Home » নিবন্ধ » ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবণা শেষ পর্ব-
fol-webd-8

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবণা শেষ পর্ব-

Share Button

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবণা

শেষ পর্ব-

এস.এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাটকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের উপাখ্যান ও নাট্যরীতি যৎসামান্য ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঢাকা থিয়েটারের নাসির উদ্দিন ইউসুফ এবং আরণ্যক নাট্যদলের মামুনুর রশীদ। এঁনাদের নাটকে লোক ঐতিহ্য, ইতিহাস, বিদেশী কাহিনীসহ স্বদেশের আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় ও মূল্যবোধ নাটকের বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃতরূপ যেখানে গ্রামীণ পোপট, নাটক রচনা সেখানে নিঃসন্দেহে জীবন আশ্রয়ী শিল্পের অঙ্গীকার থেকে উদ্ভূত, যা বাংলাদেশের নাটকের নিস্বজ ধারা ও রীতির অন্যতম পরিচায়ক। বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যচর্চায় সচেতনভাবে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যাঙ্গিকের দক্ষ প্রয়োগে নাটককে সমৃদ্ধ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক, সেলিম আল দীন, মামুনুর রশীদ, জামিল আহমেদ, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এস. এম. সুলতান প্রমূখ। অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে আফসার আহমদ, সালাম সাকলাইন, আব্দুল্লাহ হেল মাহমুদ, মান্নান হীরা, সাজেদুল আউয়াল, সুলতান মুহম্মদ রাজ্জাক, সায়মন জাকারিয়া প্রমূখ।

সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চা বলতে আমরা উপরিউক্ত ধারার থিয়েটার চর্চাগুলোকেই বুঝি। আমরা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করি হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারায় লালিত ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের আঙ্গিক ও পরিবেশনারীতি থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমকালীন বা বর্তমান শহুরে বা নাগরিক থিয়েটার চর্চায়  ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রভাব একেবারই ক্ষীণ। তাই সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন। বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে বাঙলার স্বতন্ত্র নাট্য দর্শন উপস্থাপনের নিমিত্তে সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের উপস্থাপন জরুরী হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব নাটকের বিভিন্ন ধারা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখবো  গ্রীক নাটক তার স্বকীয় শিল্প দর্শন থেকে উদ্ভূত হয়ে সারা বিশ্বে আজ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। অনুরূপভাবে আমরা যদি দেখি ইংরেজি থিয়েটার তাদের স্বতন্ত্র আঙ্গিক নিয়ে বিশ্ব নাট্যে আজ অবস্থান করে নিয়েছে। আমাদের ভারত বর্ষের সংস্কৃত থিয়েটারের কথা আমরা বলতে পারি সংস্কৃত নাটক তার নিজস্ব নিয়মরীতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকেই সারা বিশ্বে  আজ স্বীকৃত। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে বা বিশ্ব নাট্যাঙ্গনে বাঙলা নাটক বা বাঙলা নাট্যের স্বতন্ত্র কোন অবস্থান বা স্বতন্ত্র কোন শিল্প দর্শন প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি।আমরা মনে করি পুরাণ, উপকথা, লোকগাঁথা,নৃত্য, গতি, সংলাপ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সহজাত শিল্পভাবনা ও রুচির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের সমগ্র পরিসর জুড়ে আছে বাংলা ভাষা-ভাষী শিল্প দর্শন। আর তাই সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ ঘটানো একান্ত অপরিহার্য। তদোপরি উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয় মান হয় যে, ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের নাট্যিক ও সঙ্গীত গুণ অনেক ঋদ্ধ। সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের নৃত্যভঙ্গিমা, গীতধর্মীতা, উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক সংলাপ, সরস বর্ণনা, বাঙলা ভাষা শৈলীর ব্যবহার, উপমা, চিত্রকল্প, মুদ্রা ও ছন্দ, তালের ব্যবহার, বাঙালির নন্দনজাত রঙ রেখার ব্যবহার, বাঙালির চির পরিচিত সুর ধ্বনি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি এবং এই নান্দনিক শিল্প রুচির ব্যবহার বাঙলা নাটককে বিশ্বরঙ্গ মঞ্চে একটি স্বতন্ত্র মর্যদা দানে সমর্থ। কিন্তু হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক হওয়া সত্ত্বেও পাশাত্যেও প্রভাবে আমরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যকে যেন এক পাশে সরিয়ে রাখতে অভ্যস্ত হয়ে পরেছি।

দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, অনেক থিয়েটার ও নাট্যবোদ্ধারাই আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের পরিবর্তে বিজাতীয় সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গে অতি আগ্রহী। আত্ম পরিচয় যখন জাতীয় জীবনের মুখ্য তখন চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন কিংবা ইউরোপ দ্বিতীয় বিবেচনা বলে মনে করি। যারা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তাদের দোদুল্যমানতা আমাদের হতাশ করে বইকি।

আলোচনার অন্তে বলা যায় হাজার বছরের সংস্কৃতির ধারায় লালিত  ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের নানাবিধ পালা প্রত্যক্ষণ শেষে একথা বলতে দ্বিধা কাজ কওে না যে, ঐতিহ্যবাহী এই নাট্যাঙ্গিক শিল্পের নির্যাসে অনেক ঋদ্ধ। বাঙলা নাট্য মঞ্চের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের নানাবিধ নাট্যিক উপাদান যেমন এখানে উল্লেখ করা যায়, গুজরা সতীর বনবাস পালার অভিনয় কৌশল, অষ্টক পালার উপস্থাপনা, পদ্মার নাচনের নৃত্যভঙ্গিমা, মনসা মঙ্গনের বর্ণনা ও সঙ্গীত যা আধুনিক বা সমকালীন থিয়েটার চর্চায় ব্যবহৃত হলে আমাদের নাট্য শিল্প নিঃসন্দেহে উত্তরোত্তর  সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে আজ আমরা একথা দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করতে পারি।

 এস.এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন

এম.ফিল গবেষক

নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ

Check Also

3dec

ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা

মিডিয়া খবর:-          -:সাজেদুর রহমান:- বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর একের পর এক আক্রমণে সীমান্তবর্তী …

santal-village

আসব ফিরে আবার দেখ এইনা গায়েতে

মিডিয়া খবর :- সাঁওতাল বিদ্রোহের এক লোক কাহিনী। ১৮৫৫ সালে সুরু সাঁওতাল বিদ্রোহ। ‘বাজাল’ নামে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares