Home » চলচ্চিত্র » চলচ্চিত্রে বাস্তবতার যোগাযোগ
film

চলচ্চিত্রে বাস্তবতার যোগাযোগ

Share Button

মিডিয়া খবর :-                   -: ড. নুরুল ইসলাম বাবুল :-

Photography is truth. The cinema is truth twenty-four times per second.  –film Jean-Luc Godard

সতেরশ দশকের দিকে চলমান দৃশ্যের জনপ্রিয় যন্ত্র হিসেবে আমেরিকা ও ইউরোপে ম্যাজিক লণ্ঠনের চাহিদা বেড়েই চলছিল। সে দেশের মানুষগুলো সবাই চাইতেন এই যন্ত্রটিকে নিজের করে ঘরে রাখতে। এমনও জানা যায়, আঠারশ দশক পর্যন্ত এমন কোন রাতের বিনোদন অনুষ্ঠান শেষ হত না এই ম্যাজিক লণ্ঠনের উপস্থিতি ছাড়া। ম্যাজিক লণ্ঠন হচ্ছে চলমান চিত্রের একটি প্রাথমিক যন্ত্র যার মাধ্যমে হাতে আঁকা ছবি চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হত।

পরবর্তিতে ১৮৬২ ফ্রান্সে জন আইয়েরটন বিশ্বের প্রথম এ্যানিমেটেট চলচ্চিত্র বা চলমান চিত্রের একটি যন্ত্রের প্যাটেন্ট করিয়েছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়, যার নাম দেয়া হয়েছিল- Thaumatrope বা ‘জীবনের চাকা’।  যেখানেও  হাতে আঁকা কিছু ছবি বা স্থিরচিত্র এই যন্ত্রের মাধ্যমে চলমান দেখা যেত। তারপর এরূপ ভিন্ন ভিন্ন নামে কিছু যন্ত্র আবিস্কার হতে থাকল যেমন Phenakistoscope,  Zoetrope,  Praxiniscope প্রভৃতি যাদেরকে একধরনের টয়  বা খেলনা বলা হত।

১৮৭২ সালে এডয়ার্ড মুইব্রিজ স্থিরচিত্র তোলা এবং এর গতি দেয়া নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা শুরু করেন। তাঁর পরীক্ষায় দেখা যায় still-lifeএকটি ঘোড়া দৌড়ানোর ট্রাকে বারোটি ক্যামেরা বসিয়ে একসাথে ছবি তোলার চেষ্টা করেন, তার ফলসরূপ   যে চিত্রটি পাওয়া যায় তা দেখে মনে হয়- ঘোড়াটি দৌড়াচ্ছে। এইরকম কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে তিনি  Zoopraxiscope নামের একটি যন্ত্র আবিস্কার করলেন যা দিয়ে স্থির ছবি গুলোর একটি তড়িৎ  প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেত যা চলমান চিত্র বা চলচ্চিত্র মনে হত। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৮৮৫ সালে জর্জ ইস্টম্যান ও উইলিয়াম ওয়াকার বলে দুজন ব্যক্তি ফিল্ম রিল তৈরী করলেন যা কিছু দিনের মধ্যেই সেল্যুলয়েডে রপান্তরিত হল। তারও কিছুকাল পরে অর্থাৎ ১৮৯১ সালের দিকে এডিসন কোং ‘কাইনেটস্কোপের‘ মাধ্যমে  সার্থক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কথাও ইতিহাসে উল্লেখ আছে যার একটি উন্নত ভার্শন ১৯৯৬ সালে বিশ্ববাসী দেখেছিল, এর ঠিক এক বছর আগে ১৮৯৫ সালে  ল্যুমিয়েরে ভাতৃদ্বয় সিনেমাটুগ্রাফ আবিস্কার ও পৃথিবীতে প্রথম স্বার্থকভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন, যে ইতিহাস film-3কমবেশী আমাদের সবারই জানা।

একটি ট্রেন প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াচ্ছে বা কারখানা থেকে শ্রমিকরা বেড়িয়ে আসছে অথবা একটি নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে  প্রভৃতি দৃশ্যগুলি সবই ছিল বাস্তবের প্রতিচ্ছবি। চলচ্চিত্রে বাস্তবের প্রয়োগ ছিল সেই সুচনার লগ্ন থেকেই। অর্থাৎ কোন ঘটনা ক্যামেরার সামনে যে ভাবে ঘটছে ঠিক সেই ভাবেই দর্শকদের সামনে প্রদর্শিত হত। ক্যামেরা সেই সময়ে একটি নির্ধারিত স্থান থেকে দৃশ্য ধারণ ছাড়া আর অন্য কোন কৌশল জানতো না (অর্থাৎ রিয়েল পিপল, রিয়েল সেট এবং রিয়েল ইভেন্টসের দৃশ্য গ্রহণ) তাই ল্যুমিয়ের ভাতৃদ্বয়ের দ্বারা ধারণ করা প্রথমিক এক মিনিটের ঐ চলচ্চিত্র গুলো নির্ধারিত বিষয়ের এক একটি বাস্তবচিত্র। এজন্য ঐ চলচ্চিত্র গুলো ছিল মানুষের প্রাত্যহিক জীবন যাপন এবং কাজ করার প্রতিচ্ছবি।

এরমধ্যে অনেক চলচ্চিত্র  সামাজিক  চাহিদার উপরেও নির্মিত হত, যেমন একজন মানুষের তার পরিবারের জন্য একটি চাকরী প্রয়োজন, সে একটি চাকরীর সন্ধান পায় কিন্তু সেটা পেতে হলে তাকে একটি সাইকেল যোগাড় করতে হবে তাই সে এবং তার স্ত্রী সংসারের অন্য প্রয়োজনীয় জিনিষ বিক্রি করে দেয় যেন তারা সাইকেলটি নিতে পারে। পরেরদিন সে সাইকেলটি যোগাড় করে চাকরীতে যোগ দেয় কিন্তু চাকরীর প্রথম দিনেই তার সাইকেলটি চুরি হয়ে যায় তাই এখন তার চাকরীটি ঠিক রাখতে হলে সাইকেলটি তার ফেরৎ পেতে হবে। এটা হলো ডি’ সিকার বাইসাইকেলfilm-1 থিভস-এর প্রথম দশ মিনিটের গল্প যা ছিল ইতালীর রাস্তায় ধারণ করা অতি সাধারণ দৃশ্য যেখানে ছিল না কোন যান্ত্রিক আস্ফালন বা প্রোফেশনাল অভিনেতা-নেত্রীর অভিনয়।।পরবর্তীতে জাদুকর চলচ্চিত্রকার জর্জ মিলিজ চলচ্চিত্রে একধরনের অলীক বা কল্পনা  এবং তারসাথে কিছু পরীক্ষামূলক যান্ত্রিক স্পেশাল ইফেক্টের আভির্ভাব ঘটান। পরে এডুইন পর্টার তাঁর  দ্য গ্রেট ট্রেন রোবেরি (১৯০৩) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মত চরিত্র, সেট এবং নির্ধারিত একটি ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়ে দর্শককে একটি বিশ্বাসযোগ্য গল্প দেখতে বাধ্য করেছিলেন।

আসলে বাস্তববাদ মূলত একটি দার্শনিক ধারণা, যা আমরা পরিপূর্ণ ভাবে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে পাই ‘শিলার’ এবং ‘শ্লেগেল’ নামক দুজন দার্শনিকের কাছ থেকে। চলচ্চিত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে  পাম মরিসের মতো  প্রায় সব তাত্ত্বিকরাই মনে করেন, নান্দনিক ভাবে বাস্তববাদের মুল কথাই হলো- যে কোন সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য আখ্যান এবং বাস্তব সম্মত চরিত্রায়ণ। এ প্রসঙ্গে রুডফ আর্নহাইম ১৯৩০ সালেই লিখেছেন- Film offered the possibility of “the mechanical imitation of nature” in which original and copy become indistinguishable in the eyes of the public. পরবর্তিতে আন্দ্রে বাঁজা আরও যোগ করে বলেছেন- Would transform the mechanical reproduction of the cinematic image into a prophecy.

সচেতন পাঠক হিসেবে আমরা জানি যে, আলঙ্কারিক কলা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক আন্দোলন হিসেবে বাস্তববাদ তার সবচেয়ে সুসঙ্গত ও দৃঢ় রূপ লাভ করে ফ্রান্সে। অনুসরণ, সাদৃশ্য ভিন্নরূপ সহকারে কনটিনেন্ট -এর অন্যত্র, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায়। এটির আগে  রোমান্টিসিজম ও পরে এসেছিল এমন এক আন্দোলন  যা এখন সাধারণভাবে প্রতীকিবাদ বলে সংজ্ঞায়িত। আমরা দেখি বাস্তববাদ  ১৮৪০ থেকে ১৮৭০-৮০ সাল পর্যন্ত  একটি প্রধান আন্দোলন হিসেবেই ছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমকালীন জীবনের সতর্ক পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে বাস্তব জগতের একটি প্রকৃত, বিষয়মুখী নিরপেক্ষ উপস্থাপনা দেওয়া। ‘বাস্তববাদ’ শব্দটিও মূল দর্শন সংক্রান্ত বিষয়াদির সাথে গভীর ভাবে যুক্ত; যাকে কলার ক্ষত্রে একটি ঐতিহাসিক, রচনারীতি সংক্রান্ত আন্দোলন বা দিক বলে মনে করা হয়।

আসলে বাস্তবতা নির্ভর করে দৃশ্যগত বাস্তববাদের উপরে যা দর্শকের প্রত্যাশা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সমাধান ঘটায়। এ জন্যেই গ্রীক নন্দন তত্ত্বে মাইমেসিসের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। মাইমেসিস একটি অতি প্রাচীন ধারণা যা  কোন কিছুর হুবহু অনুকৃতিকেই বোঝায় যা কিনা চলচ্চিত্রে বাস্তববাদ ও প্রতিবিম্বের ধারণা দেয়। এরিস্টোটলের (৩৮৪-৩২২ বিসি) film-2পোয়েটিক্স  থেকেই আমরা প্রথম এর একটি যথাযথ ধারণা পাই। তাঁর মতে- মানুষের চিরন্তন ইচ্ছাই হলো এই অনুকরণ করার প্রবণতা আর কর্মতৎপরতার এই অনুকরণমূলক সম্ভাবনা ‘এপিক ট্রাজেডি’ এবং ‘বাদ্যনাট্যে’ প্রবল। পরবর্তীকালে বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কবিতায়ও এর  বেশ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সমালোচক স্যামুয়েল জনসন শেক্সপিয়ারকেও এর আওতায় নিয়ে আসেন এবং বলেন- তাঁর নাটকেও আমরা জীবনেরই প্রতিচ্ছবির প্রতিফলন দেখতে পাই। পরবর্তিতে দার্শনিক এম, এইচ আব্রারমস এই মাইমেসিস নিয়ে আরও ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছান যা তাঁর লেখাতে দেখা যায়। তাঁরই গবেষণার পরিপ্রক্ষিতে ডেভিড বর্ডওয়েল মনে করেন- হয়তো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বাস্তববাদের পোশাকে মাইমেসিস সাম্প্রতিক কালের চলচ্চিত্রকে প্রভাবিত করছে।

ঐতিহাসিক এই সকল তত্ত্বের মধ্যেই আমরা দেখি এক বা দুই রিলের চলচ্চিত্র গুলোর পরবর্তী পর্যায়ে চলচ্চিত্রে গল্প বলা শুরু হলে বাস্তবের একধনের রূপান্তর ঘটে যেটাকে আমরা দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি- বিশেষ করে হলিউড ধ্রুপদী চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ঘটনা ও চরিত্রের সত্যতা ইমেজের মধ্য দিয়ে তুলে ধরে দর্শকের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে একধরনের বাস্তবতা তৈরী করা। এবং ক্যামেরা দৃশ্য গ্রহণের প্রথম বিন্দুর যে যান্ত্রিক পুনর্জনন বাস্তবতা তা চলচ্চিত্রের ঘটনাপ্রবাহের শেষ পর্যন্ত একটি নির্ধারিত নিয়ম রীতির কঠোর পদ্ধতি বজায় রেখে দর্শকের মনে  বিশ্বাসযোগ্যতা স্থাপন করা।

(লেখক :- চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা, সহকারী অধ্যাপক গ্রীণ বিশ্ববিদ্যালয়)

 

 

Check Also

meyeti-ekhon-kothay-jabe

মুক্তি পেল নাদের চৌধুরীর মেয়েটি এখন কোথায় যাবে

মিডিযা খবর:- আজ ১০ মার্চ মুক্তি পেয়েছে নাদের চৌধুরী পরিচালিত ছবি ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’। …

nuru miah o tar beauty driver

নুরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার

মিডিয়া খবর :- গত ২৪ জানুয়ারি কোনও কর্তন ছাড়াই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares