Home » ইভেন্ট » ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র রজতজয়ন্তী
beder-meye

‘বেদের মেয়ে জোসনা’র রজতজয়ন্তী

Share Button

ঢাকা:-

বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ চলচ্চিত্রটি একক অনন্য মাইলফলক। ১৯৮৯ সালের ৯ জুন ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। মুক্তির পরপরই তুমুল জনপ্রিয় হয় এটি। টিকিট না পেয়ে আত্মহত্যা, সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। প্রথম তিন মাসে ৪০ কোটিরও বেশি টাকা আয় করে সিনেমাটি। বাংলাদেশের বেশ কিছু সিনেমা হলে একটানা ৬ মাস হাউসফুল ছিল এই সিনেমাটি। বলা হয়ে থাকে এ ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যকে এখনও কোনো ছবি টপকাতে পারেনি। ২০১৪ সালের ৯ জুন ছবিটি মুক্তির ২৫ বছর পূর্ণ করলো। এ ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন অঞ্জু ঘোষ! এ ছাড়াও ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, শওকত আকবর, রওশন জামিল, প্রবীর মিত্র, সুষমা, সাইফুদ্দিন, নাসির খান প্রমুখ। ছবিটিতে মোট ১১টি গান ছিলো যার ১০টি গানই পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুলের লেখা। সেই গানগুলোর মাঝে রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠের ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’ এবং মুজিব পরদেশীর কণ্ঠে ‘আমি বন্দি কারাগারে’ গান দুটি আজও শ্রোতার মুখে মুখে ফেরে।

ছবিটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ১৯৯১ সালে মতিউর রহমান পানুর পরিচালনায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় রিমেক হয় এটি। মুল গল্প, গান, নায়িকা সব একই রাখা হয়েছিল। শুধু বাংলাদেশের নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিবর্তে এই ছবির রিমেকে অভিনয় করেছিলেন চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী (দীপক চক্রবর্তী)। কলকাতা সহ গোটা পশ্চিমবাংলায় বেদের মেয়ে জোসনাকে নিয়ে শুরু হয়েছিল তুমুল উত্‍সাহ। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় এরপরেও অনেক বাণিজ্যিক ছবি তৈরি হয়, কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই ফ্লপ হয়। সীমান্তের এপার -ওপার মিলিয়ে ব্যবসা আর জনপ্রিয়তার নিরিখে সফলতম বাংলা সিনেমা এখনও পর্যন্ত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ই।

কাহিনী-

বঙ্গরাজের এক পরগনার কাজী সাহেবের (প্রবীর মিত্র) একমাত্র দশ বছরের মেয়ে জোসনাকে সাপে কাটে। তাকে বাঁচানোর সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে। ভাসতে ভাসতে সেই ভেলা নদীর তীরের একটি বেদে বহরের কাছে এসে থামে। বেদে বহরের নিঃসন্তান বেদে সর্দার (সাইফুদ্দিন) তাকে ভালো করে তোলে এবং জোসনা নামেই নিজের নাতনির মতো একজন পেশাদার বেদেনি হিসেবে গড়ে তোলে। জোসনা একদিন রাজবাড়ি থেকে সাপখেলা দেখিয়ে ফেরার পথে বঙ্গরাজের উজিরপুত্র “মোবারক” (নাসির খান) জোসনার সম্মানহানি করতে চায়, আর এমন সময় রাজকুমার “আনোয়ার” (ইলিয়াস কাঞ্চন) এসে তাকে উদ্ধার করে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্য গভীর প্রেম হয়ে যায়। বঙ্গরাজ- তার পুত্র যুবরাজ আনোয়ার সকল বিষয়ে এখন পারদর্শী তাই তিনি ঠিক করে উজিরকন্যা “তারা বানু”কে (ফারজানা ববি) পুত্রবধু করে আনোয়ারের উপর রাজ্যের সমস্ত দায়িত্ব অর্পন করবেন। ঠিক এমন সময় আনোয়ারকে একটি সাপে কাটে, আর তাকে এমন সাপেই কেটেছে যার বিষ নামাতে কোন ওঝাই রাজি হলো না, যখন প্রায় সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ তখনই সেনাপতি পুত্র “রাজ্জাক” (মিঠুন) জোসনাকে সাথে নিয়ে আসে। জোসনা তার নিজের জীবন বাজি রেখে আনোয়ারকে সুস্থ করে তোলে, এর আগে বঙ্গরাজ প্রতিশ্রুতি দেয়- জোসনা আনোয়ারকে সুস্থ করতে পারলে সে যা চাইবে, রাজা রাজসভায় সবার সামনে খুশি হয়ে তাকে তাই দিবেন।

এবার চাওয়ার পালা- পূর্ণ রাজসভায় সবার সামনে জোসনা গানের সুরে কী ধন আমি চাইবো রাজা গো… ও রাজ চাই যে রাজকুমারকে কিন্তু রাজার মতে জোসনার চাওয়ার পরিমাণ এতই বেশি যে তাকে পুরস্কারতো দূরের কথা শেষ পর্যন্ত তিরস্কার করে কপালে রক্ত ঝরিয়ে রাজসভা থেকে বের করে দেয়। এবং বেদে বহরের সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তাড়িয়ে দেয় রাজ্য থেকে, এদিকে আনোয়ার এই ঘটনা মায়ের কাছে জানতে পেরে জোসনাকে খুঁজতে বেরিয়ে যায়। খুঁজে পেয়ে জোসনাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে প্রাসাদে, পিতা বঙ্গরাজের কথা অমান্য করে জোসনাকে বিয়ে করার অপরাধে বঙ্গরাজ- পুত্র আনোয়ারের মৃত্যুদণ্ড দেন ও পুত্রবধু জোসনাকে পাঠান বনবাসে। রানীমা নিজ কৌশলে জল্লাদের হাত থেকে পুত্র আনোয়ার ও পুত্রবধু জোসনাকে বাঁচিয়ে দুজনকে একসাথে বনবাসে পাঠিয়ে দেন। শুরু হয় তাদের বনবাস জীবন। জোসনার চেয়ে খাবার খেতে চায় না আনোয়ার, সে চায় নিজে কোনো কাজ করবে এবং রাজপুত্র হয়ে গেল কাঠুরিয়া।

দুজনের দিন ভালই যাচ্ছিলো, হঠাৎ একদিন নরসুন্দরের বেশে আগমন ঘটলো উজিরপুত্র মোবারকের। সে ঐ এলাকার জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, মোবারক- আনোয়ার ও জোসনাকে চিনতে পেরে মনে মনে ফন্দি আঁটতে থাকে এবং জমিদার বাড়িতে গিয়ে রাতের আঁধারে কিছু অর্থ ও অলংকার চুরি করে জমিদারের একজন প্রহরীকে হত্যা করে। এবং আনোয়ার ও জোসনার ঘরের পাশে কাঠের স্তুপের মধ্য রেখে আসে। জমিদারের প্রহরী খুন হওয়ায় জোর তালাশ- কে হত্যা করলো তার প্রহরীকে খুঁজতে পাঠালো সব লোক, মোবারক সরাসরি তাদের জানায় এই জঙ্গলে এক তাগড়া জোয়ান স্ত্রী সহ বসবাস করে। জোসনা গেছে ধর্মপিতার (কাজী সাহেবের) কাছে আর এমন সময় জমিদারের প্রহরীরা আনোয়ারকে ধরে নিয়ে যায়, যখন সে জমিদারের প্রশ্নের মুখে তখনই মোবারক রক্ত মাখা খঞ্জর আর চুরি যাওয়া জিনিস পত্র নিয়ে আসে। ফলে বন্দি হয় আনোয়ার, আর জোসনা আনোয়ারকে খুঁজে হয়রান এমনসময় মোবারক তার লালসার শিকার বানাতে চায় তাকে, জোসনা মোবারকের মুখে জ্বলন্ত আগুনের ফুলকি চেপে ধরে পালিয়ে যায়।

এদিকে বঙ্গরাজ যখন পুত্র শোকে কাতর তখন সেনাপতিপুত্র রাজ্জাকের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিষ্ঠা রাজার মন জয় করলে, রাজা তার রাজ্যের সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেন রাজ্জাকের হাতে। রানীমা গোপনে রাজ্জাককে জানায় রাজকুমার আনোয়ার এখনো বেঁচে আছে, খুশি হয় রাজ্জাক। এদিকে রাজ্জাকের হাতে রাজ্যের দায়িত্ব তুলে দেয়ায় লোভী উজির তার কন্যা তারা বানুকে রাজ্জাকের সাথে বন্ধুত্ব করতে বলে। কিন্তু তারা ক্ষোভে দুঃখে আত্মহত্যা করতে গেলে রাজ্জাক তাকে বাঁচায় এবং জানায় রাজকুমার আনোয়ার এখনো বেঁচে আছে। ঘটনাচক্রে প্রেম হয়ে যায় ওদের, রাজ্জাক তারা বানুকে ছেলে সাজিয়ে তারকা নাম দিয়ে রাজকুমারের খোঁজে তার মামা জমিদারের কাছে পাঠায়। জমিদার সাহেব তারাকে ছেলে হিসেবে পেয়ে খুশি হয়, জমিদারের কারাগারে বন্দি থাকা আনোয়ার একবুক কষ্ট নিয়ে গেয়ে উঠে- মা… আমি বন্দি কারাগারে আছিগো মা বিপদে বাইরের আলো চোখে পড়ে না। গান শুনে তারা বেরিয়ে কারাগারের কাছে এসে রাজকুমারকে বন্দি থাকতে দেখে কষ্টে বুক ভেঙে যায় তার। সে মহারাজ জানাতে চাইলে আনোয়ার বাধা দিয়ে বলে আগে আমার জোসনাকে খুঁজে বের করো।

শুরু হয় আনোয়ারের অপরাধের বিচারকার্য বিচারক কাজী সাহেব আনোয়ারকে হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে আসে তার ধর্মমেয়ে (জোসনা) অনুনয় বিনয় করে স্বামীকে ছেড়ে দিতে। কাজী সাহেব জোসনাকে বলেন, মা এটা বিচারালয় আর বিচারালয়ের বিচারকার্য কোনো আবেগের কথা গ্রহণযোগ্য না। তারা একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে রাজকুমার সম্বোধন করলে কাজী সাহেব জানতে চায় কে রাজকুমার, আনোয়ার; বঙ্গরাজের পুত্র শুনে বিশ্বাস করেন না তিনি। এদিকে তারার পাঠানো বার্তায় রাজ্জাকের মাধ্যমে বঙ্গরাজ তার পুত্র আনোয়ার বেঁচে আছে এবং তারই রাজ্যের অধীনে একটি পরগনার জমিদারের কারাগারে হত্যার দায়ে বন্দি জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে রওনা দেন সেখানকার উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছেই পুত্রকে বিচারালয়ে দেখে বুকে জড়িয়ে নেন তিনি, এবং শ্যালক কাজী সাহেবকে নির্দেশ দেন রাজকুমারকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। কিন্তু রাজকুমার যে নির্দোষ প্রামাণ না করতে পারলে এটাই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়, এমন সময় রাজ্জাক উজিরপুত্র মোবারককে ধরে নিয়ে আসে এবং সে সব দোষ স্বীকার করে।

বিচারালয়ে হাজীর জোসনার দাদা-দাদী, জোসনা কাজী সাহেবকে বাবা বলেডাকলে তার পালনকারী দাদা-দাদী বলে; বাবা এলো কোথা থেকে আমরা তো তোকে সাপে কাটা অবস্থায় নদীতে একটি কলার ভেলায় ভাসানো পেয়েছিলাম। শুনে চমকে উঠে কাজী সাহেব জানতে চায় তখনকার কোনোচিহ্ন আছে কি না, ওনারা একটা চিঠি বের করে দেন তার হাতে।

—আর এতেই বেজে ওঠে রাজ্যময় মহামিলনের বাঁশি।

মুক্তির সাল          : ১৯৮৯
প্রযোজনা সংস্থা    : আনন্দমেলা চলচ্চিত্র
প্রযোজক             : সুকুমার রঞ্জন ঘোষ

শ্রেষ্ঠাংশে

  • ইলিয়াস কাঞ্চন – আনোয়ার
  • অন্জু – জোসনা
  • মিঠুন – রাজ্জাক
  • ফারজানা ববি – তারা
  • সাইফুদ্দিন – বেদে সরদার
  • নাসির খান – মোবারক
  • শওকত আকবর – বঙ্গরাজ
  • প্রবীর মিত্র – কাজী সাহেব (বিচারক)
  • রওশন জামিল – জোসনার দাদী
  • দিলদার – মনি
  • আব্বাস – জমিদার
  • সুষমা –
  • মায়া চৌধুরী –
  • মঞ্জুর রাহী –
  • নাদের –
  • গোলাম শরিফ খান –
  • ফজল রহমান –

 * (তথ্যসুত্র – দৈনিক পত্রিকা সমুহ এবং বাংলা উইকিপিডিয়া)

সাউন্ড ট্র্যাক

ট্র্যাক গান কণ্ঠশিল্পী নোট
মায়ায় গড়া এই সংসারে রথীন্দ্রনাথ রায়
ও রানী সালাম বারেবার/পাহাড়িয়া সাপের খেলা সাবিনা ইয়াসমিন
এসো এসো শাহাজাদা..গো রুনা লায়লাঅ্যান্ড্রু কিশোর
বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে রুনা লায়লা ও অ্যান্ড্রু কিশোর শিরোনাম গান
প্রেম যমুনা সাঁতার দিলাম..গো রুনা লায়লা
কি ধন আমি চাইবো রাজা..গো রুনা লায়লা
ও তুই ডাকলি যারে আপন করে রথীন্দ্রনাথ রায়
মেরনা মেরনা জল্লাদ..গো রুনা লায়লা
আমারো লাগিয়া..রে বন্ধু সাবিনা ইয়াসমিন ও অ্যান্ড্রু কিশোর
১০ ওরে তারা তুই দিলি ধরা খুরশিদ আলম ও রুনা লায়লা
১১ মা.. আমি বন্দি কারাগারে মুজিব পরদেশী

Check Also

রীনা ব্রাউন

মুক্তি পাচ্ছে রীনা ব্রাউন

মিডিয়া খবর:- আগামী ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার স্টার সিনেপ্লেক্স প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে চলচ্চিত্র …

Nusrat-Faria

শুভ ও নুসরাত ফারিয়ার ধ্যাৎতেরিকি

মিডিয়া খবর :-  সব প্রতিক্ষার অবসান শেষে এবার শুটিং শুরু হল আরেফিন শুভ ও নুসরাত ফারিয়ার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares