Home » প্রোফাইল » ১ম বাংলাদেশী নারীর এভারেস্ট জয়ের গল্প
nishat-majumder

১ম বাংলাদেশী নারীর এভারেস্ট জয়ের গল্প

Share Button

মিডিয়া খবর :-

নিশাত মজুমদার, বাংলাদেশের চার জন এভারেস্ট বিজয়ীর একজন। তৃতীয় বাংলাদেশী এবং প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে নিশাত এভারেস্ট চূড়া জয় করেন। নিশাত মুজমদারের সহযাত্রী ছিলেন বাংলাদেশের আরেক এভারেস্ট জয়ী এম. এ. মুহিত। এটি নিশাতের প্রথমবার হলেও মুহিতের ছিল দ্বিতীয়বারের মতো এভারেস্ট চূড়া জয়ের অভিযান। এখানে তুলে ধরা হয়েছে নিশাত মুজমদারের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি, এভারেস্ট জয়ের গল্প সহ আরও অনেক কিছু।
জন্ম ও পরিবার:

১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ১০ নং ইউনিয়নের (দক্ষিণপাড়া) ভাটারা মজুমদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন নিশাত মজুমদার। নিশাত মজুমদারের পিতার নাম আবদুল মান্নান মজুমদার ও মায়ের নাম আশুরা মজুমদার। নিশাত মজুমদারের বাবা একজন ব্যবসায়ী এবং মা গৃহিণী। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নিশাত দ্বিতীয়। দুই বছর বয়সে পরিবারের সাথে ঢাকায় আসেন নিশাত মজুমদার। বর্তমানে তারা পান্থপথে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। নিশাত মজুমদারের পুরো নাম নিশাত মজুমদার নিশু।

পড়াশোনা

নিশাত মজুমদার ফার্মগেটের বটমূলী হোম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। নিশাত বর্তমানে ঢাকা ওয়াসায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

পর্বত আরোহী হয়ে ওঠা

শৈশবে বৈমানিক হতে চেয়েছিলেন, কখনোই পবর্তারোহী হতে চাননি। কিন্তু তিনিই প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসাবে জয় করেছেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ এভারেস্ট। প্রথম পাহাড় দেখাতেই পাহাড়ের প্রেমে পড়া। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের হাত ধরেই পর্বত আরোহণের সুযোগ হয় নিশাত মজুমদারের। আর অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে পরিচয় সেই অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক সংগঠন দলছুটের আয়োজনে নিশাতের পরিচালিত রেক্সোনা চ্যালেঞ্জ অনুষ্ঠানে। স্বেচ্ছাসেবকের কাজের পাশাপাশি ক্লাইম্বিং আর র‌্যাপলিং শিখেছেন তখনই। সে সময় বাংলাদেশের একমাত্র পর্বতারোহণ ক্লাব বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। ২০০৫-এর ১১ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো এদেশে পালিত হওয়া বিশ্ব পর্বত দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে জুমার ক্লাইম্বিং করা একমাত্র তরুণী হওয়ার মধ্য দিয়েই নিশাতের সঙ্গে এই ক্লাবের পরিচয়। এরপর একে একে পরিচয় শম্পার সঙ্গে, ইনাম আল হকের সঙ্গে, মুহিতের সঙ্গে। পরের বছর থেকে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সব আয়োজনে নিয়মিত ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে সাদিয়া সুলতানা শম্পার নেতৃত্বে ৮ নারী উঠলেন ক্রেওক্রাডংয়ে। এদের মধ্যে নিশুও ছিলেন। সেই বছরই মে মাসে নিশু নির্বাচিত হলেন এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকিংয়ে ২য় নারী দলের সদস্য। নিজের চোখে এভারেস্ট দেখে তিনিও স্বপ্ন দেখলেন এভারেস্টযাত্রী হওয়ার। আর এ কারণেই ২০০৭-এর মে মাসে নিশুর একমাস কাটল বিখ্যাত পর্বতারোহণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। এতে তিনি ‘এ’ গ্রেড রেজাল্টসহ বেসিক পবর্তারোহণ কোর্সে উত্তীর্ণ হন।

এভারেস্ট জয়ের আগে

এক লাফেই কোনো অভিযাত্রী এভারেস্ট চূড়ায় উঠতে পারবেন না। এজন্য তাকে ছোট-বড় আরও কিছু পাহাড় পর্বতে আরোহণের মাধ্যমে নিজেকে উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। নিশাত মুজমদার এভারেস্ট জয়ের আগে দেশে-বিদেশে আরও কিছু পাহাড়-পর্বতে আরোহন করেছেন।

  • ২০০৩ সালে এভারেস্ট বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া (৩,১৭২ ফুট) কেওক্রাডং জয় করেন।
  • ২০০৬ সালের মার্চে বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে বিএমটিসি আয়োজিত বাংলাদেশের নারী অভিযাত্রী দলের সঙ্গে ফের কেওক্রাডং চূড়ায় ওঠেন তিনি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বিএমটিসি আয়োজিত নারী অভিযাত্রী দলের সঙ্গে তিনি এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (১৭ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতা) ট্র্যাকিংয়ে অংশ নেন।
  • ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে হিমালয়ের মেরা পর্বতশৃঙ্গ (২১ হাজার ৮৩০ ফুট) জয় করেন নিশাত।
  • এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে পরের বছরের মে মাসে (২০০৮) হিমালয়ের সিঙ্গুচুলি পর্বতশৃঙ্গে (২১ হাজার ৩২৮ ফুট) ওঠেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি বাংলাদেশ ভারত যৌথ অভিযানে ভারতের উত্তর কাশীর গঙ্গোত্রী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী ১ পর্বতশৃঙ্গে (২১ হাজার ফুট) ওঠেন।
  • নিশাত ২০০৯ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ভারতের যৌথ অভিযানে পৃথিবীর ৫ম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালুতে (২৭ হাজার ৮৬৫ ফুট) ওঠেন।
  • ২০১১ সালের অক্টোবরে বিএমটিসি আয়োজিত হিমালয়ের চেকিগো নামের একটি শৃঙ্গেও সফল অভিযানে যান তিনি।

এভারেস্ট জয়ের গল্প

২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন নিশাত মজুমদার। কাঠমুন্ডুতে প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করে ৯ এপ্রিল লুকনা পৌঁছান। এভারেস্টে ১৪টি দিক থেকে ওঠা যায়। তবে প্রধান পথ দু’টি। প্রথমটি হচ্ছে নেপালের আর দ্বিতীয়টি হলো তিব্বতের দিক দিয়ে। তিব্বতের দিকের পথ নেপালের তুলনায় সহজ। সেখানে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া যায়। নেপালের দিকটা অনেক বিখ্যাত। এই পথ ধরেই তেনজিং ও হিলারী উঠে ছিলেন। নিশাত মজুমদাররাও নেপালের দিক থেকে যাত্রা শুরু করে। ৮ দিন ট্র‌্যাকিং করে বেস ক্যাম্পে পৌঁছান তারা। তারপর এক এক করে বিভিন্ন ক্যাম্প পার হয়ে ১৯ মে শনিবার নেপালের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টায় তিনি ২৯ হাজার ২৯ ফুট (৮,৮৪৮ মিটার) উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করেন। তবে এর আগে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে নিশাত মজুমদারকে। ২৭ এপ্রিল ক্যাম্প-১ থেকে ক্যাম্প-২ এর পথে রওনা দেন নিশাত মজুমদার, মুহিত সহ তাদের সাথে থাকা অন্য চারজন শেরপা। ক্যাম্প-২ এ যাওয়ার পথে তাদেরকে ‘কুম্বু হিমবাহ’ পার হতে হয়। ২০ টি মই দিয়ে সেই বরফের ফাটল তাদেরকে পার হতে হয়েছিল। এ সময় নিশাতের খুব পানির পিপাসা পায়। পানি খাওয়ার জন্য তারা মাত্র থেমেছেন, তখনই দেখেন ডান দিকে নুৎসে পর্বতের মাথা থেকে তুষার ধ্বস আসছে। সে সময় নিশাতরা পর্বতের প্রায় ২ থেকে আড়াইশ ফিট দূরে। সব সময় এ ধরনের তুষারধস পর্বতের গা বেয়ে নিচে নেমে যায়। নিশাতরা সেই তুলনায় অনেক দূরে ছিল। তাই তারা ভেবেছিল এই তুষারধস তাদে কাছাকাছি আসবে না। একসময় তাদের শেরপা ‘সেফটি’ ‘সেফটি’ বলে চিৎকার করেন। এর মানে হচ্ছে বরফের শেরপা বলতে চাচ্ছেন বরফের গায়ে যন্ত্র দিয়ে নিজেকে শক্ত করে বেঁধে রাখা। নিশাত তুষারধসের ছবি তুলছিলেন। তাই অন্য সবাই সেফটিগে যেতে পারলেও নিশাত সেফটিগে যেতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর নিশাত আবিষ্কার করেন সে উড়ছে। এক সময় মাটিতে পড়ে যায়। কিছু একটা ধরার চেষ্টা করে শেষমেষ বরফ ছাড়া হাতে কিছুই উঠে না। বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে মাটির সাথে চেপে রাখেন। নিশাত যে জায়গাটিতে পড়েছিলেন সেই জায়গা থেকে বরফ খাদের দূরত্ব ছিল মাত্র আড়াই ফুট। বরফের খাদে পড়ে গেলে কেউ আর নিশাতকে খুঁজে পেতো না। তুষারধস যখন মোটামুটি থেমে যায় তখন মুহিত দেখেন দলের অন্য সবাই আছেন কিন্তু নিশাত নেই। অনেক খোঁজাখুজির পর কিছুটা দূর থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসতে থাকে। মুহিতদের কাছ থেকে সেই গোঙানির শব্দের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩০ ফুট। মুহিতরা সেখানে গিয়ে দেখেন নিশাত উঠে বসার চেষ্টা করছে। নিশাতের নাক-কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে। এভারেস্ট জয়ের ঠিক আগের দিন পর্যন্ত সবাই ধরে নিয়েছিলেন খারাপ আবহাওয়ার জন্য এভারেস্টের পথে অনেক দূর উঠেও শেষ পর্যন্ত নিশাত মজুমদার ও এম এ মুহিতদের এ যাত্রায় ফিরে আসতে হবে।  কিন্তু এই অবস্থার মধ্য থেকেও এভারেস্ট জয়ে পিছপা হন নি নিশাত মজুমদার ও মুহিত। ঢাকা থেকে রওনা শুরু করে এভারেস্ট চূড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে নিশাতদের ৫৮ দিন লেগেছিল। ৯ এপ্রিল কাঠমুন্ডু থেকে বেসক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা শুরু করেন ৭ দিন হেঁটে ১৫ এপ্রিল তারা বেস ক্যাম্পে পৌঁছান। বেস ক্যাম্প থেকে চুড়ায় যেতে নিশাতদের ১ মাস ৪ দিন লেগেছে।

আর্থিক যোগান

একেক জনের এভারেস্ট আরোহণে ৩৫ লাখ টাকা দরকার যা একক পরিবারের পক্ষে জোগান দেওয়া কঠিন। স্পন্সর হিসাবে ১১টি কোম্পানি সহয়তা করেছিল। এগুলো হলো- আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ, একেকে, প্লান, মাছ রাঙ্গা, প্যারাগন গ্রুপ, ড্যানিস, পোলার, বারজারসহ আরো কয়েকটি।

বেস ক্যাম্প কি ?

সাধারণত বেস ক্যাম্প থেকেই টেকনিক্যাল ক্লাম্বিং শুরু হয়। ভূমি থেকে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত সাধারণত বরফ থাকে না। এখানে হেঁটে হেঁটে ওঠা যায়। নেপালের দিক দিয়ে বেস ক্যাম্পের উচ্চতা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার ফিট। এটি কুম্বু হিমবাহের উপরে। এক কথায় যাকে বেস করে আমাদের পরবর্তী আরোহন শুরু হয় সেটি বেস ক্যাম্প।

পর্বতারোহনের সময় যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়

অনেকে ভাবেন এভারেস্ট জয় করা খুবই সহজ। কিন্তু এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে অভিযাত্রীদের অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন – শ্বাস নিতে কষ্ট। অনেক উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকার কারণে রাতে বহু চেষ্টা করেও ঘুম আসে না। মাথা ব্যাথা করে। নাক, কান দিয়ে রক্ত বের হয়। বুক ব্যাথা করে, মাথায় পানি জমে, ফুসফুসে পানি জমে। খেতে ইচ্ছা করে না। তবে সবার ক্ষেত্রে এই সব ধরনের সমস্যা হয় না। এছাড়া এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে কারো হাত ও পায়ের আঙ্গুল কিংবা নাক-কান দেখতে না পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে অনেককেই এগুলো হারাতে হয়। যারা ভাবেন এভারেস্ট জয় করা খুব সহজ তারা এই বিষয়গুলো একটু ভালোভাবে চিন্তা করবেন।

(courtesy online-dhaka.com)

Check Also

jafor iqbal hero

নায়ক জাফর ইকবাল শুভ জন্মদিন

মিডিয়া খবর :- শুভ জন্মদিন আমাদের নায়ক (জাফর ইকবাল). আশির দশকের রূপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা …

s-m-solaiman-1

থিয়েটারের স্বজন এস এম সোলায়মান

মিডিয়া খবর:-        -: কাজী শিলা :- এস এম সোলায়মান থিয়েটারের আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares