Home » সাহিত্য » নাটক » নাটক- একাত্তরের লাশের গন্ধ
jessore-kill

নাটক- একাত্তরের লাশের গন্ধ

Share Button

মিডিয়া খবর :-          -: কুমার প্রীতীশ বল:-

কথক : আজ এখানে আপনাদের সমুখে আমরা হাজির করব, ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়িকে। দাদিবুড়িকে আপনারা অনেকে চেনেন। অনেকে জানেন। অনেকে আবার শুনেছেন কিংবা পত্রিকার পাতায় পড়েছেনও তাঁর কথা। আজ এখানে, এই আলোকোজ্জ্বল নাটমঞ্চে আপনারা আমাদের প্রিয় দাদিবুড়ির কাছে শুনবেন একাত্তরের তাঁর সেই দিনগুলোর কথা। দাদিবুড়ি ৭১সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী ছিলেন। থাকতেন কলেজের ভেতরেই ছোট্ট একটি টিনের ঘরে।
: একজন ছাত্র দাদিবুড়িকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা এবং যতœসহকারে মঞ্চের ভেতর থেকে ধরে ধরে এনে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেয়। দাদিবুড়ি একটু এদিক সেদিক তাকিয়ে তারপর ধীরে ধীরে স্মৃতিচারণ শুরু করেন। দাদিবুড়ি কোনো পেশাদার বক্তা না হওয়ায় তিনি কোনো ধরনের সম্বোধনের ধার না ধারেই বলা শুরু করেন আপন স্টাইলে। দাদিবুড়ির কথা বলা শুরু করলে একটু পরে ছাত্রটি চলে যায়।
দাদিবুড়ি : আমি আনোয়ারা বেগম। আপনারা আমাকে সকলে ভালোবেসে দাদিবুড়ি বলে ডাকেন। তাই কেউ আমার নাম জানতে চাইলে আমিও বলি, আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়ি। আজ আপনারা আমার কাছে(একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) সেই একাত্তরের কথা শুনতে আমাকে এখানে ডেকে এনেছেন। কিন্তু আপনাদের দেখে শুনে মনে হচ্ছে, আপনারা সকলেই আমার চাইতে জ্ঞান গরিমায় অনেক অনেক বেশি। আমি ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজের জন্মকালীন সময় থেকেই দারোয়ান, পাহারা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ কারতাম। কিন্তু কোনোদিন ওখানে পড়ার সুযোগ হয়নি। থাক, ওসব কথা। (একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) আপনারা তো আমাকে ডেকে এনেছেন একাত্তরের কথা শুনতে। ৭১এর কথায় না হয় বলি। কলেজটা তখনও ঠিক ঠাকমতো পাকা করা হয়নি। চারপাশে দেয়াল আছে। কিন্তু উপরে টিন নেই। দরজা জানালাও তেমন একটা ছিল না। এক দুটোতে থাকলেও তালার ব্যবস্থা নেই। আমার থাকার জায়গা ছিল না। তাই কলেজের ভিতরেই থাকতাম।
কথক : ৭১এর ২৫মার্চের কালো রাত্রি। চারদিকে ঘনঘোর অন্ধকার। যেন এক মহাঅমানিশা। বাংলার প্রতিটি মানুষ ঘুমে বিভোর। জেগে আছে শুধু ঘাতককূল। হঠাৎ মধ্যরাতে ভেসে আসে গোলাগুলির আওয়াজ। কামান, মেশিনগানের শব্দ। মর্টারের আওয়াজ। চারদিক থেকে শোনা যায় নারী-পুরুষের আর্তনাদ, ছোটাছুটি। আর্মির বুটের শব্দ। রাস্তাগুলো আর্মিতে ছেয়ে গেছে। ওরা গুলি চালাচ্ছে। আগুন দিচ্ছে। লাশ পড়ছে। আহত হচ্ছে। আর্মি শুয়ে বসে গুলি চালাচ্ছে। এর মধ্যেই দূর থেকে নানান শ্লোগানও ভেসে আসে। শ্লোগানগুলো হলো : জয় বাংলা। জয়বাংলা। বীর বাঙালি অস্র ধর। বাংলাদেশ স্বাধীন কর। ভুট্টোর বুকে লাথি মার। বাংলাদেশ স্বাধীন কর। ইয়াহিয়ার মুখে জুতা মার। বাংলাদেশ স্বাধীন কর। ঢাকা না পিন্ডি। ঢাকা, ঢাকা। আমার নেতা, তোমার নেতা শেখ মুজিব। শেখ মুজিব।(২৫মার্চের গণহত্যার ভয়াবহ পরিস্থিতিটা শব্দ-আলো ব্যবহার করে এখানে ফুটিয়ে তুলতে পারেন।)।
: পরদিন ছিল ২৬ মার্চ। সারাদিন কারফিউ। ২৭ তারিখ সকালে কিছু সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। রাস্তায় তেমন মানুষজন নেই। চারপাশে গভীর শূণ্যতা, হাহাকার। রাস্তায় অল্পকিছু রিকসা ছাড়া কোনো গাড়ি-ঘোড়া নেই। এর মধ্যে চুপিসারে কলেজে আসেন অধ্যক্ষ আবুল কাশেম স্যার।
অধ্যক্ষ : আনোয়ারা…ও…আনোয়ারা। তুই কোথায়? তুই কোথায় আনোয়ারা?
দাদিবুড়ি : জ্বি। এখানে স্যার। স্যার, একটু অপেক্ষা করুন। আমি এক্ষুণি অফিস ঘর খুলে মুছে দিচ্ছি।
অধ্যক্ষ : না। তা আর দরকার হবে না আনোয়ারা।
দাদিবুড়ি : কেন স্যার? কোথাও যাবেন? আপনার শরীর খারাপ?
অধ্যক্ষ : না। না। দেশের অবস্থা খুব খারাপ। যুদ্ধ লেগেছে। তুই এখান থেকে চলে যা।
দাদিবুড়ি : যুদ্ধ লেগেছে!
অধ্যক্ষ : স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ।
দাদিবুড়ি : স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে! মুক্তিযুদ্ধ!
অধ্যক্ষ : হ্যাঁ…হ্যাঁ…স্বাধীনতার যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ।
দাদিবুড়ি : তাহলে স্যার আমরা স্বাধীন হবো।
অধ্যক্ষ : পাকিস্তানিরা গণহত্যা শুরু করেছে। নির্বিচারে মানুষ মারছে। জীবনে এই প্রথম নিজের চোখে মানুষ মারা দেখলাম। ঠান্ডা মাথায় গুলি করে মানুষ খুন করা।
দাদিবুড়ি : পাকিস্তানিরা মানুষ খুন করছে? আমি গতরাতে অনেক গুলির শব্দ পেয়েছি।
অধ্যক্ষ : তুই এখান থেকে চলে যা। এখানে আসার সময় দেখলাম, ভুঁইয়া বাড়ি উড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানিরা। জনপ্রাণীহীন শূন্য বাড়িটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে একদিনেই। নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারের অবস্থা দেখলাম একই। তরকারির ঝুড়ির উপর পরে আছে বুকে পিঠে গুলি খাওয়া লোক।
দাদিবুড়ি : আমি কোথায় যাব স্যার?
অধ্যক্ষ : ওরা মহিলাদের উপর অত্যাচার করছে। তুই সরে যা।
দাদিবুড়ি : স্যার কোথায় যাব? আপনি তো জানেন স্যার,আমার তো যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।
অধ্যক্ষ : তোর সঙ্গে আর কবে দেখা হবে জানি না।
দাদিবুড়ি : স্যার আপনি সাবধানে থাকবেন। আপনি নিরাপদ স্থানে চলে যান। আমার কিছু হবে না।
অধ্যক্ষ : আমি তো তোর জন্য এসেছিলাম। তুই না গেলে তো আমি টেনশানে থাকব।
দাদিবুড়ি : স্যার আমার জন্য কোনো চিন্তা করবেন না। আমার কিচ্ছু হবে না।
অধ্যক্ষ : তাহলে আমি গেলাম। তোর জন্য চিন্তায় থাকব। সাবধানে থাকিস।
দাদিবুড়ি : আপনি সাবধানে থাকবেন স্যার।
দাদিবুড়ি : অধ্যক্ষ স্যার চলে যাওয়ার পর ব্যাপারটা নিয়ে আমি একটু চিন্তা করি। গণহত্যা…অত্যাচার শব্দগুলো আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। স্যার আমাকে চলে যেতে বলেছেন। কিন্তু আমি কোথায় যাব? কী বা আর হবে। নানা সাত পাঁচ ভেবে এখানে থেকেই গেলাম। তবে দিনে দিনে বুঝতে পারছিলাম দেশের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। কলেজে ক্লাস হয় না অনেকদিন। আগে কোনো কোনো স্যার আসত। এখন তাও না। এর মধ্যে অধ্যক্ষ স্যার এসে আবার যুদ্ধের খবর দিয়ে গেলেন।
: তারপর একদিন ১৫/২০জন কালো কালো মোটাসোটা লোক এসে মিরপুর বাঙলা কলেজের চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখল। তাদের আগে এখানে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তারা নিজেদের মধ্যে এদিক সেদিক দেখিয়ে দেখিয়ে কী কী সব কথা বলব। ওদের কথাবার্তার আগামাথা তখন কিছুই বুঝিনি। তবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি, তাদের কারো কারো হাতে তিন মুখওয়ালা ছুরি ছিল। অনেক সময় ধরে নানান কথা বলল। পরে বুঝেছি, ওরা ছিল রাজাকাররা। সেদিন এখানে ওরা এসেছিল জায়গটা রেকি করতে। পছন্দও হয়ে যায়। এমন নিরিবিলি খালি জায়গায় তাদের তখন খুব দরকার ছিল।
রাজাকার : এটা ঠিক আছে।
রাজাকার : এটা চলবে।
রাজাকার : পেছনে জঙ্গল আছে।
রাজাকার : ওপাশে একটা শুকনো কুয়াও দেখা যাচ্ছে।
রাজাকার : এটা মনে হয় কোনো পরিত্যক্ত বাগান বাড়ি।
রাজাকার : আরে না মিরপুর বাঙলা কলেজ।
রাজাকার : পাকার কাজ এখনও শেষ হয়নি।
রাজাকার : তাই এমন মনে হচ্ছে।
রাজাকার : জবাই করার কাজটা ভালোভাবে চালানো যাবে।
রাজাকার : ঘরগুলো জেলখানার কাজ দেবে।
রাজাকার : অস্থায়ী জেলখানা ঘোষণা করা হবে।
রাজাকার : ঐ ঘরটা জবানবন্দী আদায়ের জন্য লাগবে।
রাজাকার : আমাদের বিশ্রামের জন্য ঐ ঘরটা বরাদ্দ করতে হবে।
রাজাকার : বঙ্গ ললনার সঙ্গে ভালোবাসা আদান প্রদান করার জন্য এটা উত্তম স্থান হবে।
রাজাকার : ভালো হবে। নিরিবিলিতে সব কাজ করা যাবে। কেউ কোনো খবর পাবে না।
রাজাকার : কী ভালো হবে?
রাজাকার : নিরিবিলিতে সব কাজ করা যাবে। কেউ কোনো খবর পাবে না।
রাজাকার : সব কাজই চালানো যাবে। কেউ কোনো টেরই পাবে না।
রাজাকার : কেউ কোনো খবর পাবে না।
রাজাকার : টের পেলেই বা কী হবে?
রাজাকার : না। তা কিছু হবে না।
রাজাকার : তাহলে বললি যে?
রাজাকার : টের পেলে মুক্তিদের খবর দিলে। আবার বাড়তি ঝামেলা ঘাড়ে এসে পড়বে।
রাজাকার : আসলে একবার তাড়া খেয়ে তোর মাথায় মুক্তির ভুত চেপে বসেছে। চল যাই।
রাজাকার : ভাইরে ভাই যে দৌড়ানিটা না দিল!
রাজাকার : ছুরির কাজও চলবে। আরামও করা যাবে।
রাজাকার : চল যাই।
কথক : রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর দাদিবুড়ি ওরা যেখানে যেখানে গেল, সব জায়গা আবার ঘুরে ঘুরে পরখ করে আসলেন। উদ্দেশ্য তাদের মনোভাব বুঝা। তেমন কিছু কিন্তু বুঝতে পারলেন না। কী করে বুঝবে? ওরা এমন নৃশংস, হিংস্র হবে তা কি কল্পনা করতে পেরেছিল?
: আচ্ছা রাজাকাররা এতো মানুষ মারল, এতো মেয়ে মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল, দাদিবুড়িকে কিছু করল না কেন? আমরা একদিন দাদিবুড়িকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। দাদিবুড়ির জবাব শুনে আমরা রীতিমতো অবাক বনে গেলাম। দাদিবুড়ি আমাদের বলেছিলেন-
দাদিবুড়ি : আমাকেও মারতে এসেছিল। আমার মাথা ভর্তি জটা চুল ছিল। (সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে আঁচল সরিয়ে দেখালেন জটা চুল) মাথায় তখন অনেক চুল। তখন আমি জিকির করতাম। একদিন সন্ধ্যায় জিকিরে বসে একধ্যানে জিকির করছি। মাটিতে বসে জোড়ে জোড়ে জিকির করছি। হুলস্থুল করে কয়জন আমার সামনে এসে হাজির হলো।
রাজাকার : এ আপদ আবার কোত্থেকে এসে জুটল।
রাজাকার : ছুরি দিয়ে জবাই করে দেব নাকি?
রাজাকার : তাহলে তো আপদ বিপদ সব শেষ হয়ে যাবে।
রাজাকার : দাঁড়া একটু পরখ করে দেখি।
রাজাকাররা ঘুরে ঘুরে দাদিবুড়িকে দেখে আর কথা বলে। দাদিবুড়ি জোড়েশোড়ে জিকির করে।
রাজাকার : এ আপদ আবার কোত্থেকে এসে জুটল।
রাজাকার : জবাই করে দেব নাকি?
রাজাকার : তাহলে আপদ বিপদ সব শেষ হয়ে যাবে।

রাজাকার : ছুরি দিয়ে জবাই করে দিই।
রাজাকার : আমার হাত মিশমিশ করছে।
রাজাকার : আর একটু অপেক্ষা কর।
দাদিবুড়ি আরও জোড়েশোড়ে জিকির করে।
রাজাকার : না। ওরে মারিস না। এ মহিলা সাচ্চা ঈমানদার।
রাজাকার : জবাই করব না?
রাজাকার : সাচ্চা ঈমানদার?
রাজাকার : না। মারার দরকার নাই।
রাজাকার : মনে হচ্ছে সাচ্চা ঈমানদার।
রাজাকার : সাচ্চা ঈমানদার!
দাদিবুড়ি : তারপর ওরা সেদিনের মতো চলে যায়। এরপর আরও অনেকবার…প্রায় প্রতিদিনই এসেছিল। কিন্তু আমাকে আর মারে নাই। ঘরেও আগুন দেয় নাই। যুদ্ধের পুরো সময় আমি ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজেই ছিলাম। ওখানে থেকেই দেখেছি, ৭১এর ভয়াবহ নয়মাস। মুখোমুখি হয়েছি নানান ভয়াবহ অভিজ্ঞতার।
কথক : ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজ ক্রমে পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। আর এই বধ্যভুমির নারকীয় হত্যাকান্ডের মূর্তিমান সাক্ষী আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়ি। প্রতিদিন শুকনো কুয়া থেকে লাশগুলো টেনে হিঁচড়ে তোলা তারপর পেছনের ঝোপঝাড়ে নিয়ে ফেলা, ধুয়ে মুছে হায়েনাদের বর্বরতার চিহ্ন রক্ত পরিষ্কার করা, বন্দীদের মলমূত্র পরিষ্কার করা, কলেজের একটি ঘরে আটক বন্দীদের ভয়ার্ত আর্তনাদ — সব মিলিয়ে এক দুর্বিসহ জীবনযাপন করতেন দাদিবুড়ি। ৭১এর পুরোটা সময় দাদিবুড়ি কাটিয়েছেন এই বন্দীশালার ভেতর। প্রতিটি প্রহর অতিক্রম করেছেন মৃত্যু সামনে রেখে, অনিশ্চয়তায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে।
: ভয় লাগত না দাদিবুড়ির? চারপাশে লাশ, লাশের গন্ধ। কাটা হাত-পা-মাথার মধ্যে কীভাবে যাপন করতেন আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়ি? আমরা জানতে চেয়েছিলাম।14-december
দাদিবুড়ি : আমি বলে টিকেছিলাম। অন্য মানুষ হলে পারত না। আমার মা বলত-
মা : আমার মেয়েটাকে আল্লাহ এতো সাহস দিল কেমন করে? (দুই হাত তুলে) আল্লাহ…আমার মেয়েকে একি সাহস দিলে, আরও সাহস দাও। আরও শক্তি দাও। আমার মেয়ে যেন এ দেশের সকল মানুষের আশা ভরসা হয়ে বেঁচে থাকতে পারে। প্রথমে আমার মেয়েটি বকশীবাজারে নবকুমার স্কুলে আগে চাকরি করত। ওখানে থাকতেই ওর স্বামী তাকে বাদ দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে। জানি না আজ সে কোথায়? তারপর প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম স্যার আমার মেয়েকে দয়া করে বাঙলা কলেজে চাকুরি দেন। থাকবার জন্য ছোট একটা ঘরও দেন। তারপর থেকে সে ওখানেই থাকে। যুদ্ধের পুরো সময়টা সে ওখানেই ছিল। যুদ্ধকালীন রাজাকারদের সংঘটিত নানান বর্বরতার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকল আমার মেয়ে।
: যুদ্ধের সময় এক সন্ধ্যায় কে জানি কখন এসে ছোট একটা মেয়েকে রেখে গেছে ওর দরজায়। পরে আর কেউ মেয়েটির কোনো খোঁজ নিল না। আমার মেয়ে ওকে তার সঙ্গে রেখে লালন-পালন করেছে। বড় করেছে। বিয়েও দিয়েছে। গত বছর ঐ মেয়েটা মারা যায়।
দাদিবুড়ি : আরেক সন্ধ্যায় হানাদারদের অত্যাচারে একটা তরুণী মেয়ে পালিয়ে এসে আমার ঘরে আশ্রয় নেয়। ওর মুখে শুনেছিলাম মা-ভাইসহ তাদের ধরা পরার কথা। তরুণীটি বলল-
তরুণী : রাত বারোটার দিকে হঠাৎ চমকে উঠি।
কথক : গুড়–ম গুড়–ম গুলির আওয়াজ। থেমে থেমে কয়েকবার গুলি হলো। এরপর একটানা প্রচন্ড গুলি।
তরুণী: তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে মা আর ভাইয়াকে নিয়ে দাঁড়ালাম খাওয়ার ঘরের মাঝখানে। একি কান্ড, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রাতটা ভয়ংকর হয়ে গেল।
কথক : একসঙ্গে নানা রকমের বিকট শব্দ হচ্ছে চারদিকে। ভারি বোমার শব্দ। মেশিনগানের আওয়াজ। আবার একটা সরু আওয়াজ মাঝে মাঝে বাতাস চিরে চিরে যাচ্ছে।
তরুণী: বন্ধ জানলার কাঁচ দিয়ে দেখলাম আতশবাজির মতো আকাশে কি যেন জ্বলে জ্বলে উঠছে। আমাদের সারা ঘর আলোকিত হয়ে গেল। এলোপাতারি গুলি কাঁচ ভেঙ্গে যে কোনো মুহূর্তে গায়ে এসে লাগতে পারে। দিশেহারা হয়ে আমরা বাথরুমে ঢুকে পরলাম। বাকি রাতটা তিনজনে ওখানে ছিলাম। কোথায় কি হচ্ছে, কে কেমন আছে জানবার কোনো উপায় নেই।
কথক : একটু বেলা হলে দোতালা তিন তলার প্রতিবেশিরা দু একজন সাবধানে নেমে এসে দু একটা কথা বলে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে গেল। সবাই রাতভর জেগেছে। সবার চেহারায় আতঙ্ক। এক ফাঁকে দারোয়ান এসে খবর দিয়ে গেল। আমরা কোথাও বের হয়নি।
দারোয়ান : কলেজের মাঠে তিন চারজন মানুষ মরে পড়ে আছে। গতরাতে ওরা দেয়াল টপকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখনই গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে নিচে পড়ে গেছে।
তরুণী: খবরটা শুনে মনটা ‘হায় হায়’ করে উঠল। কিন্তু নিরব থাকা ছাড়া আর কিবা করার আছে?
কথক : কিছুক্ষণ পর দারোয়ান আবার আসলো। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দারোয়ান বলল-
দারোয়ান : রাস্তা থেকে বন্দুকধারী সৈন্যরা কড়া হুকুম দিচ্ছে, ছাদ থেকে ফ্ল্যাগটা নামিয়ে ফেলতে। নইলে গুলি করবে।
কথক : হঠাৎ খেয়াল হলো-
তরুণী : তাইতো ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম আমরা। এখন উপায়? এই গুলির মধ্যে কে ছাদে উঠতে রাজি হবে? একটু পরে চমকে উঠলাম। পাশের বাসার বার তের বছরের ছেলেটি কোন ফাঁকে গিয়ে লাল-সবুজ-হলুদ রং এর পতাকাটি নামিয়ে এনেছে। হায় আল্লাহ, ভাগ্যিস গুলি লাগেনি। সারাদিন আর কারো তেমন কিছু খাওয়া দাওয়া হয়নি। কী করব ভেবেও পাচ্ছি না। দম বন্ধ করা আতংকের একটা দিন আরেকটা রাত কাটল। আবার ভোরের আলো ফুটছে। আশ্চর্য! গুলির শব্দের সঙ্গে আজান শোনা যাচ্ছে। ভাবলাম-ঢাকা শহরে কি তা হলে দু’চারজন মানুষ বেঁেচ আছে? কিন্তু হঠাৎ বাইরে থেকে কারা যেন দরজায় প্রচন্ড ধাক্কা দিচ্ছে। মনে হলো- দরজা এক্ষুণি ভেঙ্গে পড়বে। তাই খুলে দিলাম। হুড়মুড় করে ৪/৫জন খান সেনা ঢুকে গেল। বুনো, হিংস্র দৃষ্টি, ঘর্মাক্ত নিষ্ঠুর চেহারা দেখে মনে হলো সারারাত ধরে ওরাই গুলি করে মানুষ মেরে খুন করেছে। ঘরের মধ্যে যেভাবে ছিলাম তেমনি বসে রইলাম। আমার ভাই যন্ত্রের মতো আস্তে আস্তে ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল- ওরা হয়ত কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে।
কথক : একজন অফিসার মতো লোক এগিয়ে এসে ক্রদ্ধ স্বরে উর্দুতে বলল-
আর্মি : তোমরা এখান থেকে গুলি ছুঁড়েছ?
ভাইয়া : না…না। আমি টিচার। আমি গুলি ছুঁড়ব কেন?
কথক : টিচার বলাটাই ভুল হলো। অফিসার ভয়ানক রেগে গেল।
আর্মি : টিচার? তোমরাই ছাত্রদের গুলি ছুঁড়তে শিখিয়েছ।
কথক : এরপর বুটের আওয়াজ তুলে ওরা এঘর ওঘর ঘুরে দেখল। একজন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল-
আর্মি : ঘরে বন্দুক আছে?
ভাইয়া : না। বন্দুক থাকবে কেন?
তরুণী: আমার বুকটা কেঁপে উঠল। গতকাল মা, ভাইয়ার শিকারের বন্দুকটা খুলে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে বাক্সের নিচে রেখে দিয়েছে। না… ভাগ্যক্রমে ওরা বাক্সটার কাছে গেল না। মনে হলো অন্য কিছু করার মতলব করছে। হঠাৎ খেয়াল হলো দুজন সৈন্য আমাদের সবার দিকে বন্দুকের নল তাক করে আছে। মা বিড়বিড় করে উঠল।
মা : লা..ইলাহা ইল্লা আনতো…।
তরুণী : মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কোত্থেকে যে এত সাহস আর শক্তি পেলাম তা বলতে পারব না। বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়ে একটা বন্দুক চেপে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলাম- না…না গুলি করো না। তোমরা যা চাও তাই দেব।
কথক : ভাইটা তাড়াতাড়ি ওদের দিকে এগিয়ে গেল আর উর্দুতে নানা কথা বোঝাতে লাগল। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। ভাই, বোন আর মাকে বন্দুকের মুখে জীপে তুলে নিল। কালো কাপড় দিয়ে ওদের চোখ বন্ধ করে দিল। তারপর জীপ ছুটল। কেউ জানে না কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। একসময় জীপ এসে থামে। ওদের চোখ বন্ধ অবস্থায় নামিয়ে এনে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। এই ঘরটি আর কোথাও নয়। মিরপুর বাঙলা কলেজের একটা কক্ষ।
তরুণী : চোখ বন্ধ অবস্থায় ঘরটিতে আমাদের ঢুকানোর পর বুঝতে পারলাম, এখানে আমরা একা না। আরও অনেকে আছে। পুরুষ মানুষও আছে। পরের দিন আমাকে আবার অন্য ঘরে নিয়ে গেল। চোখ বন্ধ। তারপরও বুঝলাম, এখানেও আমি একা না।আরও অনেকে আছে। তবে এখানে সবাই মেয়ে মানুষ। এক সময় দেখলাম আমার চোখের বাঁধন হালকা হয়ে গেছে। খুলেও ফেললাম।
দাদিবুড়ি : তারপর!
তরুণী : আজ সকালে ওরা এসেছিল, আরও কয়েকটা মেয়ে নিয়ে। মেয়েগুলোকে ঢুকিয়ে দিয়ে ওরা চলে যায়। ভালো করে খেয়াল করলাম, আশেপাশে ওরা আছে কিনা। যখন নিশ্চিত হলাম নেই, তখন-
দাদিবুড়ি : তখন তোমার চোখ খোলা ছিল?
তরুণী : না…না। আমি তখন হালকা করে চোখ বন্ধ করে ওদের আসা যাওয়া খেয়াল করছিলাম। চলে গেল মনে হওয়ার পর আপনার কাছে পালিয়ে এলাম। আমাকে একটু সুযোগ করে দেন এখান থেকে বের হওয়ার।
দাদিবুড়ি : এখনই আমি তোমাকে সুযোগ করে দেব।
তরুণী : এখানে কোথাও আমার মা, ভাই আছে।
দাদিবুড়ি : ওরা থাকুক আপাতত। তুমি যখন বের হতে পেরেছ। তখন তুমি পালাও।
তরুণী : একবার ওদের সঙ্গে দেখা যদি করতে পারতাম।
দাদিবুড়ি : তাহলে তুমি পালাতে পারবে না।
তরুণী : আম্মা যদি আমাকে কখনও খুঁজে?
দাদিবুড়ি : ওদের জন্য অপেক্ষা করলে তুমিও যেতে পারবে না। এখন তুমি পালাও।
তরুণী : বলছিলাম, আম্মা যদি আমাকে কখনও খুঁজে?
দাদিবুড়ি : আমি ওদের খোঁজ পেলে তোমার কথা বলব।
কথক : পরে ঐ তরুণীকে দাদিবুড়ি পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন।
দাদিবুড়ি : পালিয়ে যাওয়ার তিন মাস পর তরুণীটি এক সঙ্গে আটক থাকা মা ভাইয়ের খোঁজ নিতে এসেছিল।
নেপথ্য কণ্ঠ : খোঁজ পেয়েছিল?
দাদিবুড়ি : খোঁজ পেয়েও আর কী করবে? ওদের পরিণতি জানতে পারে, বদর বাহিনী ওদের হত্যা করেছে। খবরটা শুনে মেয়েটি খুব কান্নাকাটি করেছিল। বার বার বলছিল, আমার কী হবে? আমি কার কাছে থাকব? মেয়েটি প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। তারপর সে কোথায় চলে গেল কিছুই জানি না।
: এখানে যাদের ধরে আনত, তাদের ওরা খেতে দিত না। কষ্ট দিত। মারধর করত। নানানভাবে অত্যাচার করত। মেয়েদের ধর্ষণ করত। মেয়েগুলোকে দিয়ে দিনের বেলা পা টিপাত। নানান আজে-বাজে কথা বলত। আমার খুব কষ্ট লাগত। মেয়েগুলো নিরবে কান্না করত। আর অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওদের ফায় ফরমাসগুলো পারন করত। এরপর তাদের রেহাই মিলত না।
৩/৪জন মেয়ে ২/৩জন রাজাকারের পা টিপছে। মেয়েগুলো পা টিপছে আর কাঁদছে।
রাজাকার : কান্নার কি আছে? কান্নার কি আছে?
রাজাকার : মনে কর স্বামীর সেবা করছিস।
রাজাকার : আগে বিয়ে হয়েছিল?
মেয়েগুলো কান্না করছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। জবাব দেয় না।
রাজাকার : আগে বিয়ে হয়েছিল? বল?
রাজাকার : বল না। আগে বিয়ে হয়েছিল কিনা?
একজন মেয়ে জবাব দেয়।
মেয়ে : না।
রাজাকার : আমাকে বিয়ে করবি?
রাজাকার : বল না।
রাজাকার : বিয়ে করবি?
রাজাকার : বল না। বিয়ে করবি?
রাজাকার : বিয়ে করলে সমস্যা কোথায়?
রাজাকার : বিয়ের আর বাকি কী আছে?
রাজাকার : কলমা পড়া।
রাজাকার : ওটা সময় সুযোগ করে পড়ে নেব না হয়।
রাজাকার : আচ্ছা…ও তোর কত নম্বর বিবি হবে রে?
রাজাকার : এতো সেরেছে। এতোদিনে কতটা বিবির সঙ্গে সময় কাটালাম। না সংখ্যা বলতে পারব না।
রাজাকার : আচ্ছা ওদের পেটে যে বাচ্চা হবে, ওরা আবার জয়বাংলা বলবে না তো!
রাজাকার : আরে না।
রাজাকার : ওরা আমাদের মতো পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলবে তো?
রাজাকার : ওরা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলবে।
রাজাকার : ওরা আবার জয়বাংলা বলবে না।
রাজাকার : ওরা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলবে।
রাজাকার : তাই তো এই ব্যবস্থা।
রাজাকার : যুদ্ধের সময় এটা জায়েজ আছে।
রাজাকার অট্টহাসিতে ফেটে পরে। আলো নিভে যায়। মেয়েগুলোর আর্তচিৎকার। রাজাকারদের উল্লাস।
দাদিবুড়ি : কখনো ভাবিনি এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমাকে দেখতে হবে। ভাবিনি মানুষের এতো অপমানের এতো অমানবিকতার সাক্ষী হয়ে থাকতে হবে। জানলার ফাঁক দিয়ে কয়েকজন যুবতী মেয়ের মুখ দেখতে পেলাম। তারপর ওদিকে গেলাম। ওদের সামনে গিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে বের হয়ে এলাম। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কয়েক মুহূর্ত এভাবে কাটল। ঘরের ভেতরে কয়েকটি মেয়ে। দুজনের শরীরে কোনো কাপড় নেই। দুজনের পরনে শুধু জাঙ্গিয়া। আমার কয়েকটা কাপড় এনে ওদের পরতে দিলাম। মেয়েগুলোর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তারা কথা বলতে পারছিল না। তাদের পুরো শরীর নরপশু হিংস্র হায়েনা শয়তানদের নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। সারা ঘরের মেঝেতে চাপ-চাপ জমাট বাঁধা রক্ত। ছেঁড়া শাড়ী, ব্লাউজ, পেটিকোট, ব্রা, মেয়েদের ছেঁড়া চুল ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পূর্ব পাশের জানালার লোহার রডের সঙ্গে সুতার রশি বাঁধা এবং হাত বেঁধে রাখার স্পষ্ট চিহ্ন আছে। এই রশি দিয়ে ওদের বেঁধে শয়তানগুলো ধর্ষণ করেছে।
: ওফ…(নীরব হয়ে চোখ মুছে) রাজাকারদের তিনমুখা ছুরি ছিল। কথা নেই, বার্তা নেই সেই ছুরি দিয়ে যখন-তখন জবাই করত মানুষ। জবাই করত কারণ প্রতিদিন এতো এতো মানুষ ধরে আনত, সবাইকে ওখানে রাখার জায়গা ছিল না। গাদাগাদি করে রাখত। একজনের উপর তিনজন। তারপরও জায়গা হতো না। পায়খানা, প্রস্রাব সব ওখানেই করতে হতো। জবাই করে করে ফেলে দিয়ে জায়গার সংকুলান করত। মেরে মেরে কখনও ঐ শুকনো কুয়ার মধ্যে আবার কখনও গর্তের মধ্যে ফেলত। রাজাকাররা না থাকলে আমি গিয়ে গিয়ে লাশগুলো তুলে আনতাম। কাটা হাত, পা, মাথা তুলতাম। তারপর সবকিছু একে একে কলেজের পেছনের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে ফেলতাম। আর ভাবতাম, হায়রে কার ছেলেরে বাঘে খেল?
কথক : দাদিবুড়ি মরা মানুষ নিয়ে টানাটানি করত, শুধু তাই না। আহতদেরও সেবা করত। বাইরের খবরাখবর দিতেন। বন্দীদের টুকটাক ফায়ফরমাস খাটতেন। রাজাকারদের গতিবিধি জানাতেন। দাদিবুড়ি কখনও কখনও ওদের মুখে ধরাপরার কাহিনী, নানান নৃশংসতার কাহিনী শুনতেন। শুনতেন পরিবার- পরিজনের কথা। ওরাও তাঁর কাছে বলে বলে হয়ত একটু হালকা হতো।
পুরুষ : সন্ধ্যায় আমার আশ্রয় বাড়িতে গৃহকর্তার সঙ্গে রেডিও শুনছিলাম। সরকারি নির্দেশাবলী প্রচার হচ্ছে: আইন হাতে নিও না। পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। ধৃত দু®কৃতকারীদের থানায় সোপর্দ কর। (ঘোষণাটি সম্ভব হলে অডিওতে প্রচার করা যেতে পারে)। ভাবছিলাম, কত মিথ্যা-অসার এই ঘোষণা।
কথক : হঠাৎ কড়ানাড়ার শব্দে গৃহকর্তা দরজা খুলে দিলেন। অমনি একদল লোক হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। সকলের হাতে অস্র। নাক মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। শুধু চোখদুটো একটু একটু দেখা যাচ্ছে। অনেকটা গর্ব করেই নিজেদের পরিচয় দিল।
বদর : আমরা বদরবাহিনীর লোক। নড়াচড়া করবে না কেউ। লাইন হয়ে দাঁড়িয়ে নাম বল।
পুরুষ : আমি আমার নাম বললাম।
বদর : তোমাকে গ্রেফতার করা হলো।
পুরুষ : একটু আগে রেডিওতে শুনলাম, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার করা হবে না। তাহলে আমার নামে পরোয়ানাটা দেখাও।
বদর : আমাদের ওসব লাগে না।
কথক : আসলেই লাগত না। আজও লাগবে না। এখনও ওরা যুদ্ধরত। আজও ওদের হাতে পরাজিত অস্ত্র। টারগেট এক ও অভিন্ন। বাংলা । বাঙালি।
পুরুষ : অতপর দলনেতা আমার হাত-চোখ বেঁধে কোমরে রশি লাগাতে হুকুম দিল। কিন্তু হঠাৎ আমার গৃহকর্তা বদরবাহিনীর দলনেতার সামনে দৌড়ে এসে বলল-
গৃহকর্তা : না ওকে আমার বাড়ি থেকে নিতে দেব না। আমি জানি, বদরবাহিনী মানুষ খুন করে। তোমরা তদন্ত কর। ও কোনো দুষ্কুতকারী না।
কথক : দলনেতা রাগতস্বরে তাঁকেও গ্রেফতারের নিদের্শ দিল। আর অমনি দুজন লোক এসে তারও কোমরে রশি পরিয়ে দিল।
বদর বাহিনীর দুজন লোক গৃহকর্তাকে দড়ি দিয়ে বাঁধছে।
পুরুষ : তোমরা আমাকে নিতে এসেছ, আমি তো যাচ্ছি। তাঁকে ছেড়ে দাও। নয়ত এক পাও নড়ব না আমি।
: কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে ধাক্কাতে ধাক্কাতেই আমাদের রাস্তায় নিয়ে এল। সেখানে ওদের কয়েকজন পরিচিত লোক বিস্তারিত পরিচয় জানবার পর, ওরা আমার গৃহকর্তাকে ছেড়ে দিল।
: রাস্তায় নামতেই ওরা আমার চোখ দুটো কালো কাপড়ের শক্ত আঁটুনিতে বেঁধে দেয়। তারপর হাত দুটোও পেছন দিকে মুড়ে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলল। ক’মিনিট হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। বুঝলাম, আমাদের পাড়ার শেষ প্রান্তের মিরপুর বাঙলা কলেজ। এখন বদর বাহিনীর নির্যাতন শিবির। কয়েক মিনিট পর বিকট স্বরে একজন চেঁচিয়ে উঠলÑ
আর্মি : হল্ট।
পুরুষ : অমনি দাঁড়িয়ে গেলাম। পরবর্তী নিদের্শ এল-
আর্মি : সেন্ট্রি দরওয়াজা খোল।
পুরুষ : চলনে বলনে সবকিছুতে সামরিক ঢং। কথাবার্তায় উর্দু ইংরেজির ব্যবহার বেশি। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেলাম। দু’পা ভেতরে দিতেই হঠাৎ পিঠে বুটের আঘাতে হুমড়ি খেয়ে ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। মনে হলো বসা, শোয়ায় অনেক মানুষ যেন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মুখে গরম রক্ত অনুভব করলাম।
কথক : দাঁত ভেঙ্গেছে। নয়ত জিব কেটেছে। ওরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কে একজন এসে জিজ্ঞেস করল।
বন্ধী : কে তুমি ভাই?
কথক : নাম বলতেই দুজন জড়িয়ে ধরল সস্নেহে। এরা তার অতি নিকটের মুক্তিযোদ্ধা। ওকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিল ওরা। হাত-চোখ তখনো বাঁধা। অন্য সকলেরও তাই। এমনকী পনের দিন আগের লোকদেরও। এটাই এখানকার নিয়ম। সকলে জানতে উদগ্রীব, বাইরের অবস্থা কেমন? যুদ্ধের অবস্থা কী? কীভাবে ধরা পড়ল। এমন সময় হঠাৎ বুটের আওয়াজ। সেন্ট্রি দরজা খুলে হাঁক দিল।
সেন্ট্রি : খান সাহেব এসেছে। সকলে উঠে বস।
পুরুষ : বাইরে থাকতে শুনেছিলাম এ খান সাহেব ভয়াল নিষ্ঠুর শক্তিধর একলোক। এখানকার সর্দার।
কথক : প্রথমে নাম ধাম আর কিছু সাধারণ গোছের রাজনীতির কথা জিজ্ঞেস করল। মনে হলো কে যেন লিখছিল এসব। হঠাৎ ভেংচি উচ্চারণে খান সাহেব বলল-
খান সাহেব : জয় বাংলা বলো না?
পুরুষ : সে তো সকলেই বলছে।
কথক : আর অমনি মুখে এসে লাগল এক তীব্র ঘুষি। তারপর অকথ্য গালাগাল আর চারিদিক থেকে বেশ ক’জন সমানতালে ইচ্ছামতো সারা গায়ে সজোরে লাথি ঘুষি মেরে চলল।
পুরুষ : বুঝলাম, দাঁত ভেঙেছে আর নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অসহ্য আঘাতের তোড়ে মেঝেয় পড়ে গেলাম। যন্ত্রণায় হঠাৎ-
: উহ আল্লাহ-
: শব্দ করে উঠলাম। আর অমনি মুখে সজোরে আঘাত হেনে বলল-
খান সাহেব : শালা, লেনিন আর মাও সে তুং বল। শেখ মুজিব বলল। আল্লাহ নয়।
কথক : মাত্রা যেন ক্রমশ বাড়ল। নির্যাতনের কতো না অভিনব কায়দা কৌশল।
পুরুষ : তারপর কিছুই আর মনে নেই। এই যে এখন ঘুম ভাঙ্গল।
দাদিবুড়ি : ঠান্ডা মেঝের ওপর পড়ে আছেন। সারা গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
পুরুষ : ভীষণ পানির তেষ্টা লাগছে।
দাদিবুড়ি : আমি পানি নিয়ে আসছি।
পুরুষ : দয়া করে একটু পানি দেবেন। পেটে খুব ক্ষুধা।
দাদিবুড়ি : তুমি বস, আমি তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসি।
কথক : ছেলেটির ওঠার শক্তি নেই। আবার নেতিয়ে পড়ল। একটু পরে দূরে কোথাও কাক ডাকছে। হয়ত ভোর আসছে পৃথিবীর বুকে। ক্ষুধার্ত বন্দী বাঙালিদের চুরি করে খাদ্য সরবরাহ করা, তাদের পায়খানা, প্রস্রাব পরিষ্কার করা আর গর্ত থেকে লাশ সরিয়ে জঙ্গলে ফেলা- সবকিছুই করেছেন দাদিবুড়ি পুরো একাত্তর জুড়ে।
দাদিবুড়ি : ঐদিন সকালে ছেলেটিসহ আরও কয়েকজনকে ওরা তিন মুখওয়ালা ছুড়ি দিয়ে জবাই করে ফেলে রাখল। আমি এসে দেখলাম, কারো কারো শরীর তখনও গরম ছিল। একেবারে তাজা রক্ত।
কথক : বর্বরের দল বাঙালি নারী-পুরুষদের মুখোমুখি বেঁধে লটকিয়ে হাতি তামাশা করতে করতে হত্যা করত। শহরের বিভিন্ন নির্যাতন কেন্দ্র থেকে এখানে বন্দি বাঙালিদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো হত্যা করার জন্য। এই হত্যাকান্ডগুলোর বেশির ভাগ সম্পন্ন হতো গভীর রাতে। মাঝে মাঝে ভোরেও হতো। কাউকে কাউকে হত্যার আগে সারা শরীরে লবণ ছিটিয়ে দিত। তারপর রেলের লোহার পাতের সঙ্গে হাত পা মাথা শক্ত করে বেঁধে জবাই করত।
দাদিবুড়ি : এলোমেলোভাবে মেঝেতে মানুষের লাশ পরে আছে। এখানে ওখানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। মানুষের ছিন্নভিন্ন হাত, পা, মাথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি একেএকে মানুষের ছিন্নভিন্ন হাত, পা, মাথা কুড়িয়ে একত্র করে বাইরে নিয়ে যাই। লাশগুলো একটা একটা করে টেনে টেনে বাইরে নিয়ে যায়। তারপর মেঝের রক্ত পরিষ্কার করতে লেগে যায়। কাঁদতে কাঁদতে এসব করতাম। কাঁদতাম আর টানতাম। কাঁদতাম আর টানতাম। দুর্গন্ধে পেটের ভেতর থেকে নাড়ি ভুরিসহ সব বেরিয়ে আসতে চাইত। বমি চলে আসত। তারপরও থামতাম না। কাঁদতে কাঁদতে তারপরও করতাম।
: লাশের গন্ধে আমি ভাত খেতে পারতাম না। কলেজের বারেন্দা ভর্তি রক্ত। রক্ত পরিষ্কার করতাম। আর লাশ টানতাম। রক্ত মুছতাম আর কাঁদতাম। লাশ টানতাম আর কাঁদতাম। ক্ষণে ক্ষণে দুর্গন্ধে পেটের ভেতর থেকে নাড়ি ভুরিসহ সব বেরিয়ে আসতে চাইত। পাকিস্তানি আর্মি আর রাজাকার আলবদররা মিলে বাঙলা কলেজের পিছনে বাঙালিদের কেমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করত, লাশগুলো ফেলত কলেজের ভেতরের শুকনো কুয়ায় আর গর্তে। আমার চোখে এখনো জ্বলজ্বল করে ভাসছে বিভৎস সেই সব দৃশ্য। তখন ভাত খেতে পারতাম না লাশের গন্ধে। এখন পারি না অভাবে।
কথক : এর মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাস যারা ঘরের মধ্যে বন্দী জীবন কাটিয়েছিল, বিজয়ের উল্লাসে তাঁরা সকলে দলে দলে ঘরের বাইরে রাজপথে নেমে আসে।
স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিল। শ্লোগান : জয় বাংলা। জয় বাংলা। তোমার আমার ঠিকানা । পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। তোমার নেতা আমার নেতা। শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। জয় বাংলা। জয় বাংলা।
মিছিল কয়েকবার মঞ্চ প্রদক্ষিণ করে। শ্লোগান একবার দেওয়ার পর ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে। রক্ত লাল’ গানটি বাজবে।
দাদিবুড়ি : একদিন প্রিন্সিপাল স্যার এসে বললেন, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষ খবরটা যখন শুনলাম, তখন মনে মনে আল্লাহর কাছে শোকরানা আদায় করলাম। কিন্তু যতটা উচ্চসিত হওয়ার উচিত ছিল. যতটা আনন্দ করা যেত, ততটা করতে পারিনি।
অধ্যক্ষ : আনোয়ারা…আনোয়ারা।
দাদিবুড়ি : অনেকদিন আমাকে এমন করে নাম ধরে কেউ ডাকেনি বলে নিজের নামটাও ভুলে যায়। একটু পরে সম্বিত ফিরে পাই। প্রিন্সিপাল স্যার কলেজের চারপাশে রক্ত, লাশ আর মানুষের কঙ্কাল দেখে খুব ভরকে যান। ইতস্ততভাবে আমার নাম ধরে ডাকেন।
অধ্যক্ষ : আনোয়ারা…আনোয়ারা।
দাদিবুড়ি : কে?
অধ্যক্ষ : আমি আনোয়ারা। তোর প্রিন্সিপাল স্যার।
দাদিবুড়ি : ও…প্রিন্সিপাল স্যার!
দাদিবুড়ি : প্রিন্সিপাল স্যারকে দেখে আমার চোখে এতকাল জমা হওয়া সব পানি বেরিয়ে আসে। খেয়াল করলাম, স্যারের চোখেও পানি।
অধ্যক্ষ : আনোয়ারা আমি ভেবেছিলাম, তুই বেঁচে নেই। কলেজের খবর আগেই পেয়েছিলাম। তাই ভয়ে তোকে দেখতে আসতে পারিনি।
দাদিবুড়ি : স্যার…আমি সারাক্ষণ আপনার জন্য চিন্তা করতাম। স্যার আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান। ওরা কখন আবার আসে।
অধ্যক্ষ : নারে আনোয়ারা, ওরা আর আসবে না। সে সাহস আর নেই।
দাদিবুড়ি : কেন স্যার?
অধ্যক্ষ : দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।
দাদিবুড়ি : দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!
অধ্যক্ষ : হাঁ আনোয়ারা, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।
দাদিবুড়ি : স্যার তাহলে কলেজে শুরু হবে কবে?
অধ্যক্ষ : এ অবস্থায় কী করে ক্লাস শুরু হবে? আগে তো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হবে।
দাদিবুড়ি : তা আমি করব স্যার।
অধ্যক্ষ : তুই করবি? পারবি?
দাদিবুড়ি : পারব। এতোদিন তো তাই করেছি।
অধ্যক্ষ : এমন দুর্গন্ধের মধ্যে থাকতে পারবি?
দাদিবুড়ি : পারব স্যার।
: ৭১এর ছড়িয়ে থাকা লাশ, তারপরের নরকঙ্কাল সরিয়েছি নিজের হাতে অনেকদিন ধরে। রাস্তার পাশে ভরে উঠা জঙ্গলে ও বাঁশ ঝোপের মধ্যে অনেক কঙ্গাল। অনেক কঙ্গালের হাতের হাড়ের সঙ্গে চুড়ি ছিল। আবার কয়েকটি কঙ্গালের পাশে মেয়েদের লম্বা চুল ও ছেঁড়া শাড়ী, ব্লাউজ পড়ে থাকতে দেখেছি। জঙ্গল আর রাস্তা, কুয়া সব জায়গা থেকে সদ্য পচা মানুষের লাশের দুর্গন্ধ ভেসে আসে। কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের দেওয়া ঔষুধ নাকে লাগিয়ে নিতাম, যেন লাশের উৎকট গন্ধ নাকে না আসে।
: দেশ স্বাধীন হয়েছে ভালো লাগছে। কিন্তু সেই স্মৃতি এখনো ভুলতে পারিনি। কুয়া ভর্তি লাশ আর লাশ, জঙ্গলের পেছনে লাশ, আটক করে রাখা বন্দীদের ঘর থেকে ভয়ার্ত চিৎকার- সবকিছুই একে একে মনে পড়ে। চোখে ভাসে। আমি ভুলতে পারি না। তাই একাত্তরের সেই বিজয় দিবসের আমার অনুভূতি-উপলব্ধির কথা কেউ জানতে চাইলে আমি কখনই আপনাদের মতো গুছিয়ে জুৎসই শব্দমালা সাজিয়ে বলতে পারি না।
কথক : সেই সব কথা মনে হতেই আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়ির ভাঁজপড়া গালে টপটপ পানি পড়ে। জীবনের শেষ বেলায় এসে যখন তিনি আবার শুনতে পেলেন, মিরপুর বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থীরা যুদ্ধাপরাধীর বিচার, কলেজে স্মৃতিসৌধ আর বধ্যভূমি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানববন্ধন করছে, তাদের সঙ্গেও হাত মেলাতে ছুটে আসেন আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়ি। দাঁড়ান মানববন্ধনে।
কথকের প্রথম লাইন বলা শেষ হওয়ার পরপরই আনোয়ারা বেগম দাদিবুড়িকে মাঝখানে নিয়ে সকল কুশিলব মানববন্ধনের মতো হাতে হাত ধরে লাইন করে দাঁড়ায়। সকলের গলায় ঝুলানো যুদ্ধাপরাধীর বিচার, স্মৃতিসৌধ, বধ্যভূমি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি লেখা প্লেকার্ড। ধীরে ধীরে মঞ্চ জুড়ে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে।

 নাটকটি কেউ মঞ্চস্থ করতে চা্লে কুমার প্রীতীশ বল এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন্- pritish baul <pritish_baul@yahoo.com>

Check Also

syed shamsul haque

আমার পরিচয়-সৈয়দ শামসুল হক

মিডিয়া খবর :- বাঙালীর আত্মপরিচয় নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা অসাধারন কবিতা- ‘আমার পরিচয়’ আমি …

SKY

এ এস মাহমুদ খানের কবিতা

মিডিয়া খবর :-     দুঃখ বিলাস মন খারাপের বারন্দায় বসে এই হঠাৎ এমন কেন কিসে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares