Home » নিবন্ধ » জোড়া মানিক

জোড়া মানিক

Share Button

মিডিয়া খবর:-     :- মোস্তাফিজুর রহমান টিটু:-

বেশ বিরক্ত লাগছে। গত পনের মিনিট জেলখানার মত বিশাল গরাদের এই গেটে শব্দ করছি। গেটতো খোলেই নাই ওপাশে তেমন কোনো সাড়াশব্দও পাচ্ছি না। গেটের পাশের দেয়ালও বেশ উচু । উকি দিয়ে দেখার সুযোগ নাই। অথচ একটু আগেও মনটা বেশ ভালো ছিলো। দিন পনেরোর জন্য সিলেট আসা। অফিসের কাজে। অফিসের ফাইন্যান্স ম্যানেজার হাবীবুর রহমান সাহেব। বয়স্ক লোক । আগে রেলওয়ের কর্মকর্তা ছিলেন। অবসর নিয়ে এখন আমাদের এই প্রাইভেট ফার্মে আছেন। আমার সাথে সম্পর্কটা অফিসের সিনিয়র-জুনিয়র কিংবা সহকর্মীর চাইতে বেশ কিছুটা বেশী। গত দুইদিন আগে আমাকে ডেকে বললেন–“মোস্তাফিজ আমার মামাতো ভাইকে কিছু জরুরী দলিল আর কাগজপত্র পৌঁছে দিলে আমার খুব উপকার হয়। কুলাউড়া রেল ষ্টেশনে নেমে ঘন্টাখানেকের পথ। তুমি পৌছে দিয়ে আবার রাতের ট্রেন ধরতে পারো অথবা ওখানে রাতটা থেকে পরদিন সকালেও সিলেট যেতে পারো। আমি এর মধ্যেই সিলেটের লোকজনকে বলে দিয়েছি এই ব্যাপারে।“
-ঠিক আছে হাবিব ভাই। কোনোরকম ওজর আপত্তি ছাড়াই রাজী হই।

দুপুরে কুলাউড়া ষ্টেশনে নেমে রিক্সা নিলাম। রিক্সা দশ মিনিট পরেই ছোট মফস্বল শহরের সীমানা পেরিয়ে যায়। ভুকশিমইল সড়কের দুইপাশে মেঠো জমি…রাস্তার দুইপাশের গাছ একটু উঁচুতে উঠে পরস্পর আলিঙ্গনে আবদ্ধ…একটু পরপর রাস্তার পাশে একটা দুইটা দোকান…দোকানে এক/দুই/তিন জন মানুষ অলস বসে আছে। সুন্দর, শান্ত, অলস জীবন। জীবনানন্দ দাশের বর্ননায়…

“ সোনালী খড়ের ভারে অলস গোরুর গাড়ি—বিকেলের রোদ প’ড়ে আসে
কালো নীল হলদে পাখিরা ডানা ঝাপটায় ক্ষেতের ভাঁড়ারে,
শাদা পথ ধুলো মাছি—ঘুম হয়ে মিশিছে আকাশে,
অস্ত-সূর্য গা এলিয়ে অড়র ক্ষেতের পারে-পারে”

আমার খুব খুব ভালো লাগে। এই জীবন-মানুষ-প্রকৃতিকে খুব কাছে থেকে সেভাবে দেখা হয় নাই কখনো এটা আমার জীবনের অন্যতম বড় আফসোস।

পেকুড় বাজার পার হই। তারপর কাদিপুর এসে মল্লিক চৌধুরির বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করে এই জায়গায় আসা। প্রথম কয়েক মিনিট রিক্সাওয়ালাও চেষ্টা করলো। আমিই বললাম তাকে চলে যেতে। এখন মনে হচ্ছে ভুল হয়েছে। মুল রাস্তা থেকে এই বাড়ি সামান্য ভিতরে। এই ভিতরের রাস্তায় কাউকে দেখতেও পাই নাই এই সময়ে। ভাবছি মুল রাস্তায় ফিরে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করবো এমন সময় এক কিশোর এলো …

“আফনে কোনবায় তাকি আইলা? আমিতো বাজারর খান্দাদ খাড়াই রইছলাম, দাদায় খইছলা, আফনে আইবা”  বলতে বলতেই কিশোর কিভাবে যেনো বাইরে থেকেই খুলে ফেলে গেট। ভিতরে ঢুকি। গেট থেকে প্রায় দুইশো ফুট দুরে বাসা। কাজেই গেটের শব্দ ভিতর থেকে শোনা না যাবারই কথা। গেট থেকে বাসায় যাবার রাস্তাটা পাকা, দুই পাশে খুব সুন্দর যত্নে তৈরী ফুলের বাগান। প্রায় গ্রামে এত সুন্দর বাগান দেখে আমি কিছুক্ষণ আগের বিরক্তিটা ভুলে যাই। বাসার ভিতরে ঢুকে আরো মুগ্ধতা। ঝকঝকে টাইলসের উপর দামী কার্পেট, দামী শোফা-টেবিল এমনকি খুব সুন্দর একটা ঝাড়বাতিও। গ্রামে এমন বিলাস বহুল বাড়ি আমার ধারনার বাইরে ছিলো। পরে জেনেছি এরকম বহু বাড়ি আছে সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। প্রবাসী সিলেটীরা যার মালিক। একটু পরেই লাঠি ভর করে এক বৃদ্ধ বসার ঘরে আসলেন।

“আসতে কষ্ট হয় নাইতো? হাত মুখ ধুয়ে নেও। একসাথে নাস্তা করবো।“ ভরাট স্বরে আমাকে বলেন মল্লিক চৌধুরি। গলার স্বরে বয়সের কোনো ছাপ নাই।
-না একদম কষ্ট হয় নাই। হাবীব ভাই এই প্যাকেটটা দিয়েছেন। আর আমি একটু তাড়াতাড়ি বের হবো। রাতের ট্রেনটা ধরব। আমি উত্তর দেই ।
“তুমি কালকের ট্রেনে যাইবা। হাবীবের সাথে আমার কথা হইছে। এই পান্না সাবরে রুম লইয়া যা।“ এমন জোরালোভাবে বললেন যে এর উপরে যেনো আর কোনো কথা নাই। অতএব গেটে দেখা সেই কিশোরের সাথে বাড়ির ভিতরে যাই। ঝকঝকে বিশাল রুমের সাথে লাগোয়া বাথরুম। বাথটাব, গীজার, দর্শনীয় টাইলস…সর্বত্রই স্বাচ্ছন্দ্যের বাড়াবাড়ি।

থাকতে যেহেতু হবেই তাই সময় নিয়ে গোসল করে বের হলাম। পান্না ডাইনিং রুমে নিয়ে গেলো। চৌধুরি সাহেব বসে আছেন। টেবিলে হরেক রকমের খাবার। মোগলাই থেকে শুরু করে চিকেন প্যাটিশ। খাবারের স্বাদও বেশ ভালো। খেতে খেতেই জানলাম ভদ্রলোক বহুদিনের লন্ডন প্রবাসী। তবে এখন বছরের অর্ধেক সময় এখানেই কাটান। রুমে ফিরে ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে বিছানায় যাই। ক্লান্তি কিংবা আরামের কারনে অল্প সময়েই ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম যখন ভাঙ্গে তখন চারিদিক অন্ধকার। রুমের লাইট জালাতেই পান্না এসে হাজির…
“বাক্কাসময় গুমাইলা। দাদায় দুইবার আফনার খতা জিকাইছইন। দাদায় রাইত এখটু জলদি খাইন। রেডি অইয়া আউক্কা।“ রুমের দেয়াল ঘড়িতে দেখি রাত সাড়ে আটটা বাজে। পুরো চার ঘণ্টার ঘুম। একটু লজ্জা পাই।

হাত মুখ ধুয়ে আবার ডাইনিং রুমে যাই। টেবিল জুড়ে আবারো অনেক খাবার। অবাক হই না আর। একটু পরেই মল্লিক চৌধুরী আসেন।
“চলো খাওয়া শুরু করি। আমি একটু তাড়াতাড়ি খাই।”
-আমি সরি। আমার জন্য আপনার দেরী হলো। বিনীতভাবে বলি।
“আরে নাহ। আসলে ডায়াবেটিসের রুগীতো। তাই একটু নিয়ম মানতে হয়।” খেতে খেতে নানা কথা হয়। মল্লিক সাহেবের জানা এবং অভিজ্ঞতার পাল্লা অনেক ভারী। তাই উনিই বেশী বলেন আমি শুনি। এক পর্যায়ে রাজনীতির প্রসঙ্গ আসে।

“সিলেট যে বাংলাদেশের অংশ এর পিছনে কার অবদান বেশী জানো?”
-কার? আমি জিজ্ঞেস করি।
“মাওলানা ভাসানীর। ৪৭ সালে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের নাকি ইন্ডিয়ার অংশ হবে তার জন্য গণভোট হয়। সিলেট রেফারেন্ডাম। আমার বয়স তখন ২৬/২৭।“ সিলেটের গণভোট সম্বন্ধে বিভিন্ন বই পড়ে কিছুটা জানতাম।
-যতটুকু জানি সেই ইলেকশনের রেজাল্টতো খুব ক্লোজ ছিলো। আমি বলি।
“হ্যা। ৫৭% হ্যা আর ৪৩% না। ভাসানী সারা সিলেট ঘুরেছেন। আমিও তখন সক্রিয় রাজনীতি করি। কত জায়গায় গিয়েছি ভাসানীর সাথে। শেখ মুজিব তখন তেমন নামকরা কেউ না। তবে আমাদের এই কুলাউড়াতেই শেখ মুজিবের এক ভাষণ শুনে বুঝে যাই এই হবে ভবিষ্যতের নেতা। আমাদের সময়েতো এত ধান্ধা ছিলো না। মানুষ চেনা সহজ ছিলো।”
-আপনি লন্ডন গেলেন কখন ?
“৫৩ সালে। এখন ৯৫ সাল। হিসাব করলে ৪২ বছর হয়ে গেছে।”
-আপনার ছেলে মেয়ে ?
“তিন ছেলে, এক মেয়ে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। লন্ডনেই থাকে। ছেলে মেয়ে নিয়ে সবাই ভালোই আছে।” বলে একটু চুপ করেন ভদ্রলোক।
“সাত বছর আগে স্ত্রী মারা যায়।” আবার বলা শুরু করেন চৌধুরি সাহেব ।
“বৃদ্ধরা এমনিতেই সংসারে অচল। তবে স্ত্রী বেঁচে থাকতে সেটা তেমন বুঝি নাই। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি নিয়ে দিন ভালোই যাচ্ছিলো।  কিন্তু বিপত্নীক বৃদ্ধ যে ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়ার মত সেটা খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যাই। তাই টাকা পয়সা খরচ করে এই বাড়িটা করি।  বছরের ছয় মাস এখানেই থাকি।  মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েরাও আসে। এসব কথা বাদ দেও।  সিলেট রেফারেন্ডাম নিয়ে বলি। করিমগঞ্জও বাংলাদেশের অংশ হওয়া উচিত ছিলো…” এভাবেই বেশ রাত পর্যন্ত গল্প শুনি। ইতিহাসের গল্প বইয়ে পড়া আর মানুষের মুখে শোনার যে অনেক পার্থক্য সেটা টের পাই।

পরেরদিন সিলেট আসি। থাকার হোটেল আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো। খাবার হোটেলের ব্যাপারেও এক বন্ধু পরামর্শ দিয়েছিলো। জিন্দাবাজার আর লামাবাজারের মাঝামাঝি এক স্থানে হোটেলটা। যাই সেখানে। খুব পুরোনো বিল্ডিং। বন্ধু অবশ্য বলেছিলো বাইরের সজ্জা দেখে পছন্দ হবে না,  তবে খাবার ভালো তার চাইতেও বড় কথা খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ভিতরে গিয়ে বসি। খাবারের অর্ডার দেই।  একটু পরেই ওয়েটারদের একজন চিৎকার করে বলে “জোড়া মানিক আসতাছে”। মিনিট দুয়েক পরেই দুজন বয়স্ক লোক ঢোকে হোটেলে। একটা আজব জিনিষ খেয়াল করি একটু পরে। বয়স্ক ভদ্রলোক দুজনকে ওয়েটাররা টিনের থালা টিনের পিরিচ এমনকি গ্লাসটা পর্যন্ত টিনের দেয়।  একটু কৌতুহল হয়।  কিন্তু প্রকাশ করি না। খাওয়া শেষে চলে আসি।

পরেরদিন আবার হোটেলে যেতেই ম্যানেজার আসে আমার টেবিলে।
“আপনাকে গতকাল দেখেছি। মনে হয় বাইরে থেকে আসছেন।” ম্যানেজার বলেন ।
-জ্বি। অফিসের কাজে আসছি। কয়েকদিন থাকবো। আমি উত্তর দেই।
“কিছু মনে করবেন না। আপনাকে একটা কথা বলা দরকার।”
-জ্বি বলেন।
“আমাদের হোটেলে দুজন রেগুলার কাস্টমার আছে। বয়স্ক লোক। দুজনের নামই মানিক বলে সবাই ডাকে জোড়া মানিক।”
-জ্বি গতকাল দেখেছি। আমি আবারো ছোট উত্তর দেই।
“ওনারা আপনাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে। আমাদের সব কাস্টমারকেই করে। কিছু মনে করবেন না। মানুষ ভালো। বয়স হয়েছেতো। আর ভুল করেও ওনাদের ঝগড়া থামাতে যাবেন না।”
-জ্বি। বুঝলাম না।
“খেয়াল করেছেন কিনা জানি না। ওনাদের থালা গ্লাস সব টিনের। কারন ওনারা দুই দিন পরপরই ঝগড়া করেন আর তখন গ্লাস থালা ছুড়ে ভেঙ্গে ফেলেন। টিনের থালা গ্লাস ওনারা নিজেরাই কিনে আমাদের দিয়েছেন। ঝগড়া করেন আবার নিজেরাই ঠিক হয়ে যান। কিন্তু কেউ যদি ওনাদের বোঝাতে যায় তাহলে…”
-ঠিক আছে বুঝতে পারছি।

সেদিনও জোড়া মানিক আসেন এবং সত্যি সত্যি ম্যানেজারের কথামতো আমার বিশাল ইন্টারভিউ নেন। আমার মজাই লাগে। আরো মজা লাগে যখন দেখি নিজেরা একজন অপরজনকে লম্বু-বাটু সম্বোধন করছেন। যদিও দুজনের উচ্চতা প্রায় একই।

পরেরদিন হোটেলে গিয়েই দেখি জোড়া মানিক বসে আছে। আমি ঢুকতেই একজন ডাক দেন। আমি তাদের টেবিলে গিয়ে বসি। হোটেলের ক্যাসেটে তখন আইয়ুব বাচ্চুর “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে “ বাজছে।
“ম্যানেজার ক্যাসেট বন্ধ করো।” লম্বু মানিক চিৎকার করে বলেন।
-কেনো গানটাতো ভালোই। আমি আস্তে করে বলি।
“এই চিৎকার চেঁচামেচি গান? শোনো মিয়া আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দিন এর পরে এই দেশে কোনো শিল্পী আসে নাই।”
-আপনার বাবা কি আব্দুল আলীম আর আব্বাসউদ্দিন এর গান পছন্দ করতেন? আমি নিরীহভাবে জিজ্ঞেস করি।
“নাহ ওনারাতো পুঁথিপাঠ আর কিছু ভাওয়াইয়া গান শুনতেন।”
-হয়তো আপনার বাবার কাছেও আব্দুল আলীম আর আব্বাসউদ্দিন কোনো শিল্পীই ছিলো না। আমি যতটা সম্ভব নিরীহ সুরে বলার চেষ্টা করি।
‘লম্বু ছেলেটার কথায় যুক্তি আছে কিন্তু।‘ এতক্ষণে বাটু মানিক কথা বলেন।
‘তবে তোমার কপালে দুংখ আছে।‘ বাটু মানিক আমাকে বলেন।
-কেনো? আমি জিজ্ঞেস করি।
‘শোনো বিয়া শাদীতো করো নাই। দাম্পত্য ঝগড়ায় যুক্তির মুল্য ফুটা পয়সা। ঝগড়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইলা যাবা। মাঝে মাঝে দম নেবার জন্য পনের-বিশ সেকেন্ড থামবা। এই ফাঁকে প্রতিপক্ষ একটা দুইটা শব্দ বলতে পারে। আবার শুরু করে দিবা। এর চাইতে বেশী সময় থামবা না। “থামছুইন কি হারছুইন” আমাদের ময়মনসিংহের ভাষায়। ঐ লম্বু তোর ছোট ছেলের নতুন টিভি কেনার গল্পটা বলনা।”
“শোনো তাইলে।” উৎফুল্ল চিত্তে গল্প শুরু করেন লম্বু মানিক।
‘আমাদের টিভিটা বদলাইতে হবে। ছবি পরিষ্কার না।” ছোট বউ বলে।
“কই আমিতো দেখি ছবি ঠিকই আছে।“ ছেলে উত্তর দেয়।
‘কি আমি চোখে দেখি না।”
“আমিতো সেইটা বলি নাই।”
‘বলছো। অবশ্যই বলছো। মনে মনে বলছো। তোমাকে আমার চেনা হয়ে গেছে। এখনতো আমি চোখে দেখি না। আমার রুচিজ্ঞান নাই। আমি খ্যাত। আমার পরিবার খ্যাত।’
“ঠিক আছে ঠিক আছে। একটা নতুন টিভি কিনবো।” এভাবেই হার মেনে নেয় আমার ছেলে।
এভাবেই নতুন বিদ্যা শেখা হয়। কিন্তু পরবর্তী জীবনে সেটা তেমন কাজে লাগে না। দোষ অবশ্যই শিক্ষকের না, দোষ অধম ছাত্রের। চমৎকার সময় কাটে সেদিন জোড়া মানিকের সাথে। কথায় কথায় জানলাম তারা বাল্যবন্ধু। ময়মনসিংহে বাড়ী ছিলো। সরকারী চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক বছর আগে। এখন সিলেটেই স্থায়ী।

পরের দিন অবশ্য তাদের ভিন্নরুপ দেখতে পাই।
‘কি আমারে পশু কইলি।’ জোরে চিৎকার করছেন বাটু মানিক। আশে পাশের সবাই ভাব করছে যেন কিছুই হচ্ছে না। আমিও সেই ভান করে একটু দুরের এক টেবিলে বসি।
“তুই হইলি দুই পয়সার মানুষ।” চিৎকারের মাত্রা বাড়ে। একটু পরেই টিনের থালা বাটির ঝনঝন শব্দ। দুইজনই যার সামনে যা আছে তা মাটিতে ছুড়ে ফেলছেন। হোটেলের কর্মচারী, কাস্টমার কারো মধ্যেই বিন্দুমাত্র ভাবান্তর নাই। রাগে গজগজ করতে করতে দুজনেই হোটেল থেকে বের হয়ে যান অল্প পরেই। পরেরদিন আবার সব স্বাভাবিক। সেদিন চমৎকার আড্ডা হয় জোড়া মানিকদের সাথে। সেবারে আরো একদিন অনেকখানি চমৎকার সময় কাটাই এই বয়স্ক দুই ভদ্রলোকের সাথে।

এর ছয় মাস পরে আবার সিলেট যেতে হয়। এবার অবশ্য মাত্র দুইদিনের জন্য। প্রথমদিন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত ছিলাম। পরেরদিন দুপুরে ফিরতি ট্রেন। ভাবলাম সেই পুরোনো হোটেল থেকেই দুপুরের খাবার খেয়ে যাই। হোটেলে ঢুকতেই দেখি বাটু মানিক একা এক টেবিলে বসে আছেন। একটু অবাক হই ।
-আসসালামু আলাইকুম চাচা। কেমন আছেন? আমি সামনে গিয়ে বলি।
“ওহ তুমি । কবে আসছো?”
-এইতো গতকাল। আজকের দুপুরের ট্রেনেই চলে যাবো। আপনি একা যে?
“লম্বু মারা গেছে জানো?” বিমর্ষভাবে বলেন বাটু মানিক। শুনে আমার খুব খারাপ লাগে।
-কিভাবে? কতদিন আগে?
“মাসখানেক আগে। হঠাৎ হার্ট এটাকে।”
-খুব খারাপ লাগছে। আপনারা অনেক ভালো বন্ধু ছিলেন।
“হ্যা। গত আট বছরে খুব কম দিনই আছে যেদিন ওর সাথে দেখা কথা হয় নাই। জানোইতো আমরা একই এলাকার লোক। মাঝখানে চাকুরী সংসার কারনে একটু দুরত্ব তৈরী হয়েছিলো। অবসর নেই কাছাকাছি সময়েই। দুজনের স্ত্রীও মারা যায় তিন মাসের ব্যবধানে। তারপর থেকে …” এতখানি বলে একটু চুপ করেন বাটু মানিক। আমিও কিছু খাবারের অর্ডার দিলাম।

“ওর ভালো নাম ছিলো জুবায়ের আমার মাহবুব। এই নামে আমাদের এখন আর কেউ চেনে না। সবাই চেনে লম্বু মানিক আর বাটু মানিক নামে। বৃদ্ধ বয়সে বিপত্নীক হওয়া মানে কি জানো?” আমাকে জিজ্ঞেস করেন। আমি কোনো উত্তর দেই না…উত্তর জানলেতো দিবো।
“ছেড়া ন্যাকড়ারও কিছু দাম সংসারে আছে। বৃদ্ধ বিপত্নীকের সে দামও নাই। অথচ স্বামীহারা বৃদ্ধাদের কিন্তু এই সমস্যা নাই। ছেলে-মেয়ে বউ-জামাই নাতি-নাতনি নিয়ে তারা বেশ সংসারে মজে থাকে। আমার বোন বিধবা হয়েছে অনেকদিন। এখনও দুই-দিন কোথাও বেড়াতে গেলে নাতি-নাতনিরা অস্থির হয়ে যায়।” আবার বলা শুরু করেন বাটু মানিক ।

“বৃদ্ধ বিপত্নীকের শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকলে আরও সমস্যা। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মানুষের কিছু বিনোদনের দরকার হয়। ধরো নাতি নাতনির সাথে বসে টিভিতে নাটক দেখছি। পাশের রুম থেকের বউ টেলিফোনে কথা বলছে ‘আরে আমার শ্বশুরের কথা আর কি বলবো। এই বয়সে কোথায় একটু নামাজ কালাম নিয়ে থাকবে। নাহ টিভি খুললেই উনি এসে বসবেন। বুড়া বয়সে এত রস কোথা থেকে যে পান।’ এমন স্বরে বলবে যে আমি যেন শুনতে পাই। বাইরে গিয়েও শান্তি নাই। সিনেমা হলে যাবে ছেলে ছোকরারা আওয়াজ দিবে – বুড়ার ভীমরতি হইছে। একটু ভালোমন্দ খেতে চাইলেই ‘বুড়ার বয়স হইছে লোভ গেলো না’। সংসারের এসব নিষ্ঠুরতার কথা কোথাও বলা যায় না…কেউ শুনতে চায় না ।“ আমি কিছু বলি না…বলার থাকে না । তাই চুপচাপ খাবার খাই আর কথা শুনি।
“আমরা দুই বন্ধু মিলে তাই অনেক সময় কাটাতাম। জানো দুই বন্ধু মাঝে মাঝেই কেনো ঝগড়া করতাম।”
-কেনো ?
“আশে পাশের মানুষের মনোযোগ পাবার জন্য। টিনের থালার ঝনঝন শব্দ ভালো লাগতো। মনে হতো এখনও ভালো আছি…বেশ আছি। লম্বুটা হঠাৎ এমনভাবে চলে গেলো।” বলে চুপ করে থাকেন বাটু মানিক। আমিও চুপ করে থাকি। কি বলে সান্ত্বনা দেবো বুঝতে পারি না। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ট্রেনের সময় প্রায় হয়ে গেছে।
-চাচা ভালো থাকবেন নিজের যত্ন নিবেন। গৎবাঁধা কথা বলে দ্রুত হোটেল থেকে বের হই।

রিক্সায় উঠে বেশ কিছুটা সময় মন খারাপ থাকে। স্টেশনে এসে দেখি ট্রেন প্রায় ছেড়ে দিচ্ছে। ট্রেন ধরার টেনশনে মন খারাপ ভাব দ্রুত কেটে যায়। তাছাড়া ২৫ বছর বয়সে ৭৫ বছর বয়সকে আলোকবর্ষ দুরের মনে হয়…কোনো যুবকইতো বৃদ্ধ-বিপত্নীক হয় না…হয় কি? সেই বয়সে অন্তত আমি তা ভাবি নাই…ভাবার সময় ছিলো না।

Check Also

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করল ভারতীয় স্থলবাহিনী

মিডিয়া খবরঃ-      সাজেদুর রহমানঃ- প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেছেন গতকাল। রাতেই ডাকা …

ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা

মিডিয়া খবর:-          -:সাজেদুর রহমান:- বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর একের পর এক আক্রমণে সীমান্তবর্তী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares