Home » প্রোফাইল » হৃদয়ের গহীনে তারেক মাসুদ
Tarek-Masud

হৃদয়ের গহীনে তারেক মাসুদ

Share Button

মিডিয়া খবর:-          -:কাজী শিলা:-

বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে ক্ষণজন্ম এক নক্ষত্র, বাংলাদেশের বিকল্প ধারা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত নাম- বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের ৫৯তম জন্মদিবস আজ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্বের দরবারে পৌছে দেয়ার জন্য যে কজন মানুষ ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে তারেক মাসুদ তার অন্যতম।Tareq-Masud1

তারেক মাসুদের পুরো নাম আবু তারেক মাসুদ। তারেক মাসুদ নামেই পরিচিত তিনি। ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তিনি। মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ ও বাবার নাম মশিউর রহমান মাসুদ। ভাঙ্গা ঈদগা মাদ্রাসায় প্রথম পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এরপর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ছয় মাস পড়াশোনার পর বদলি হয়ে নটর ডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।সেখান থেকেই ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুTareq-Masud-2ক্ত ছিলেন। দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন। তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আশির দশকের মধ্যভাগে শুরু হওয়া স্বাধীনধারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের অগ্রগণ্য পরিচালক তিনি। ১৯৮২ সালের শেষ দিকে তিনি জীবনের প্রথম ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ডকুমেন্টারিটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের উপর। চিত্রশিল্পী এস.এম সুলতানের জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র আদম সুরত (১৯৮৯) নির্মাণের অংশ হিসেবে প্রায় সাত বছর তিনি শিল্পীর সান্নিধ্যে কাটান এবং সেই সময়েই তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি, এনিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গান (১৯৯৫)-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রকার হিসেবে তারেক মাসুদ বাংলাদেশে ব্যাপকভাTareq-Masud-Muktir-ganবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পকালীন প্রবাসজীবনে তিনি আবিষ্কার করেন মার্কিন পরিচালক লিয়ার লেভিনের ধারণকৃত ১৯৭১ সালের ফুটেজ যা তার জীবনের ধারা বদলে দেয়। লিয়ার লেভিনের ফুটেজ ও পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফুটেজ মিলে তিনি ও আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ মিলে নির্মাণ করেন মুক্তির গান যা জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড-এর পরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। মুক্তির গান ‘ফিল্ম সাউথ এশিয়া’ (১৯৯৭) থেকে বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। মুক্তির গান সারা দেশে বিকল্প পরিবেশনায় প্রদর্শিত হয় এবং বহুল জনপ্রিয় এই চলচ্চিত্রটি দেখে সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তার ভিত্তিতে ভিডিও চলচ্চিত্র মুক্তির কথা (১৯৯৯) নির্মিত হয়। মুক্তির কথা প্রাধান্যশীল মধ্যবিত্তের বয়ানের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের একটি ভিন্ন ভাষ্য নির্মাণ করে।

Tareq-Masud-matir-moynaমুক্তির গান তারেক মাসুদকে দেশে চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। আর তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র মাটির ময়না(২০০২) তাঁকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। মাটির ময়না ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপ্রেস্কি আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারের আওতায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করে এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশে নির্মিত সবচাইতে আলোচিত চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। এটি পরিচালকের আত্মজৈবনিক এক চলচ্চিত্র যাতে মাদ্রাসা পড়ুয়া এক বালকের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা ছাড়াও বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শন প্রতিভাত হয়েছে। মাটির ময়না ইউরোপ ও আমেরিকায় বাণিজ্যিকভাবে সিনেমা হলে মুক্তি পায় এবং বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্রটির ডিভিডিও প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হয়ে দেশে-বিদেশে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে মাটির ময়না।

Tareq-masud-Antorjatraতারেক মাসুদের উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো অন্তর্যাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৯) এবং রানওয়ে (২০১০)। অন্তর্যাত্রা চলচ্চিত্রে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অভিবাসী বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে বার বার শেকড়ের টানে ফিরে আসার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের নরসুন্দর চলচ্চিত্রে প্রাধান্যশীল মুক্তিযুদ্ধের বয়ানের বিনির্মাণ দেখা যায় যেখানে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের ধাওয়া খেয়ে পলায়নরত এক মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয় বিহারী নরসুন্দররা, যাদের সম্পর্কে সাধারণ ধারণা আছে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। রানওয়ে চলচ্চিত্রে সমসাময়িক বাংলাদেশের নানান ইস্যুকে মোকাবেলা করা হয়েছে, বিশেষত ২০০৪-০৫ সালের জঙ্গিবাদের সমস্যাকে আলোকপাত করা হয়েছে।

জাতীয় আত্মপরিচয়, লোকজ ধর্ম ও সংস্কৃতি তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে বিশেষ গুরুত্বসহকারে চিত্রিত হয়েছে। যেজন্য তার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যে ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় আত্মপরিচয় সুনির্দিষ্ট হয়েছে। মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে নির্মীয়মান চলচ্চিত্র কাগজের ফুল-এর বিষয়বস্তু ছিল ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ।

২০১৩ সালে, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান/প্যাসিফিক/আমেরিকান ইন্সটিটিউট এবং দক্ষিণ এশিয়া সলিডারিটি ইনিশিয়েটিভ, তার চলচ্চিত্রের প্রথম উত্তর আমেরিকান ভূতাপেক্ষ আয়োজন করে।Tareq-Masud-M

তারেক মাসুদ বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও চলচ্চিত্র সোনার বেড়ি (১৯৮৫), প্রথম অ্যানিমেশন-চিত্র ইউনিসন (১৯৯৪) ও প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রা নির্মাণ করেন। সর্বশেষ ফিচার চলচ্চিত্র রানওয়ে মুক্তি পায় ২০১০ সালে।  স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদের সহ-পরিচালনা ও সম্পাদনার কাজ করেছেন। স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্যচিত্র ও অ্যানিমেশন মিলিয়ে তারেক মাসুদ মোট ১৬টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে অ্যা কাইন্ড অফ চাইল্ডহুড, নারীর কথা, ইন দ্যা নেইম অফ সেফটি, ভয়েজ অফ চিলড্রেন, সে উল্লেখযোগ্য।

২০১২ সালে তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর ২০১২ সালে বিভিন্ন সময়ে লেখা তার চলচ্চিত্র সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলোকে একত্র করে একটি বই প্রকাশিত হয় “চলচ্চিত্রযাত্রা” নামে। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়া তারেক মাসুদের আগ্রহের বিষয় ছিল লোকসঙ্গীত এবং লোকজ ধারা।Tareq-Masud-f

তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন। এই দম্পতির ‘বিংহাম পুত্রা মাসুদ নিশাদ’ নামে এক ছেলে আছে।

বাংলা চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদের অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গুনী নির্মাতা তারেক মাসুদের জন্মদিনে মিডিয়া খবরের পক্ষ থেকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলী।

 

Check Also

misha sawdagor

মিশা সওদাগর লড়বেন সভাপতি পদে

মিডিয়া খবর:- ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাবে বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির নির্বাচিত বর্তমান কমিটির দায়িত্ব। …

কলিম শরাফী

কলিম শরাফী রবীন্দ্রসংগীতের এক অনন্য জাদুকর

মিডিয়া খবর :- কলিম শরাফী। রবীন্দ্রসংগীতের এক অনন্য জাদুকর। ছিলেন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ কণ্ঠের অধিকারী। আর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares