Home » নিউজ » হাজার বছরের নগরসভ্যতা বিক্রমপুরে

হাজার বছরের নগরসভ্যতা বিক্রমপুরে

Share Button

মিযিয়া খবর :-

বাংলাদেশ ভুখণ্ডে নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছিল হাজার বছর আগে। সমন্বিত পরিকল্পনা আর নিপুণ স্থাপত্যশৈলীতে। আজকের আধুনিক নগরের যে বৈশিষ্ট্য তার বেশির ভাগের উপস্থিতিই ছিলো প্রাচীন নগর সভ্যতায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাচীন বিক্রমপুরের যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলেছে তাতে নগর সভ্যতার এই চিত্রই ফুটে উঠেছে।

মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের নাটেশ্বর গ্রামে প্রায় ১০ একর জায়গা জুড়ে খনন করে পাওয়া গেছে প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। মিলেছে বৌদ্ধমন্দির, ইটের তৈরি প্রায় অক্ষত দুটি রাস্তা, বৌদ্ধদের ধর্মীয় আচারের বিশেষ স্থান আট কোনা বর্গাকার স্তূপ। এছাড়া চওড়া ও আঁকাবাঁকা দেয়াল পাওয়া গেছে এমন এক অবস্থানে যা অত্যন্ত পরিকল্পিত স্থাপত্যশৈলীর এক নগরের পরিচয় দেয়। প্রাচীন বিক্রমপুর অঞ্চল বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলা।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য অন্বেষণ এবং মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন যৌথভাবে পাঁচ বছর ধরে এ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ করে চলেছে। এতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। খনন তত্ত্বাবধানে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন। গবেষণা কাজে যুক্ত আছেন জাহাঙ্গীরনগর ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর এই উদ্যোগের সঙ্গে এ বছর যুক্ত হয়েছে চীনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান ইউনান প্রাদেশিক ইনস্টিটিউট।

এর আগে গবেষণা খননে এ অঞ্চলে প্রাক-মধ্যযুগীয় বৌদ্ধবিহার, পঞ্চস্তূপ, আটকোনা স্তূপ ও ইটে তৈরি নালার নিদর্শন পাওয়া গেছে। এগুলো সুপরিকল্পিত ও অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এবার ইটের রাস্তা, প্রায় চার মিটার চওড়া সীমানা প্রাচীরবিশিষ্ট দুই জোড়া চতুর্স্তূপ মিলেছে। কমপ্লেক্সের প্রবেশপথ এমনকি কিছু বসতির নিদর্শনও মিলেছে। এখানে দেয়ালের যে কাঠামো মিলেছে তার নৈর্মাণশৈলী বেশ অপ্রচলিত। এগুলো নিচের দিক থেকে চওড়া হয়ে ওপরের দিকে উঠেছে। বিশালাকার আট কোনা স্তূপ পাওয়া গেছে যার মাঝখানে আরেকটি আট কোনা ছোটো মণ্ডপ আছে। এই মণ্ডপে বৌদ্ধদের পবিত্র নিদর্শন রেলিক থাকত বলে ধারণা করা হয়।

যে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে তাতে আট কোনা স্তূপের পাশেই একটি মন্দিরের উপস্থিতি মিলেছে। এটি প্রায় ১০০ বর্গমিটার এলাকায় নিয়ে তৈরি। এর পাশ দিয়েই আছে ইটের তৈরি রাস্তা। মন্দিরটি অষ্টম বা নবম শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই মন্দির ও কয়েকটি স্থাপনার দেয়ালের ভিত্তিমূলে ব্যবহার করা হয়েছে ঝামা ইট। এ ছাড়াও স্তূপ কমপ্লেক্সের পাশে ইটের তৈরি আরো একটি রাস্তা পাওয়া গেছে। এসব স্থাপনার নির্মাণ ও গঠনশৈলী দেখে প্রমাণ মেলে যে, এখানে বসতি ছিলো।

বৌদ্ধ সভ্যতার এ ধরণের বিশেষ নিদর্শনের সন্ধান এর আগে বাংলাদেশে আর কোথাও মেলেনি। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এ অঞ্চলে একটি নগরী গড়ে উঠেছিল এবং সম্ভবত এই নগরী ছিলো দীর্ঘস্থায়ী।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, পণ্ডিত ও বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক অতীশ দীপঙ্করের জন্ম ৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুরে বজ্রযোগিনী গ্রামে । তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন এবং ১৯ বছর বয়সে পাটনায় নালন্দা মহাবিহারে লেখাপড়া করতে যান। দেশে ফিরে এলে সম্রাট ধর্মপালের অনুরোধে তিনি বিক্রমশিলা মহাবিহারে অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন। এক পর্যায়ে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয় রোধের জন্য চীনের রাজার আমন্ত্রণে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যান। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অতীশ দীপঙ্কর বিক্রমশিলা মহাবিহারে থাকার সময় এই অঞ্চলে শিক্ষা ও সভ্যতার ব্যাপক বিকাশ ঘটে।

নাটেশ্বর গ্রামে যে জমিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলছে তার মালিক স্থানীয় বাসিন্দা নরেশ চন্দ্র দাস। তিনি জমিটি গবেষণার জন্য দান করেছেন। গবেষণা কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এলাকার বাসিন্দারাও ব্যাপক সহযোগিতা করছেন। হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন মাটির নিচ থেকে তুলে এনে তা নতুন প্রজন্মের সামনে মেলে ধরতে পারলে আধুনিক সভ্যতা আরও সমৃদ্ধ হবে- প্রত্নতত্ত্ববিদরা এটাই মনে করেন।

আমরাও চাই বাংলাদেশের মাটিতে যে অতীত ঐতিহ্য রয়েছে তা উন্মোচিত হোক। এ ব্যাপারে সরকার তথা সকলের সহায়তা কাম্য।

 

Check Also

প্রযোজকদের একসুত্রে বাঁধবে টিপিএ

মিডিয়া খবর :- নবগঠিত টেলিভিশন প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টিপিএ) উদ্যোগে মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হল ১৭ নভেম্বর …

jhunu

নৃত্যগুরু রাহিজা খানম ঝুনু গুরুতর অসুস্থ

মিডিয়া খবর :- একুশে পদক প্রাপ্ত নৃত্যগুরু মাতা রাহিজা খানম ঝুনু গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কিডনি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares