Home » নিবন্ধ » সংগীতের সুধা, সুধার সংগীত – প্লাবন ইমদাদ
musiac

সংগীতের সুধা, সুধার সংগীত – প্লাবন ইমদাদ

Share Button

সংগীতের সুধা, সুধার সংগীত-
প্লাবন ইমদাদ

ফিনল্যান্ড, ১৫ এপ্রিল:-
একবার শিল্পী সুমন চট্রোপাধ্যায়ের একটা ডকুমেন্টারি দেখছিলাম। একটা দৃশ্যে তিনি গাড়ীতে করে ঘুরছিলেন কলকাতার পথে। হঠাৎ একটা কামারের দোকান থেকে ধাতব পাত পেটানোর শব্দ কানে আসে শিল্পীর।শিল্পী কামারের সেই পাত পেটানোর শব্দের ছন্দ থেকে সাথে সাথে জন্ম দেন এক নতুন সুরের। সেই সুরের গায়ে কথার মালা জড়িয়ে রচিত হয় এক নতুন গান। সংগীত মানুষের ইনভেনশন নয়, ডিসকভারী যা তার স্বভাবের অতলে নিমজ্জিত ছিল অনাদিকাল থেকে। শুধু মানুষ কেন, পুরো জগতটাই তো ছন্দময়। দোয়েলের গান, ঝরনার তান, প্রিয় ফুলদানী ভাঙার অদ্ভুত শব্দ, ফিবোনাচ্চির অমোঘ নিয়মে সমুদ্রের ঢেউয়ের গান- সবই তো অন্তর্নিহিত সংগীত। মহান পিথাগোরাস তার কামারদেরকে বলতেন লোহা পিটিয়ে নানা আকারের ঘনবস্তু বানাতে আর তাতে তিনি পিটিয়ে পিটিয়ে আবিস্কারে করতেন নানা স্বর আর সুরের লুক্কায়িত রহস্য। এমনি করেই তিনি পৃথিবীকে দিয়ে যান স্বপ্তস্বরের ধারণা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো যে মহাজগতে যত রকম শ্রবণযোগ্য শব্দ রয়েছে তার সবই এই অঞ্চলের আওতাধীন। খুব সহজভাবে বলতে গেলে একটা ঝর্ণার কাছে দাড়িয়ে একটা হারমোনিয়ামে খুব সুন্দরভাবে সেই জল পতনের শব্দকে মেলানো যাবে, যেন ঝর্ণা হলো কন্ঠশিল্পী আর হারমোনিয়াম বাদ্য। এভাবে মানুষের কান্না, হাসি, কথা, পাখির ডাক, ফুটপাতে গড়িয়ে চলা পঙ্গু মানুষের কাঠের গাড়ী সবকিছুই সংগীতভুক্ত করা সম্ভব পিথাগোরাসের এই মহান তত্ব দিয়ে। ডারউইন যখন জগতের অপার রহস্য উৎঘাটনে বেরোলেন বিগল জাহাজে করে পৃথিবীর পথে পথে তখন বিবর্তনের অজস্র দৃষ্টিকোণের ভীড়ে সংগীতের মত গুরুত্বপুর্ণ বিষয় চোখ এড়িয়ে গেলোনা। ১৮৭১ সালে রচিত ‘দ্যা ডিসেন্ট অব ম্যান এন্ড সিলেকশন ইন রিলেশন টু সেক্স’ বইতে খুব সুন্দরভাবে ব্যাক্ত করেছেন, মানুষের পুর্বসূরিরা তাদের ভালবাসা ও কামের ভাষাগত প্রকাশ শেখার আগেই সংগীতকে প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে’। সংগীতের মাধ্যমেই অন্যান্য প্রাণীর মত মানব মানবীরাও এক সময় কাছে ডাকতেন, ‘প্রিয় এমনও রাত যেন যায়না বৃথা”র মত সুরে সুরে। হার্বাট স্পেনসার তার বিখ্যাত রচনা ‘On The Origin And Function Of Music’ এ খুব অসাধারনভাবে সংগীতের উৎপত্তি ও কার্যকারিতা সম্পর্কে তাবৎ ব্যাখ্যা দিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত প্রভাবিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাই লিখে ফেললেন তার সংগীত বিষয়ক প্রবন্ধ: সংগীত ও ভাব এবং সংগীতের উৎপত্তি ও উপযোগীতা। কবিগুরু তার ক্ষুরধার লেখনীতে ব্যাক্ত করেন, ‘মানুষেও সুখে হাসে, যন্ত্রণায় ছটফট করে! রাগে ফুলিতে থাকে, লজ্জায় সংকুচিত হইয়া যায়। অর্থাৎ শরীরের মাংসপেশীসমূহে মনোবৃত্তির প্রভাব তরঙ্গিত হইতে থাকে। মনোবৃত্তির অতিরিক্ত তীব্রতায় আমরা অভিভূত হইয়া পড়ি বটে, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও সাধারণ নিয়ম স্বরূপে বলা যায় যে, শরীরের গতির সহিত হৃদয়ের বৃত্তির বিশেষ যোগ আছে। তাহা যেন হইল, কিন্তু সংগীতের সহিত তাহার কী যোগ?’
আছে। মনের সাথে এ এক অদ্ভুত শরীরি যোগাযোগ। আমরা কথোপোকথনের সময় সাধারনত মধ্যম স্বর ব্যাবহার করি। কিন্তু কোন বিশেষ আবেগীয় অবস্থায় সেই মধ্যমা থেকে বিচ্যুত হয়ে হয় আমরা স্বরের অনেক উপরে চলে যাই অথবা অনেক নিচের ঘরে নেমে আসি। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত গুলো খেয়াল করলে দেখা যায় প্রথমে ‘আলাপ’ নামক এক নিন্ম স্বরের সূচনা সংগীত দিয়ে শুরু হয় যা ধীরে ধীরে উত্থিত হয় উর্ধ্ব স্বরে। শেষে সপ্তমীতে চড়ে ক্ষান্ত হয়। হার্ড রক গানগুলো পশ্চিমা বিশ্বে এমনকি ইদানীং আমাদের অঞ্চলেও যে লিরিক ব্যাবহার করে তার মধ্যে একটা প্রণোদনা বা প্রতিবাদ থাকে। তাই তার স্বর হয় অনেক উর্ধে, যেমনটি আমরা করি রেগে গেলে। আবার খুব বেদনাবিধূর গানগুলোর বেশীরভাগই হয় নিচু স্বরের। যেমন: কবিগুরুর গানগুলোই তো এমন। বেশীরভাগ গানই নিচু স্কেল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে উপরে যায়। এর ফলে পুরো সপ্তস্বর জুড়ে আমরা খুব আকুলভাবে প্রকাশ করতে পারি আমাদের ক্ষোভ, ঘৃণা, প্রেম, যন্ত্রণা, কাতরতা, কাম ও উদ্বেগ। আমারও পরাণও যাহা চায় কথার মত করে বললে যতটা না নিজের ভেতর থেকে সেই তীব্রতাটাকে বের করে দিতে পারি প্রিয়তমের কাছে তা থেকে অনেক বেশী পারি যখন কয়টি স্বর মিলিয়ে গলার পেশীগুলোকে চড়িয়ে নামিয়ে প্রকাশ করলে। আর তাই সংগীত জগতের অন্যতম মানসিক প্রতিষেধকগুলোর একটি।

২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘দ্যা কোরাস’ সিনেমার কথা চলে আসে প্রতিষেধক শব্দটা আসতেই। ফরাসি একজন ব্যার্থ সংগীতজ্ঞ আসেন এক অবাধ্য শিশুদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যেখানে বদমেজাজী প্রধান শিক্ষক তার মূলমন্ত্র মনে করেন, মাইরের উপর ওষুধ নাই। সংগীতজ্ঞ সেই চিরচারিত শাষণ নীতি বদলে অবাধ্য শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেন সংগীত নামক এক মোহময় পরশপাথরের সাথে। বদল যেতে ধরে শিশুদের মনোজগত।
আধুনিক মনোবিদ্যা মস্তিস্কের গহীনে প্রবেশিত হয়ে বের করে আনছে মস্তিস্কে উপর সংগীতের প্রভাব আর পরিবর্তন। সেই তত্বকে কাজে লাগিয়ে সংগীতকে পরিণত করেছে চিকিৎসা রুপে, এ এক অনবদ্য দৃষ্টিভঙ্গি। মহান সাধক লালন তার মৃত্যুর আগ রাতে ভোর অব্দি কেবল গান গাইতে থাকেন এবং ধলপ্রহরে গান গাইতে গাইতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নজরুল তার শেষদিনগুলোতেও বিহব্বলভাবে গান শুনতেন আর অঝোরে কাদতেন। সংগীত মানবের এমনি এক ব্যাকুল সৃষ্টি।

ধর্মীয় দিক থেকে সংগীত সম্পর্কে অনেক দ্ব্যার্থবোধক দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে। সেই দ্ব্যার্থবোধকতা দূরীভূতকল্পে লালন খুব সুন্দর করে গানে গানেই বলে গেছেন:

আল্লা নবীজির গান
পিরে আওলিয়ার শাণ
যে বলে হারাম সে তো জ্ঞানীহীন,
না বুঝে ভেদ বিধান
হারাম তোরা বলছ ক্যান
এই গান শুনে নবীর পিয়াসী……..

 

 

Check Also

pitha-660x330

শীতের পিঠা ছাড়া শীত যেন পূর্ণতা পায় না

মিডিয়া খবরঃ-      : সাজেদুর রহমান:- হলুদ পাতা চিঠি লেখে হাড়গিলাদের বাড়ি, আমার পাতা …

beauty-rizvi

বিউটি ও রিজভীর লোকগান

মিডিয়া খবর :- গীতিকার ফয়সাল রাব্বিকীনের কথায় দ্বৈতগানে কণ্ঠ দিলেন ক্লোজ-আপ ওয়ান তারকা বিউটি ও …

One comment

  1. ভাল লেগেছে লেখাটা, ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares