Home » নিউজ » চেতনার বাতিঘর শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
jahanara

চেতনার বাতিঘর শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

Share Button

ঢাকা:-

 – রুদ্র মাহমুদ

কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধিসাধনের উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করেননি তিনি। প্রতিকূল সময়ে এদেশের মানুষের প্রাণের দাবিকে অনুভব করেছিলেন বলেই নেমেছিলেন লড়াইয়ে। কোটি জনতার সুপ্ত চাওয়াকে দিয়েছিলেন সাংগঠনিক রূপ। বাংলাদেশের গর্ব তিনি, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনত শ্রদ্ধা।

দেশে আজ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে এক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আজকে এই জনমত গড়ে তোলার পেছনে বিশাল অবদান রেখে গেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি।
প্রতি বছরের মতো এবারো জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান, স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্ম নেন। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবার বলতে যা বোঝায়, সে রকম একটি পরিবারেই তিনি জন্মেছিলেন। জাহানারা ইমামের বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম।

জাহানারা ইমাম মাট্রিক পাস করেন ১৯৪২ সালে। ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বিএ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

শিক্ষক হিসাবে তার কর্মময় জীবনের প্রথম কাল কাটে ময়মনসিংহ শহরে। সেখানে বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (১৯৫২‌‌-১৯৬০), বুলবুল একাডেমি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক (১৯৬২-১৯৬৬)এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিংকলেজের প্রভাষক (১৯৬৬‌-১৯৬৮)হিসাবে তার কর্মজীবন অতিবাহিত হয়। তিনি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন।

আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধে জাহানারা ইমামের ছেলে শাফী ইমাম রুমী শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বামী শরীফ ইমামও মারা যান। ৭১ সালে স্বামী আর সন্তান হারানো জননী স্বাধীনতা উত্তর এদেশের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির উল্থানের পক্ষে তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর উপন্যাস বা দিনলিপি যাই বলিনা কেন, একাত্তরের দিনগুলি ছিলো একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মায়ের দৃঢ়তা আর আত্মত্যাগের অনন্য উদাহরন।

একাত্তরের পাকিস্তানিদের দেশীয় দোসরদের বিচারের দাবিতে প্রতিকূল একসময়ে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদ জননীর নেতৃত্বে গঠন করা হয় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এর পাশাপাশি ৭০ টি সংগঠনের সমন্বয়ে সেবছরই ১১ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। যার আহবায়কও ছিলেন শহীদ জননীর জননী জাহানারা ইমাম।

শহীদ জননীর নেতৃত্বেই ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক প্রতীকী বিচার সম্পন্ন হয়। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। সারাদেশে ঘাতক দালালদের বিচারের দাবি ওঠে।

গণআদালত গঠন করে রায় ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কিমিট এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।

আশির দশকের শুরুতে ১৯৮২ সালে জাহানারা ইমাম মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রতি বছর একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো তাঁকে। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য শহীদ জননীকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্টয়েট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসার আওতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছেন তিনি। ২৬ জুন ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্টয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের ৬৫ বছর বয়সে জাহানারা ইমাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জাহানারা ইমাম শিশু সাহিত্য, অনুবাদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন বই লিখেছেন। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ তার বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি স্বাধীনতা পদক (১৯৯৭), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কমর মুশতরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), আজকের কাগজ হতে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার (বাংলা ১৪০১ সনে), নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা (১৯৯৪), রোকেয়া পদক (১৯৯৮) প্রভৃতি পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে আলোকশিখা জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন তা বিফলে যায়নি। আজকের তরুণ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে গভীর রেখাপাত করেছে, তার উৎস হলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

বি দ্র : লেখাটি প্রতিমুহূর্ত ডটকম থেকে সংগৃহিত।

Check Also

Shesh chal

সজল ও তাইয়্যাবা তাহসীন জুটির শেষ চাল

মিডিয়া খবরঃ-    -: সাজেদুর রহমানঃ- মায়ের হাত ধরে নতুন বাবার সংসারে এসেছে আদনান। কয়েকমাস পরে …

tazrin gouhor

আব্বার লেখা গানের ডায়রিটা এখন আমার কাছে: তাজরিন গহর

মিডিয়া খবরঃ- ছোটবেলা থেকেই গানের সাথে ওঠাবসা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় চার নেতার সামনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares