Home » প্রোফাইল » মন আমার দেহ ঘড়ি -আব্দুর রহমান বয়াতী
abdur-rahman-boyati

মন আমার দেহ ঘড়ি -আব্দুর রহমান বয়াতী

Share Button

মিডিয়া খবর:-

একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া
জনম ভরি চলিতেছে।
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে।
 
এ রকম অসংখ্য চমৎকার চমৎকার গান দিয়ে আমাদের মনি কোঠায় স্থান করে উজ্জল হয়ে আছেন আব্দুর রহমান বয়াতী। প্রায় চার যুগ ধরে তিনি বাউল গানে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের মঞ্চ মাতিয়েছেন। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বুশের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে ডিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে তিনি জীবনের গর্ব অনুভব করেন। অথচ শেষ বয়সে আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে কেটেছে তার জীবন। মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে একটি বাড়ির নিচতলায় পরিবারসহ ভাড়া থাকতেন এই শিল্পী। ছেলে আলম বয়াতীর সামান্য রোজগারে খুব কষ্টে পরিবারের খরচের যোগান হত।
অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই মহান শিল্পী দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে মৃতু্র প্রহর গুনেছেন। ২০১৩ সালের ১৯ অগাস্ট এ লোক শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
 abdur-rahman-boyati-2
ঢাকার দয়াগঞ্জে ১৯৩৬ সালে ১ জানুয়ারি আব্দুর রহমান বয়াতির জন্ম। দয়াগঞ্জ বাজারে তাঁর বাবা তোতা মিয়ার একটি হোটেল ছিল। সেখানে মাঝে মধ্যে অনেক গুণী বাউল শিল্পীর আসর বসত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর ভেতর গানের প্রতি ভালবাসার সূত্রপাত। ছোটবেলা থেকেই বাউল গানের প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। যেখানে বাউল গানের আসর বসত সেখানেই ছুটে গিয়ে সামনের সারিতে বসে মনেপ্রাণে গান শুনতেন। প্রখ্যাত বাউল শিল্পী আলাউদ্দিন বয়াতী, মারফত আলী বয়াতী, খালেক দেওয়ান, হালিম বয়াতী, রজ্জব আলী দেওয়ান, আলেক দেওয়ান , দলিল উদ্দিন বয়াতীসহ বহু শিল্পী প্রায়ই আসতেন গানের অনুষ্ঠান করতে। বাবার অনুপস্থিতিতে কোন কোন দিন মনভরে বাংলার বাউল গান শুনতেন এবং নিজেও রপ্ত করে ফেলতেন। গানে প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিৰা না থাকলেও, তাঁর একটি অসাধারণ ৰমতা ছিল_একটি গান একবার শুনলে পরৰণে হুবহু গাইতে পারতেন তিনি। একা একা বসে চেয়ার-টেবিল অথবা মাটির পাতিলকে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বেছে নিয়ে গুনগুনিয়ে গান করতেন। এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় কিছু লোক তাঁকে গান গাইতে বললে গানপাগল কিশোর আব্দুর রহমান গেয়ে উঠলেন ‘লাউয়ের আগা খাইলাম ডগা খাইলাম এনই সাধের ডুগডুগি, আমার কদুর বয়সে করলো বৈরাগী’। তাঁর কণ্ঠের সুরের কারুকাজ শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী আলাউদ্দিন বয়াতী, সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বুকে টেনে নেন। সেই থেকে শুরু হলো তাঁর নতুন জীবন। মনে মনে গ্রহণ করেন এই কালজয়ী বাউল শিল্পীর শিষ্যত্ব্ব। আব্দুর রহমানের সঙ্গীত জগতে প্রবেশ পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন তাঁর বাবা। ছেলের গান গাওয়াকে তিনি মেনে নিতে পারলেন না। এমন সময় তাঁর পাশে ভাগ্যদেবী হয়ে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলেন মা আজমেরী বেগম। বাবার সাফ জানিয়ে দেয়া, ছেলে গান গাইলে ঘরের দরজা তাঁর জন্য চিরতরে বন্ধ।
বাবার এত নিষেধ অমান্য করেও রহমান ছুটে যেতেন বয়াতীদের গানের আসরে। কখনো কখনো বাবার বকুনি খেয়ে গানের জন্য ঘর পালালেও, মমতাময়ী মা রাতের আঁধারে চুরি করে ভাতের থালা তুলে দিতেন সনত্মানের হাতে। মায়ের মনের সুপ্ত ইচ্ছা ছিল, তাঁর ছেলে একদিন বড় সঙ্গীতশিল্পী হবে। এজন্যই তিনি মমতা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তাঁকে। প্রতি বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট মাজারে কাওয়ালি গানের আসর বসত। ১৫ মিনিট সময় দেয়া হত বাউল গানের জন্য। আব্দুর রহমান যথারীতি চলে যেতেন এবং গান শুনিয়ে মতিয়ে রাখতেন আসর। একদিন হাইকোর্ট মাজারে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে খ্যাতনামা সঙ্গীত পরিচালক শাহনেওয়াজ বিটিভিতে অডিশনের জন্য নিয়ে যান। কিন্তু ঢাকার লোক ঠিকভাবে কথা বলতে পারে না, এই অযুহাত দেখিয়ে বাদ দিয়ে দিলেন তাঁকে। পর পর দুইবার সত্য বলায় সে অডিশন থেকে একই অযুহাতে বাদ পড়ায়, তৃতীয়বার মিথ্যার আশ্রয় নিলেন। তৃতীয়বার তাঁকে অডিশনের জন্য ডাকেন বরেণ্য শিল্পী মুসত্মফা মনোয়ার। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, বাড়ি কোথায়? তিনি বলেছিলেন, বাবার পৈতৃক বাড়ি বিক্রমপুরে। মিথ্যা বললেও এ ছিল এক চরম সত্য। এরপর তাঁর জীবনে আসে এক নতুন বসনত্ম। ১৯৭২ সালে দেশের বরেণ্য শিল্পী আব্দুল আলীমের সঙ্গে নিজের লেখা ও সুর করা ‘মরণেরই কথা কেন স্মরণ কর না, আজরাইল আসিলে কারো কৈফিয়ত চলবে না’ গানটি বিটিভিতে পরিবেশন করে শ্রোতাদের কাছে অনেক প্রিয় হয়ে ওঠেন। ষাটের দশকে বাংলাদেশ বেতারে গান গেয়ে জয় করে নিয়েছেন অগণিত শ্রোতার মন। এর পর দীর্ঘ সময় আলাউদ্দিনের সঙ্গে রহমানের দেখা না হলেও তাঁর অনেক গান তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতেন। অনেক দিন পর রথখোলার মোড়ে খালেক দেওয়ানের সঙ্গে পালা গানে অংশ নেন আব্দুর রহমান। সেই সময় আলাউদ্দিন বয়াতীকে একটি লোক এসে বলেন, খালেক দেওয়ানের সাথে পালা গান গাইবেন আপনার এক শিষ্য, নাম রহমান। তিনি চিন্তায় পড়ে যান। এ নামে তাঁর কোন ছাত্র আছে কি না মনে করতে পারছিলেন না। ছুটে যান গানের আসরে। ভোর পর্যন্ত চলছিল পালা গান। রহমান শুনতে পান চাদর মুড়ি দিয়ে আলাউদ্দিন বয়াতী তাঁর গান শুনছে। রহমানের গলায় ছিল একটি টাকার মালা। তিনি এটি নিয়ে আলাউদ্দিন বয়াতীর গলায় পরিয়ে দেন। তখন তাঁকে সবাই চিনতেন আব্দুর রহমান নামে, সেই দিন আলাউদ্দিন বয়াতী বলেন, তুমি যখন আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছো, আজ থেকে তোমার নামের শেষেও থাকবে বয়াতী। তারপর থেকে আব্দুর রহমানের নাম হলো, আব্দুর রহমান বয়াতি।abdur-rahman-boyati-1
অর্থের অভাবে লেখাপড়ায় বেশি অগ্রসর হতে পারেননি রহমান। মাত্র অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। আক্ষরিকভাবে যথাযথ শিক্ষা লাভ না করলেও রহমান বয়াতী দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে একজন গুণী শিল্পীকে সম্মান দেখাতে হয়। তিনি শুনে শুনে হাজার হাজার গান রপ্ত করা ছাড়াও পালা গানের বিভিন্ন কৌশল, কোরান, হাদিস, গীতা, বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের তত্ত্বজ্ঞান আয়ত্ব্ব করেন। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় কয়েকটি গান হল- ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন মেসত্মরি বানাইছে’, ‘আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে’, মরণেরই কথা কেন স্মরণ কর না’, ‘মা আমেনার কোলে ফুটলো ফুল’, ‘ছেড়ে দে নৌকা মাঝি যাবো নদীয়া’, ‘আমি ভুলি ভুলি মনে করি প্রাণের ধৈর্য মানে না’সহ অসংখ্য গান। তাঁর বেশ কিছু অডিও ক্যাসেট, ভিডিও সিডি ও রিমিক এ্যালবাম আছে, যেগুলো এখনও শ্রোতাদের কাছে অনেক প্রিয়। চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজের আমন্ত্রণে বাউলশিল্পী হিসেবে তিনি জীবনে প্রথম ‘গুণাহগার’ নামে একটি ছবিতে প্লেব্যাক করেন। এ ছাড়া মোস্তাফিজুর রহমানের ‘শঙ্খনীল কারাগার’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে তিনি প্লে-ব্যাক করেছেন। তিনি জমিউর রহমান লেমনের ‘পরানের গহীনে’ নামে একটি নাটকে অভিনয়ও করেছেন। খান আতাউর রহমানের ‘ফারাক্কা’ নামের একটি ডকুমেন্টারিতে অংশ নিয়েছিলেন। গানের পাশাপাশি তিনি কিছু ছবিতে অভিনয়ও করেছেন। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হল_আমজাদ হোসেনের ‘কসাই’, মফিজ উদ্দিনের ‘অসতী’ এবং সাহাদাত খানের ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী বেশ কিছু বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। সেগুলো হলো-‘হাঁস-মুরগির খামার’, ‘নিরৰরতা’, ‘শিশুশিক্ষা’, ‘পঞ্চম জাতীয় পলিও টিকা দিবস’, ‘বনের শোভা পশুপাখি তাদেরকে কেউ মাইরো না’, ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ৰতিকর’, ‘নির্বাচনী প্রচারণা’, ‘৮৮ বন্যা’, ‘খরার সময়ে বৃষ্টির জন্য বিজ্ঞাপন’, ‘ক্রীড়া উন্নয়ন লটারী’ ও ‘পরিবার পরিকল্পনা’। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৫ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১০ মিনিটের একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের পরই এই শিল্পীর খ্যাতি সারাবিশ্বে ছড়াতে থাকে। বঙ্গবন্ধুই তাঁকে সর্বপ্রথম বিদেশে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন।
পৃথিবীর প্রায় ৩২টি দেশে তিনি লোকসঙ্গীতের মরমী সুর ছড়িয়ে দেন। বিদেশের মাটিতে তাঁর সবচেয়ে বড় পাওয়া আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে ডিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। 

সম্মাননা এবং পুরস্কার
লোকসংগীতে অসামাণ্য অবদানের জন্য পেয়েছেন, সিটিসেল চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ড, সোলস অ্যাওওয়ার্ড, টেলিভিশন দর্শক ফোরাম কর্তৃক লাইফ টাইম এ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গুণীজন সংবর্ধনা, নজরুল একাডেমি সম্মাননা ২০০৪, সমর দাস স্মৃতি সংসদ অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ বাউল সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, ইউএসএ জাগরনী শিল্পীগোষ্ঠী অ্যাওয়ার্ড, স্বরবীথি থিয়েটার বাংলা নববর্ষ ১৪১২ উপলক্ষে সংবর্ধনা ও সম্মাননা, কায়কোবাদ সংসদ আজীবন সম্মাননা, স্পেল বাউন্ড বিশেষ সম্মাননা, বাংলাদেশ বাউল সংগঠনের গুণীজন সম্মাননা পদক, বিক্রমপুর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী পদক, জাতীয় যুব সাংস্কৃতিক সংস্থার সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি স্বর্ণ পদক ও আজীবন সম্মাননা-২০০৫, সিটি কালচারাল সেন্টার কর্তৃক গুণীজন সম্মাননা পদক, বাউল একাডেমি পদক, একতা অ্যাওয়ার্ড, লোকসঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতি স্বরূপ লোকজ বাউলমেলা পদক ২০০৪ ও ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান সঙ্গীত একাডেমি সম্মাননা পদক ২০০৬ ও শ্রেষ্ঠ বাউলশিল্পী অডিও ক্যাসেট পুরস্কার।

 

Check Also

misha sawdagor

মিশা সওদাগর লড়বেন সভাপতি পদে

মিডিয়া খবর:- ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাবে বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির নির্বাচিত বর্তমান কমিটির দায়িত্ব। …

কলিম শরাফী

কলিম শরাফী রবীন্দ্রসংগীতের এক অনন্য জাদুকর

মিডিয়া খবর :- কলিম শরাফী। রবীন্দ্রসংগীতের এক অনন্য জাদুকর। ছিলেন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ কণ্ঠের অধিকারী। আর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares