Home » নিবন্ধ » ঐতিহাসিক পলাশী দিবস আজ

ঐতিহাসিক পলাশী দিবস আজ

Share Button

মিডিয়া খবর :-

২৩ জুন, আজ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। এ দিনে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য নিভে গিয়েছিল কুচক্রীদের কূটজালে। শুরু হয়েছিল পরাধীনতার কশাঘাত আর শোষণ-নিপীড়নের নতুন অধ্যায়। বিশ্ব ইতিহাসে এ দিনটি পলাশী দিবস হিসেবে পরিচিত।

২৫৭ বছর আগে (১৭৫৭ সাল) এ দিনে পলাশীর আম্রকাননে সততার মৃত্যু হয়েছিল আর জয়ী মীরজাফরের অসততা। হৃদয়বান শাসক নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যবনিকা ঘটেছিল বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্যের।

স্বাধীন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার চলে গিয়েছিল ইংরেজ ও তাদের দোসর বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের হাতে। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে করুণ মৃত্যু হয়েছিল বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ও মহান এক শাসকের।

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দূর্গ রক্ষার জন্য অল্প কিছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলি, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ও পলাশীতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তারা কেউ ইংরেজদের পথরোধ করেনি।

নবাব বুঝতে পেরেছিলেন, সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল। কিন্তু ততক্ষণে আর করার কিছু ছিল না তার। বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফরকে বন্দি করার চিন্তা বাদ দেন। তিনি মীরজাফরকে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে শপথ নিতে বলেন।

বিশ্বাসঘাকতা যার রক্তে সে কী কখনো প্রতিজ্ঞা করে তা রক্ষা করতে পারে? সে সময় মীরজাফর পবিত্র কোরআন স্পর্শ করে অঙ্গীকার করেছিলেন, তিনি শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না। কিন্তু সেই শপথ তিনি রাখেননি। ক্ষমতার লোভে বিকিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সত্ত্বা, ঐতিহ্যকে।polashi-filed

২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও লর্ড ক্লাইভের মধ্যে এক যুদ্ধ ‘নাটক’ মঞ্চায়িত হয়। এতে নবাব বাহিনীর পক্ষে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল মাত্র ৩ হাজার। যুদ্ধের ময়দানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও তার অনুসারী প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্য নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

বেলা আটটার সময় হঠাৎ করেই মীরমদন ইংরেজবাহিনীকে আক্রমণ করেন। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীরমদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীরজাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ যেখানে সৈন্যসমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মীরমদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলা বারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীরমদন ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মীরমদন মৃত্যুবরণ করেন।

এমন সময় বাংলার মানুষ আবারও মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা দেখলেন। ইংরেজদের আক্রমণ না করে তার সৈন্যবাহিনীকে শিবিরে ফেরার নির্দেশ দেন তিনি। এই সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা নবাবকে আক্রমণ করে। যুদ্ধ বিকেল পাঁচটায় শেষ হয় এবং নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে।

ইংরেজদের পক্ষে সাতজন ইউরোপিয়ান এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাকে সাহায্য করেনি। ফলে যুদ্ধে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পরাজয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেবাদাসদের সাহায্যে এভাবেই বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দীর্ঘ ১৯০ বছর এদেশে শাসন শোষণ করে। কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করে।

siraj-ud-doula-1 ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজউদ্দৌলাকে মহানন্দা নদীর পাড় থেকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দি হওয়ার সময় নবাবের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী লুতফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ৪ জুলাই (মতান্তরে ৩রা জুলাই) মীরজাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে আরেক বিশ্বাসঘাতক মুহম্মদী বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেওয়া হয়। এরপর সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের সদস্যকে এক এক করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে মীরজাফর ও তার ছেলে মিরন।

 নবাবের সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাদেরও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। ইতিহাসবিদ নিখিল নাথ রায়ের লেখা ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনী` থেকে জানা যায়, নবাবের সেনাবাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনার সংখ্যা ছিল অনেক কম। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা না হলে নবাবের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত।

ইতিহাস কথা বলে। সত্যের মৃত্যু হয় না। সত্য চির অম্লান, উদ্ভাসিত। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কুচক্রের ফাঁদে পড়ে জীবন দিয়েও গেলেও তার অবদান, ভালোবাসা বাঙালিদের মনে অম্লান হয়ে থাকবে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে জ্বল জ্বল করবে তার কৃতি। আর ঘৃণিত কলঙ্কজনক এই ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে জড়িত ছিল যারা, সেই বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায়দুর্লভ, মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, নন্দকুমার প্রমুখ কুচক্র আজ ঘৃণার পাত্র হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই নিয়েছে। আজ বাংলায় মীরজাফর একটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেদিন কুচক্রী মীরজাফরের জয় হলেও ইতিহাসে তার পরাজয় হয়েছে শোচনীয়ভাবে।

writer – এস এম কামরুজ্জামান (courtesy – risingbd.com)

Check Also

আসব ফিরে আবার দেখ এইনা গায়েতে

মিডিয়া খবর :- সাঁওতাল বিদ্রোহের এক লোক কাহিনী। ১৮৫৫ সালে সুরু সাঁওতাল বিদ্রোহ। ‘বাজাল’ নামে …

সংখ্যা বাড়ছে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর

মিডিয়া খবরঃ- বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান আর ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে  নানা ধরনের জীববৈচিত্র্য দেখা যায় যা অনেক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares