Home » টেলিভিশন » আমাদের টেলিভিশন, মানহীন গন্তব্য
tv logo

আমাদের টেলিভিশন, মানহীন গন্তব্য

Share Button

মিডিয়া খবর:-       -: তির্থক আহসান রুবেল:-

দর্শকরা আমাদের দেশের টিভি চ্যানেল দেখে না। অভিযোগটা পুরানো। কিন্তু কেন দেখবে তারা! এই প্রশ্নটি কখনো সামনে এসেছে আমাদের! দেশপ্রেমকে পুঁজি করে দেশীয় টিভি চ্যানেলের পর্দায় কেন চোখ রাখতে হবে, যখন আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো গণমানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠছে না! কতটা চাহিদা পূরণ করতে পারছে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো! আমাদের গণমাধ্যমগুলোই বা কতটা দায়িত্ব পালন করতে পারছে! যেখানে গণমাধ্যমের একটি খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঝড় তুলছে পক্ষে বা বিপক্ষে! আমাদের গণমাধ্যম বা মূল ধারার পত্রিকাতে কে কার সাথে লিভটুগেদার করছে, এমন একটা খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাবিধ তর্কে, হুমকি-ধামকিতে ঝড় তুলে, সেখানে অবহেলায় হারিয়ে যায় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তীদের মৃত্যু দিবস! তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে নৈতিকতা কোথায়! পত্রিকার পাতা ভরে যায় সানি লিওনের অন্তর্বাস নিঁখোজের খবর, কিন্তু উঠে আসে না সুপারহিট কিংবদন্তি মান্না কিংবা তারেক মাসুদের মৃত্যু দিবসের খবর তখন প্রশ্ন উঠে!

আলাপ হতে পারে আমাদের টেলিভিশন নিয়ে! দর্শক আমাদের টিভি কেন দেখছে না! সেটা কি বড় প্রশ্ন হতে পারে! নাকি প্রশ্ন হওয়া উচিত দর্শক আমাদের টিভি কেন দেখবে! কি দিচ্ছে আমাদের টিভি! সবাই সবাইকে নকল করছে! সবাই টক শো চালায়, সবাই লাইভ কনসার্ট চালায়, সবাই একই খবর চালায়। বিশ্বের আর কোন দেশে তাদের রাজনৈতিক দলের প্রতিটা মূহুর্ত্ব নিয়ে খবর প্রচার হয় কিনা জানি না। কিন্তু এদেশে হয়! প্রতিদিন সরকারের বড় নেতা থেকে শুরু করে আঁতিপাঁতি চুনোপুঁটি কি বললো, কি করলো সবই আমাদের খবরের অংশ। একইভাবে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান করা পক্ষ কে কি বললো না বললো, তাও দখল করে করে আমাদের চ্যানেলগুলোর লম্বা সময়। এসব খবরের বেশীরভাগ খুব কি গুরুত্বপূর্ণ? কিন্তু আমাদের চ্যানেলগুলোকে খুব গুরুত্ব সহকারে এই খবরগুলো পরিবেশন করতে হয়। করতে তারা বাধ্য। খবরের গুরুত্ব বলে বা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে যে একটা শব্দ আছে, তা বোঝা যায় না টেলিভিশন দেখে।

প্রতিটা চ্যানেলে নাটক-টেলিফিল্ম-মেগা সিরিয়ালের নামে চলছে কারণ ছাড়াই পর্দাকে ব্যস্ত রাখার প্রতিযোগীতা। দেশের বেশীরভাগ দর্শক এগুলোকে কোনভাবেই গ্রহণ করছে না। কারণ মানহীনতার চুড়ান্ত পর্যায়ে এগুলোর অবস্থান। কিন্তু কেন! প্রথমত দোষী আমাদের টিভি চ্যানেল। কারণ একটা নাটক বা টেলিফিল্ম ভালভাবে নির্মাণ করতে যে খরচ হয়, তা কোনভাবেই পাচ্ছে না নির্মাতারা। নির্মাতা যদিও এ দায় নেবার কথা না। কিন্তু এ দেশে নির্মাতাকেই প্রযোজক যোগাড় করতে হয়। কখনো সে নিজেই প্রযোজক। খরচ বাঁচাতে নির্মাতা ইউনিটকে অমানবিক প্ররিশ্রম করায়। অন্যদিকে আর্টিস্টরা ২ দিনের বেশী সময় দিতে কোনভাবেই রাজি নয়। আবার আর্টিস্ট যদি কোন কারণে ২ দিনের বেশী সময় দিতে চায়, তবে নির্মাতা সেটা গ্রহণ করতে পারে না। কারণ সেলিব্রেটি আর্টিস্ট এবং লাইট-ক্যামেরা সব মিলে প্রতিদিনের খরচ প্রায় লাখ টাকার কাছাকাছি। অথচ একটি নাটক বাবদ চ্যানেলগুলো খরচের সমান টাকা দিতেও রাজি নয়! ফলাফল মানহীন ৪০ মিনিটের ফুটেজ। দর্শক তার সময় অপচয় করে কেন কাটাবে এই ফালতু সময়টুকু! এবার প্রশ্ন আসছে চ্যানেল কেন একটা নাটকের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ দিচ্ছে না! এটা খুব মজার তথ্য যে, মানহীন নাটকে তাদের আয় কম। মানে বিজ্ঞাপন বাবদ তারা সেভাবে টাকা পাচ্ছে না। কিন্তু বিজ্ঞাপন বাবদ তারা সেভাবে আয় করতে পারছে না কেন! প্রথমত একেক চ্যানেলে একই প্রতিষ্ঠান একেক রেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। মূলত চ্যানেলের গ্রহণযোগ্যতা এবং দর্শকদের রেটিং এর উপর এটা নির্ভর করে। এর বাইরে চ্যানেলের মার্কেটিং বিভাগের দূর্বলতা এবং মানহীনতা অন্যতম। এরও বাইরে ভয়াবহ আরেকটা ব্যপার ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে! আর তা হলো, সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে বিজ্ঞাপনী এজেন্সি সমূহ নিজেরাই নাকি এখন নাটক সরবরাহ করছে চ্যানেলগুলোতে এবং তার বিনিময়ে বিজ্ঞাপন দেয়। ফলে স্বাধীন নির্মাতা বা লবিংহীন নির্মাতারা আরো বেশী সংকটে পড়ছে। ফলে পুরোদমে একটা দুষ্ট চক্রের খপ্পরে পড়ে গেছে টেলিভিশন নাটক। যার দরুণ মানহীনতার চুড়ান্ত ফলাফল সামনে দাঁড়িয়ে আছে মহিরূহ হয়ে। চ্যানেল যখন নিজেই বাছাই করতে পারছে না মানসম্পন্ন নাটক-টেলিফিল্ম, তখন দর্শক কেন ভরসা করবে! আরো একটা ভয়াবহ ব্যপার হচ্ছে, কখনো কখনো চ্যানেল ঠিক করে নাটকের প্রধান চরিত্র সমূহ কারা হবে! মানে চরিত্রের সাথে যায় কি যায় না সেটা বড় কথা নয়! তাদের পছন্দের আর্টিস্ট নিতে হবে। হয়ত সেখানেও লবিং! ফলে সে আর্টিস্টও লবিং এর গুণে রেট বাড়িয়ে বসে থাকে! ফলাফল, বাজেটের বেশীর ভাগ খরচ আর্টিস্টের পিছনে! ফলে নাম মাত্র খরচে প্রি এবং পোস্ট প্রোডাকশনের ব্যয় নির্বাহ। আর সবটাই নাকি বিজ্ঞাপন পাওয়া না পাওয়ার উপর নির্ভর করে। ফলাফল পরিচালক হিসেবে ব্যক্তিটির নাম টাইটেলে দেখা যায়। কিন্তু মূল খরচের আনুমানিক হাজার বিশেক বখরা। আর বিজ্ঞাপনের নামে অত্যাচারের কথা না-ই বা বললাম। শোনা যায়, বিজ্ঞাপন চালানোর প্রয়োজনে নাটক/টেলিফিল্মের দৈর্ঘ্য কেটে ফেলতেও দ্বিধা করে না চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। কেউ ভাবে না, দর্শক নাটক/টেলিফিল্ম দেখতে বসেছে, বিজ্ঞাপন না। বিজ্ঞাপন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু তার মাত্রাও নির্ধারণ জরুরী। ভয়াবহ আরেকটি ব্যপার হচ্ছে, নাটক আদৌ প্রচার হবে কিনা কেউ জানে না। যদি সেটা কোন রকম হয়, তার বিল কবে পাবে সেটা নির্ভর করে চ্যানেলের মর্জির উপর। সাধারণত মাস তিনেক লেগে যায় সে টাকা আদায়ে। সব মিলেমিশে একটা নাটক নির্মাণ এবং অনএয়ার হবার পর সব মিলিয়ে প্রায় ছয় মাস লেগে যায় চ্যানেল হতে টাকাটা তুলতে।

প্রায় প্রতিটা চ্যানেলে প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে শুরু হয় টক শো। বেশীরভাগ পরিচিত মুখ গতানুগতিক ভাবনার বাইরে আর কোন দর্শনই দিতে পারে নি। সবচেয়ে বড় ব্যপার, দর্শকরা বিশ্লেষকদের মুখ দেখেই বলতে পারে যে, কে কোন দলের প্রতিনীধি হিসেবে টকশো তে উপস্থিত হয়েছে। ফলে দর্শকরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে বিশ্লেষণের কোন নিদর্শন পান না। তবে বিজ্ঞাপনী বাজারে এই তথাকথিত বিশ্লেষকদের আবার দাম অনেক। ফলে চ্যানেলগুলো টক শোর মাধ্যমে মুটামুটি আয় করে যাচ্ছে।

কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, এটাই সত্য যে আমাদের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত। কে সরকারে আছে আর কে নেই, সেটা বিবেচ্য নয়। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত এটাই সত্য। পাশাপাশি এটাও সত্য যে, যাদের গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে, তারা এই সেক্টরটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। হয়ত তারা শুধুমাত্র ব্যবসায়িক ভাবনা থেকে একটি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করছেন! কিন্তু যে কর্মীরা সেখানে কাজ করে, বিশেষত তরুণ নবীন কর্মী যারা তারা! ফলে আদর্শগত একটা দ্বন্দ মানসিকভাবে তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যপার, একজন মালিক বা লাইসেন্স হোল্ডাররা কোটি কোটি টাকা খরচ করে হয়ত একটি স্বপ্নের বুনন গাথেন! কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দুষ্টু চক্রের খপ্পরে ধ্বংস হয় তার স্বপ্ন, আর্থিক ক্ষতি লুটপাট চলে নানা ছুতায়, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পড়ে চ্যানেলের তরুণ নবীন কর্মীরা। যা প্রভাব ফেলে তার দায়িত্বপালনে। টিভি পর্দায় কি তার প্রভাব পড়ে না! ফলে মালিকপক্ষও হচ্ছে নানাভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ। যার প্রভাব অবশ্যই কর্মীদের উপর পড়ে।

সব মিলিয়ে এটা পরিস্কার যে, আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো চলছে চরমতম অস্থিরতার মাঝে! আর তার বলি হচ্ছেন দর্শক, নির্মাতা, কর্মজীবি থেকে শুরু করে সর্বমহল। কর্মীরা চাকরীর খাতিরে চ্যানেলগুলোর সাথে জড়িত থাকলেও, দর্শকরা কোন আগ্রহ অনুভব করছে না দেশীয় চ্যানেলগুলোর প্রতি। ফলে তারা মেতে উঠেছে ভারতীয় চ্যানেলগুলো প্রতি। কিন্তু এর জন্য দোষী কে! চ্যানেল? চ্যানেলের কর্মী? চ্যানেলের কর্মকর্তা? বিজ্ঞাপনী সংস্থা? নির্মাতারা? দর্শকদের উদাসীনতা? কোন গোপন সিন্ডিকেট? ভাবনায় অনেক রকম নাম আসতে পারে! কিন্তু চুড়ান্ত নাম যে কোন ভাবেই হোক মানহীনতা!

বি.দ্র.: লেখাটি ‘মিডিয়া ওয়াচ‘ এর চলতি সংখ্যায় (বর্ষ:২ সংখ্যা: ২৩) এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

# লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

tirthokduet@gmail.com

Check Also

ittadi-chandpur

ইত্যাদি দিনাজপুরে

মিডিয়া খবর:- এবার দিনাজপুরে ধারণ হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি। দিনাজপুরের কুঠিবাড়ী বিজিবির …

jessore-6th-dec

যশোর মুক্ত দিবস

মিডিয়া খবরঃ-         সাজেদুর রহমানঃ- ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিনেই যশোর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares