Home » চলচ্চিত্র » রাজত্ব’ সিনেমার রাজত্বহীনতা
images

রাজত্ব’ সিনেমার রাজত্বহীনতা

Share Button

রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ন

 

– ব্যস্ততার কারনে একটু দেরী করেই প্রেক্ষাগৃহে দেখতে যাই ইফতেখার চৌধুরীর ‘রাজত্ব’। এখানে বলে রাখা ভালো মুক্তির আগে চলচ্চিত্রটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে চলচ্চিত্রটি নিয়ে কিছু লেখার আগে এর পোস্টার নিয়ে কিছু কথা না লিখলে আমার এই পর্যালোচনা অসম্পূর্ন থেকে যাবে। এতোদিন দেশের তথা ঢালিউড চলচ্চিত্রে বিদেশী কাহিনী নকলের অভিযোগ থাকলেও পোস্টার নকলের ঘটনা মোটামুটি নতুন বললেই চলে। অনেকে বলেন, নকল কোন ব্যাপার না। এটা হতেই পারে। অন্যদেশও নকল করে। তাছাড়া সেইসব নকল চলচ্চিত্র এদেশের দর্শক দেখার সময় তো কোন প্রশ্ন তোলে না। সব দোষ শুধু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের! মূল কথা হলো,এদেশের মানুষ এদেশের চলচ্চিত্রকে ভালোবাসে। আর সেই কারণেই তারা চায় আমাদের দেশের পরিচালকরা নিজেদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করুক। আপনিও নিশ্চয়ই চাইবেন না আপনার সন্তান অন্যের লেখা নকল করে পরীক্ষায় পাশ করুক। কেননা আপনি জানেন নকল করে পরীক্ষায় পাশ করলেও ভবিষ্যৎ এ তার জন্য ঘোর অন্ধকার অপেক্ষা করবে। ‘রাজত্ব’ চলচ্চিত্রের পোস্টারের যে বিষয়টি আমাকে র্সবপ্রথম অবাক করেছে সেটি হলো, পোস্টারে চলচ্চিত্রের নামের উপরে সংগীত পরিচালক এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম আর নীচে পরিচালকের নাম! যদিও পূর্বে দেখে এসেছি পরিচালকের নামের পরই চলচ্চিত্রর নাম থাকতো। এখানে কেনো ইফতেখার চৌধুরীর মতো একজন প্রতিশ্রুতিশীল পরিচালক নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। তবে এটা ঢের বুঝতে পেরেছি চলচ্চিত্র থেকে ‘শিল্প’ শব্দটি চিরতরে নির্বাসনে চলে গিয়েছে! তার বদলে রাজত্ব করছে ‘ব্যবসা’ শব্দটি। ‘রাজত্ব’ চলচ্চিত্রটিও তার ব্যতিক্রম নয়। আর সে কারনে হয়তো বা বলিউড এবং তামিল চলচ্চিত্রের পোস্টার হুবহু নকল করেছে। যাকে এক কথায় গলাকাটা পোস্টার বলে। অন্যদিকে পোস্টারে শাকিব খানকে যে মোটর সাইকেল ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে পর্দায় তাকে সেই মোটর সাইকেল ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। একে দর্শকদের সাথে প্রতারণা করা বললে নেহায়েত ভুল বলা হবে না। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, কেনো এই গলাকাটা পোস্টার? আমাদের মেধা দিয়ে কি ব্যতিক্রমী পোস্টার তৈরী করা যেতো না? কিংবা কেনো সাধারণ দর্শকদের সাথে প্রতারণা? আমার এই প্রশ্ন গুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার দূর্দান্ত এক ক্ষমতা আমাদের কতিপয় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের আছে! সে কারনে প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে চলচ্চিত্রের ভেতরটা নিয়ে কিছু পর্যালোচনা করা যাক। চলচ্চিত্রের শুরুটা হয় ফ্ল্যাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। যেখানে ফ্ল্যাট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০% কমিশন দাবি করে তনি গ্রুপ চাঁদাবাজ। এমন সময় ব্যবসায়ীর সহযোগী রতন পরোক্ষভাবে নায়ক শাকিব খানের উপর ভরসা করার কথা বলেন। পরদিন চাঁদা নিতে আসা তিন গ্রুপের মধ্যে কথা কাটাকাটি হওয়ার এক পর্যায়ে উড়ন্তভাবে শাকিব খানের আবির্ভাব হয়। এমন আবির্ভাব বাংলা চলচ্চিত্র অহরহ হয়ে থাকে। যে কারনে কোন নতুনত্ব খুঁজে পেলাম না। শুরুতে একটি আইটেম গান থাকলেও সেটিতে আদৌ কোন শৈল্পিকতার ছোঁয়া ছিলো কিনা সংশয় আছে। আইটেম গানের নামে ক্যামেরায় যেভাবে দুই আইটেম গার্লের নিতম্ব আর স্তন এলাকা বারবার ফ্রেম বন্দী করেছে তা দেখে আমার কল্পনা শক্তিকে কয়েক বছর আগের অশ্লীল যুগকে মনে করিয়ে দিয়েছে। চলচ্চিত্রে আধুনিকতার নামে অশ্লীলতা কারো কাম্য নয়। আমি খেয়াল করেছি আইটেম গান শুরু হওয়ার পরপরই অনেক নারী দর্শক প্রেক্ষাগৃহ ত্যাগ করেছেন। বলিউড থেকে আমদানি হওয়া আইটেম গানের নামে নারীর দেহকে পণ্য হিসেবে প্রদর্শণ করা এদেশের সিনেমার জন্য কতটুকু সুফল বয়ে আনছে তা এখনই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা উচিত। নারীকে পণ্য হিসেবে প্রদর্শন করা চলচ্চিত্রে নতুন না হলেও এর ব্যাপকতা নতুন করে শুরু হয়েছে যার কৌশলটা ভিন্ন । আধুনিক প্রযুক্তির ঝবঝকে প্রিন্ট আর নারীর দেহের সংমিশ্রণ প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানার মূল মন্ত্র হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে। যেখানে অভিনয়ের নান্দনিকতা বড় একপেশে হয়ে পড়েছে। ‘রাজত্ব’ চলচ্চিত্রে আমরা তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি। পুরো চলচ্চিত্রে নায়িকা ববির দেহটাই প্রাধান্য পেয়েছে, অভিনয় বিষয়টাকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়া হয়নি। আমি মানছি আমাদের চলচ্চিত্রের বেশীরভাগ দর্শক তরুণ। আর এই তরুণদের হাততালি আর শুকনো কামনাকে উৎসাহিত করার জন্য পর্দায় ববির খোলামেলা উপস্থিতি। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে ববি সফল। তরণদেরকে বেশ ভালোভাবে উত্তেজিত করতে পেরেছেন। অন্যদিকে যারা চলচ্চিত্রটি দেখেছেনে একটু মনে করে দেখুন ববি চলচ্চিত্রটিতে শহর থেকে দূরে বসবাসকারী একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি। অথচ চলচ্চিত্রটিকে ববির সাজ- সজ্জা মধ্যবিত্ত পরিবারের সাথে মানানসই নয়। শাকিব খান যখন মোটর সাইকেল খারাপ হওয়ায় ববিদের বাড়িতে সাহায্যের জন্য মাঝ রাতে হাজির হয় তখন ববির পোশাকটার কথা মনে করুন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মধ্যরাতে এমন পার্টি ড্রেস পরিধান করে নিশ্চই থাকে না। ‘রাজত্ব’ চলচ্চিত্রে ববির যেসব জায়গায় আবির্ভাব হয়েছে সেসব জায়গাতো বটেই গান গুলোর দৃশ্যায়নে উরু, পিঠ আর স্তনটাযুগলকে যেভাবে ফ্রেমবন্দী হতে দেখি তা আর কিছু নয় নারীকে ‘দেখার বস্তু’ হিসেবে হাজির করা মাত্র। এইসব বিষয়ে ববিকে আরো সচেতন হওয়া খুব জরুরী। কেননা অভিনয়কে পাশ কাটিয়ে দেহটাকে গুরুত্ব দিলে হয়তোবা মূলধারার সামাজিক দর্শক তাকে কখনো গ্রহণ করবে না। এদিকে চলচ্চিত্রের একর্পায়ে শাকিব খান ববির ধর্ষিতা বোনকে যে হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেই হাসপাতালের ইন্টার্নি ডাক্তার ববি। ববি নিজের বোনকে শাকিব খানকে না জানিয়ে চিকিৎসা শেষে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কারন জানতে চাওয়ার এক পর্যায়ে সেখানের কর্তব্যরত প্রধান ডাক্তার ববির বোনের ধর্ষিতা হওয়ার খবরটি বলে। যা শাকিব খান জানতো না। তবে আমার অবাক লেগেছে দৃশ্যের প্রয়োজনে যখন আবার হাসপাতাল দেখানো হলো তখন সেটা আগের হাসপাতালের পরিবর্তে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল দেখানো। ডাক্তার-কর্মচারী-ববির ইন্টার্নি সব ঠিক থাকলেও ঠিক নেই হাসপাতাল। হাসপাতাল পরিবর্তনের কোন দরকার ছিলো বলে আমার মনে হয়না। একেই বলে চলচ্চিত্রিক অসংগতি, যা আমাদের ওস্তাদ পরিচালকরা বুঝেও বোঝেন না। দায়সারা কাজ করে দর্শক টানার চেষ্টা করেন। শাকিব খান নিজের জায়গায় বেশ ভালে করেছেন। তার সংলাপ বলায় যথেষ্ট স্পষ্টতার ছাপ ছিলো। একশান দৃশ্য থেকে শুরু করে রোমান্টিক দৃশ্য এবং নাচ সব বিভাগে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। কেননা তিনি নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা রেবেকা’র মেকাপ আরো নমনীয় হলে পারতো। এছাড়া অতিরিক্ত অভিনয় দেখাতে গিয়ে অভিনয় বাস্তব রুপ পায়নি। কমেডি চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন তাদের মেকাপ যাচ্ছে তাই হয়েছে। বিশেষ করে ঠোঁটে মাত্রাতিরিক্ত লিপস্টিক ব্যাবহার করা হয়েছে। যা খুবই দৃষ্টিকটূ লেগেছে। খল চরিত্রে আমির সিরাজীকে আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন পরিচালক। পুরো চলচ্চিত্রে ‘রাজত্ব’ শব্দটি দুইবার উচ্চারিত হয়েছে। তাও আবার আমির সিরাজীর মুখ থেকে। সংলাপে আমির সিরাজী পুরো শহরের রাজত্ব নিজের বলে জাহির করতে চাইলেও চলচ্চিত্রে তার তেমন কোন চিত্র দেখতে পাইনি। ‘রাজত্ব’ শব্দটি শুধু সংলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যে কারনে রাজত্বহীনতায় ভুগেছে ‘রাজত্ব’। অদিত’র সংগীত আহামরি না হলেও ভালো হয়েছে। তবে বলিউডের ছায়া থাকায় নিজের প্রতিভাটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে আমি বলবো। আশাকরি ভবিষ্যতে নিজের মেধা দিয়ে আরো ভালো কিছু করবেন। সম্পাদনা এবং চিত্রগ্রহণে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া ছিলো। সবশেষে বলতে গেলে নামের সাথে চলচ্চিত্রের মিল না থাকলেও ইফতেখার চৌধুরীর নির্মান মোটামুটি ভালেই ছিলো। আশা করবো চলচ্চিত্রকে ব্যবসার দৃষ্টিতে না দেখে শিল্পের দৃষ্টিতে দেখে আগামীতে আরো ভালোমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন।

Check Also

meghkonya

ফেরদৌসের মেঘকন্যা

মিডিয়া খবর:- শেষ হচ্ছে ফেরদৌসের মেঘকন্যা। দীর্ঘ বিরতির পর ‘মেঘকন্যা’র শেষ লটের শুটিং শুরু হতে যাচ্ছে। …

misha sawdagor

নায়ক হয়ে আসছেন মিশা সওদাগর

মিডিয়া খবর:- চলচ্চিত্রে নায়ক হিসাবে অভিষেক হলেও খল চরিত্রাভিনেতা হিসেবে মানুষের মনে স্থায়ী আসন লাভ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares