Home » ইভেন্ট » দক্ষিণা সুন্দরী’র খোঁজে এক সন্ধ্যায়
dakhina1

দক্ষিণা সুন্দরী’র খোঁজে এক সন্ধ্যায়

Share Button

পাভেল রহমান :

কমনওয়েলথ গেমস-এর সাংস্কৃতিক আসরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নাটক মঞ্চায়নের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছে। ন্যাশনাল থিয়েটার অব স্কটল্যান্ডের ব্যবস্থাপনায় গ্লাসগোতে ২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমস উপলক্ষে আয়োজিত টিন ফরেস্ট থিয়েটার উৎসবে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় ‘থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশ’ প্রযোজিত নাটক ‘দক্ষিণা সুন্দরী’ মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের প্রাক্তন কিছু শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তোলা দল ‘থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশ’ নাটকটি কমনওয়েলথ গেমসে প্রর্দশন করবে। বাংলাদেশের তরুণ এই শিল্পীদের জন্য সময় বরাদ্দ হয়েছে ১ ঘন্টা। কমনওয়েলথভুক্ত ৭১টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশসহ ৬টি দেশ এই বৃহৎ খেলার উৎসবে নাটক প্রদর্শন করবে।

অন্য দেশগুলো হলো ভারত, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, মাল্টা ও জ্যামাইকা। আগামী ২৪ জুলাই স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে প্রথমবারের মতো তুলে ধরা হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্য নিয়ে নির্মিত নাটক ‘দক্ষিণা সুন্দরী’। নাটকটি রচনা করেছেন শাহমান মৈশান ও নির্দেশনা দিচ্ছেন সুদীপ চক্রবর্তী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির তিন তলার সেমিনার রুমে এখন নাটকটির মহড়া নিয়ে দারুণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ‘থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশ’ এর নাট্যকর্মীরা।

নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী।জানান, ‘আগামী ১৩, ১৪ ও ১৫ জুন ঢাকায় নাটকটি মঞ্চস্থ হবে। এরপর থিয়েট্রেক্স নাটকটি নিয়ে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে আগামী ৯ জুলাই কন্ট্যাক্টিং দ্য ওয়ার্ল্ড নাট্যোৎসব এবং লন্ডনে আগামী ১৩ ও ১৪ জুলাই চিকেনশেড থিয়েটারের শেডলিংক সেলিব্রেশনে যোগ দেবে। এছাড়া প্রবাসী বাঙালীদের আমন্ত্রণেও নাটকটির আরো দুটি প্রদর্শনী করার কথা রয়েছে।

দক্ষিণা সুন্দরী নাটকের কাহিনী ও নির্মাণ শৈলী প্রসঙ্গে নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘অপরূপ বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, শিল্পকলা, কৃত্য ও বিশ্বাসের মিলিত তান শোনা যায় দক্ষিণা সুন্দরী নাটকে। পটভূমি হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে বিশ্বের বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে গীত, নৃত্য, বাদ্য সহকারে সর্বপ্রাণবাদী পাঁচালী আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে বাংলার রূপ। উপস্থাপনে অনুসরণ করা হয়েছে আখ্যানরীতি। কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে এক জোড়া মানব-মানবী। পুরুষ চরিত্রের নাম বনা আর নারী চরিত্র চন্দ্রে। চরিত্র দুটি যেনো প্রাচীন বঙ্গের চণ্ড বণ্ড জাতির উত্তরাধিকার।

নাটকের নির্মাণ প্রসঙ্গে সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘নন্দনতাত্ত্বিক রসের আশ্রয়ে নাটকের আখ্যান বিস্তারিত হয় প্রতিটি প্রাণের গুরুত্ব ও অস্তিত্ত্বের অনস্বীকার্য রূপ প্রকাশ করে। নাটকটিতে আরো থাকছে একটি জাতি গোষ্ঠীর প্রোথিত বিশ্বাস আর সভ্যতার বিবর্তনে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বৈরীত।’

যে প্রক্রিয়ায় কমনওয়েলথএর সাংস্কৃতিক আসরে বাংলাদেশের নাটক :
এবারেরর কমনওলেথ গেমসের সাংস্কৃতিক বিভাগে সঙ্গীত, নাট্য ও নৃত্য উৎসব থাকছে। নাট্য উৎসবের সমন্বয়ক ন্যাশনাল থিয়েটার অব স্কটল্যান্ড। আয়োজক কমিটি থেকে গত অক্টোবরে কমনওয়েলভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার জন্য নাটক আহবান করা হয়। এ্ই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা নেওয়া হয় কমনওয়েলথভুক্ত দেশে অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিলের। বিভিন্ন দেশের তরুণ নাট্যশিল্পীদের কাছে তাদের নাট্য ভাবনা চাওয়া হয়, যেখানে থাকতে হবে দেশের ঐতিহ্য ও পরিবেশ।  

এ প্রসঙ্গে সুদীপ জানান, ‘সুন্দরবনকে ঘিরে আমাদের নাট্য ভাবনা বিস্তারিত হয়। এ বিষয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের বাংলাদেশ শাখার আর্টসের প্রধান ঈশিতা আজাদ ও ব্যবস্থাপক নাহিন ইদ্রিস ভীষণভাবে উৎসাহিত করেন। আমাদের মনে হয়ছে সুন্দরবন এই দেশের জনজীবনে ভীষণভাবে গুরুত্ব বহন করে। নাটকে সর্বপ্রাণবাদী বিষয়বস্তুরমাধ্যমে একই সঙ্গে বাংলার রূপ-সৌন্দর্য, পরিবেশ ও শিল্পকলা তুলে ধরা হচ্ছে। রয়েছে বনবিবির পালা, গাজীর গান, প্রকৃতির পট প্রভৃতি।

থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সুদীপ বলেন, ‘কিছুদিন আগে কবর নাটকের মঞ্চায়নের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত নাট্যদল থিয়েট্রেক্স। এখানের নাট্যশিল্পীগণের বয়স, তারুণ্য ও কর্ম উদ্দীপনা আয়োজকদের শর্তের সঙ্গে মিলে যায়।’  

তিনি আরো বলেন, গত বছরের নভেম্বরের ২৫ তারিখ আয়োজকদের কাছে নাটকের ধারণাপত্র পাঠানো হয়।  কমনওয়েলথ গেমসের মতো এত বড় আসরে আমাদের ধারণাপত্র গৃহীত হবে কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু গত কয়েকমাস আগে ন্যাশনাল থিয়েটার অব স্কটল্যান্ড চুড়ান্তভাবে নাম ঘোষণা করে থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়। কমনওয়েলথভুক্ত ৭১টি দেশেরে মধ্যে বাংলাদেশের নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ হতে পারবো এটাই বড় আনন্দ।

দক্ষিণা সুন্দরীর খোঁজে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব চর্যাপদের সূত্র ধরে তার এক গবেষণা থেকে বলেন, বাংলার বাঘই হলো এই দক্ষিণা সুন্দরী। চর্যাপদে উল্লেখ রয়েছে, শবর ও শবরী হরিণ শিকারে গিয়ে যে ব্যঘ্র চর্ম পরিহিত প্রাণীর মুখোমুখি হয় তাকে দক্ষিণা সুন্দরী নামে অভিহিত করা হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে এক সময় বনবিবির পালার ব্যাপক প্রচলন ছিল, তারও আগে ছিল বনদেবী, এবং বরিশাল অঞ্চলে দক্ষিণা দেবীর নাম জানা যায়। তার মানে ধারণা করা যায়,  দক্ষিণা দেবী, বনদেবী, বনবিবি, দক্ষিণা সুন্দরী একটি কৃত্যমূলক রেখায় গঠিত ও পরম্পরাগত । আবার বাংলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণে সুন্দরবন, দক্ষিণে বাঘ সব মিলিয়ে এ নাটকের নাম রাখা হয় ‘দক্ষিণা সুন্দরী। ’

সুন্দরবনকে বেছে নেওয়ার কারণ
সুন্দরবনকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষণার পাশাপাশি কয়েক দফা সুন্দরবনে যান নাট্যশিল্পীরা। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা মনে করি যে কোনোভাবে হোক সুন্দরবন টিকে থাকতে হবে। সুন্দরবনের বাঘ, পাখি, মৌমাছি, কাদামাটি এমনকি সুন্দরবনের পোকাকেও টিকে থাকতে হবে, টিকিয়ে রাখতে হবে। নইলে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। নির্বিচারে বাঘ, হরিণ, বৃক্ষ হত্যা করছে মানুষ। বাঘ মানুষকে আক্রমণ করে না। বাঘের বসবাস স্থলে মানুষ ঢুকে গেছে। বাঘের খাবারে  মানুষ ভাগ বসিয়েছে। বাঘের খাবারে এখন টান পড়েছে। একই সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটতো আছেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মিঠা পানির অভাব বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এর কারণ, অবাধ জল প্রবাহে কৃত্রিম বাধা। যেমন তিস্তা ব্যারেজ, ফারাক্কা বাধ প্রভৃতি। এগুলোর কারণে হিমালয় থেকে আসা মিঠা পানি বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে যেতে পারছে না। সুতরাং, সুন্দরবনে পানি মিঠা পানি আসছে না। ফলে বঙ্গোপসাগরের লবনাক্ত পানি সুন্দরবনে ঢুকে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণিরা লবনাক্ত পানি পান করতে না পেরে মানুষের সংস্পর্শে চলে আসছে। আবার অনেক উদবাস্তু মানুষেরা নদীতে বাড়ি-ঘর-জমি হারিয়ে সুন্দরবনে বাসা বেধেছে। যার ফলে প্রান্তিক মানুষ ও প্রান্তিক বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংর্ঘষ বাধছে। এক্ষেত্রে মানুষ তার শক্তির প্রমাণ দিচ্ছে, নিষ্ঠুর হচ্ছে, গাছ কাটছে, প্রাণি মারছে। এখানেই মানুষ থেমে নেই। নতুন নতুন প্রকল্প স্থাপন করার জন্য সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। বনের ভেতরে বা কাছাকাছি এসব কৃত্রিম স্থাপনা বন্যপ্রাণিদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে। সুন্দরবনে অনেক নিশাচর প্রাণি আছে। যান চলাচলে বনের ভেতর তাদের অবাধ বিচরণে বাঁধা পাবে এবং এক সময় এই প্রাণিরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আবার তেল, কয়লা জাতীয় বর্জ্য বনের জলসীমানায় পড়লে অনেক প্রাণি টিকতে পারবে না। অনেক প্রজাতির গাছ মারা যাবে। জীব বৈচিত্রের জন্য এসব নিশ্চিতভাবেই হুমকিস্বরূপ।

কুশীলববৃন্দ
অপরূপ বাংলার সর্বপ্রাণবাদী পাঁচালী ‘দক্ষিণা সুন্দরী’ রচনা করেছেন শাহমান মৈশান ও নির্দেশনায় সুদীপ চক্রবর্তী, গবেষণা উপদেষ্টা ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, পোশাক পরিকল্পনা তত্বাবধানে ওয়াহীদা মল্লিক জলি, রূপসজ্জা পরিকল্পনা তত্ত্ববধানে রহমত আলী, নৃত্য বিন্যাস অমিত চৌধুরী, সংগীত পরিকল্পনায় নীলা সাহা, আলোক পরিকল্পনায় মীর্জা শাখেছেপ শাকিব ও আতিকুল ইসলাম, মুখোশ পরিকল্পনা সুশান্ত কুমার সরকার, দ্রব্য পরিকল্পনা খাঁন মো: রফিক, পট অংকন রঘুনাথ চক্রবর্তী, অভিনয় ও পোশাক পরিকল্পনা করেছেন আতিকুর রহমান, মাহজাবীন ইসলাম, নুসরাত শারমীন, সৈয়দা ইফাত আরা ও এস এম জুম্মান সাদিক এবং প্রযোজনা সহযোগিতায় ন্যাশনাল থিয়েটার অব স্কটল্যান্ড ও ব্রিটিশ কাউন্সিল।

 

সৌজন্যে – রাইজিং বিডি.কম ( লিংক-http://www.risingbd.com/new/detailsnews.php?nssl=bcc6ac40d8442d5fbe53018fcb3c9787)

Check Also

Untitled-1

সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে ‘শিখণ্ডী কথা’

মিডিয়া খবর:  হিজলতলী গ্রামে বাড়ি রমজেদ মোল্লার। তার পরিবারে জন্ম হয় রতন মোল্লার। কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালে …

জাদুর প্রদীপ

শিল্পকলায় স্বপ্নদলের ‘জাদুর প্রদীপ’

মিডিয়া খবর : স্বপ্নদলের ব্যতিক্রমী প্রযোজনা মাইমোড্রামা ‘জাদুর প্রদীপ’। আজ ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares