Home » নিবন্ধ » বাংলার পুতুলনাচ: একটি নিম্নবর্গের সংস্কৃতি সংগ্রাম

বাংলার পুতুলনাচ: একটি নিম্নবর্গের সংস্কৃতি সংগ্রাম

Share Button

মিডিয়া খবর:-                 -: সাইদুর রহমান লিপন :-

আমি মরা নাচাই, মরা নিয়াই আমার কারবার। আমার ছেলেকে যতটুকু আদর করি, এর থেকেও বেশি আদর করি আমার পুতুলরে। তারে দিয়াই আমি পরিচিত। আমার পরিবারের লোকজন তারা এইটার ভাত খাইতেছে। সবাই এর কামাই খায়েই তো মানুষ হইল, এই পুতুলের পয়সা দিয়েই তারা মানুষ হইছে। – ধনমিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রখ্যাত পুতুলনাচ শিল্পী।

পতঞ্জলি (খ্রীষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দী) তাঁর অষ্টাধ্যায়ী-মহাভাষ্যে দৃষ্টান্তসহ যে আলোচনা করেছেন, তা বিশ্লেষণ করে সুকুমার সেন মনে করেন, ‘পতঞ্জলির [তাঁর] সময় জনসমাজে দৃশ্য ও শ্রাব্য আখ্যায়িকা প্রয়োগের তিনটি প্রধান রীতি ছিল। এক. নৃত্য-অভিনয়, দুই. পুতুলবাজি, তিন. কথকতা। সুকুমার সেন পতঞ্জলির উক্তি বিশ্লেষণ করে এমনও অনুমান করেন যে, ‘অশোক মৌর্য পুতুলবাজির প্রবর্তন করেছিলেন’।

ভরত নাট্যশাস্ত্রে সাজগোজ করা অভিনয় সামগ্রী বা আহার্য অভিনয় চার রকমের- পুস্ত (রূপ, পাঞ্চালিকা বা পুতুল, পাপেট, ড্যামী) অলংকার, অঙ্গরচনা এবং জীবিত প্রাণী। পুস্ত’র রয়েছে আবার তিনটি ভাগ- সন্ধিম, ব্যাজিম ও চেষ্টিম। এখানে ‘যে পুতুল (রূপ) আপনা আপনি নড়াচড়া করে তাকে বলে চেষ্টিম। মূলত এই ব্যাখ্যা পরিস্কারভাবে পুতুলনাচের সাথে সংস্কৃত নাট্যের সম্পৃক্ততার বিষয়টিকে তুলে ধরে।

পতঞ্জলির পূর্বে পাণিনির সময়ে ’নাট্য’ শব্দটির অর্থ ছিল ’নটের কর্ম’ অর্থাৎ ’নটকর্ম’ যাকে সম্পূর্ণতই একটি জীবিকা নির্বাহের বিষয় হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। সে সময়ে পশু মানুষ ইত্যাদির প্রতিমূর্তি বা পুতুল খুবই পরিচিত বস্তু ছিল। কিছু কিছু বিশেষ পুতুল সম্পর্কে বলা হয় যে- ‘[এগুলো] বিক্রয়ের জন্য নির্মিত নয়, জীবিকার্থে মানে যার দ্বারা অন্নসংস্থান হতো। বিক্রয়ের জন্য নয় অথচ রোজগার হয় এমন গড়া মূর্তি পুতুলবাজিই হতে পারে।’putun-n

বৃহদ্ধর্মপুরাণে বর্ণিত গঙ্গাবতার বৃত্তান্ত অনুসারে জয়দেবের গীতগোবিন্দের অভিনয়ের সাথে পুতুলবাজির সম্পৃক্ততা অনুমান করা হয়েছে। এমনকি আরও পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যদেবের সময়েও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সাথে পুতুলবাজি প্রয়োগের যোগসূত্র খুঁজেছেন অনেকেই।

এসকল তথ্য উদ্ধৃত করার উদ্দেশ্য অভিনয়শিল্পের সাথে পুতুলনাচের উৎস ইতিহাস তুলে ধরা নয়, কেননা এটা আলোচ্য বিষয় নয়। তবে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ এই স্বল্প সংখ্যক নমুনা থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে, প্রথমত- ‘পুতুলবাজি’ বা পুতুলনাচ পরিবেশনার মূলে ধর্মীয় বা কৃত্যমূলক সম্পৃক্ততা যাই থাকুক না কেন, পুতুলনাচ প্রাচীন ও মধ্যযুগে একটি ‘কর্ম’ অর্থে ‘পেশা’ বা ‘জীবিকা’ নির্বাহের উপায় হিসেবে বিবেচিত হতো এবং দ্বিতীয়ত- পুতুলনাচের উদ্ভব বিকাশের মূলে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা যা-ই হোক না কেন, ক্ষমতাকেন্দ্রের উচ্চবিত্তের সাথে এই শিল্প সংশ্লিষ্ট পুতুলনাচিয়েদের ছিল সুসম্পর্ক, যা সহজেই অনুমান করা যায়। কেননা, মৌর্যদের তত্ত্বাবধানে পুতুলনাচের চর্চা, ভরত নাট্যশাস্ত্রে পুতুল নাচের উপস্থিতি, জয়দেবের গীতগোবিন্দে পুতুল নাচের সংশ্লিষ্টতা, চৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সাথে পুতুলনাচের সম্পৃক্ততা এ সবই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা উচ্চবিত্তের সক্রিয় ও ইতিবাচক পৃষ্ঠপোষকতার (ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক) চিত্র তুলে ধরে।

কিন্তু ইতিহাসের ধারায় আধুনিক যুগে এসে বড় ধরনের হোচট খেতে হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে লোকসংস্কৃতির আদি পরিবেশনা এই পুতুলনাচের ইতিহাস ১৯৪৭ এর ভারত ভাগ পরবর্তী সময়ে এক বিশাল শূণ্য গহবরে নিপতিত হয়। এই পর্বের ইতিহাস কেবল খন্ডিত হয়েছে তাই নয় বরং এ নিয়ে রয়েছে ‘বিস্তর বিভ্রান্তি’। কেউ কেউ আবার এমনও মত প্রদান করেছেন যে, বাংলাদেশে বর্তমান ধারার পুতুলনাট্য চর্চার সূত্রপাত বা উৎসসন্ধান করা বলতে গেলে ‘প্রায় অসম্ভব’। এ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে যে, ‘এই শিল্প মাধ্যমটি অদ্যাবধি অনুসন্ধিৎসু গবেষক বা শিল্প সংস্কৃতির ইতিহাস রচনাকারদের সমীহ আদায় করতে পারেনি। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে যে, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’র পরিচয়ে বিপুল আয়তনের গ্রন্থ রচিত হলেও সেখানে পুতুল নাচ বা পুতুল নাট্য আসন পায় নি। এমন কি দু একটি জেলার মাটির পুতুল সংক্রান্ত কিছু তথ্য ব্যতিত জেলা ভিত্তিক ইতিহাস গ্রন্থেও ঠাঁই হয়নি ‘বাংলাদেশের পুতুলনাচ’ সম্পর্কিত কোনো অধ্যায়।’ সুতরাং এই সকল দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের পুতুলনাচের বর্তমানে যে ধারার চর্চা প্রচলিত রয়েছে এর উদ্ভবের মূলে যে সকল তথ্য পাওয়া যায়, মোটামুটি ভাবে তা এই রকম-

বিবিধ তথ্য-উপাত্ত এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য পর্যালোচনায় দৃষ্ট হয় যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির (১৯৪৭) পূর্বে অভিন্ন বাংলায় ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্যের সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ জনই ছিলেন একেবারে প্রান্তিক শ্রেণীর; নিম্নবর্ণের হিন্দু জাতি-গোষ্ঠীর। সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার কারণে ও দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে তাঁদের প্রায় সকলেই চলে যান সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গে। ফলে সৃষ্টি হয় ব্যাপক শূন্যতা। এ সময় ধীরে ধীরে উদ্ভব ঘটে মুসলমান পুতুলনাট্য শিল্পীদের দ্বারা পরিচালিত পুতুলনাট্য। পূর্বোক্ত হিন্দু সমাজের ব্যক্তিবর্গ পরিচালিত দলে কিছু কিছু মুসলমান ব্যক্তিও কাজ করতেন (যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কালুমিয়া, তারা মিয়া, ধন মিয়া প্রমুখ)। হিন্দু শিল্পীগণ চলে গেলে তাঁদের রেখে যাওয়া কিংবা তাঁদের নিকট থেকে খরিদ করা পুতুল ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে এবং পূর্বতন দলে কাজের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে মুসলমান শিল্পীদের পুতুলনাট্য সংগঠন।

সুতরাং, শ্রদ্ধেও রশীদ হারুনের বাংলাদেশের পুতুলনাট্য: সংকট ও সম্ভাবনা শীর্ষক ‘পুতুলনাচ অনুষ্ঠান-২০০৭’ উপলক্ষে প্রকাশিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর উৎসব স্মরণিকার প্রবন্ধ বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে পুতুলনাচের বর্তমান ধারার চর্চা কিছুতেই একশত বছরের অধিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।putun-na

লোকসংস্কৃতির কোনো নিদির্ষ্ট একটি ধারা বা রীতির ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির ইতিহাস হয়ত কখনো শতবছর বা সংখ্যার মানদন্ডে বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু মোহিত রায় (লোকনাট্য-লোকনৃত্য, জেলা লোকসাংস্কৃতিক পরিচয় গ্রন্থ: নদিয়া, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ, মার্চ ২০০৩) ও রশীদ হারুনের দেয়া তথ্য ও যুক্তি অনুসারে এদেশে পুতুলনাচ প্রচলনের মূলের গল্পটি যদি হয় এরকম যে, বৃটিশ শাসন পরবর্তী দেশভাগের প্রাক্কালে দেশান্তরের বিষাদময় ‘ব্যাপক শূণ্যতার’ গহবর থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের পুতুলনাচ। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়- প্রথমত, কী এমন প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল সেদিন যে, পুতুলনাচের সকল শিল্পী (হিন্দু) দেশ ত্যাগ করা সত্ত্বেও এই শিল্পরীতির পূনঃ প্রচলন বা চর্চা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল? দ্বিতীয়ত, সমাজের কারা বা কোন শ্রেণীর মানুষ সেদিন এই ‘শূণ্যতা’ পূরণে এগিয়ে এসেছিল এবং কেন? তৃতীয়ত, লোক সংস্কৃতিতে ধর্মীয় বা কৃত্যমূলক নানা পরিবেশনারীতি থাকা সত্ত্বেও কেন পুতুলনাচকেই মাধ্যম হিসেবে বেঁছে নিলেন? এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পুতুলনাচের বর্তমান অবস্থা, দল, সাংগঠনিক কাঠামো, পেশা, কাহিনী, বিষয়, ধর্ম প্রভৃতি বিবেচনায় উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করা যেতে পারে।

এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে সারা দেশে প্রায় ৫০ টি পুতুলনাচ সংগঠনের সন্ধান পাওয়া যায়। তন্মধ্যে প্রায় ২০টি জেলায় ৩০-৩৫ টি দল এখনো প্রায় নিয়মিত (প্রশাসনের অনুমোতি সাপেক্ষে) প্রদর্শনী করে থাকে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী এলাকা, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ-জামালপুর, খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা, রাজশাহী-সিরাজগঞ্জ-কুষ্টিয়া, এবং দিনাজপুর-লালমনিরহাট-গাইবান্ধা-কুড়িগ্রাম প্রভৃতি এলাকায় প্রচলিত রয়েছে এসব পুতুলনাচের দল। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রকাশিত পুতুলনাচের দল পরিচিতিমূলক তথ্য এবং অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত সকল তথ্যের ভিত্তিতে পুতুলনাচের দলগঠন প্রক্রিয়া এবং পরিচালনায় কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যেমন- ক. পূর্ববাংলা এবং বাংলাদেশ পর্বে গঠিত কোনো দলেরই দীর্ঘ পরম্পরাগত চর্চার ঐতিহ্য নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুতুলনাচিয়ে হিন্দু শিল্পীদের দেশত্যাগের সময়ে ক্রয় বা দানসূত্রে পাওয়া পুতুল এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সামগ্রির সহায়তায় গড়ে উঠেছে এই সকল দল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাক্তন দলের মুসলিম সদস্যদের দ্বারাই গঠিত হয় নতুন দল, তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দল গঠনে হিন্দু সদস্যদেরও সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।

খ. প্রাপ্ত তথ্যে লক্ষ্য করা যায়, দলের অধিকারী থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল কুশীলব অর্থ ও সামাজিক মর্যাদায় নিম্নশ্রেণীর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের পেশা দিনমজুর, রিক্সাওয়ালা, মুদি দোকানদার, ভূমিহীন কৃষক, ভাংগারী ব্যবসায়ী ইত্যাদী। গ. প্রায় সকল দলই পেশাদারিত্বের তাগিদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনের লক্ষ্যে দল গঠন বা পরিচালনা শুরু করেন। এক্ষেত্রে দল সমূহের নামকরণের দিকে তাকালে সহজেই পেশাদারিত্ব এবং মর্যাদাগত পরিবর্তনের আকাঙ্খা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন- রয়েল বীণা পুতুলনাচ, দি নিউ সোনারগাঁ হাসি খুশি পুতুলনাচ, দি আজাদ পুতুলনাচ, দি নিউ স্টার সোনালী ঝুমুর ঝুমুর পুতুলনাচ প্রভৃতি। নামকরণের এই রীতি সুস্পষ্ট ভাবে বৃটিশ উপনিবেশ আমলে বাংলার যাত্রা, সার্কাস প্রভৃতি পরিবেশনায় যেরূপ পেশাদারিত্বের প্রভাব পড়েছিল, পুতুলনাচ দলের নামকরণ যে সেই ধারা অনুসরণ করে থাকবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। অন্যভাবে দেখলে দলের নামকরণে এই রীতি অবলম্বনের মাধ্যমে সমাজের অগ্রসর শ্রেণীর দৃষ্টি আর্কষণে অতি সরল অথচ তীব্র বাসনার প্রতিফলন বলেও মনে করা যায়।

ঙ. রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিক পরিবর্তন নব গঠিত দলগুলোর কাহিনী ও বিষয় নির্বাচনের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে। ফলে দেশভাগ পূর্ববর্তী পুতুলনাচের কাহিনীতে পুরাণ, দেব-দেবীর আধিক্যের পরিবর্তে সামাজিক, প্রণয়, কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক আখ্যান ও বিষয়ের পরিবেশনা ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তথাপিও বেশ কিছু দলের কাহিনীতে ধর্মীয় ও কৃত্যমূলক আখ্যানের নিয়মিত উপস্থিতি এখনো বর্তমান।

চ. দলগুলোর উদ্ভবের মূলে যেমন দীর্ঘ পরম্পরাগত যোগসূত্র নেই, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার কাঙ্খিত পরিবর্তন না হওয়ায় পরম্পরাগত প্রজন্ম তৈরীতেও অনেক দলের কুশিলব আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ছ. বেশ কিছু দলের ধর্মীয়, সামাজিক, প্রণয়, কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক বিষয়ভিত্তিক আখ্যান পরিবেশনের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সেবামূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

উল্লেখিত সকল বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করার পূর্বে বর্তমানে সক্রিয় পুতুলনাচ দলের পরিবেশিত আখ্যানের বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীকরণের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। কেননা এ থেকে দল পরিচালনায় টিকে থাকার সংগ্রামের ইঙ্গিত খুঁজে নেওয়া যেতে পারে।
এ পর্যায়ে প্রাপ্ত ৫১ টি পুতুলনাচ দলের পরিবেশিত কাহিনীর বিষয় মোটামুটি এরকম-
১. ধর্মীয়: রাম-সীতা, রাবণ, কৃষ্ণ, মনসা, বেহুলা প্রভৃতি
২. প্রেম-প্রণয় ও কিংবদন্তি: নসিমন, বেদের মেয়ে, রূপবান, নিমাই সন্যাস, রাজা হরিশচন্দ্র প্রভৃতি
৩. ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ভিত্তিক ছোট গল্প বা ঘটনা: হরিণ শিকার, বাঘ শিকার, নৌকাবাইচ, ভূতের খেলা, সাপ খেলা প্রভৃতি
৪. রাজনৈতিক: মুক্তিযুদ্ধ
৫. উন্নয়নমূলক: অল্প বয়সে বিয়ে, যৌতুক, অশিক্ষা প্রভৃতি।

বিখ্যাত পুতুলনাচিয়ে শিল্পী পিটার সুম্যন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, ‘আজকের আধুনিক অভিনয়শিল্প মূলত পুতুলনাচ থেকেই অস্তিত্ব লাভ করে থাকবে’। অন্যদিকে পরিবেশনাধর্মী সকল শিল্পের গোড়ায় রয়েছে ধর্ম বা কৃত্যের যোগ। এই যুক্তি বিবেচনায় বাংলার পুতুলনাচের সাথেও ধর্মের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়-
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুতা-পুতুলনাট্যের ‘আদি উৎস’ রাজস্থানী ‘কাঠপুত্লী’ এ কথা মান্য করেন কোনো কোনো গবেষক। তাঁদের এরকম মত পোষণ করার মূল (একমাত্র?) সূত্র হলো পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার হাঁসখালী থানার মুড়াগাছা কলোনিতে বসবাসরত প্রবীণ পুতুলনাট্য শিল্পীর অভিজ্ঞতা-প্রসূত স্মৃতিচারণা।

ঐ কলোনিতে পুনর্বাসিত প্রায় ১০০টি পুতুলনাট্য দলের প্রবীণ শিল্পীগণ সকলেই ১৯৪৭ সালের দেশ-বিভাজনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বাকেরগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে অভিবাসী হয়েছেন। অভিবাসী পুতুলনাট্য শিল্পীদের স্মৃতিচারণাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তৎকালীন মহকুমা পিরোজপুরের খেজুরতলা গ্রামে মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্ম প্রচার ও কৃত্যের অংশ হিসেবে প্রচলিত ‘রাধাপাগলের মেলা’য় এসেছিল রাজস্থান থেকে সুতাচালিত কাঠপুত্লি দল। ঐ দলের পুতুলনাচ দেখে কোনো কোনো তরুণ দর্শকের মনে তীব্র আকাক্সক্ষা জাগ্রত হয় অনুরূপ পুতুলনাচ সৃজনের। উল্লেখ্য, উপরোক্ত শিল্পীগণ দেশ বিভক্তির পর পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে পূর্বোক্ত মুড়াগাছা কলোনিতে পুনর্বাসিত হয়ে জীবিকার নিমিত্তে নতুন করে গড়ে তোলেন ‘ভারতমাতা পুতুলনাচ’ শীর্ষক সংগঠন। বর্ণিত শিল্পীদের অভিপ্রায়ে রাজস্থানের প্রচলিত ‘কাঠপুত্লি’ গ্রামবাংলার লোক মৃৎশিল্পীর সৃজনি কুশলতায় ‘সুতা পুতুলনাট্য রূপে আসরে নেমেছে’ বাংলার জন-মানুষের চিত্তরঞ্জনের নিমিত্তে।

উদ্ধৃত তথ্য বিবেচনায় নিলে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয়- প্রথমত, প্রাচীন বা মধ্যযুগের মতো একালেও পুতুলনাচ চর্চার মূলে ধর্মের সক্রিয় যোগাযোগ রয়েছে। রাধাপাগলের মেলায় মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমনই ধর্মযোগের সাক্ষ্য বহন করে। পাশাপাশি বর্তমানে পুতুলনাচের যে সকল দল রয়েছে অধিকাংশক্ষেত্রে মুসলমান অধিকারী দ্বারা পরিচালিত হলেও আখ্যান পরিবেশনায় রাম সীতা, রাবণ, বেহুলা, মনসা, প্রভৃতি ধর্ম বিষয়ক আখ্যানের উপস্থিতি মূলত ধর্মের পূর্ব-যোগসূত্রকে তুলে ধরে।

দ্বিতীয়ত, ১০০টি পুতুলনাচের দলের একযোগে দেশত্যাগের মতো বিরল ঘটনা পরিস্কার ভাবে প্রামাণ করে যে, উল্লেখিত অঞ্চলগুলোতে পুতুলনাচের ব্যপকতা ছিল, ছিল পরম্পরাগত চর্চার ঐতিহ্য। তৃতীয়ত, পুতুলনাচের বিকাশ বিবর্তনে ধর্মের উপস্থিতি সক্রিয় থাকলেও তা কখনো লক্ষ্য হিসেবে নয় বরং উপলক্ষ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা ১০০টি পুতুলনাচের দল দেশ ত্যাগের পর ভারতবর্ষে ধর্ম প্রচারকে উপজীব্য করেছে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। বরং যা জানা যায় তা হলো ‘জীবিকার’ নিমিত্তে বাংলার জনগণের ‘চিত্তরঞ্জনের’ উদ্দেশ্যে গঠন করেছে নতুন দল। অর্থাৎ পুতুলনাচ এক্ষেত্রেও পেশা বা জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে ১৯৪৭ পরবর্তী রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বিভাজনের ফলে এ অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ায় বাংলার পুতুলনাচে দেব-দেবী বা পুরাণ বিষয়ক আখ্যানের প্রদর্শন পরিবর্তিত বাস্তবতায় অনেকাংশেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশের পুতুলনাচের দল দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ফলে ঐ ‘ব্যাপক শূণ্যতার’ মাঝে এ অঞ্চলে নতুন করে পুতুলনাচের চর্চার যে ধারা সূচিত হয় তার মূলে পেশা, জীবিকা এবং সামাজিক মর্যাদার উন্নয়নই প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে থাকবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ‘পুতুলনাচের’ মতো একটি অতি জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় পরিবেশনারীতি জীবিকার উপায় হিসেবে গ্রহনযোগ্যতা লাভে ব্যর্থ হবে কেন ? কেন বর্তমান সক্রিয় দলগুলো পুতুলনাচ পরিবেশনায় পরম্পরা বজায় রাখতে প্রজন্ম তৈরীর আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে?

সেই ছোট বেলা থেকে অদ্যাবধি গ্রামীণমেলা এবং পুতুলনাচ এই দুটোকে একে অন্যের পরিপূরক বলে জেনে এসেছি। অর্থাৎ বিষয়টি অনেকটাই এরকম যে, মেলা থাকলে পুতুল থাকে, আর থাকে পুতুলের নাচ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, মেলার সংখ্যা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। তবে হ্রাস পাওয়ার কারণ কেবল ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক নয়, অনেকাংশে অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কেননা গ্রামীণ আড়ং বা মেলা মূলত পণ্য ক্রয় বিক্রয় বিশেষ করে কুটির শিল্পমূলক পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

কিন্তু একদিকে যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ফলে কুটিরশিল্পজাত পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সহজলভ্য হয়ে ওঠায় ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণমেলা ক্রমশই তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে অনার্য বা স্থানীয় দেব-দেবী, পীর-দরবেশ বা বিশেষ স্থান নির্ভর গ্রামীণমেলা তার কৃত্য ও ধর্মীয় গুরুত্ব হারাচ্ছে। কেননা এক সময়ের প্রবল শক্তিশালী ও সামাজিক ভাবে স্বীকৃত ও জনপ্রিয় সকল আধ্যাত্মিক চরিত্র পরিবর্তিত নতুন বাস্তবতায় অগণিত বিশ্বাসী ভক্তের আশা-আকাঙ্খা আর ইচ্ছে পূরণে ব্যর্থ হয়ে ওঠায় সামাজিক ভাবেই এঁদের অবস্থান দূর্বল হতে থাকে। ফলে স্থানীয় দেব-দেবী, পীর, দরবেশ প্রভৃতি আধ্যাত্মিক চরিত্রদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রামীণমেলাও বর্তমানে তার মহা-জৌলুস হারিয়ে মৃতপ্রায় নদীর মতো ক্ষীণ ধারায় বহমান।

বর্তমানে কেবল ‘মৌসুম’ এবং ‘দিবস’ ভিত্তিক কিছু গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী মেলা নিয়মিত ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে- বৈশাখী মেলা, বিজয় মেলা ইত্যাদি। পাশাপাশি আরেকটি নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাবে- যেমন, বৃক্ষমেলা, কুটিরশিল্প মেলা, মৎস মেলা, তাঁত মেলা, বাণিজ্য মেলা প্রভৃতি শহরকেন্দ্রিক মেলা। তবে এই সকল মেলার গঠন-কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্য গ্রামীণ মেলার মতো নয়, এগুলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও বিষয়ভিত্তিক । তাই মাছের বল হয় যেমন পানি তেমনি ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণমেলাই যেন পুতুলনাচিয়েদের পেশা বা জীবিকার প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু সহজ উত্তর হচ্ছে এই- মেলাই যদি না থাকে জীবিকা থাকে কেমনে।

তাছাড়া, আঙ্গিক, রীতি, বৈশিষ্ট্য বিচারে পুতুলনাচ অন্যান্য সকল লোক-পরিবেশনার আবেদন ও আকর্ষণ থেকে ভিন্ন। কেননা একজন গায়েন যেমন অনায়াসেই রাম, সীতা, কৃষ্ণ, মাদার, মানিক, গাজী অথবা মনসাকে সাথে নিয়ে ভক্তের গৃহে, গৃহস্তের উঠানে, সার্বজনীন মন্দিরে বা মাজারে অথবা বৃহৎ প্রাঙ্গণের আসর মাতিয়ে রাখতে পারেন, পক্ষান্তরে, একজন অধিকারী কিন্তু পুতুলনাচের কাঠামোগত আঙ্গিক-বৈশিষ্ট্যের কারনেই তাঁর সাজানো পুতুল নিয়ে উঠান থেকে প্রাঙ্গণ সর্বত্র সাবলিল ভাবে বিচরণ করতে পারেন না, তাই অধিকারীর পুতুল সকল স্থানে আমন্ত্রিতও হতে পারে না। সুতরাং পুতুলনাচ প্রদর্শনে কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই এমন কিছু দূর্বলতা রয়েছে যা জীবিকার ক্ষেত্রকে সীমিত করে রাখে। অর্থাৎ মেলা না থাকলেও ভক্তের উঠানে রাম, কৃষ্ণ, মনসা, মাদার, মানিক প্রবেশ করতে পারবে, কিন্তু মেলার মতো সার্বজনীন ও বৃহত পরিসরের ক্ষেত্র না থাকলে পুতুলনাচ যেন তাঁর প্রাণশক্তি ফিরে পায় না।

অন্যদিকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুতুলনাচ এবং পূর্ববাংলা ও বাংলাদেশ পর্বের পুতুলনাচ সম্পর্কে যে সকল উদ্ধৃতি ও তথ্য নির্ভর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো তার পর্যালোচনায় কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যমূলক বিষয় লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে শুরু করে পূর্বপাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্বের সকল সময়েই পুতুলনাচ একটি পেশা বা জীবিকার বাহন হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রাচীনযুগের প্লবক, কুহক সম্প্রদায় এবং পাকিস্তান পর্বের মতুয়া সম্প্রদায় ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ পর্বের ভূমিহীন কৃষক, মুদি দোকানদার আর ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীসহ পুতুলনাচ শিল্পীদের পেশাজীবন সম্পর্কে যে সকল তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এরা প্রায় সকলেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদমর্যাদায় নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ কথাটি এভাবে বলা যায় যে, লোকসংস্কৃতির আদি পরিবেশনা পুতুলনাচের চর্চা ও বিকাশ সকল যুগে ঐ নিম্নবর্গের মানুষের হাত ধরেই সম্পন্ন হয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রাচীন ও মধ্যযুগে পুতুলনাচিয়ে শিল্পী-কুশলীদের সামাজিক ও পেশাজীবন নিম্নস্তরের হলেও আলোচ্য উদ্ধৃতি থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, সে যুগের পুতুলনাচিয়ে শিল্পীদের সাথে ক্ষমতাকেন্দ্রে থাকা উচ্চবিত্তের সরাসরি ও ইতিবাচক যোগাযোগ ছিল। ইতিহাসের পাতায় বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন পরিবেশনা রীতির সাথে পুতুলনাচের সম্পৃক্ততার দৃষ্টান্তই মূলত এই অনুমানের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যায়।putul

অন্যদিকে পূর্বপাকিস্তান এবং বাংলাদেশ পর্বের চিত্রটি সম্পূর্ণভাবে বিপরীত। অর্থাৎ নিম্নবর্গ সাাধারণ মানুষের এই সংস্কৃতি চর্চাকে শহরায়তনিক সংস্কৃতি চর্চার সাথে কখনোই গ্রহণযোগ্য ভাবে যুক্ত হতে দেখা যায় না বরং বলা যায় অনেকাংশেই থেকেছে অবহেলিত। পরিতাপের বিষয় এই যে, মূলগত একই বিষয় হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে শহরায়তনিক শিল্পচিন্তা ও বচনের উপর দাঁড়িয়ে ‘পুতুলনাচ’ এবং ‘পাপেট থিয়েটারকে’ সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ-ব্যঞ্জনায় গ্রহণ করা শুরু করে দিয়েছি আমরা। অর্থাৎ ’পুতুলনাচ’ হচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির পরিবেশনা আর ‘পাপেট থিয়েটার’ হচ্ছে টেলিভিশন স্ক্রীনে প্রদর্শিত শিক্ষামূলক শিশুতোষ অনুষ্ঠানের ‘আধুনিক পুতুল’। বাংলাদেশের মিডিয়া ও কর্পোরেট হাউজের কল্যানে বাংলাদেশের ‘পাপেট থিয়েটার’-এর নামে যে ইমেজ তুলে ধরা হচ্ছে তা পাশ্চাত্যের শিল্প-চিন্তা ও কৌশল দ্বারা নির্মিত ‘রড পাপেট’ বা ‘দন্ড পুতুল’। অথচ বাংলার পুতুলনাচ সম্পর্কে যা কিছু তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায় তাতে সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে- এই বঙ্গে ‘দন্ড পুতুল’ কখনোই বিস্তার লাভে সমর্থ হয়নি। ‘সুত্রপুতুল’-ই সমগ্র বাংলার পুতুলনাচের বিস্তারে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এ থেকে আবারও পরিস্কার হয় যে, শহরায়তনিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে যদিও বা ‘পুতুলনাচের’ নান্দনিক প্রয়োগ প্রতিষ্ঠা পেল কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে তা কখনোই বাংলার পুতুলনাচের প্রধান ধারা ‘সুত্র পুতুল’কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হলো না।

সুতরাং এতক্ষণের সামগ্রিক আলোচনার ভিত্তিতে বাংলার পুতুলনাচের চর্চা ও বিকাশে পাঁচটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা যেতে পারে- ১. পুতুলনাচ অর্থনৈতিকভাবে একটি লাভজনক পেশা বা জীবিকার উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারা, ২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার বিভিন্ন স্তরের সাথে নিম্নবর্গের পুতুলনাচিয়েদের গ্রহনযোগ্য এবং কার্যকর মেলবন্ধন তৈরী না হওয়া, ৩. পুতুলনাচিয়ে শিল্পী ও কলাকুশলিদের সমিতি বা সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকা, ৪. কেবল গ্রামীণ মেলা নির্ভর প্রদর্শনীর উপর নির্ভরশীল না থেকে সামগ্রিক ভাবে পুতুলনাচের শিল্প সম্ভাবনাকে সামাজিক ও মানব উন্নয়ন বা সেবামূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করে পুতুলনাচ প্রদর্শনের বিকল্প ক্ষেত্রানুসন্ধান না করা, এবং ৫. পুতুলনাচের দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় না আনা এবং শিল্পী কলাকুশলিদের উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রদর্শনের ব্যবস্থা না করা।

এই সব প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় রেখে উপসংহারে বাংলার পুতুলনাচের উন্নয়ন ও বিকাশে দুটি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
এক. গ্রামীণ বা কৃত্যমূলক মেলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি সরকারী বেসরকারী উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম এবং শহরায়তনিক বিভিন্ন মেলা যেমন, বৃক্ষমেলা, মৎসমেলা প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক সকল সার্বজনীন মেলা অনুষ্ঠানে পুতুলনাচের শিল্প-সম্ভাবনাকে যুক্ত করা যেতে পারে।

দুই. শহরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্ভব বিভিন্ন কার্যক্রমে পুতুলনাচকে যুক্ত করা যেতে পারে এবং পুতুলনাচিয়ে দলগুলোর মানসিক ও নৈতিক প্রেষণা বৃদ্ধি করে এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রদত্ত প্রস্তাবনা বিবেচনায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হলে একদিকে যেমন পুতুলনাচের সাথে জীবিকা নির্বাহের বিষয়ে বিদ্যমান শংকা দূর হতে পারে, অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদার বিভিন্ন স্তরের সাথে নিম্নবর্গের পুতুলনাচিয়েদের সংযোগ সম্পর্ক বা যোগযোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। যার ফলে ভবিষ্যতেও হয়তো ধন মিয়ার মতো অন্য কোনো পুতুলনাচিয়ে গর্ব করে বলতে পারেন- পুতুলের কামাই খায়েইতো মানুষ হইল’। 

লেখক- নির্দেশক, গবেষক, শিক্ষক

Check Also

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করল ভারতীয় স্থলবাহিনী

মিডিয়া খবরঃ-      সাজেদুর রহমানঃ- প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেছেন গতকাল। রাতেই ডাকা …

ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা

মিডিয়া খবর:-          -:সাজেদুর রহমান:- বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর একের পর এক আক্রমণে সীমান্তবর্তী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares