Home » চলচ্চিত্র » একজন সাহসী কাজী হায়াতকে খুঁজে না পাওয়ার গল্প
kazi-hayat

একজন সাহসী কাজী হায়াতকে খুঁজে না পাওয়ার গল্প

Share Button

মিডিয়া খবর:-               -: ফজলে এলাহী পাপ্পু:-

গতবছর নারায়ণগঞ্জের প্রিয় শাকিল ভাইয়ের আমন্ত্রণে ও সৌজন্য বহুদিন পর সিনেমাহলে একটি ছবি উপভোগ করেছিলাম । কাজী হায়াত এর ‘ইভটিজিং’ নামের সেই চলচ্চিত্রটি ছিল দারুন । এক কথায় বলা যায় যারা বাংলা বাণিজ্যিক ছবিকে পোঁচায় তাদের জন্য ‘ইভটিজিং’ ছিল একটা বিরাট ধাক্কা। ডিজিটাল সিনেমা যে নাটক নয় তা তিনি প্রমান করেছিলেন ।ছবিটি দেখার পর আমাকে অনেকেই রিভিউ লিখতে বলেছিলেন । কিন্তু প্রিয় দারাশিকো ভাই ও স্নেহের জুবায়েদ দিপ এর রিভিউ দেখার পরে আমার আর কিছু লিখার প্রয়োজন মনে হয়নি । আমি আজ অন্য একটি বিষয়ে কথা বলবো ।
কাজী হায়াত বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সাহসী পরিচালকদের একজন । যার ছবির সাথে পরিচয় সেই শিশুকাল থেকেই । এরপর দুরন্ত কৈশোরে কাজীর দায়ী কে, দাঙ্গা, ত্রাস, সিপাহী, চাঁদাবাজ , দেশপ্রেমিক এর মতো সাহসী ছবিগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে ।আজ থেকে ২০ বছর আগে নির্মিত কাজীর ‘দেশপ্রেমিক’ ছবির প্রেক্ষাপট আজকের বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে একদম মিলে যায় । একজন পরিচালক কতটা দূরদর্শী হলে এমন ছবি বানাতে পারেন ভাবলে আজো অবাক হই । একজন মেধাবী চিত্র পরিচালক সাহসী ছবি নির্মাণ করায় কিভাবে সরকারের রোষানলে পরে জীবনটা ধ্বংস হয়ে যায় সেই চিত্রটি ‘দেশপ্রেমিক’ ছবিতে তিনি তুলে ধরেছিলেন । kazi-hayat-maruf
কাজী বরাবরই সাহসী । কিন্তু ‘ইভটিজিং’ ছবিতে কাজীকে সেইভাবে খুঁজে পাইনি । কাজী কখনও তাঁর একটি গল্পের ভেতরে সমসাময়িক একটি বিষয় নিয়ে থাকেননি। তিনি প্রাসঙ্গিক আরও অনেক বিষয় তাঁর একটি গল্পের ভেতরে তুলে ধরেন । কিন্তু ‘ইভটিজিং’ গল্পে ছবিটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঐ একটি বিষয়ের দিকেই ছিলেন যা কাজীকে মানায় না। আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে কাজী যেন আরও কিছু বলতে চেয়েছেন কিন্তু তা বলতে পারছেন না কোন একটা কারনে। হয়তো শেষ বয়সে এসে অপমানিত হওয়ার ভয়ে কাজী সমসাময়িক আর কোন বিষয় নিয়ে ছবিতে কথা বলেননি । তবে একটা জায়গায় খুব অল্প সময়ের জন্য চেনা কাজীকে খুঁজে পেয়েছিলাম । ছবিতে কাজী হায়াত নিজে অভিনয় করেছিলেন মনি ডাক্তার নামে একজন হিন্দু ডাক্তারের চরিত্রে । সেই মনি ডাক্তারের সবাই বহু আগে চলে গেছে ভারতে শুধু তিনি নিজেই রয়ে গেছেন বাংলাদেশে । গ্রামের চেয়ারম্যান মিজু আহমেদ এর সাথে একটি কথোপকথনের দৃশ্য মিজু আহমেদ কাজীকে ভয় দেখাচ্ছিলেন এই বলে ‘’ ডাক্তার তুমি কেন বাংলাদেশে পরে আছো । তোমার সবাই থাকে ভারতে। তুমিও এইদেশ থেকে যাওগা । দেশের অবস্থা ভালো না, দেখতেছো না দেশে হিন্দু গো ঘর বাড়ী পোড়াই দিতেছে, কোনদিন আবার তোমার ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দেয়, আগুনে পুইরা মরার চেয়ে ভারতে যাওয়া ভালো না?’’ । উত্তরে কাজী বলেছিলেন ‘’ দেখো চেয়ারম্যান , আমারে ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নাই। এইদেশের মানুষ কোনদিন সাম্প্রদায়িক ছিল না এবং আজো নেই। এই দেশে আমরা হিন্দু ,মুসলিম, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান সবাই যুগ যুগ ধরে মিলেমিশে বাস করছি ও করবো। এই দেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ , খ্রিস্টান সবার। তোমাদের মতো কিছু স্বার্থবাদী লোক হিন্দুদের ঘর বাড়ী , মন্দির পুড়িয়ে রাজনীতির খেলা খেলছো। বাংলাদেশের মানুষ এখন সব বুঝে, তোমাদের এই খেলা আর চলে না ‘’ । এই সংলাপটির মাঝে কাজী সমসাময়িক একটি বিষয়ের উপর তাঁর সাহসী বক্তব্য তুলে ধরেছেন । উনি কাদের ইঙ্গিত করেছে সেটা স্পষ্ট। এই অল্প একটু সময় মনে হয়েছিল হ্যাঁ, এইতো সেই কাজী হায়াত যাকে এতক্ষণ ধরে খুঁজছিলাম । ছবির শেষ দৃশ্য মারুফের একটি সংলাপে ছিল বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশের কথা। অর্থাৎ কাজী বুঝাতে চেয়েছেন বর্তমান দুর্বিষহ অবস্থার বদলের স্বপ্ন তিনি দেখছেন । যে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ হলো সুখি ও সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ । সাধারন মানুষ যেমন আজকের অস্থির অবস্থার মাঝেও যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে কাজী সেই কথাটিই মারুফের মুখ দিয়ে বলতে চেয়েছেন ।
এই দুটো জায়গা ছাড়া পুরো ছবিতে খুব চেনা সাহসী কাজী হায়াত কে আমি খুঁজে পাইনি । বারবার মনে হচ্ছিল কাজী আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু বলতে পারছেন না । অথচ কাজী তো এমন ছিলেন না। ছাত্র রাজনীতি, গডফাদার সাংসদ, সরকারি দলীয় চাঁদাবাজ, চাটুকার প্রশাসন সহ আমাদের ঘুণে ধরা নষ্ট রাজনীতি ও সমাজপতিদের তুলধুনো করেছিলেন কাজী হায়াত। সেই কাজী হায়াত আজ কেন মনের কথাগুলো বলতে পারছেন না? যে কাজী হায়াত আজ থেকে বিশবছর আগে ‘’দেশপ্রেমিক’’ ছবিতে বলেছিলেন ‘শিল্পীকে তোমরা বাঁধা দিও না।শিল্পীর মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করো না । শিল্পীকে তাঁর কথা বলতে দাও ।‘’ সেই কাজী হায়াত যেন আজ নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেছেন । সেই কাজী হায়াত শিল্পী হিসেবে আজ স্বাধীনভাবে তাঁর কথা বলতে পারছেন না । কাজীর সেই ছবির সাথে আজ এ যেন নির্মম এক বাস্তবতার এক অদ্ভুত মিল । নিজের নির্মিত ছবির সাথে আজকের নিজের জীবনের বাস্তবতার এই অবিশ্বাস্য মিল দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি সেদিন। কাজীর এই বলতে না পারাটা প্রমান করে আজ বাংলাদেশের কোন শ্রেণির মানুষ স্বাধীন নয়। কেউ স্বাধীনভাবে তাঁর ক্ষোভ, ঘৃণা প্রকাশ করতে পারছে না। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।আমাদের জন্মগত নাগরিক অধিকার থেকে আজ আমরা বঞ্চিত। অন্যায় অসত্যর বিরুদ্ধে প্রতিবাদগুলো আজ মানুষের বুকের ভেতর চাপা পরে যাচ্ছে । অনেক কিছু না বলেও কাজী তাঁর নীরবতা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন আজ আমরা নিজ দেশেই পরাধীন। হয়তো নীরব থেকে কাজী আমাদের এই সত্যটাই বুঝাতে চেয়েছেন ।

সবশেষে কাজী হায়াত এর জন্য থাকলো অনেক অনেক শুভকামনা ও শ্রদ্ধা। আল্লাহ যেন সাহসী এই মানুষটিকে সুস্থ ও নিরাপদে রাখেন । কারন গুম, হত্যা , সাম্প্রদায়িক উস্কানি, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, নিজ ঘরে সাংবাদিক দম্পতি খুন, র্যা বের কিলিং মিশন সহ অনেক অনেক ঘটনা গত কয়েক বছরে জমা হয়েছে যেগুলো দিয়ে সাহসী কাজী হায়াত এর কাছ থেকে আরও অনেক সাহসী ছবি পাওয়ার বাকি আছে আমাদের । যা কাজী হায়াত ছাড়া আর অন্য কেউ নির্মাণ করতে পারবে না । ভালো থাকুন প্রিয় কাজী হায়াত ।।

Check Also

রীনা ব্রাউন

মুক্তি পাচ্ছে রীনা ব্রাউন

মিডিয়া খবর:- আগামী ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার স্টার সিনেপ্লেক্স প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে চলচ্চিত্র …

Nusrat-Faria

শুভ ও নুসরাত ফারিয়ার ধ্যাৎতেরিকি

মিডিয়া খবর :-  সব প্রতিক্ষার অবসান শেষে এবার শুটিং শুরু হল আরেফিন শুভ ও নুসরাত ফারিয়ার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares