Home » নিবন্ধ » বৃক্ষরোপণ সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হওয়া দরকার

বৃক্ষরোপণ সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হওয়া দরকার

Share Button

মিডিয়া খবর:-          -:রাজু আহমেদ:-

চলছে বর্ষাকাল। বৃক্ষ রোপনের উপযুক্ত সময়। বর্ষার শুরুতে মহামন্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের অনেক বিশিষ্টজন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বৃক্ষ চারা রোপণ করেন এবং সেটাতে পানি ছিটান। দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতৃবৃন্দের মাত্র কয়েকটি চারা রোপন করার মাধ্যমে পুরো দেশবাসীর বৃক্ষ রোপণ সম্পর্কীয় দায়িত্ব পালন শেষ হয়ে যায় না। বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয় থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং গোটা দেশবাসীকে গাছ লাগানো সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় সে উদ্যোগ সীমিত। আবার আনুষ্ঠানিক শোভা যাত্রা করে ‘গাছ লাগাই পরিবেশ বাঁচাই’ স্লোগানের মাধ্যমে মিডিয়ার উপস্থিতিতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় যে বৃক্ষ চারাটি রোপন করা হয় পরবর্তীতে সে চারাটিরও কোন যত্ন নেয়া হয় না। তাই দেখা যায় বর্ষার মওসুম আসলেই বৃক্ষ রোপণের জন্য যারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাদের অধিকাংশ সংখ্যকেই সারা বছরেও একবার রোপিত সে বৃক্ষটির খোঁজ নেন না। যার ফলে অযত্নে চারাটির আর বেড়ে ওঠা হয় না। সেটা কোন পশুর খাদ্য কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়ে যায়। সরকারী উদ্যোগে গাছ লাগানো কর্মসূচীতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ এবং খরচ হলেও টাকা বিনিয়োগের তুলনায় উপকার হয় সামান্যই। তবে যদি বন বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে বনায়ণের সাথে সম্পৃক্ত সকলেই বৃক্ষ রোপণের গুরুত্ব ও উপকারীতা সম্মন্ধে সচেতন হয় বা সচেতন করা যায় তবে তা দেশবাসীর অস্তিত্ব বা জীবন রক্ষায় বৃক্ষরাজি প্রধান ভূমিকা পালন করবে।

আশার কথা, মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হতে শুরু করেছে। নিজেকে নিয়ে মানুষ এখন ভাবতে শিখেছে। কি খাবে, কি খাবে না এ নিয়ে মানুষের সচেতনতার সীমা নাই। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের পরিমান কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে মানুষের সামান্য মাথা ব্যাথা নাই। গাছকে মানুষের সবচেয়ে উপকারী বন্ধু বলা হয় কেননা গাছ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। বাংলাদেশকে সবুজ শ্যামল প্রকৃতির দেশ বলা হলেও এখানে প্রয়োজনের তুলনায় সবুজের পরিধি খুবই কম। পরিবেশবাদীদের মতে, একটি দেশের মোট ভূমির ২৫% বনভূমি থাকা আবশ্যক অথচ বাংলাদেশে সে পরিমান বনভূমি নাই। সরকারী হিসেবে মতে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমান মাত্র ১৭.৫০%। সরকারী হিসেবে মতে, বাংলাদেশে মোট বনভূমি ২৫ লাখ হেক্টর বা ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার অর্থ্যাৎ মাথাপিচু মাত্র ০.০২ হেক্টর। সরকারী হিসেবের চেয়ে ইউনোস্কোর হিসেবে বনভূমির পরিমান আরও কম। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমান মাত্র ১০%। বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমিকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। যার মধ্যে পাহাড়ি বনভূমির আয়তন ১৩,৩৫৫ বর্গমাইল, ম্যানগ্রোভ বনভূমির পরিমান ৭,৪১২ বর্গমাইল, সমতল ভূমির বনভূমির পরিমান ১,২১৪ বর্গমাইল এবং গ্রামীণ বনভূমির পরিমান ২,৭১১ বর্গমাইল। অত্যন্ত দূর্ভাগ্যের হলেও দেশের ২৮টি জেলায় সরকারি বনভূমি নাই। পরিবেশর জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমি আছে মাত্র ৭টি জেলায় ( চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবন, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা )। দেশের বাকী ৩০টি জেলায় প্রয়োজনের তুলনায় খুব সামান্য বনভূমি রয়েছে। সরকার কর্তৃক দেশের উপকূলীয় ১২ জেলায় সবুজ বেষ্টনী ঘোষণা করা হলেও তা রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে ধ্বংস হতে শুরু করেছে। বিভাগ অনুযায়ী বনভূমির পরিমান হল, চট্টগ্রামে ৪৩%, খুলনায় ৩৮%, ঢাকায় ৭%, সিলেটে ৬%, বরিশালে ৩% এবং রাজশাহীতে মাত্র ২%। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগের মানুষ পরিবেশগত মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী বনায়ণ ধ্বংসে যেমন দেশের মানুষ ভূমিকা রাখছে তেমনি বর্হিবিশ্বের পরাশক্তিসমূহের অপতৎপরাতাও কম নয়। আমারা বনায়ণ ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে পড়েছি। আবাসনের নাম করে অপরিকল্পিত ভাবে বনায়ণ ধ্বংস করছি। এছাড়া জ্বালানী হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত কাঠ ধ্বংস করছি। বন মন্ত্রনালয় নির্ধারিত স্লোগান ‘একটি গাছ কর্তন করলে দুটি গাছ রোপন করব’ কে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না। বনায়ণ ধ্বংসের এ মহাযজ্ঞের কুফল বর্তমানে উপলব্ধি করতে না পারলেও নিকট ভবিষ্যতে এটা আমাদের জন্য দুর্যোগ বয়ে আনবে। এছাড়াও ২০০২ সালের ১লা মার্চ পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার বন্ধ না হওয়ার কারনে রোপিত বৃক্ষ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বিশ্বের পরাশক্তিসমূহ তাদের রাসয়নিক অস্ত্র কারখানায় পারমানবিক চুল্লি ব্যবহার এবং অন্যন্য কারখানা থেকে নির্গমিত কালো ধোঁয়া পরিবেশকে ভয়াবহভাবে দুষিত করছে। যার প্রভাবে বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলসহ উপকূলীয় বনাঞ্চলের বৃক্ষসমূহ বিপদজনক ভাবে মরে যাচ্ছে। এ কারনে বিশ্ব জলবায়ু এবং প্রাণী অস্তিত্বের জন্য বাংলাদেশ খুবই বিপদ জনক সীমারেখায় রয়েছে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন।

বৃক্ষ রোপন ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারের সাথে ব্যক্তিকেও সম্পৃক্ত হতে হবে। অন্য কোন স্বার্থে না হোক অন্তত নিজেদের অস্তিত্বসহ সকল প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বেশি করে বৃক্ষ রোপণ করা আবশ্যক। বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বৃক্ষ রোপন করার উপযুক্ত সময়। সুতরাং বসত ভিটার আনাচে-কানাচে যেখানেই খালি জায়গা পাওয়া যাবে সেখানে বেশি করে বৃক্ষ রোপন করতে হবে । বেশি সম্ভব না হোক অন্তত প্রত্যেকের উচিত একটি ফলজ, একটি বনজ এবং একটি ঔযুধি বৃক্ষ রোপন করা। আগামী প্রজন্মকে সুস্থ বিকাশের সুযোগ করে দিতে এ কর্তব্যটুকু পালন করা রাষ্ট্রের সকল সুনাগরিকের উচিত। সরকারও বৃক্ষ রোপনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাইতো বাংলাদেশ সরকার দেশের বনভূমিকে সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ গ্রহন করেছে। সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের বনভূমিকে ২০% উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। কাজেই আমাদের উচিত এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করা। আমাদের কিংবা সরকারের ব্যর্থতায় যদি এ উদ্যোগ সফল না হয় তবে দেশে বন্যা, খরা, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রাদুর্ভাব অতিমাত্রায় বেড়ে যাবে। যার ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন ধ্বংস হবে তেমনি আমাদের জীবনও হুমকির মূখে পড়বে। কাজেই ১৯৯০ ও ২০০২ সালে প্রণীত বন সংরক্ষন আইনের আওতায় এসে দেশের বনভূমির পরিমানকে অন্তত ২৫% উন্নীত করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হই। চলতি ২০১৫ সালের বর্ষা মওসুমে দেশের ১৬ কোটি মানুষ যেন ৪৮ কোটি বৃক্ষ চারা রোপন করে দেশের পরিবেশ রক্ষার কাজ শুরু করতে পারি সে ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করি।

 

 

Check Also

আসব ফিরে আবার দেখ এইনা গায়েতে

মিডিয়া খবর :- সাঁওতাল বিদ্রোহের এক লোক কাহিনী। ১৮৫৫ সালে সুরু সাঁওতাল বিদ্রোহ। ‘বাজাল’ নামে …

সংখ্যা বাড়ছে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর

মিডিয়া খবরঃ- বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান আর ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে  নানা ধরনের জীববৈচিত্র্য দেখা যায় যা অনেক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares