Home » নিবন্ধ » জীবন কবি চাঁনবয়াতি
chan-mia

জীবন কবি চাঁনবয়াতি

Share Button

–   প্লাবন ইমদাদ

 ঢাকা:-

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে জেলখানায় বসে কবর নাটক রচনা ও মঞ্চস্থ করেন মহান নাট্যকার ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, যা হয়ে উঠে ইতিহাস। ইতিহাসের পাতা থেকে গেলেও জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে। উচ্চমার্গীয় তত্ব আর জীবনবোধের থেকে যোজন যোজন দূরে অনেক মানুষ থাকে যারা কেবল ক্ষুদ্র গন্ডির ভেতর হাতড়ে বেড়ায় একান্ত অতল জীবনবোধ। সেই জীবন জিজ্ঞাসা তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এমনি এক অজানা, অচেনা মেঠোপথের স্বভাব কবি চান বয়াতিকে, যিনি সমাজ আর সামাজিক মানদন্ড দ্বারা আঘাতে জর্জরিত হয়ে জামালপুরের ছোট্ট্র কারাগারে আশির দশকে কয়েদী অবস্থায় দরাজ গলায় গেয়ে উঠেন, ‘আমার জেল হবে না ফাঁসি হবে গো, দুলু উকিল কইলোনা, মেজিস্ট্রেট শামছুল আমায় জামিন দিলনা’। হ্যা, সেই অজানা, অচেনা পাড়া গাঁয়ের চাঁনবয়াতী, জামালপুর শহর সংলগ্ন চর ভাবকিতে যার জন্ম ও বেড়ে উঠা। আজন্ম সংগীত ও জীবনবোধ তাকে তাড়া করে ফিরেছে আর মধ্যযৌবনে সেই সংগীত চর্চা ও সামাজিক কুচর্চা ও ধর্মের অপব্যাবহারের বিপরীত স্রোতে দাড়িয়ে তাকে বরণ করতে হয় কারাবাস। কিন্তু দরাজ কন্ঠ থেমে থাকেনি। তাই জেলখানায় বসেই অন্যায়ের প্রতিবাদে গেয়ে উঠেন আপন সুরে। কারাধ্যক্ষ খেয়াল করেন বিষয়টা আর ডেকে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনেন তার লুক্কায়িত কথা। পরে তিনি মামলার জটিল কার্যক্রমে বাড়িয়ে দেন সহযোগিতার হাত। কারাবাসের পর জেরখানায় রচিত সে জারি গান ছড়িয়ে পড়ে মাঠে ময়দানে। পৌষ মাঘের রাতে মানুষ রাতভর আসর বসিয়ে শুনেন বয়াতির আত্নকথা। বয়াতি হয়ে উঠেন আঞ্চলিক, গণমানুষের মহানায়ক। একে একে নবীজি, মনসুর হাল্লাজসহ মর্মস্পর্শী সব জীবনী আর সুফি তত্ত্বের নানা দিক নিয়ে বাঁধতে থাকেন আপন সুর আর কথার মালা। জামালপুর জেলায় সর্বপ্রথম অডিওতে ধারন হয় তার সেসব মর্মস্পর্শী জারি। দূর-দূরান্তের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে যায় চান বয়াতির জারি। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা সজ্জিত লিকলিকে দেহ আর সারিন্দা গলায় বয়াতি আসর কাঁপান রাতের পর রাত। শৈশব থেকেই রুপকথার মত শুনে এসেছি চাঁনবয়াতির গল্প। দূর প্রবাসে এসেও বয়াতির রুপকথা পিছু ছাড়েনি। ইচ্ছে ছিল তাকে নিয়ে কিছু একটা করার। তাই এবার দেশে গিয়ে আমার শখের সস্তা ক্যামেরাটা নিয়ে ছুটে যাই বয়াতির সন্ধানে। অনেক ঘাট পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ভাবকি বাজারে খুজে পাই আমার স্বপ্নের বরপুত্রকে। সবার আগে যা চোখে পড়ে তা হলো তার চোখ। আমি মানুষকে খুজে বেড়াই তার চোখে। হ্যা, তাকেও খুজে পেলাম তার সেই মরে যাওয়া নদীর মত বিরান চোখ দুটোতে। আমি টের পেলাম একটা তন্বী নদী ছিল ওখানে, অনেক ঢেউ আর শুভ্র কাশফুলে সমৃদ্ধ ছিল সেই নদীটা। কি মায়া, কি আকূলতা, কি বিধ্বস্থ নষ্টালজিয়া! তাকে টেনে নিয়ে গেলাম তার যৌবনের দিনগুলোতে। খনখনে দুপুরেই যেন চাঁদের রাত বানিয়ে নিলাম জোর খাটিয়ে আর বয়াতি বিছিয়ে দিলেন তার স্বপ্নপুরীর গল্পের শীতলপাটি। একবার বয়াতি গেলেন তুলসীপুর বাজারে গান গাইতে। বাজারের বিশাল ময়দান কানায় কানায় ভরে গেল তবু ঠাই হলোনা সহস্র লোকের। জনতার পিড়াপিড়িতে তাই বয়াতিকে সেখানে অবস্থান করতে হলো চার রাত। আরেকবার সরিষাবাড়ীর এক গানের আসরে বয়াতি গাইছিলেন এক ঐতিহাসিক জারি যেখানে এক বিভস খুনীর বিবরন আছে। জারির মাঝপথে এক যুবক হঠাৎ লাঠি নিয়ে তেড়ে আসলেন আসরের দিকে সেই খুনীকে আঘাত করতে। পরে জনতা তাকে ঠেকালেও তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে চিৎকার করছিলেন সেই নিষ্ঠুর খুনীর বিরুদ্ধে। এইতো শিল্পির স্বার্থকতা, এই তো শিল্পের শক্তি! বলতে গিয়ে কেঁপে উঠেন বয়াতি আর আমার তৃষ্ণা বাড়ে। বয়াতি শুনান মানবিকতার কথা, শুনান সুফিবাদের কথা, শুনান আত্নার কথা, শুনান শুদ্ধতার কথা। আমি তখন দেখি এক বাঙলার মিশেল ফুকো কিংবা কার্লমার্ক্সকে। আমি দেখি এক প্রগতিশীল অপ্রাতিষ্ঠানিক জীবন কবিকে। আমি দেখি তারাশঙ্করের নিতাইকে যে জীবনের কাছে আকূল জিজ্ঞাসার জন্যে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এভাবে কথার ঈন্দ্রজাল বুনতে বুনতে একসময় আসে কষ্টের অধ্যায়, আসে প্রবঞ্জনার অধ্যায়। চান বয়াতির অডিও অ্যালবাম বাজারে বেচে কিভাবে বয়াতির প্রাপ্য হিস্যা তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি সে কথা শুনি। মেধাস্বত্ব আইন জানেনা তিনি, জানেন না রাষ্ট্রের ধুয়াশাচ্ছন্ন আইনের বাহান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি। তাই সরলতা চিরকাল প্রবঞ্চিত হয়, প্রতারিত হয় মানবতা। বয়াতি শুনান কি করে বাঙলার ঐতিহ্য এই জারি গান গিলে খায় নগরসভ্যতা। কিভাবে একজন জীবন কবি হারিয়ে যান সময়ের মানচিত্র থেকে। সব শেষে অনেক আশা নিয়ে বয়াতি তাকান আমার দিকে, যদি আমার দ্বারা তার হিস্যার কিছুটা আদায় হয়। কিন্তু আমি লজ্জায় নুয়ে পড়ি। আমি তো রাষ্ট্রযন্ত্র নই, আমি তো সচিবালয় বা সংসদের কংক্রিটের ইমারত নই, আমি নিতান্তই স্বপ্নবাজ এক অতি ক্ষুুদ্র মানব। তবু কাঁপা ঠোটে বলে আসি, চেষ্টা করবো। যখন বিদায় নিই আমার সস্তা ক্যামেররার স্মৃতি ভান্ডারে তখন জীবনকবির ডিজিটাল কথামালা আর চিত্রসকল। জানিনা কি হবে এসব দিয়ে। আমার এডিটিং প্যানেল নেই, আমার গণমাধ্যম নেই, আমার সমৃদ্ধি নেই। তবু মুচকি হেসে আত্নাকে জানান দেই, আমার অন্তত কিছু অনবদ্য মূহুর্ত রইলো জীবন কবি চাঁনবয়াতির সাথে, আর কি কিছুর প্রয়োজন আছে!

পুনশ্চ: জামালপুর শহরের অলিগলি তন্যতন্য করে শেষ পর্যন্ত খুজে পেয়েছি তার কিছু অনবদ্য জারি গানের ক্যাসেট যা ডিজিটালাইজ করে সংরক্ষিত রাখবো আন্তর্জাতিক জগতে।

গণমাধ্যমের কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি চাঁন বয়াতিকে তুলে ধরবার আকাঙ্খা থেকে। সময়ের মানচিত্র থেকে একটা চাঁন বয়াতি হারিয়ে গেলেও সে দায় কিন্তু কোন না কোনভাবে গণমাধ্যমের উপরই বর্তায়।

Check Also

kushtia-radha-binodh-pal-sm

জাপান বন্ধু ড. রাধা বিনোদ পাল

মিডিয়া খবর:-  পৃথিবীর বুকে  ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ – ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫(৬ বছর, ১ দিন)  মানবসভ্যতার ইতিহাসে এযাবৎকাল পর্যন্ত সংঘটিত সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে …

গরুর গাড়ি

উজ্জ্বলতম গৌরবময় ইতিহাসের পাতায় গরুর গাড়ি

মিডিয়া খবরঃ-    – : সাজেদুর রহমান :-  ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক নগরের মন যখন ক্লান্ত হয়ে …

One comment

  1. Khub e Valo laglo Chan boyati ke jante pere. Vul bollam jante para ta onek dur er bapar, Porichito holam matro.E rakom hajar hajar chan boyati chorie chitie ache e desher anache kanache. Ka’jonke amra jante pari? Plabon ke donnobad Erakom ekjon maromi shadhok ke tule dharar jonno…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares