Home » ইভেন্ট » বিজ্ঞাপনের মনো-ব্যাবচ্ছেদ- প্লাবন ইমদাদ
adweb-13

বিজ্ঞাপনের মনো-ব্যাবচ্ছেদ- প্লাবন ইমদাদ

Share Button

ঢাকা, ১লা মে:-

কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথকে তৎকালিন সুলেখাকালি’র কর্তৃপক্ষ খুব করে ধরলো তাদের কালির প্রচারনার জন্য দু’কলম লিখে দিতে। কবিগুরু লিখে দিলেন দু’কলম বিজ্ঞাপন, ‘সুলেখাকালি, কলঙ্কের চেয়েও কালো।’ কলঙ্ক কেমন কালো হয় তা চর্মচক্ষে আমাদের দেখার সৌভাগ্য নাহলেও কবিগুরু অন্তত আমাদেরকে একটা মানদন্ড দিয়ে গেছেন যাথেকে কিছুটা হলেও অনুমান করা যাবে কলঙ্কের বিমূর্ত রুপ। এযুগে কবি জন্মালে হয়তো তার ‘ছুটি’ গল্পে ফটিকমা’কে কোন টেলিকম কোম্পানির মোবাইল ফোনে কল করে জানাতো প্রাণের আকুলতা, ‘বীরপুরুষ’ কবিতার ঘোড়া হয়ে যেতো কোন জেনারেটর কোম্পানীর পণ্যের ক্ষিপ্রতার প্রতীক আর হৈমন্তীর দীঘল চুল হয়ে যেতো কোন নারিকেল তেলের নিজস্ব সাফল্য। বিখ্যাত সার্কাস ব্যাবসায়ী ফিনেস টাইলর বার্নাম বলতেন, ‘প্রতি মূহুর্তেই পৃথিবীতে একেক জন বোকা মানুষ জন্ম নিচ্ছে’। আর এই বোকাদের চোখে ধুলো দেয়ার মধ্যে একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পেতেন বার্নাম। আর বিজ্ঞাপনের নানবিধ ধোকা নিয়ে ভেনজ পিকার্ড পঞ্চাশের দশকে প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত বই ‘হিডেনপার স্যুয়েডারস’। এটাই প্রথম বই যা বিজ্ঞাপন শিল্পের অভ্যন্তরীন রুপ উন্মোচন করে দেয় পৃথিবীর কাছে। আমাদের আচরণ কিভাবে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কর্পোরেশন, আধুনিকতা, বাজার দ্বারা তারই এক অনবদ্য প্রামাণ্য কর্ম নথি এ বই।

পিকার্ডের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে একজন উর্ধ্বতন বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ অনায়াসে বলেন, ‘আমরা যখন একটা কসমেটিক বিক্রি করছি, আমরা তখন আসলে কসমেটিক নয়, বিক্রি করছি ‘প্রতিজ্ঞা’ যা তাকে সু্ন্দর বানাবার প্রতিজ্ঞা করছে; আমরা যখন একটা গাড়ী বিক্রি করছি আসলে ক্রেতা তখন গাড়ী কিনছে না, কিনছে প্রেসটিজ বা প্রতিপত্তি।’ মানুষের আচরণ নিয়ে তাই যতটা না গবেষণা হয়েছে মানুষের আত্নোন্নয়নের লক্ষে, তার থেকে বেশী গবেষণা হয়েছে মানুষকে নিয়ন্ত্রন ও ব্যাবহার করার লক্ষে। এক গবেষণায় দেখা গেছে একদল মহিলাকে নীল, সাদা ও ধুসর রঙের তিনটি ভিন্ন প্যাকেটে তিন ধরনের কাপড় কাচার গুড়া সাবান দিয়ে জানাতে বলা হয় যে কোন সাবানটি সব থেকে বেশী কার্যকরী। ব্যাবহারের এক সপ্তাহের মাথায় শতকরা নব্বইভাগ মহিলা জানালেন যে নীল রঙের প্যাকেটের সাবান সব থেকে বেশী কার্যকরী। মজার ব্যাপার হলো যে,  ঐ তিনটি প্যাকেটে আসলে একই গুড়া সাবান ছিল। পরবর্তীতে এম আর আই পরীক্ষায় দেখা গেল মস্তিস্ক কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোর প্রতি অপেক্ষাকৃত বেশী সংবেদনশীল। পরে প্যাকেটের রঙটাও নির্ধারিত হলো উজ্জল রঙ। অত্যাধুনিক শপিং মলে মৃদুসংগীত বাজতে দেখা যায় ইদানীং। এ নিয়ে অনেক আগেই মানুষ গবেষণার স্বীকার হয়েছে। দেখা গেছে মৃদুসংগীত মানুষের স্নায়ুকে এক ধরনের শীতলতা দান করে যার ফলে সে স্বাভাবিক গতির তুলনায় ধীরে হাঁটে। এর ফলে আশেপাশে সাজিয়ে রাখা পণ্য নজরে পড়ার সম্ভাবণা স্বাভাবিক অবস্থার থেকে অনেকগুন বেড়ে যায়।

আধুনিক বিজ্ঞাপন নির্ভর সংস্কৃতিতে একটা ব্র্যান্ডের জিনস কিংবা একটা টি-শার্ট বিজ্ঞাপনে হয়ে ওঠে একেকটা  প্রেসটিজ ইস্যু, একটা ঘড়ি হয়ে উঠে ব্যক্তিত্বের নির্ধারক, একটা জুয়েলারী হয়ে ওঠে ভালবাসা প্রকাশের অদ্বিতীয় মাধ্যম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বেপুঁজিও বাজার ব্যবস্থার চরম উৎকর্ষের ফলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নামান্তর নারীও হয়ে ওঠে পণ্য প্রসারের আরেক মূল্যবান পণ্য। পঞ্চাশের দশকে মেরলিন মনরোর শারীরিক গঠন তাই হয়ে ওঠে সকল নারীর আরাধ্য। আর তাই ভিঞ্চির সুঠামদেহী মোনালিসাকে ছুড়ে ফেলে সবাই ছুটে মনরোর পানে।দেখা দেয় সভ্যতার নতুন রোগ ‘অ্যানেরক্সিয়ানার্ভোসা’। নারীরা পুরুষতন্ত্রের চৌকাঠ মাড়িয়ে আলোকিত মঞ্চে পা বাড়ায় মুক্তির আশায়। দৈহিক প্রদর্শন আর গ্ল্যামারের আতিশয্যে সে হারিয়ে ফেলে তার নিজস্বতাকে। নারীবাদিরা তাই গলা ফাটান নারীর বাণিজ্যিকীকরনের বিপক্ষে। ২০০১ সালের এডিডাস জুতার জাকজমকপূর্ণ ক্যাম্পেইনে জুতার একেকটা ফিতার উপর বা পাশে বসিয়ে দেয়া হয় একেকটা আবেদনময়ী নারীকে যার কোন সম্পর্কই নেই জুতার সাথে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে বিজ্ঞাপনে নারীকে হয় যৌনতার প্রতিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় অথবা আদর্শ-মমতাময়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মনোবিজ্ঞান বলছে এমন পরিস্থিতিতে পুরুষনারীকে দু’টি অবধারিত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে চিন্তাই করতে পারেনা। ফলে বাড়তে থাকে পরনারীর প্রতি আসক্ত হবারপ্ রবণতা। কারন সে খুজতে শুরু করেছে দ্বৈতরুপধারী দুই ভিন্ননারীকে যথাক্রমে ঘরে ও বাইরে।

বিজ্ঞাপনের দ্বারা মানুষের মনোজগৎ দখল করার কিছু সাধারন কার্যকরী পদ্ধতি রয়েছে যা জাতী, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকরী। এ প্রভাবক গুলোর মধ্যে একটা হলো দেশপ্রেম। এডলফ হিটলারের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনেও ছিল এই দেশ প্রেমমূলক গুজব। জোসেফ গবেলস নামক একজন গুজব বিশেষজ্ঞ সহ আরো কিছু মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গড়ে তোলেন ‘মিনিস্ট্রি অব প্রোপাগান্ডা’ বা ‘গুজব মন্ত্রনালয়’ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কুখ্যাত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকায় তোলপাড় তোলে দেশপ্রেমের বানী। শোনা  যায় জার্মান জাতি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি। তেমনি বিজ্ঞাপনে দেশপ্রেমের অসাধারণ আবেগাপ্লুত চিত্রায়নের সাথে জুড়ে দেয়া হয় পণ্যকে। যেন এইপণ্যের মাঝে মিশে আছে আপনার গভীর স্বদেশপ্রীতি। আরেকটি প্রভাবক হলো অন্যকে হেয় করণ। অনেকপণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় অন্যান্য সাধারন পণ্যের প্রাথমিক নিন্দাকরন এবং পরবর্তীতে নিজপণ্যের মহত্বগাঁথা। বিজ্ঞাপনের আরেকটি বিশেষ প্রভাবক হলো সামাজিক স্তর বিন্যাস। এ পদ্ধতির সফল প্রয়োগের ফলেই কিছুপণ্য হয়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদার নির্ধারক। যেসমস্ত সমাজে বৈষম্য যতবেশী সেসব সমাজে এই ধরনের বিজ্ঞাপন বেশী ফলপ্রসূ। আরেকটি শক্তিশালী প্রভাবক হলো দূর্বলগোষ্ঠির প্রতিকরুনা প্রদর্শন। যেমন অনেক বিজ্ঞাপনেমা, বৃদ্ধ, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ইত্যাদি গোষ্ঠিকে বিশেষায়িত করে মানুষের সহমর্মিতা আদায় করা হয় ঐপণ্যের প্রতি। আমরা ভেবেই বসি যেহেতু পণ্যটি মায়ের স্নেহ নিয়ে বা শিশুর কোমলতা নিয়ে বা বৃদ্ধের সহমর্মিতা নিয়ে কথা বলছে সেহেতু ঐ পণ্য অধিক নির্ভরযোগ্য ।এভাবে আমরা পরোক্ষ ভাবে দূর্বল হয়ে পড়ি সেইপণ্যের প্রতি। বিজ্ঞাপনের আরেক অন্যতম একটি শক্তিশালী প্রভাবক হলো ধর্মীয় অনুশাসন।একবার বাংলাদেশে এরোমেটিক সাবানের বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হলো যে সেখানে ব্যাবহৃত চর্বি হালাল অর্থ্যাৎ এরোমেটিক সাবান হলো একশো ভাগ হালাল সাবান। তার কিছুদিনের মধ্যে দেশে লাক্স সাবানের বিক্রি অদ্ভুতভাবে কমে যায়। কারন মানুষের ধারণা হয় লাক্স এ শুকরের চর্বি ব্যাবহার করা হয়।কিন্তু পরে জানা যায় তা ছিল ভুল। শুদ্ধতা হলো বিজ্ঞাপনের আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার। শতভাগ খাটি বলে অনেক ভেজালপণ্য ও তাই চালিয়ে দেয়া হয় ঘরে ঘরে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতিজ্ঞা ও অন্যতম এক বিজ্ঞাপনী হাতিয়ার। আর তাই লক্ষ করা যায় সাবান, শ্যাম্পু, শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে চুলের তেলও হয়ে ওঠে আপনার সুস্বাস্থ্যের একচ্ছত্র অধিপতি।

প্রতিযোগীতামূলক বাজার ব্যাবস্থায় বিজ্ঞাপন খুবই বৈধ ও বাজারে প্রভাব সৃষ্টির একটি অনবদ্য পদ্ধতি। কিন্তু সে পদ্ধতির ফলে খুব নিভৃতে মানব মনোজগতের এক বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়ে যা চর্মচক্ষে প্রতীয়মান নয়। সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রকট করে সামাজিক শ্রেনীকরণ ও বৈষম্যের মনোভাব তৈরী করা, নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু যৌনতা বা গৃহকর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, মানুষের আবেগের বানিজ্যিকী করণ, নেতিবাচক মূল্যবোধের বিস্তার, প্রয়োজনের থেকে অনেক বেশী আকাঙ্খা তৈরী করণ সহ নানাবিধ প্রভাব বজিয়ে রাখছে আমাদের ক্রমবর্ধমান বিজ্ঞাপন সংস্কৃতি। ব্রিটেন সম্প্রতি শিশুদের মুটিয়ে যাওয়া ও খাদ্যাভাস সংক্রান্ত মানসিক রোগের উপর শিশু সংক্রান্ত বা শিশুজড়িত বিজ্ঞাপনের প্রভাবের উপর গবেষণা  শুরু করে বিজ্ঞাপনের নেতিবাচক প্রভাব সংক্রান্ত কিছুতথ্যও পেয়েছে। মুটিয়ে যাওয়ার পেছনে অনেকটাই ফাস্টফুড আসক্তি একটি অন্যতম কারন যা চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। সুইডেনই তো মধ্যে বিজ্ঞাপনে শিশুর ব্যাবহারের উপর কড়া নজরদারি বিষয়ক এক শক্তিশালী আইন পাশ করেছে যা ডেনমার্কও চিন্তাভাবনা করছে। পুরোইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক কেন্দ্রীয় আইন আছে যা বিজ্ঞাপনের নানা নীতিমালা দ্বারা আচ্ছাদিত। একটি সুস্থ, সুন্দর ও বিকশিত সমাজ ব্যবস্থায় গনমাধ্যমের শক্তিশালী ভুমিকা অনস্বীকার্য। একটি জরিপে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ গড়ে প্রতি দিন তিনশত বিজ্ঞাপন দেখে আর সমগ্র আয়ুর তিন বছর সময়কালের সমপরিমান সময় বিজ্ঞাপন দেখে ব্যায় করে। বিজ্ঞাপন হলো গণমাধ্যমের অপরিহার্য অংশ। তাই বিজ্ঞাপনের ছাকন প্রক্রিয়াও একটি জাতি বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়।

Check Also

jessore-6th-dec

যশোর মুক্ত দিবস

মিডিয়া খবরঃ-         সাজেদুর রহমানঃ- ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিনেই যশোর …

5th-dec

৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১

 মিডিয়া খবরঃ-        সাজেদুর রহমানঃ- ৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১।   সকাল ৯ টায় মিত্রবাহিনীর …

One comment

  1. yes, carrying on…… be with us please

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares