Home » নিবন্ধ » কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াটা জরুরী
Bangladesh

কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াটা জরুরী

Share Button

মিডিয়া খবর:-        -:ফজিলাতুন নেছা শাপলা:-

ক’দিন আগে ঢাকা মতিঝিল এজিবি কলোনীতে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। লিখছি, রুনা এবং রুনার ঘটনাকে নিয়ে। রুনা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রটা প্রাণ দিয়ে দেখিয়ে গেলেন–আমাদের !!! একটা দুটো করে যে সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে এবং এ সব মূলহোতারা যখন টীন এজড ছেলেমেয়ে তখন বিষয়টা রীতিমত ভয়ের। আর এজিবি কলোনীর এই ভয়ংকর ঘটনাটা শুনে এবং দেখে, আমার নিজের দেড় বছরের শিশুটির কথাই মনে হয়েছে। রুনার জায়্গায় আমি থাকলে আমার শিশুটির আজ কি হত-সে কথা ভাবতেই শিউরে উঠি। কাজেই আমি খানিকটা হলেও অনুমান করতে পারছি, রাইকার কী অবস্থা!!! রাইকা তো তবু ছোট শিশু কিন্তু রাইকার পরিবার? তাদের জন্য যে কোন শান্তনা নেই সেটা মানুষ হিসেবে আমি ভালোই বুঝতে পারছি। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে এই অন্যায় আর কারো জীবনে না ঘটুক এবং অন্যায়কারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সেটাই আমার দাবী।

এবার আমি যে কথাগুলো বলতে চাই, সেটা অনেকটা স্ববিরোধী কথার মত হবে-তবুও কথাগুলো বলার সময় এসে গেছে। এ ধরণের কথা আমি আমি ঐশীর বেলাতেও বলেছিলাম, যে কিনা নিজের হাতে তার বাবা-মা’কে খুন করেছে। এ জি বি কলোনীর ঘটনার নায়কেরা সবাই প্রা্য় ১৮/১৯ বছরের। পত্রিকায় এদের ছবি দেখে, আমার প্রথম যে কথাটা মনে হয়েছে যে, এই সব অল্প বয়সী ছেলেরা মোটর বাইক পেল কোথা থেকে?  তার উত্তর হতে পারে, বাবা-মা দি্য়েছেন এবং তারা তাদের রাস্তায় চলাচল করার পারমিশন দি্য়েছেন। এরা কেমন বাবা-মা? কারণ এই ছেলেগুলোর তো এখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যাস্ত থাকার কথা, দল বেধে মটর সাইকেল নিয়ে অসামাজিক কাজকর্ম চালানোর কথা নয়। এটা কী বাবা-মা বা পরিবারের কেউ খেয়াল করেননি? দুই নম্বর প্রশ্ন যেটা মাথায় এলো সেটা হল- ১৯ বছরের ছেলেরা কি রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারে? যদি আইন থাকে তাহলে সেটা দূর্বল আইন এবং রাষ্ট্র এর জন্য ভীষণভাবে দায়ী। কারণ ১৮/১৯ বছর বয়সে কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারে কিনাBangladesh1, পেলেও সেটা কতটা যুক্তি সঙ্গত? আর যদি আইন না থাকে তাহলে এরা রাস্তায় মোটর সাইকেল হাঁকাচ্ছে কী করে? পুলিশ তাহলে কী করছিল? এরপর যে প্রশ্নটা মাথায় এসেছে সেটা হল-ছেলেগুলো যে বখে যাচ্ছে, এদের স্কুলের শিক্ষকরা কী করেছেন? এরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কতটা নৈতিক শিক্ষা পাচ্ছে বা পেয়েছে? সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হল- খবরে প্রকাশ, এরা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে, সেটা কিভাবে? এবং এরা ক্রমাগত অন্যায় করেই যাচ্ছে তাহলে এদের সাহস দিচ্ছে কারা? মাথার ওপর কারা ছাতা ধরে আছে? যারা ছাতা ধরে আছে, তারা আসলে কি চায়? তাদের কেন কেউ কিছু বলছে না?

এর কিছু উত্তর আমার কাছে আছে আর কিছু উত্তর নেই।

সব দিক বিবেচনা করে দেখে যেটি বলার এখন সময় এসেছে সেটি হল-পরিবার, স্কুল, সমাজ, রাষ্ট্র এই সব সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের হাতে পড়ে কিছু তরতাজা তরুণ বিপথে হিরো হচ্ছে আর তার খেসারত দিচ্ছেন রুনা এবং তার অবুঝ শিশু ও তার পরিবার। এখানে মিডিয়াও সমানভাবে অপরাধী। মিডিয়া সে সব ফলাও করে প্রচার করছে অকথ্য (সন্ত্রাসী, মাস্তান, বখাটে) ভাষায়, সাধারণ মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছে— সাধারণ মানুষের আহাজারিতে এবার হয়ত নড়েচড়ে বসবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপরাধী ২/১ জনকে কোমরে দড়ি দিয়ে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাবে গরাদে এবং সেখানেও তৈরী হবে কোন না কোন নাটক, সেটাই লাইভ দেখবে সবাই। হয়ত বিচারই হবে না কোন এই অপরাধীদের!!! উল্টো দেখা যাচ্ছে, রুনার পরিবার দিন কাটাচ্ছে ভয়ে-আতঙ্কে। ওরা মামলা তুলে নিলে, বিচার হবে কিভাবে? —- এভাবেই এ পোড়া দেশে, রাজনৈতিক-সামাজিক মানে সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার এই অপরাধী চক্রের হাত থেকে কোনভাবেই বেরুতে পারছে না আজকের তরুণ সমাজ। কেউ সঠিকভাবে এদের দায়িত্ব নিচ্ছে না, কেউ এদের পথ দেখাচ্ছে না।

এবার আমি কিছু  ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়স যে কোন ছেলে-মেয়ের জীবনেই নানা ভাবে খারাপ-ভালো প্রভাব রাখে। এই সময়টায় বাবা-মা বা পরিবার কিম্বা শিক্ষক অথবা সমাজের অন্য সংস্থাগুলোর খুব সতর্ক থাকার কথা।

আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি- আমাদের দেশের চেয়ে জাপানে এ বয়সের ছেলেমে্যেদের অবস্থা অনেক বেশী খারাপ কিন্তু তারপরেও ওদের সমাজের অবস্থা আমাদের মত এত করুণ নয়। জাপানে ১৩ থেকে ১৯ বছরের ছেলে-মেয়েরা অনেকেই হর হামেশাই রাত করে বাড়ি ফেরে না। বাবা-মা সে খবর সবার আগে স্কুলের শিক্ষকদের দেন, শিক্ষকরা বাবা-মা’র সাহায্যে চেষ্টা করেন, ছেলেটিকে বা মেয়েটিকে খুঁজে আনতে, না পারলে পুলিশের সাহায্য নেন। পুলিশ বুঝি্যে-শুনিয়ে তাদের বাড়ি ফিরিয়ে আনে।

অথচ আমাদের দেশে কোন স্কুল পড়ুয়া বাচ্চা ছেলে হর হামেশা স্কুল পালায় অথবা রাত করে বাড়ি ফেরে না, এরকমটা হয় না বল্লেই চলে।

ওখানে ক্লাস এইট নাইনের ২/৪ জন ছেলে-মেয়ে রোজ রোজ কোন না কোন ছুঁতো নাতা ধরে স্কুল পালায়। আর এটা করলে, পথচারী থেকে শুরু করে দোকানদার যে কেউ স্কুল টাইমে, স্কুল ইউনিফর্ম পড়া কাউকে স্কুলের বাইরে দেখলেই- স্কুলে খবর দেয়। শিক্ষক এবং পুলিশ এ ব্যাপারে খুব খুব তৎপর। তারা যে ভাবেই হোক, ঐ সব ছেলেমেয়েদের ধরে- ফিরিয়ে আনে পরিণামে তাদের কপালে মারধোর নয় জোটে স্পেশাল মোরাল লেসন।

ওখানকার প্রায় সব স্কুলেই ক্লাস এইট এবং নাইনে ২/১ টা বাচ্চাকে পাওয়া যাবেই যারা খুব ভায়োলেন্ট এবং উচ্ছৃঙ্খল। কখনই এদের শারীরিক শাস্তি দেওয়াBangladesh2 হয় না। বরং আরও ৩/৪ জন শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে ওদের স্বাভাবিক ভাবে ক্লাস করতে দেওয়া হয়। ওরা ক্লাসে হৈ হুল্লোড় মারামারি করে খুব বিরক্ত করে, তবুও ওদের পেটানো হয় না। কারণ ওদের আইন, সবারই ক্লাসে থাকার অধিকার আছে। আমি এমনও দেখেছি, ক্লাসের ঘন্টা পড়েছে। শিক্ষক দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লাসে ঢুকেছেন কিন্তু একজন ১৬ বছরের ছেলে ক্লাস করবে না বলে বারান্দায় বা ক্লাস করিডরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। ক্লাস শিক্ষক এসে তাকে পাঁজকোলা করে ক্লাসে নিয়ে যাচ্ছেন আর সে একই কাজ বার বার করে করছে। তখন অন্য দুজন শিক্ষক এসে তাকে চ্যাংদোলা করে ক্লাসে নিচ্ছেন। কারণ স্বাভাবিক ভাবে সে ক্লাসে যাবে না। এই নিয়ে শিক্ষক আর সেই ছাত্রের দারুণ হাসাহাসি, যেন এমন মজার কাণ্ড সচরাচর ঘটে না। আমি হলফ করে বলতে পারি, এর চেয়ে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা হাজার গুণ ভালো। শিক্ষকদের এখনও এরা যথেষ্ট সম্মান করে এবং তাদের সামনে এরা ভয়ে গুটিয়ে থাকে। বাবা-মা সহ যে কোন বড়দের যথেষ্ট ভক্তি শ্রদ্ধা করে এই সব তরুণ ছেলে-মেয়েরা।

যে অভিজ্ঞতা দিয়ে লেখাটার ইতি টানব সেটা হল–

জাপানের প্রত্যেকটা জুনিয়র হাই স্কুলে আছেন নির্ধারিত শৃঙ্খলা রক্ষাকারী শিক্ষক, যাদের আলাদা দায়িত্ব বাচ্চাদের শৃঙ্খলা শেখানো। নৈতিক বিষয়ে আলোচনা করা। এ রকম শিক্ষকদের এ বয়সের বাচ্চারা দু চোখে দেখতে পারেনা। আমি একটা ঘটনা বলছি, ক্লাস নাইনের ছেলেরা আবহাওয়া খারাপের জন্য সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামে বাস্কেটবল খেলছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী এক শিক্ষক। তিনি বেশ বয়ষ্ক এবং সজ্জন। আমার সাথে বেশ খাতির। খুব ভালো এবং নরম সরম মানুষ। সেই শিক্ষকটিকে এক ছেলে ইচ্ছা করে, পেছন থেকে- অনেক দূর থেকে পা দিয়ে জোরে শট মেরে বল দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করে। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।

ফলাফল হল- এর পরে ছেলেটির পরিবার, পুলিশ এবং শিক্ষকরা খুব গোপন একটা মিটিং করে ঐ ছাত্রকে পাঠায় কিশোর সংশোধনালয়ে। এই ঘটনা শিক্ষকগণ আর সংশ্লিষ্ট ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রী এবং বিশেষ করে ঐ ছাত্রের বাবা-মা ছাড়া আর কেউ জানত না। কারণ তাতে স্কুলের অন্যান্য বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, প্রভাবিত হতে পারে। অন্য অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়তে পারেন।

কিশোর সংশোধনালয়ে পাঠিয়েই শিক্ষকরা দা্য়িত্ব শেষ করেননি, ছেলেটিকে নিয়ম করে দেখতে যেতেন স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল এবং একজন মনোবিজ্ঞানী বা স্কুল কাউন্সেলর। আহত শিক্ষকটি চিঠি লিখতেন মাঝে মাঝেই। সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারটি নিয়ম করে খোঁজ নিতেন। তার জন্য পজিটিভ কথা লিখে গিফ্ট, কার্ড পাঠাতো তার ক্লাসের সব ছেলে-মেয়েরা। সে যেন বৈষম্যের শিকার না হয় সেটা নিশ্চিত করা হত।

আমাদের ছেলে-মেয়েরা, কিম্বা আমার ভাই অথবা পাশের বাসার ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেটা তো এমন নয়!!!! বিছিন্নভাবে হলেও তাহলে এরকম মারাত্মক ঘটনা কেন আমাদের সমাজে প্রায়-প্রায়ই ঘটছে? আমরা তাহলে কি করছি? আমাদের ছেলে-মেয়েরা কেন এরকম ভয়ংকর হয়ে উঠছে?

এই কেনর উত্তর খুঁজে বের করবার সময় এসে গেছে। পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে, একজন সচতন নাগরিক হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেব, একজন আইনের রক্ষক হিসেবে আমরা কী কোনভাবে এই সব ছেলে-মেয়ে যারা সমাজবিরোধী কাজ করছে বা খুনের মত জঘন্য অপরাধ করছে তাদের দায় এড়াতে পারি?

ফজিলাতুন নেছা শাপলা

খণ্ডকালীন মনোবিজ্ঞানী

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

 

Check Also

Bangladesh

উদ্ভট হালচাল !

মিডিয়া খবর:- একটা মেয়ে শারীরিকভাবে ধর্ষিতা হয় একবার। কিন্তু ধর্ষিতা মেয়েটা সেটা প্রকাশ করলে কিংবা …

lalon

লালন মরলো জল পিপাসায়

মিডিয়া খবর :-    – কাজী চপল ভারতীয়  উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্বিক সাধক ফকির লালন শাহ। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares