Home » নিবন্ধ » “হৃদয়ের কান্না” মোঃ জাহিদুল ইসলাম
sky-n-color

“হৃদয়ের কান্না” মোঃ জাহিদুল ইসলাম

Share Button

মিডিয়া খবর :- 

মানুষ সৃষ্টির কি সত্যিই সেরা জীব ! হয়তোবা কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে নাও হতে পারে। মানুষ সেরা শব্দের অর্থ কি জানে ? সেরা!

বাস-ট্রাক-রিকশা দ্রুতগতিতে রাস্তার এপাড় থেকে অন্যদিকে ছুটে চলে যাচ্ছে। ছুটে চলার শব্দ, কিংবা মানুষের কোলাহল, যান্ত্রিক জীবনের নানা বর্ণিলতা- কোনো কিছুই মনকে গ্রাস করছেনা আজ? সব স্থির? না কি সবকিছু চলছে; না না, সব নয়, কেবল সময় চলছে? আমিই বোধহয় শুধু আপেক্ষমাণ!

সময়গুলো আপনগতিতে ছুটে যায়, কিন্তু আব্দুল হক সাহেবের ভাবনাগুলো স্থির হয়ে বসে থাকে, নিজেদের মতো করে তারা অবরোধ পালন করে চলে নিজস্ব কক্ষপথে। তাদের নেই কোন প্রধানমন্ত্রী, নেই কোন পিকেটার! বিষয়টি বেমানান হলেও নতুন নয়। প্রায়শই তিনি এ ধরণের সমস্যায় পড়েন; যা কিছু তার নয় বা তার মতো নয় সেগুলোর মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতে হয়, চোখে চোখ রাখতে হয়- কী আশ্চর্য! আব্দুল হক সাহেবের কাছে জীবন মানেই হলো ভাসমান অনুভূতির টুকরো, কেউ কেউ সেই টুকরোগুলো ধরে ফেলে- তাদের কাছে জীবন সার্থক, আবার কারো কারো দিন শেষ হয় কেবল ধরবার চেষ্টাটুকু করেই- তাদের কাছে জীবন গতানুগতিক। কিন্তু তিনি এর কোনো উপসংহার টানতে পারেন না।
সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিললেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায় পরের দিনের জন্যে। নতুন করে আবার তার উত্তর খুঁজতে হয়। শেষ বেলা এসে আবার পড়ে থাকে সে-ই বিষণ্ন প্রশ্নটি- জীবন কি অর্থহীন? জীবন মানে কি সারাটাজীবন দু’বেলা ভাত খাওয়ার জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়ানো ?জীবন মানে কি সৎ মায়ের আদর পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে চেয়ে থাকা ?জীবন মানে কি ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে লিখে রাখা বইগুলো অপ্রকাশিত অবস্থায় চটের ঝুলিতে করে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো ?

এইটুকু লেখার পর আব্দুল হক সাহেব একটা সিগারেট ধরালেন। আনমোনে তাকিয়ে রইলেন জ্বলন্ত সিগারেটের ছাইয়ের দিকে। তিনি একা থাকেন। লেখালেখিটাকে তিনি সাধনা বলেই জানেন, তাই বাজারের আগাছার মত অন্য লেখকদের ভিড়ে নিজের জায়গাটাই করে নিতে পারেননি। বটগাছের ন্যায় ছায়াদানকারী এক গাছের নিচেই নিজের আবাস গেঁড়েছেন। তাঁর ঘরের আভিজাত্য না থাকলেও হৃদয়ের মাঝে আছে একবুক আভিজাত্য। সিগারেটের দিকে তাকিয়ে আবার তিনি ভাবছেন আব্দুল হক চরিত্রের কথা। বিগত বাইশ বছর ধরে এই চরিত্রটি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে এমন স্রষ্টা একেবারেই দুর্লভ-
যিনি মাত্র একটি চরিত্র নিয়ে এতবছর কাজ করেছেন। তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম ঘিরে মাত্র একটি চরিত্র। আদর্শ একটা চরিত্র!  যার মাঝে নেই কোন কল্পনা কিংবা রূপকথা। রক্তের কালিতে যার মাঝে লেখা আছে প্রতিটি আত্মকথন । প্রায়সময়ই তিনি ভাবেন তার পান্ডুলিপিটা একদিন প্রকাশিত হয়েছে। সবাই তাকে প্রশ্ন করছে, ‘এই চরিত্রের মাঝে আপনি কি খুঁজে বেড়ান?’

কোনো উত্তর মেলেনি, মেলেনি কোন মনগড়া ভাবার্থ। কেবল কোথায় যেনো একটি ঘণ্টা বাজে। ছুটির ঘণ্টার মতো। আব্দুল হক সাহেব তবুও হিসেব মেলাতে পারেননা। অল্প সিগারেটের প্যাকেট আর জীর্ণ ময়লাধরা মানিব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে
উঠে দাঁড়ান। লেখাটি ওই পর্যন্ত পড়ে রইলো,
বিষণ্ন প্রশ্নটির কোনো উত্তর এখনো মেলেনি, কেবল বুকের কোণে ছুটির ঘণ্টা। তাহলে কি ছুটির ঘন্টা !

রাত একটা পেরিয়ে গেছে ঠিক এক ঘণ্টা আগে। শহর হিসেবে রাত খুব বেশি নয়, তবুও অন্য সবাই এমন রাতে বেরোতে
পারেন না। আব্দুল হক সাহেব গোত্রের লোকেরা, মানে নামি-দামি লেখক সম্প্রদায়- এতো রাতে কোনোভাবেই ঘর নামক চুন-সুরকি দেয়া দেওয়াল ছেড়ে বের হতে পারেন না। তাদের গাড়ি চাই, নিরাপত্তা চাই; তাই
রাত একটায় তারা পরিবারের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে হোটেলের চার দেয়ালে বন্দী হয়ে নিশিসুধায় আকণ্ঠ ডুবে থাকতে পারেন, কিন্তু একা রাস্তায় বের হওয়া, অসম্ভব! কিন্তু আব্দুল হক সাহেব মুক্ত সে সমস্যা থেকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি হেঁটে চলছেন রাতের বন্দর নগরীতে।  হাতের সিগারেট প্রায় শেষ। একরাশ ধোঁয়ার কুন্ডলী মুখ থেকে বের করতে করতে জ্বলন্ত সিগারেটটা সামনের দিকে ছুঁড়ে ফেললো। রাতের শহরটা ক্রমশই জমে উঠেছে। রাস্তায় রিক্সা কিংবা ছোট ছোট যানবাহন নেই, একদম ফাঁকা। ট্রাক আর বাসের রাজত্ব চলছে মহারাস্তার বুকে !

রাত একটায় চট্টগ্রাম শহরে তেমন নিস্তব্ধতা নেমে আসে না, তবুও শব্দহীনতার একটি মলিন আচ্ছাদন যেনো ক্রমশই নেমে আসতে থাকে। অন্ধকারের মতো ধীরে, মৃদু পায়ে। টেকনিক্যাল মোড়ে এসে একটু দাঁড়ালেন আব্দুল হক সাহেব। কোন দিকে যাবেন তিনি? সামনে বড়রাস্তা ধরে যেতে থাকলে অন্ধকারে গ্রাস হওয়ার আশংকা রয়েছে ?
তিনি শুধু জানেন- জীবনকে প্রশ্ন করতে হয় না, জীবন নিজেই একটি বড়ো প্রশ্নবোধক, স্বপ্নে বাস্তবে জীবনের নামে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নই কেবল দুলতেথাকে পেন্ডুলামের মতো। রাস্তায় হাঁটছেন
তিনি, ফাঁকা রাস্তাকে কেমন যেনো প্রেতের মতো লাগে। দুই নাম্বার মোড়ে আসতেই অবশ্য সে দৃশ্য বদলে যায়, খানিক মুখরতা বেলা শেষের গানের মতো এখনও জেগে রয়েছে এখানে। হয়তো এটুকুও শেষ হয়ে যাবে, রাতের কী অনন্য ক্ষমতা!
দুই নাম্বার মোড়ের ধারে এখনো দু একটা চাকার উপরে বসানো টং এর দোকান খোলা। এক কাপ রঙ চায়ের কথা বলে তিনি
স্থির চেয়ে রইলেন চা বিক্রেতার দিকে। বয়স্ক বৃদ্ধ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। পকেটে রাখা শেষ সিগারেটটা ঠোঁটে জ্বালিয়ে প্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়। কিন্তু সিগারেটের প্যাকেটটাকে মোটেও অসুখী মনে হলো না তার। রাস্তার সংসারে সে যেনো অভ্যাগত নয়, নিয়মিত অতিথি। চা এলো- তারপর টি-ব্যাগটাও ছুঁড়ে দিলেন রাস্তায়, কেমন অর্থপূর্ণ হয়ে উঠলো রাস্তার সংসার।
চা শেষ করে আবার হাঁটতে লাগলেন। নতুন কেনা গোল্ডলীফের প্যাকেটটাকে পকেটে নয়, হাতে রাখলেন; কেনো যেনো তাঁর মনে হলো- ছুঁয়ে দেখার মাঝেও একটি সুখ আছে। সোডিয়াম লাইটের আলোতে হাঁটছেন আব্দুল হক সাহেব, সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ
একটা ছায়া। দুই নাম্বার গেট পেরিয়ে জি.ই.সি মোড়ের রাস্তা ধরে তিনি হাঁটছেন। পথ শেষ হয় না- কোলাহল মিলিয়ে যায়, গভীর থেকে গভীরতর নিঃসঙ্গ ভুবনে
তিনি প্রবেশ করেন। হঠাৎই মনে প্রশ্ন জাগে- এ মুহূর্তে আব্দুল হক সাহেবের চরিত্রটা  কী করতেন? তিনি কি নৈঃশব্দের করতলে কোনো প্রশ্ন রেখে যেতেন? কোনো প্রশ্নের
টিপ পড়িয়ে দিতেন অন্ধকারের কপালে?
হাঁটতে হাঁটতে দৈনিক পূর্বোকোণ অফিসের লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন আব্দুল হক সাহেব। বন্ধ গেট। একপাশে লিখে রাখা এখানে টাটকা দুধ পাওয়া যায়। দুধের বিজ্ঞানপনেও আজকাল টাটকা আর তাজা শব্দটা ব্যবহার করা হয়। অথচ, এই শব্দগুলো ব্যবহার করা মানুষের মাঝেই টাটকা শব্দটা নেই। অদ্ভুত সত্যিই অদ্ভুত!

রাতের আঁধার ফুড়ে আবার তিনি হাঁটতে লাগলেন। নাসিরাবাদ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়। লোহার বিশাল গেইট। রাস্তা পাড় হয়ে অপর প্রান্তে চলে আসলেন। গেইটের সামনে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে পড়ে গেলো ব্যথিত তারুণ্যের কথা, ফানুসের মতো উড়ে যাওয়া উচ্ছ্বাসের কথা। কিন্তু না, আজ তিনি কোনো প্রশ্ন করবেন না- বস্তুত প্রশ্ন করাটা তাঁর কাজও নয়; তিনি কেবল পেরিয়ে যাবেন এই
গেট, লোহার গেট, টপকে যাবেন- যেমন যেতেন অতীতে। স্কুলের সামনের নাতিদীর্ঘ রাস্তাটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আব্দুল হক সাহেব। এ তাকিয়ে থাকার কোনো অর্থ নেই, তিনি কিছুই খুঁজছেন না- কেবল স্থির তাকিয়ে আছেন। আলো-আঁধারের মিহিন সংসার বুকে নিয়ে আছে চারপাশ। ধীর পায়ে এগিয়ে চলছেন আব্দুল হক সাহেব, সামনে কিছু নেই- আবার
হয়তো অনেক কিছু আছে। আছে ক্রোধ, বিষণ্নতা, প্রবল হৃদয়কে মাড়িয়ে যাবার ঔদ্ধত্য। আছে জামান হোটেল, স্যানমার, বাটা শো-রুমের মত অভিজাত হোটেল ও বস্ত্রবিপনী।

আব্দুল হক সাহেব বসলেন। রাস্তার ফুটপাতের যেখানে অন্ধকার, সেখানে বসে একটি সিগারেট ধরালেন। ঘাড় উঁচু করে দেখলেন বিলাসী স্যানমারের উজ্জ্বলতাকে।
অন্ধকারে আর সোডিয়াম আলোতে স্বর্ণোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে । তাঁর মনে
পড়লো- ত্রিশ বছর আগে এখানে বসে বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছিলেন স্যানমারের চেয়ে উন্নত স্থাপনা তিনি করে দেখাবেন। তিনি আজ পরাজিত! বন্ধুদের কাছে বাজি ধরা চুন-সুরকি গড়া স্থাপনা হয়তোবা তিনি তৈরী করতে পারেননি তবে তৈরী করেছেন!  আব্দুল হক সাহেব নামের এক স্থাপনা। দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে বয়ে চলেছেন। সিগারেটের শেষটান দিতে দিতে আব্দুল হক সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আব্দুল হক সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন। দীর্ঘ এতোটি বছর তিনি যে চরিত্রের মুখে এতো কথা সঁপে দিয়েছেন, তার মনের কথা আজ তিনি জানবেন। আব্দুল হক সাহেবকে ডেকে পাঠাতে হবে…।

নহ আসেননি, আসেননি আব্দুল হক সাহেব;কিন্তু বৃষ্টি এলো- ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি, হ্যাঁ বৃষ্টি এলো। হঠাৎ কেনো জানি আব্দুল হক সাহেবের উঠতে ইচ্ছে হলোনা। বন্ধ টং এর বাইরে বসে রইলেন। বৃষ্টির ফোঁটা তার রুক্ষ দেহে তার কোমল স্পর্শ বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে যায়। আলট্রাভায়োনিক শব্দে আকাশ বারেবার গুড়গুড় শব্দ করে উঠে। বৃষ্টির কথা মনে হতেই যৌবনের সেই দিনগুলো ভাসমান তেলের মত ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠে। উচ্ছল প্রাণবন্ত এক তরুণী। হাসি-আড্ডা আর বন্ধুদের সাথেই ছিল যার সারাদিন। অদ্ভুত এক মাধুর্যময় অনন্যা। রাস্তা দিয়ে কোন ছেলে পাশ কাঁটিয়ে চলে যাওয়ার সময় কিছু বলে গেলে, সাথে সাথে অগ্নিমূর্তি ধারণ করতো। মেয়েটা প্রচন্ড রকমের জেদী ছিল। কেন যে আমার মত বাউন্ডুলেকে ভালোবেসেছিল ?নাহ! সেই আবার প্রশ্ন!

আব্দুল হক সাহেব আরেকটি সিগারেট ধরালেন। বৃষ্টি তখন মধ্য যৌবনে। তার মনে হলো- পুরো দীর্ঘ ফুটপাতের কাঁটাতার দেয়া ঘেরে তিনি একা নন, আরও কেউ আছেন। মুহূর্তেই গিটারের টুংটাং শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। আব্দুল হক সাহেব কান পাতলেন- তুমুল বৃষ্টির শব্দ আর তার চেয়েও স্পষ্ট আর
তীব্র হয়ে ভেসে আসছে গীটারের টুংটাং শব্দ। শব্দ বিভ্রম নয় তো। হতেও পারে, অসম্ভব বলে কিছু নেই ?

আব্দুল হক সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। ফুটপাতের কাঁটাতার দেয়া ঘেরের ভেতরের এক মাথা থেকে হাঁটতে শুরু করলেন, মাঝামাঝি এসে- ভাজাপুরির দোকানের সামনে তিনি দেখলেন দুজনকে। অন্ধকারে দুজনকেই ছায়ামূর্তির মতো মনে হয়। দুজন বসে আছে গিটার হাতে। দুজনের কেউ কোনো কথা বলছে না, কিন্তু দুজনেই যেনো চোখে চোখ রেখে চেয়ে আছে। দুজনের মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। মেয়েটির হাতে হাত রেখে ছেলেটি গান গাইছে-

বুকের মাঝে তোমার বসত
শূন্যে আমার হৃদয়
মনের মাঝে উথাল পাতাল
জীবনে ধ্বংসের শুরু

তারপর আবার টুংটাং বাজাতে থাকে। আব্দুল হক সাহেব সেই দিনগুলো আর মনে করতে চাননা। তিনি ততোক্ষণে গিয়ে বসেছে ছাতিম গাছের একটি অন্ধকার কোণে। তিনি কোনো প্রশ্ন করবেন না, জীবনের কাছে তার কোনো প্রশ্ন নেই। ছেলেটা কোন গান পুরোটা গাচ্ছেনা। আরেকটা বিস্ময়কর বিষয়-সে মাঝে মাঝে গানের শেষ অঙশটুকু শুধু গায়- কোনো শুরু নেই, একেবারে শেষ কয়েকটি লাইন। আব্দুল হক সাহেব ভাবেন অসম্পূর্ণতা আর অন্তিমতা দিকে তার এতো ঝোঁক কেনো? সে কী তবে শেষকে ভালোবাসে? প্রশ্নগুলো মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠতেই তিনি সেগুলো এক ঝটকায় মুছে দেন- কোনো প্রশ্ন তিনি করবেন না । কিছুদূরে তিনি দেখতে পান, একপ্লেট ভাতের জন্য কেঁদে কেঁদে বারবার আবদার করছে বছর ছয়েকের বাচ্চা। বিনিময়ে পাচ্ছে একপ্লেট ভাতের বদলে কিছু তপ্ত বাক্য আর উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো কিছু অপরাধ। শেষ ! তবে কি শেষই তার উত্তর ?

চারপাশের নিগূঢ় অন্ধকারের হৃদস্পন্দন যেনো আব্দুল হক সাহেবের কানে আসে। হঠাৎ গীটারের টুংটাং শব্দ থেমে যায়। বেশ  কিছুক্ষণ, তারপর আরও কিছুক্ষণ, আরও, আরও.. ..এভাবে একটি দীর্ঘ সময়- কোনো শব্দ নেই। শব্দের অর্থের প্রগাঢ়তা বুঝতে হলে নৈঃশব্দের কোলে মাথা রাখতে হয়। এতো দীর্ঘ সময় ধরে কোনো গান নেই, গীটারের টুংটাং নেই- অতীত কি তবে চলে গেলো?
আব্দুল হক সাহেব ধীরে পায়ে হেঁটে যেতে থাকেন। শেষ রাত তখন প্রকৃতির দরজায়। বৃষ্টি থেমে গেছে। আব্দুল হক সাহেব হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। শব্দহীন এমন নিথর পরিবেশে তাঁর মনে পড়লো- বিগত জীবনের কতোগুলো দীর্ঘশ্বাসে তাঁর প্রদীপ জ্বালানো হয়নি। তাঁর কান্না পেলো, সমস্ত হৃদয়ের সংসার ওলোটপালট করে কান্না এসে ভিড় করলো গলার কাছে। যৌবনের হাজার অপূর্ণতা, কৈশোরের হারিয়ে আসা রঙতুলি- সবকিছু আব্দুল হক সাহেবের স্মৃতির পথে জ্যোস্নার আলো ফেলে ভিড় জমালো। ক্রমান্বয়ে দু চোখ বেয়ে নেমে এলো প্রসারিত কান্না। ক্রমাগত এগিয়ে যেতে লাগলেন সেই
গিটার হাতে ছেলেটি ও তার অতীত কাছে। কিন্তু এসে দেখেন- ভবিষ্যৎ কখন চলে গেছে। সেখানে ফেলে গেছে শুধু অতীত। স্তম্ভিত আব্দুল হক সাহেব তাকিয়ে রইলেন অতীতের দিকে।আব্দুল হক সাহেব জেনে যায়- আব্দুল হক সাহেবকে এবার ছুটি দেবার সময় হয়ে এসেছে। নিষ্ঠুর জগৎসংসারে নিরন্তর সময় নিয়ে আসা কাউকে বেঁধে রাখা কেবলই ছলনা। এতে মাহাত্ম্য নেই, নেই সত্যতা। আজ থেকে আব্দুল হক সাহেব মুক্ত! তিনি নিজের মতো
চলবে। আজ থেকে তিনি হাজারো হাজারো প্রশ্ন করবেন।
মুক্তি নেওয়ার আগে আব্দুল হক সাহেব,
আব্দুল হক সাহেব জানিয়ে গিয়েছেন- জীবনের অর্থ আসলে শূন্যতা, নিঃসঙ্গতার পেলব চাদরে সেই শূন্যতা ঢেকে রাখা। জীবনের আর কোনো অর্থ নেই; কেবল অর্থহীনতাটুকু-ই সত্য। হ্যাঁ, জীবন মানে হৃদয়ের কান্না। হৃদয়ের কান্নাটুকুই পূর্ণতাময় জীবন।

পরদিন সকালের এই কথাগুলোই ছাপা হয়েছিলো দৈনিক পত্রিকায়। ‘সাহিত্যিক আব্দুল হক সাহেবের সুইসাইডাল নোট’ শিরোনামে। বইমেলাতে বের হয়েছিল হৃদয়ের কান্না ব্যানারে এক উপন্যাস। আব্দুল হক সাহেব তখন সব দেখছিলেন আর মিটিমিটি হেঁসে জীবনের অর্থ উপলব্ধি করছিলেন।

Check Also

Bangladesh

উদ্ভট হালচাল !

মিডিয়া খবর:- একটা মেয়ে শারীরিকভাবে ধর্ষিতা হয় একবার। কিন্তু ধর্ষিতা মেয়েটা সেটা প্রকাশ করলে কিংবা …

lalon

লালন মরলো জল পিপাসায়

মিডিয়া খবর :-    – কাজী চপল ভারতীয়  উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্বিক সাধক ফকির লালন শাহ। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares