Home » সাহিত্য » গল্প » দেশে যখন ফিরেছেন মানিয়ে নেন
Bangladesh

দেশে যখন ফিরেছেন মানিয়ে নেন

Share Button

মিডিয়া খবর:-        -:মোস্তাফিজুর রহমান টিটু:-

আমার প্রবাস জীবনের প্রথম দিকের কথা। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে গেলাম। উন্মুক্ত মাঠে অনুষ্ঠান। তিন চারশ লোকের জমায়েত। শিশুদের হুল্লোড়, চটপটি বিরিয়ানির দোকান আর জমজমাট আড্ডা। খুব ভালো লাগছে। একটু পর শুরু হলো অনুষ্ঠান। ছোট ছোট শিশু্রা কি সুন্দর বাংলায় গান করলো। আমি মুগ্ধ।

“ভাই কি নতুন?” এক সৌম্য দর্শন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।
–হ্যা ভাই আমি নতুন। উত্তর দিলাম।
“এইসব আজাইরা অনুষ্ঠানে আসছেন। অযথা সময় নষ্ট হবে।“
–কেন ? আমি বিরক্তভাবে বললাম।
“ধুর এই ধরনের অনুষ্ঠান একটা ক্যারিকেচার ছাড়া আর কিছু না।”

— বুঝলাম ক্যারিকেচার, তাহলে আপনি আসছেন কেন ? যতসব ফালতু। মনে মনে বললাম ।

মুখে কিছু না বলে অনুষ্ঠানে মনোযোগ দিলাম। এভাবেই মতিন ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা। এরপরেও এখানে সেখানে দেখা হলো। বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ জ্ঞান, খুবই পরোপকারী মানুষ। কিন্তু তারপরও তার সাথে আমার যায় না। কারন তার কাছে বাংলাদেশের সব কিছুই খারাপ। দেশের মানুষ সব খারাপ, নেতারা চোর বাটপার, খাবারে ভেজাল ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রবাসে আসার পর খুবই স্বল্প সংখ্যক হলেও এই ধরনের লোকের দেখা পেয়েছি। আমি এদের বলি “তিতা করল্লা”। দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, কোন নেতা কত হাজার কোটি টাকা চুরি করল, যানজট, খাবারে ফরমালিন এসবই হল তাদের আলোচনার একমাত্র এবং প্রিয় বিষয়বস্তু। খাবার হিসাবে “তিতা করল্লা” হজম করতে পারলেও প্রবাসী বাঙ্গালী “তিতা করল্লা” আমি ঠিক মানাতে পারি না। দূরে দূরে থাকি। কিন্তু মতিন ভাইকে এড়াতে পারি না। শনিবার মাছ কিনতে যাবো। সকালেই মতিন ভাইয়ের ফোন “ভাই আমিও মাছ কিনতে যাবো, অযথা আর আপনি গাড়ী নিয়ে যাবেন কেন। চলেন এক সাথে যাই।” আমি প্রচুর বাজার করি। মতিন ভাই তেমন কিছুই কেনেন না । জিজ্ঞেশ করলে বলেন ভাই আমি অল্পই কিনি। স্পষ্ট বুঝতে পারি আসলে উনি আমার জন্যই বাজারে এসেছেন।

একদিন উনার বাসায় নিয়ে গেলেন। কথা প্রসঙ্গে বই এর কথা উঠতেই উনার পড়ার রুমে নিয়ে গেলেন। রুমে ঢুকেই ধাক্কার মত খেলাম। সারা রুমে শুধু বই আর বই। শেলফে বই, টেবিলে বই চেয়ারে বই মাটিতে বই। অধিকাংশই বাংলা বই। মনে মনে আমি কি যে খুশী হলাম। দেশ থেকে অনেক কষ্ট করে পনের কেজি বই এনেছিলাম। সেগুলো প্রায় পড়া শেষ। দেশ থেকে বই আনতে অনেক খরচ। মতিন ভাইয়ের এই লাইব্রেরী তাই উপরওয়ালার দান বলেই মনে হলো। মনে মনে বললাম মতিন ভাইকে আর চটানো যাবে না। ছেলেবেলায় সকালে এক গ্লাস চিরতার রস খেলে চার আনা পয়সা পেতাম। চিরতার রস যখন খেতে পারছি এতগুলো বইয়ের জন্য কিছু তিতা কথা অবশ্যই সহ্য করতে পারব। আল্লাহ ভরসা ।

এভাবেই মতিন ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। যন্ত্রনাও বাড়ে। উদহারন দেই। আমার বাসায় সবে দুই ভাই আওয়ামী লীগ বিএনপি নিয়ে আলাপ জমিয়ে তুলেছেন এমন সময় মতিন ভাই বলে বসবেন। “ বাংলাদেশের গণতন্ত্রতো আসলে বাঁশতন্ত্র এইটা নিয়ে এতো আলাপের কি আছে।” আর একদিন সবাই মিলে টেলিভিশনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলা দেখছি। অনেক দিন পরে বাংলাদেশের জয়ের একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ উনি বলে বসবেন “ধুর এই পোলাপান গুলাতো ডাংগুলিই ঠিক মতো খেলতে পারে না ক্রিকেট খেলবো কেমনে ?” সবাই খুব বিরক্ত হয় । মুখে কিছু বলে না ।

প্রতিবেশী এক ভাইয়ের বাবা মা বেড়াতে আসেন। উনাদের সাথে মতিন ভাইকেও বাসায় খেতে বলি। একথা সেকথার পর হঠাৎ মতিন ভাই বলে বসেন “দেশের সব সরকারী কর্মচারী আসলে এক একটা ক্রিমিনাল। এদেরকে ধইরা বিচার করা উচিত।” বলাই বাহুল্য প্রতিবেশী ভাইয়ের বাবা হলেন সরকারী কর্মচারী। আমার ভীষণ খারাপ লাগে। বিদায় নেবার সময় প্রতিবেশী ভাই আমাকে আড়ালে নিয়ে বলেন “ভাই মতিন ভাইকে ডাকলে আমাদেরকে আর কখনো ডাকবেন না।“

নাহ আর সহ্য করা যায় না। হেস্তনেস্ত একটা করতেই হয়। মতিন ভাইদের পরিবারকে একা একদিন খেতে আসতে বলি। ভর্তা মতিন ভাই পছন্দ করেন না। আমি ইচ্ছা করে শুধুই ভর্তা করি চার পাঁচ রকমের। মনে মনে কঠিন কিছু কথাও ঠিক করে রাখি। মতিন ভাই আসেন। খাবার টেবিলে এসেই কেমন যেন হোচট খান। একটু থম ধরে থাকেন। বলেন ভাই আমার মা খুব ভর্তা পছন্দ করতো। খেতে খেতে একটা গল্প বলি শুনেন। মতিন ভাই শুরু করেন ।

আমি এদেশে প্রথম আসি বিশ বছর আগে। পি এইচ ডি করতে। সারাক্ষণ দেশ দেশ করতাম। এত বেশী করতাম যে নামই হয়ে গেল “বাঙ্গাল মতিন”। অন্য সব ছাত্ররা যখন কিভাবে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হওয়া যায় সেই চিন্তায় মশগুল। আমি তখন শুধু চিন্তা করি কবে ডিগ্রী হবে কবে দেশে যাব। ডিগ্রী হয়। সুপারভাইজার ইউনিভার্সিটিতে একটা চাকুরীর অফারও দেন। আমি নেই না। অনেক আশা নিয়ে দেশে ফিরি। প্রথমেই ধাক্কা খাই পরিবারে। সবাই ধরে নেয় এদেশে আমি তেমন কিছু করতে পারি নাই তাই দেশে ফিরেছি। ছেলে বিদেশে থাকবে মাঝে মাঝে দেশে আসবে অনেক উপহার নিয়ে এটাইতো স্বাভাবিক। আমার ফুফু একদিন আমাকে বলেন “ঐ দেশে থালা বাটি মাজলেওতো শুনছি অনেক টাকা তুই কি সেরকম কোনো কাজও জোটাতে পারস নাই মতিন ?” আমি হেসে উড়িয়ে দেই। অফিসে জয়েন করে দেখি আমার জুনিয়র প্রমোশন পেয়ে আমার বস। গেলাম উপরওয়ালার কাছে। “মতিন সাহেব ঐসব দেশ থেকে কেউ ফেরে নাকি। আমরা কিভাবে বুঝব আপনি তেমন সুবিধা করতে না পেরে আবার ফিরে আসবেন।” যাহোক তবুও মাটি কামড়ে পরে রইলাম। কিছুদিন পরেই অফিসের বড় একটা কাজের ভার আমার উপর পড়ল। ৩/৪ কোটি টাকার কাজ। অফিসে কনট্রাক্টরদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। এসব আমার জানা খেলা। সবাই জানে আমাকে টাকা খাওয়ানো যাবে না। কিন্তু দেশ যে গত চার বছরে অনেক এগিয়ে গেছে তা আমার জানা ছিলো না। ফোনে হুমকি আশা শুরু করলো। পাত্তা দেই না। তারপর একদিন হঠাৎ আমার বস আমাকে ডেকে পাঠালেন।
“মতিন সাহেব। আগের দিনতো আর নাই । দেশে যখন ফিরেছেন মানিয়ে নেন। আর তাছাড়া আপনার ছোট মেয়ে প্রতিদিন স্কুলে যায় আসে। কখন কি হয় বলা যায়।” বস বলেন ।

আর সহ্য করতে পারি না। দুই মাসের মধ্যে আবার এই দেশে ফিরি। এরপরে আর কখনোই দেশে যাই নাই। আজকে মার মৃত্যুবার্ষিকী। দেশটাকে বড় ভালবাসতামরে ভাই। শুধু কিছু মানুষ…… কথা শেষ করতে পারেন না মতিন ভাই । টপ টপ করে চোখের জল ভাতের থালায় পড়ে। তিনি চোখের জল লুকাবারও কোনো চেষ্টা করেন না।

আমি কিছু বলি না। কিছু বলার থাকে না। মানুষের হাসি সুন্দর জানতাম কিন্তু কান্নাও যে এত সুন্দর হয় জানতাম না। মুগ্ধ বিস্ময়ে সেই সৌন্দর্য দেখতে থাকি…

Check Also

syed shamsul haque

আমার পরিচয়-সৈয়দ শামসুল হক

মিডিয়া খবর :- বাঙালীর আত্মপরিচয় নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা অসাধারন কবিতা- ‘আমার পরিচয়’ আমি …

SKY

এ এস মাহমুদ খানের কবিতা

মিডিয়া খবর :-     দুঃখ বিলাস মন খারাপের বারন্দায় বসে এই হঠাৎ এমন কেন কিসে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares