Home » নিউজ » উন্নয়ন নাট্যডায়রী থেকে -ড. জহির বিশ্বাস
unnayon-natya

উন্নয়ন নাট্যডায়রী থেকে -ড. জহির বিশ্বাস

Share Button

মিডিয়া খবর :-

যখনই কিছু লিখতে চাই তখন সম্পূর্ণ সত্য লিখতে পারি না। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Absolute Truth. তখন কখনো কখনো প্রতীকের আশ্রয় jahir-biswasনিতে হয়। যেমন: ক দিয়ে করিম, কামাল ইত্যাদি। নাটক হবে যশোরের কেশবপুরে মধুকবি (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)’র বাড়ি থেকে অল্প দূরে। পুরো নাটকের নেপথ্যে আমার মুরুব্বি ন এবং ল। বিষয়বস্তু (Message) প্রাথমিক শিক্ষায় ১০টি অধিকার। নাটকে থাকবে নৃত্য, গীত, বাদ্য, বন্দনা সঙ্গীতও।  শেষে ইন্ট্যারকটিভ পর্ব- যেখানে দর্শকের সাথে তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা, আবার তাদেরই অভিনয় ইত্যাদি। এসব বিষয়ে নাটক করতে গিয়ে কত না নাটক হয়। এখানে নেপথ্য নাটকের একটি উদাহরণ এরকম-

দৃশ্য-১-

ঢাকা: সকল অফিসিয়াল পদ্ধতি পাড়ি দিয়ে কাজ শুরু করার কথা জানুয়ারী থেকে মার্চের মধ্যে। সেখানে এপ্রিল গেল, মে’ র ২১ তারিখে কাজের অনুমতি মিললো। যাদের জন্য কাজ – ভদ্রজনেরা কেউ বলে ঋষি, কেউ বলে দলিত, অভদ্রজনেরা বলে মুচি। তাদের সন্তানেরা যাতে বৈষম্যের শিকার না হয় তারই সচেতনতা বাড়ানো। তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার দশ অধিকার। কাজ করবো  হাইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের কোন শিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী বা কোন আমুদে লোকদেরকেও সাধারণত: আমি যুক্ত করি এসব কাজে। যদিও তারা পেশাদার যন্ত্রী অথবা পেশাদার সংসারী। যা হোক ছাত্রছাত্রীদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। চট্টগ্রাম, জামালপুর, যশোর, সাতক্ষীরা সবখানে একই দৃশ্য। গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষ, স্কুল খুললেই পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষা শেষ হলেই রোজা শুরু। তাহলে নাটক হবে কখন? ঈদের পরে?
দৃশ্য-২, ঢাকা: ন বললেন, ভাই এলাকায় যান, গিয়ে একটা ব্যবস্থা করেন। ল বললেন আপনি কাজ না করলে আপনাকে নিলাম কেন? আমি বললাম, যাদের নিয়ে কাজ করবো, যাদের জন্য কাজ করবো – তারাই তো নেই। এখন শো করলে উদ্দেশ্য পূরণ হবে ? ন সংস্কৃতিমনা, বললেন- কর্ম এলাকায় গিয়ে বিকল্প দল তৈরী করেন। বিকল্প দল মানে বড়দের দিয়ে। তারা তো সারাদিন কাজ করে। সন্ধ্যাবেলায় বিনোদন। কিন্তু আমার তো একটানা সম্পূর্ণরূপে কয়েকদিন লাগবে। পরিকল্পনায় আছে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করা। তাতে ৪দিনেই নাটক নেমে যায়। প্রয়োজন হয় ৩২ থেকে ৩৫ ঘন্টা সর্বমোট। ঢাকার বড় দলগুলো প্রতি সপ্তাহে ৩দিন করে প্রতিদিন ২/৩ ঘন্টা করে মোট ৫০ থেকে ৬০ ঘন্টা কর্ম-সময় ব্যয় করে একটি উঁচু মানের নাটকে। আমার ৪দিনে ৩২ খেকে ৩৫ ঘন্টা দরকার হয়। তাতে মান যথেষ্ট ভাল থাকে। যা হোক প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ। হাইস্কুলে পরীক্ষা চলছে। খবর এলো ন-দের বন্ধু সংগঠন একটা বড়দের দল রেডি করেছে।

দৃশ্য-৩, কেশবপুর: পৌঁছলাম বুধবারে। মহড়া হবে বৃহ, শুক্র, শনি, রবি, এবং রবিবারে বিকালে শো। কিন্তু কর্মজীবিদের নিয়ে তা হবে না- মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কেশবপুরের জাহানপুর গ্রাম। মহড়া স্থানে পৌঁছলাম। সাধারণত শিক্ষা অধিকার নাটকের মহড়ার স্থান হয় স্কুল ঘর। পরীক্ষা চলছে। তাই বাড়ির উঠান। কিন্তু উঠানে কোন শিল্পী নেই কারণ তখন সকাল ন’টা। সবাই কাজে। স্থানীয় সহায়ক চ দিদি বিব্রত। বললেন, দাদা আমি সবাইকে ডাকছি, আপনি অপেক্ষা করেন। আমিও সাথে গেলাম। এপাড়া ওপাড়া ঘুরে দেখলাম- কেউ বাঁশ কাটছে, কেউ দোকানদারী করছে, কেউ ছাতা হাতে বেরুচ্ছে শহরে যাবে কাজে। এখন উপায়? অরুনকে দিয়ে দীপংকর, দীপংকরকে দিয়ে সীমা দাস- এভাবে ঘুঘু দিয়ে ঘুঘু ধরার মতো করে দল গঠন করলাম নিজে সারাদিন ধরে। (একেই বলে ম্যানেজ করা!) বিকাল হলো। সাড়ে ৪টা। বসলাম বাড়ির উঠানে। আলোচনা শুরু। এবাড়ির মাদুর, ওবাড়ির খেজুর পাটি বিছিয়ে বসলাম। তখন পাড়ার উৎসুকদের যে ভিড় হলো তাতে কাজই করা যায় না। চ’কে বললাম, মহড়া তো হবে স্কুল ঘরে। এখানে কেন? তিনি বললেন, দাদা ওপর থেকে যেভাবে বলা হয় সেভাবেই করি। বুঝলাম না ওপর মানে কে? চ সব সময় ঢাকা অফিসের ল’কে ওপর মহল বোঝায়। এবারও তাই। সন্ধ্যা নামলো। বাড়ির উঠানে খেজুর পাটিতে FGD করলাম। উদ্দেশ্য এই কমিউনিটির সন্তানদের শিশু শিক্ষা অধিকারের ১০টি অধিকার বুঝিয়ে এখানে কি কি সমস্যা তা বের করা এবং তা নাটকের মাধ্যমে বুঝিয়ে লোকদের সচেতন করা, করলামও। শিল্পীদের তালিকা চুড়ান্ত করলাম। পূর্বেকৃত ড্রাফট স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার ওরা তা ফাইনাল করবেন। নাটকে মহারানী, গোপাল ভাঁড়, শিক্ষামন্ত্রী, বাদকদলসহ ৭টি নৃত্য, ৪টি গান যুক্ত করা হলো দর্শকের আকর্ষণ বাড়াতে। আঁধার নামলো। লোডশেডিং। কুপি জ্বালিয়ে ভেজা স্যাঁতসেঁতে উঠানে কৌতুহলী নারী পুরুষ শিশুদের সামনে এই নাট্যদৃশ্য চলছে। এরই মধ্যে স্কুল ফেরত পরীক্ষার্থী একদল মেয়ে (৭ জন) এসে বললো- আমরাও নাটক করবো। পরীক্ষা? পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকেই করবো। কেউ বললো পরীক্ষা শেষ ১২টায়, কেউ বললো সাড়ে ৩টায়। অর্থাৎ কাউকে একসাথে পাচ্ছিনা। কর্মজীবিরাও তাই। ওদিক মহড়া স্থানও নেই। এই অবস্থায় প্রথম দিবস সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা গেল, উদ্দেশ্য রবিবারে বিকালে নাটক করা।development-theatre

দৃশ্য-৪, কেশবপুর: দ্বিতীয় দিবস। সকাল ৯টায় মহড়ায় গেলাম। কেউ আছে, কেউ নেই। কেউ পরীক্ষার হলে। মহড়া স্থান- একটি আগের িদিন তোলা নতুন খোলাঘর। পাশে গরু বাঁধা, গোবর, ময়লা গন্ধ। ১ ঘন্টায় ৩বার বলে গোবর পরিষ্কার করাতে পারলাম এক বৌদিকে দিয়ে। খোলা জায়গা। নিষ্পাপ দর্শকের ভিড় এড়ানো কঠিন। অরুনদাসের বড় ঢোলে চাঁটি পড়লে আর যাত্রার কর্ণেট বাঁশীতে ফুঁ পড়লে ১০ মিনিটে হাউসফুল। পাড়ার মাসি পিসিদের থেকে চেয়ে ৮/১০টা শাড়ি দিয়ে খোলাঘর ঘেরা হলো। চ -এর ম্যানেজার উ বললেন, দাদা- শো রবিবারে না করে বুধবারে করেন। বৃহ, শুক্র, শনি মহড়া করে ঢাকায় রাতের গাড়িতে এসে সাউথইষ্ট ইউনিভার্সিটি বনানীতে দুইটা ক্লাশ নিয়ে আবার কেশবপুরে। অর্থাৎ আমার অনুপস্থিতে রবি ও সোমবারে তারা নির্বাচিত দলনেতার অধীনে মহড়া করলেন। আসার আগেই ঠিক করেছিলাম কলেজে পড়া সীমা নৃত্য পরিচালক, দীপংকর নির্দেশক, যন্ত্রী অরুন সহযোগী নির্দেশক, তৃপ্তি সংগীত পরিচালক, সুমন দাস মঞ্চঅধিকর্তা ও প্রপ্স ম্যানেজার।

দৃশ্য-৫, কেশবপুর: মহড়ার ৫ম দিন। মঙ্গলবার। সকাল ৮টায় আমি হাজির। এরই মধ্যে স্থানীয় সংগঠনের ম্যানেজার ‘উ’ কে নিয়ে আমি শো এর জন্য শহরের সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেটরের দোকান (মঞ্চের জন্য), শো এর স্থান সব পরিদর্শন করার কাজ শেষ করলাম। এগুলো উ এর কাজ । আমি সহযোগিতা করলাম। মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত প্রচন্ড খাটুনী করলাম। আহ্, নাটকও রেডি! মাইকিং এর ঘোষণা আমি লিখে দিলাম। ২দিন মাইকিং হলো। বিরাট মঞ্চ। হাজার তিনেক দর্শক।  ATO সাহেব সবার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করলেন। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও দর্শক জনতার উদ্দেশ্যে। তার মেয়ে নাকি বোন অসুস্থ। তিনি চলে গেলেন। নাটকের ভেতর দিয়ে গোপাল ভাঁড় এবং মহারানীর সংলাপে এবং ইন্ট্যারকটিভ পার্টে উঠে এলো এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার ১০টি অধিকারের কোনটির অবস্থা কি, কার কি দায়িত্ব ইত্যাদি। বুধবারেই শো হলো,  শো হিট। সবাইকে ই-মেইল করে সফলতার আনন্দ ভাগ করবো কিন্তু কেউ ধন্যবাদও দিলোনা। ভীষণ মন খারাপ হলো।

পুনশ্চঃ মহড়ার ৫ম দিন ল ফোন করলেন। জ-ভাই, আপনি বুধবার শো শেষ করে বৃহঃবার সাতক্ষীরা যান। কিভাবে? পরের দিন শুক্রবার তো রোজা। কেন-দল গঠন করে চলে আসবেন। হায়, কে কাকে বোঝায়। বোঝাতে চেষ্টা করলাম। ল জোর খাটালেন। তবুও না করতেই কষে এক ধমক- আপনি ন-এর সাথে কথা বলুন। পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। হায়! সবুজ পাসপোর্ট, বঙ্গ জননী, আমি যদি পাখি হতে পারতাম! মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা অনুধাবন না করে, কাজের পদ্ধতি অনুসরণ না করে-আহ, কিভাবে বোঝাই, কাকে বোঝাই? কেউ নেই, বোঝার কেউ নেই -আছে শুধু অন্ধকার-মুখোমুখি বসিবার দয়াহীন অফিসার।

Check Also

bou-boka-day

মারুফ রেহমানের নাটক বৌ বকা দেয়

মিডিয়া খবর :- মারুফ রেহমানের রচনা ও মারুফ মিঠুর পরিচালনায় একুশে টেলিভিশনে প্রচারিত হতে যাচ্ছে …

women

পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস

মিডিয়া খবর:- আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবার নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নারী-পুরুষ সমতায় উন্নয়নের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares