নারীদের বাইচ শেষ হবার সাথে সাথে শুরু হয় পুরুষদের বাইচ অর্থাৎ মূল নৌকাবাইচ।

দুপুর সোয়া ৩টার দিকে চিত্রা নদীর পুরাতন ফেরীঘাট এলাকার নতুন শেখ রাসেল সেতুর নিচে নৌকাবাইচের উদ্বোধন করা হয়। নৌকাবাইচ উদ্বোধন করেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিরেন শিকদার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক এমদাদুল হক চৌধুরী, এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু, পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাড. সোহরাব হোসেন বিশ্বাস, নড়াইল পৌরসভার মেয়র জাহাঙ্গীর হোসেন বিশ্বাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুর রহমান, চেম্বারের সভাপতি মো.  হাসানুজ্জামান, অ্যাড. নজরুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান হিলু, জেলা পরিষদ সদস্য রওশন আরা কবীর প্রমুখ।

এরপর গুলি ছুড়ে শুরু হয় নৌকাবাইচ। প্রথমে একসঙ্গে পাঁচটি নৌকা বাইচে অংশ নেয়। বাজনার তালে তালে নৌকাগুলো পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে। নৌকার ঠিক মাঝখানে একজন বাজনদার বৈঠার তালে তালে ঢং ঢং শব্দে পিতলের থালা বাজাচ্ছেন আর নৌকার একবারে গলুইয়ের সামনে থেকে চড়েন্দার যিনি নৌকা নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি লাঠি হাতে সামনের দিকে তালে তালে ঝুঁকছেন। এসবই নৌকাবাইচের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়ে মানুষের মনে আনন্দের খোরাক জোগায়। নদীর কূলে কেবলই পিতলের থালার ঢং ঢং শব্দ, পানিতে বৈঠা মেরে যাওয়ার শব্দ আর মাঝে মাঝে মাঝিদের চিৎকার। এ হলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা।

এবারের বাইচে মোট ২০টি নৌকা অংশ নিয়েছে এর মধ্যে মেয়েদের ৫টি নৌকা অপেক্ষাকৃত ছোট, দুইপাশ মিলিয়ে মোট ৩২ জন। আর পুরুষদের নৌকা দুই ধরনের একটি টালাই, যার সামনে লম্বা গলুই থাকে।  আরেক প্রকারের নৌকা আছে যার লম্বা গলুই থাকে না, তার নাম কালাই। ১৫টি পুরুষের নৌকার মধ্যে সাতটি টালাই আর আটটি কালাই নৌকা অংশ নেয়। পুরুষদের নৌকার মধ্যে টালাই আর কালাই মিলে তিনবার বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

৯ সেপ্টেম্বর নৌকা বাইচ উপলক্ষে চিত্রা নদীর দুইপার একেবারে ঠাসা। বাড়ির ছাদে, গাছের ডালে দর্শকরা সব ঝুঁকি নিয়ে বসেছে নৌকাবাইচ দেখতে। নদীর তীরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। নৌকা নিয়ে ঘুরে নৌকাবাইচ দেখছেন কেউ কেউ। তরুণ আর যুবক ছেলেরা টায়ার নিয়ে দিনভর নদীতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের যেন আনন্দের সীমা নেই। একটি বড় ট্রলারে করে নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী সারিগানের দল বাজনার তালে তালে নেচে সারিগান পরিবশেন করে দর্শকদের মনোরঞ্জন করছে।

নৌকাবাইচ উপলক্ষে নদীর কূলে কূলে বসেছে মেলা। সেখানে চরকি আর নাগরদোলার পাশাপাশি নানা রকমের বাহারি খাবার আর পণ্য নিয়ে দোকান বসেছে। সীমাখালী ঘাট, নতুন রাসেল সেতু, থানা ঘাট, চরেরঘাট, রূপগঞ্জ বাঁধাঘাট, এস এম সুলতান সেতুসহ অন্তত ২০টি স্থানে বসেছে নৌকাবাইচ মেলা।

নৌকাবাইচে অংশ নিয়েছে খুলনার কয়রা থেকে ভাই ভাই, জলপরী, আল্লার দান এসেছে গোপালগঞ্জ থেকে, এ ছাড়া মাগুরা, যশোর এবং বাগেরহাট থেকে এসছে সোনার হরিণ, জলবিদ্যুৎ, কালাপাহাড়সহ নানা নামের মোট ১৫টি নৌকা। ভাই ভাই জলপরী নৌকার মালিক দিদার মোল্লা জানান, একেকটি টালাই এবং বড় কালাই নৌকায় দুইপাশে ৬২ থেকে ৭০ জন মাঝিমাল্লা থাকে।

এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় প্রাণ আপ এর সহযোগিতায় চিত্রানদীর  শেখ রাসেল সেতু থেকে সুলতান সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ ৩ কিলোমিটার নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরুষদের টালাই গ্রুপে প্রথম হয়েছে খুলনার তেরখাদা উপজেলার নয়া বারসাত গ্রামের দিদার মেম্বারের নৌকা, দ্বিতীয় হয়েছে একই উপজেলার মাহাবুর রহমানের নৌকা ও তৃতীয় হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার গোলাম রব্বানীর নৌকা। কালাই গ্রুপে প্রথম হয়েছে নড়াইল সদর উপজেলার গুয়োখোলা গ্রামের অসীম বিশ্বাসের নৌকা, দ্বিতীয় একই উপজেলার হাতিয়াড়া গ্রামের ভীম সরকারের নৌকা এবং তৃতীয় হয়েছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া গ্রামের কবীর মোল্লার নৌকা।

এ ছাড়া নারীদের দলে প্রথম হয়েছে নড়াইল সদর উপজেলার মুশুড়ি গ্রামের সূচিত্রা বিশ্বাসের নৌকা, দ্বিতীয় পংকবিলা গ্রামের কৃপা বিশ্বাসের নৌকা এবং তৃতীয় গুয়োখোলা গ্রামের দীপালী মজুমদারের নৌকা।

Check Also

শুটিং হাউজে লাঞ্ছনার শিকার অভিনেতা

মিডিয়া খবর :-  অভিনেতা সৌমিক আহমেদ রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের স্ক্রিপ্ট শুটিং হাউজের ম্যানেজার আলাউদ্দিনের …

শিবলীর কণ্ঠে ‘প্যারিসের চিঠি’

মিডিয়া খবর :- লতিফুল ইসলাম শিবলীর খুব জনপ্রিয় একটি কবিতা ‘প্যারিসের চিঠি’। এই কবিতা নিয়ে ‘প্রিয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares