Home » চলচ্চিত্র » ‘জীবনঢুলী’ ৩ বার দেখে, দর্শক হিসেবে আমার প্রতিক্রিয়া!
1891598_607488735997924_924611927_o

‘জীবনঢুলী’ ৩ বার দেখে, দর্শক হিসেবে আমার প্রতিক্রিয়া!

Share Button

সোমা অবন্তী

কয়েক বছর আগে যখন জানতে পারি তানভীর মোকাম্মেল-এর ‘জীবনঢুলী’ চিত্রনাট্যে ‘হাবার্ট বালস ফান্ড’ পেয়েছে তখন থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম ছবিটির জন্য।
অবশেষে বাংলাদেশ সরকারের অনুদান পাওয়ার পর ছবিটি নির্মিত হয় এবং কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীতে শো- এর বদৌলতে ছবিটি দেখার সুযোগ হয়।
‘জীবনঢুলী’ মুক্তি দেওয়া হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবসে’ । মুক্তিযুদ্ধের একটি চলচ্চিত্র মুক্তির জন্য এই কমার্শিয়াল দিনটিকে বেছে নেওয়ার কারণটা আমার বোধগম্য হয়নি।
ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পত্রিকায় নির্মাতা এবং ছবির অভিনয় শিল্পীদের সাক্ষাত্কার থেকে ছবিটি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছিলাম। পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ’৭১-এ সব শ্রেণী এবং সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন বিপন্ন হলেও সবচে’ বিপন্ন ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবন। কিন্তু দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা এবং বহুজাতিক মিডিয়ার জগতে এদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই বলে মুক্তিযুদ্ধে এদের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা তেমন বলা হয় না’।
সত্যিই তাই! বহুজাতিক মিডিয়ায় নিজেকে বিক্রি করে ‘প্রোডাকশন’ করা যায় ‘ক্রিয়েশন’ হয় না। আর তা হয় না বলেই সিনেমা হলে যাই না সচরাচর।
অনেকদিন পর মুক্তিযুদ্ধের একটা ভালো ছবি দেখার জন্য গেলাম ‘জীবনঢুলী’ দেখতে। ছবি শুরু হবে বোধহয়। হলের লাইট গুলো অফ হয়েছে। এ-কী! লুঙ্গির বিজ্ঞাপন! সাথে শাড়ি, থ্রি-পিস। যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ছবিটি দেখতে এসেছিলাম, তাতে হোঁচট খেলাম ছবি শুরুর আগেই।
তারপর…
শুধু হোঁচট নয়, এবার কষ্ট পেলাম ভীষণ। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রে ‘জাতীয় সংগীত’ এবং ‘জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন’ ব্যতীত-ই শুরু হয়ে গেল। যেখানে, কমার্শিয়াল ছবিগুলোতেও এর ব্যাতিক্রম কখনো দেখিনি। আর এটা তো মুক্তিযুদ্ধের ছবি!
আমার পাশে বসা এক দর্শককে দেখলাম বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘জাতীয় সংগীত থেকে তো টাকা পাওয়া যায় না, লুঙ্গির বিজ্ঞাপন থেকে টাকা আসে’।
ছবি শুরু হল।
টাইটেলে মতুয়াদের উৎসবের ভিজ্যুয়ালাইজেশন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এক কথায় অসাধারণ।
টাইটেল শেষে প্রথম দৃশ্যেই দেখি এক বৃদ্ধা আর শিশু গানের আসরে যাচ্ছে। আসরে জীবনের মুণ্ডুহীন শুধু ‘ধর’ এর ফ্রেম। মাহফুজুর রহমান খান-এর ক্যামেরার কাজ আমি ইতঃপূর্বে যা দেখেছি; তার কাছ থেকে এ ধরণের ফ্রেমিং অপ্রত্যাশিত।
পরের দৃশ্যে জীবন কাবাডি খেলা দেখছে। এ সময় দেখলাম ৬ দফার দাবি সম্বলিত ফেস্টুন হাতে একটি মিছিল। সময়কাল পাওয়া গেল এই দৃশ্য থেকে।এরপর বজলুর সাথে পরিচিত হলাম। সে মাছ ধরছিল। এক পাগলকে দেখলাম। তার সংলাপ, ‘কী হবেনে কবে কিডা ‘।
ঠাকুর দাস কাকার বাড়িতে গানের সাথে অসাধারণ ঢোল বাজাচ্ছিল জনৈক ঢুলী। তার সাথে ঢাক বাজাচ্ছিল যে ঢাকি তার চরিত্রের নাম দেখলাম জীবন। ছবির নাম তো ‘জীবনঢুলী’; তাহলে সে ঢাক বাজাচ্ছে কেন? আর ঢাকই যদি বাজাবে তাহলে ‘জীবনঢাকি’ নয় কেন? ভাবলাম অপেক্ষা করি, ছবি তো মাত্র শুরু; পরে হয়তো এ প্রশ্নের জবাব পাব…

তারপর এল দুর্গা পূজার সময়। জীবনের ভ্রু প্ল্যাক করা স্ত্রী সন্ধ্যারানী নারকেল কোরাচ্ছে । এ দৃশ্যে পেলাম জীবনের দু সন্তান লক্ষী এবং বলাইকে ।
দত্তবাড়িতে পূজায় ঢাক বাজাচ্ছে জীবন। মুসলমান পাগল গফুর মণ্ডপের কোণায় বসে আঁখ খাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর একটা সংলাপ– ‘মুসলমান ও নমশূদ্ররা বাইরে বসবে’। এমন একটা রক্ষণশীল বাড়ির পূজায় একজন মুসলমান পাগল মণ্ডপের সিঁড়িতে বসা– কেউ তাড়াচ্ছে না; এটা কি স্বাভাবিক?
ভ্রু প্ল্যাক করা দত্ত বাড়ির বউ এসে জীবনকে নিজ হাতে প্রসাদ দিল। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরের সংলাপ, ‘প্রসাদটা বলির পরেই দিই’। দত্তবাড়ির বউ তাহলে যা দিল সেটা কি প্রসাদ ছিল না? আর প্রসাদটা শুধুমাত্র জীবনকেই কেন দিল দত্ত বাড়ির বউ? এরপর দেখলাম পাঠা বলি।
কলাপাতায় খাওয়ার সময়ে আলোচনায় জানা গেল ৭০-এর নির্বাচনকালীন সময় চলছে।
আবার পাগলকে দেখলাম কবিতা আউরাচ্ছে –প্রায় দেড় মিনিট।
এরপর প্রতীমা বিসর্জন।
মেলোডিয়াস একটা গান পেলাম, ‘মা-কে ভাসাইয়া জলে…’। প্রতীমা নৌকায় তুলে নদীর মাঝে গিয়েও বিসর্জন দেওয়া হল না। কেন? এটাই তো স্বাভাবিক হতো। পরের দৃশ্যে দেখি প্রতীমা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে তীর থেকে জলে। যেখানে প্রতীমা ঠিক মতো ডুবলও না। অস্বাভাবিক ঘটনা। বিসর্জনের সময় সবাই একসাথে; জীবন অনেক দূরে দাড়িয়ে ঢাক বাজাচ্ছিল। সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেন একা একা ঢাক বাজাচ্ছিল জীবন? সময়টা ছিল গোধূলি; ‘ম্যাজিক আওয়ার’। জলে তীরের প্রতিবিম্ব। অসাধারণ হতে পারত যদি ‘এ-বি কম্পোজিশন’ না হয়ে ‘রুল অফ থার্ড’ অনুসরণ করা হত। ফেড আউটে পার হয়ে গেল কিছুদিন…
পরের দৃশ্যে আকাশে হেলিকপ্টার-জীবনের আতংক। চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি । এ পর্যায়ে একটা কথা মনে পড়লো। কিছুদিন আগে বাংলা নিউজ ২৪ এবং প্রথম আলোতে ‘জীবনঢুলী’-র নিউজ-এ একটা ফটোগ্রাফ দেখেছিলাম। আকাশে হেলিকপ্টার, জীবন দৌড়ুচ্ছে, পৃথিবী কাত হয়ে একদিকে হেলে পড়েছে- এরকম বাজে কম্পোজিশনের একটি ফটোগ্রাফ! ছবিতে এই দৃশ্যে সে রকম ভুল ফ্রেম দেখিনি।
ঠাকুরদাসের বাড়ির সংলাপে জানলাম, পাকসেনারা ফকিরহাটে এসেছে। পরাণপুরে তখনো আসেনি। পরের দৃশ্যেই পরাণপুরে পাকসেনার আক্রমন। দেখলাম, বোমা পড়ছে ফোরগ্রাউন্ডে, ব্যাকগ্রাউন্ডে অনেক দূরে লোক মারা পড়ছে!
জীবনের পরিবার পালাল। পাগলের ঘর পুড়ল।
তরুন সংঘ পুড়ে যাওয়ার পর ধ্বংসাবশেষে দেখলাম শুধু বেড়ার ছাই। বাঁশগুলো দাঁড়িয়ে। ভেতরে চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ-টুল কোন প্রপস নেই। তরুন সংঘ স্টাবলিশ না হয়ে শেষ পর্যন্ত সেট পোড়ার অনুভুতিই হোল।
জীবনরা বাড়ি ফিরল। শুনলাম সিতারের স্টক মিউজিক; যা আমার কালেকশনেও আছে। এ ধরণের একটা ছবি যা ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে যাবে- তাতে কপিরাইট লঙ্ঘন করে স্টক মিউজিকের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়।
জীবন বাজারে গেল। যাওয়ার পথে তিনটা সাইকেলে চারজনকে দেখা গেল, তারা বেতন তুলতে যাচ্ছেন। জীবনের ফেরার পথে রাস্তায় প্রথম শটে দেখলাম ১৮০ ডিগ্রি উল্টে থাকা একটা সাইকেলের চাকা ঘুরছে। তারপর প্যান শর্ট-এ দেখলাম এই পয়েন্টে জীবনকে ক্রস করে যারা চলে গিয়েছিলেন, তাদেরই মৃতদেহ। আশ্চর্য এই যে, সিকোয়েন্সের প্রথম শট-এ যে ১৮০ ডিগ্রি উল্টানো সাইকেল দেখেছিলাম- পরে তিনটা সাইকেলের মধ্যে একটাকেও ওই অবস্থায় দেখলাম না- সব ৯০ ডিগ্রিতে মাটিতে শোয়া!
জীবনদের পরিবারে একমাত্র কাকী ব্যতীত সবাই ভারত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পর্যায়ে প্রথম বারের মত ছবিতে একটা রাতের দৃশ্য দেখি। এই দৃশ্যে সোর্সের সাথে আলোকসম্পাত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। রাতের আলোতে কেলভিন ছিল দিনের আলোর।
পরদিন জীবন মুচির দোকানে গিয়ে স্যান্ডেলের সোলের ভেতর টাকা রেখে পেরেক মেরে আনে। এ পর্যন্ত দত্ত বাড়ি ছাড়া কোথাও কাউকে স্যান্ডেল পরতে দেখিনি। অথচ জীবনের স্যান্ডেল আছে। কখনো লুকিয়ে টাকা নিতে হতে পারে এটা বুঝি সে আগেই জানতো?
পুরনো জিনিস বেচার সময় আবারও বেশ কিছু মাথা কাটা লং শর্ট দেখলাম।
শরণার্থীদের চলার পথে আবারও একটা সুন্দর গান পেলাম, ‘মায়ের মাটির আঁচল ছেড়ে পথ করেছি সাথী’।
নৌকায় করে শরণার্থীদের যাত্রা। দুজন যুবক হারমোনিয়াম বাঁশি বাজাচ্ছে। জীবন তাল রাখতে শুরু করলো ভুল লয়ে। কানে লেগেছে। একজন পেশাদার বাদকের এই অবস্থা!
নৌকায় বিনোদ বিহারী নামে একজন গল্প করছিলেন। গল্প শুরু হতেই সবার হাসি। অথচ হাসির উপকরণ পাওয়া গেল গল্পের শেষে। সবাই আগেই বুঝে গিয়েছিলেন একটু পড়ে হাসির ঘটনা ঘটবে!
হঠাৎ রাজাকারদের দ্বারা লুণ্ঠনের শিকার হন নৌকার যাত্রীবৃন্দ। যাত্রাদলের একটা মেয়েকে রাজাকারেরা ধরে নেওয়ার সময় মেয়েটি বলতে থাকে ‘আমি একজন আরটিস’ । এই ‘আরটিস’ শব্দটা না শুনে ওই সময়ের যাত্রাদলের একটা মেয়ের মুখে ‘শিল্পী’ শব্দটাই মানানসই হতো বলে আমার ধারণা ।
যাত্রাদলের বিষয়ে আর একটা প্রশ্ন এসেছে মাথায়। ওরা কি সবাই এতিম? ওদের কি পরিবার পরিজন নেই? তাহলে ওরা যাত্রাদল হিসেবে শরণার্থী হলো কেন?
অনেক বড় পরিসরে শরণার্থী শিবিরের আয়োজনটা প্রশংসার দাবী রাখে। শরণার্থী শিবিরে সাতক্ষীরার চুকনগরের এলাকাবাসী, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ৭১ সালের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বলে জেনেছি– এতে অনেকটাই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লাম। কিন্তু এ পর্যায়ে আর একটা কথা না বললেই না- ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কেন যেন হৃদয় ছুঁতে পারছে না। ইতোমধ্যেই ছবিতে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক স্টক মিউজিক হিসেবে আমার কমন পড়েছে।
চুকনগর শরণার্থী শিবিরে পাকবাহিনী প্রবেশের সাথে সাথেই দেখলাম কয়েকজন মারা গেল। গায়ে রক্ত নেই। লং শটে অসংখ্য লাশ; গায়ে রক্ত নেই। ক্লোজ-এ গায়ের বিভিন্ন অংশে লেপে দেওয়া রক্ত। পাকবাহিনী ব্যাপক গোলাগুলি করে অসংখ্য মানুষকে মারার পর শুধুমাত্র জীবনসহ বিভিন্ন বয়সী ৬ জনকে ধরে নিয়ে লাইনে দাড় করিয়ে কেন মারল বুঝলাম না। শুনেছিলাম, ৭১-এর যুদ্ধের সময় যুবকদের মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে ধরে নিয়ে লাইনে দাড় করিয়ে মারা হতো। কিন্তু এখানে তো বাছাবাছির কোন কারণ নেই। যেখানে মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ– সবাইকেই নির্বিচারে মারা হচ্ছিল।
গণহত্যার যে শোক স্তব্ধ পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা তা না হয়ে কেমন যেন কমেডি-র আবহ তৈরি হয়ে গেলো, যখন একের পর এক দেখলাম, গুলি খেয়ে কয়েকজন গাছ থেকে টুপ করে জলে পড়লেন, একজন দু’হাত কাঁপাতে কাঁপাতে উদ্ভট ভাবে মাটিতে পড়লেন, একজনকে দেখলাম গুলি খাওয়ার পরও বিড়ি জ্বালাচ্ছেন।
জীবনের স্ত্রী সন্ধ্যারানী দু সন্তানকে নিয়ে দৌড়ুচ্ছেন। মেয়ে লক্ষী-র দুটো হাতই খালি। পাকবাহিনী ওদেরকে মেরে ফেলার পর, বেঁচে যাওয়া জীবন যখন লাশগুলো দেখছিল তখন মেয়ে লক্ষীর হাতের কাছে একটা পুতুল। কে রাখল এই পুতুল? আবেগ তৈরি না হতেই অবাক হবার পালা!
জীবন পথিমধ্যে এক বাড়িতে আশ্রিত হল। ঘরটার ডান পাশের খামটাতে কালো রং করা, বাঁ দিকের গুলো রং ছাড়া। শিল্প নির্দেশনার কী উদ্ভট কাজ!
গৃহকর্তা বললেন, মালাউন মেয়ে হলে আশ্রয় দেয়া যাবে, ছেলে নয়। কিন্তু গৃহকত্রী তা অগ্রাহ্য করে জীবনকে বসিয়ে গামছা ভিজিয়ে নিজ হাতে হাত মুখ মুছে দিলেন। তিনি জলের পাত্র এগিয়ে দিলে জীবনই তো হাত-মুখ ধুয়ে নিতে পারত, সে তো যুদ্ধাহত নয়। যাই হোক, তারপরের দৃশ্যেই সদ্য স্ত্রী-সন্তানের লাশ ফেলে রেখে আসা জীবন তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে- মহিলা পাখা দিয়ে বাতাস করছে। পরের দৃশ্যে সান্ত্বনা পেলাম; বিশ্রামের সময় অন্তত জীবনের তার স্ত্রী- সন্তানদের কথা মনে পড়েছে। এই বাড়ি থেকে বেরোবার সময় দেখলাম জীবনের পরনে রক্তের ছাপ ছাড়া নতুন ধুতি। মুসলমান বাড়িতে এমন নতুন ধুতি জীবন কিভাবে পেলো? নাকি সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে রক্তের দাগ তুলে ফেলেছে?
জীবন হাঁটতে হাঁটতে গেল ভারতের বর্ডারের কাছাকাছি বাংলাদেশ সীমান্তের এক শরণার্থী শিবিরে। সেখানে জীবনের সাথে নৌকায় থাকা অনেকই জীবিত দেখলাম। বুঝতে পারলাম তারা চুকনগরে যাননি।
অসংখ্য শরণার্থী বর্ডার পাড়ি দিচ্ছেন। তারা এসেছেন দুর-দুরান্ত থেকে মাইলের পর মাইল হেঁটে। হয়তো পথিমধ্যে কোথাও বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে। মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ নানা বয়সী শত শত শরণার্থী। বিশাল আয়োজন। এত কঠিন একটা কাজ সম্পন্ন করতে পারার জন্য পরিচালক অবশ্যই প্রশংসিত হবেন সর্ব মহলে। আমারও ভীষণ ভালো লেগেছে। কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই মানতে পারছি না- শত শত শরণার্থীর প্রত্যেকের পোশাক ধবধবে, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, যেন সব লণ্ড্রী থেকে ধুয়ে পরা! এ ঘটনাটা ঘটছিল শুরু থেকেই। নৌকায়, চুকনগরে। তা-ও মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু বর্ডার পর্যন্ত আসার পর আর মানতে পারলাম না। একটা মানুষের পোশাকেও একটু কাঁদা-মাটি, ধূলা থাকবে না?
শরণার্থীরা দল বেধে ভারতের দিকে যাচ্ছে। জীবন তাকিয়ে আছে বিপরীতে অর্থাৎ বাংলাদেশের দিকে। পরিবারের সবাইকে হারানো জীবন, দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অর্থাৎ হাটতে শুরু করলো উল্টো পথে। বাড়ি ফেরার পথে গফুর পাগলার সাথে দেখা। পাগল জীবনকে ফিরতে দেখে বলে, ‘তুই দেখি আমার চেয়ে বড় পাগল’ । অর্থাৎ পাগল নিজে জানে সে পাগল। পাগলের গায়ে কালো কোট চাপানো। এই গণ্ডগ্রামে শহরের কোট পাগল কোথায় পেলো? শত শত শরণার্থী -গ্রামবাসী কারোর গায়েই তো কোট দেখলাম না। পাগল কোট কোথায় পেল?
বাড়ি ফেরার পর কাকী সবকিছু জানতে পেরে যে অভিব্যাক্তি প্রকাশ করেছেন, তা অতুলনীয়। হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পরে কাকী যখন জীবনকে খাবার খেতে দেন, জীবনের আবারও তৃপ্তিসহ খাওয়া, সদ্য স্ত্রী-সন্তানহারা একজনের কাছ থেকে এমন অভিব্যক্তি পেলে কষ্ট লাগে।
চারজনের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কাকী চারটা গাছ লাগান।
জীবনের চাকরি হয় রাজাকার ক্যাম্পে। ঢাক হিন্দুয়ানী বাজনা বিধায় জীবনকে ওখানে ড্রাম বাজাতে হয় রাজাকারদের চাঙ্গা রাখার জন্য। সংলাপে জানলাম, ড্রাম আনা হয়েছে বিহারীদের কাছ থেকে। বিহারীদের ড্রামে কুকুরের গলায় ব্যাবহারের চামড়ার বেল্ট এল কি ভাবে? কুকুরের এই বেল্টের সংস্কৃতিটা যেই শ্রেণীর, তাদের কেউ কি এই পরাণপুরে থাকে? এই এলাকার সম্ভ্রান্ত বাড়ি হিসেবে ইতঃপূর্বে দত্তবাড়ি দেখেছি। সেখানেও এমনটা ছিল না। উদ্ভট নয় কি!
রাজাকার ক্যাম্পে যে ঘরে ধরে আনা মেয়েদের রাখা হয় তা বাঁশের বেড়ার দোতলা। কাঠের দোতলা দেখেছি, এই ছবিতে বেড়ার দোতলাও দেখলাম। কিন্তু দোতলা কেন?
নৌকা থেকে দুটো মেয়েকে ধরে আনার সময় প্রতিবাদ করায় বজলুকে গুলি করে মারা হয়। গুলি লেগে বজলুর বুক থেকে ধোয়া বেরুচ্ছিল কেন? বজলু মারা যাওয়ায় জীবনের কাকী আরেকটা গাছ লাগায়। আগের গাছগুলো স্বাভাবিকভাবেই বড় হবে কিন্তু এ সময়ের মধ্যে গাছগুলো কি একটু বেশি বড় হয়ে গেল না? চুকনগর শরণার্থী শিবিরের ঘটনা এপ্রিলের- ৫ম গাছ যখন লাগানো হচ্ছে তখনো দেশ স্বাধীন হয়নি; কয় মাসের ব্যাপার?
রাতের দৃশ্য। একটা ঘরের কাছে দুজন রাজাকার। এক মহিলা তাদের বলছে, ‘বাবারা আমার মেয়েটা ছোট, তোমরা এক একজন করে আগমন কর’। মহিলা আগে থেকেই কিভাবে বুঝলেন যে তারা দুজন একসাথে ঘরে প্রবেশ করবে?
দেখলাম লন্ডভণ্ড দত্তবাড়ি।
দত্তবাড়ির বউকে রাজাকার ক্যাম্পে ধরে আনা হয়েছে। তাকে ক্যাম্পের দোতলায় আটকে রাখার পর জীবনের সাথে তার চোখাচোখি হয়। লো-আঙ্গেল-হাই-আঙ্গেল-এর কিছু দৃষ্টিনন্দণ দৃশ্য। মনে হল, সেটটা দোতলা করা হয়েছে কি এজন্যই? ভালবাসা দিবসে ছবিটি রিলিজের কারণও কি তবে তাই?
সদ্য স্ত্রী এবং দু-সন্তান হারানো জীবনের মধ্যে সেই পূজার প্রসাদ নেওয়ার সময়কার প্রেম দেখা গেল।
এক রাজাকার মেয়েটিকে মুখ চেপে ধরে জানালা বন্ধ করে দিচ্ছে। অসহায় জীবন দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বসে আছে। মুক্তিবাহিনী রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করল। রাজাকার-রা পালিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার আগে একমাত্র মেয়েটিকে আটকে রাখা দোতলা ঘরটিতে আগুন জ্বেলে দিয়ে গেলো। কেন আগুন লাগালো?
ঘরের ভেতর থেকে ওভার দ্য শোল্ডার শটে দেখলাম বাইরে কোনও আগুন নেই। পরের ফ্রন্ট ক্লোজ শটে দেখি বাইরে ফোর গ্রাউন্ডে আগুন!
গ্রামের ঘরের জানালার শিক সাধারণত মধ্যবর্তী কাঠের ছিদ্রতে ভরা থাকে। এখানে দেখলাম মধ্যবর্তী কাঠের বাইরের দিকে শিক। মেয়েটা বাঁহাতে যে শিকটি ধরে ছিল, তা নড়বড়ে দাতের মত প্রায় খুলে যাচ্ছিলো।
ভাবলাম জীবন মেয়েটিকে বাঁচাবে। না। সে আনন্দে নাচতে নাচতে তার বাড়িতে গেল ঢাক আনতে। মেয়েটিকে ঢাক বাজিয়ে শোনাতে হবে না!
এদিকে মেয়েটি দোতলার জানালার শিক ধরে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। ঘরে তখন মেয়েটার পেছনে এবং জানালার বাইরে আগুন জ্বলছিল।
জীবন ঢাক নিয়ে ক্যাম্পে এসে দেখে মেয়েটির ঘরের দরজার ধারে কাছে তখনও আগুন আসেনি। তবুও জীবন নির্বিকার। মেয়েটাকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টাই সে করল না। আচ্ছা, ঘরে আগুন লাগলে মানুষ কি জানালার শিক ধরে দোতলায় দাড়িয়ে থাকতে পারে? নাকি জীবন বাঁচানোর জন্য ছোটাছুটি করে, সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করে? না কি ভাবে, কেউ বাঁচাতে না এলে, আমি নিজে থেকে বাঁচার চেষ্টা করব না।
আপনি কি করবেন প্রিয় পাঠক, যদি আপনার প্রিয়জনকে একটা আগুন লাগা ঘরে আটকে থাকতে দেখেন? নিশ্চয়ই তাকে বাঁচানোর সব রকমের চেষ্টাই করবেন?
‘জীবনঢুলী’ তে দত্তবাড়ির বউ যখন চোখের সামনে আগুনে পুড়ছিল, জীবন তখন ঢাক বাজাচ্ছিল!
দত্ত বাড়ির বউকে বিসর্জনের ঢাক। অর্জন করার চেষ্টার চাইতে বিসর্জন-ই মহিমাময়! গান হচ্ছিল, ‘ঢাক তুমি বাজো, বিসর্জনের দুঃখে বাজো, আগমনীর সুখে বাজো, দুঃখ ভোলার ছন্দে বাজো, বাংলারই ঘরে’-অসাধারণ গান। শুনতে ভাল লাগছিল।
ছবির শেষে এসে বুঝলাম, স্ত্রী এবং দু’-সন্তানকে হারিয়েও জীবনের কেন ঢাক বাজাতে ইচ্ছা করেনি। বুঝলাম কেন রাজাকারের মুখ থেকেও জীবনকে শুনতে হয়েছে ‘বউ পোলাপাইন মইরা শেষ, তবুও তোর চোখে এক ফোঁটা পানি দেখলাম না। তুই একটা মানুষ, না অমানুষ!’
পুরো ছবিতে একবারের জন্যও ঢোল বাজায়নি জীবন, বাজিয়েছে ঢাক। সে ঢাকি। ছবির নাম তাহলে ‘জীবনঢুলী’ কেন শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারিনি!

Check Also

nuru miah o tar beauty driver

নুরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার

মিডিয়া খবর :- গত ২৪ জানুয়ারি কোনও কর্তন ছাড়াই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় …

tanha, shuva

ভাল থেকো চলচিত্রের পোস্টার প্রকাশ

মিডিয়া খবর:- প্রকাশ হল জাকির হোসেন রাজুর নির্মিতব্য চলচিত্রের পোস্টার। জাকির হোসেন রাজুর নির্মাণে আসছে নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares