Home » রেডিও » বাংলাদেশ বেতারের ৭৫ বছর
redio-bangladesh

বাংলাদেশ বেতারের ৭৫ বছর

Share Button

মিডিয়া খবর :-           -: মিয়া সালাহউদ্দিন:-

রেডিও উদ্ভাবনের আগে প্রথমে চলে আসে রেডিও টেলিগ্রাফি ও রেডিও টেলিফোনির কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এটি আবিষ্কার হয়। ১৮৬০ সালের দিকে জার্মান বিজ্ঞানী হেনরিস হার্টস তড়িৎ চুম্বক-তরঙ্গ আবিষ্কার করেন। যোগাযোগ মাধ্যম সহজতর এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৮৯৮ সালে ২৪ বছর বয়সে ইতালিয়ান তরুণ বিজ্ঞানী গুইলিইমো মার্কোনি বিশ্বে প্রথম রেডিও আবিষ্কার এবং তার বাণিজ্যিক সার্ভিস চালু করেন। এরপর পেরিয়ে গেছে বেতার সমপ্রচারের ১১৬ বছরের ইতিহাস। এর মধ্যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে। তিরিশের দশকে জার্মান যুদ্ধবাজ একনায়ক হিটলার যুদ্ধভীতির জন্য রেডিও ব্যবহার করেন। ফলে হিটলারের তথা তৃতীয় রাইখের উত্থানের মূলে রেডিও’র ক্ষমতাই বেশি প্রাধান্য ছিল। ভারতবর্ষে ১৯২৭ সালে বেসরকারিভাবে মুম্বইতে সর্বপ্রথম বেতার কেন্দ্র চালু হয়। কলকাতায় চালু হয় ১৯৩৩ সালে। শুরুতে বেসরকারিভাবে চালু হলেও পরে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকার ১৯৩৬ সালের দিকে নিয়ন্ত্রণে আনলে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ নামে পরিচিতি লাভ করে।  তখন থেকেই শুরু হয় এই উপমহাদেশে বেতারের সর্বজয়ী যাত্রা। আমাদের দেশে বেতার সমপ্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও-ঢাকা ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র’ নামে। ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে একটি ভাড়া বাড়িতে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে…’ গান দিয়ে। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচার বেতারের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এ ভাষণ প্রচারের পর সর্বস্তরের মানুষ তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট নামে খ্যাত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের এক বলিষ্ঠ প্রচার কা-ারি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত কালজয়ী গান ও অনুষ্ঠানগুলো একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে দেশের জনগণকে স্বাধীনতার দিকে অনুপ্রাণিত করেছে। ১৯৩৯ সালে নাজিমুদ্দিন রোডে বেতার সমপ্রচার কার্যক্রম শুরু হলেও পরে ১৯৬০ সালে ঢাকার শাহবাগে বেতার ভবন পুনঃস্থাপন করা হয়। পরে আবার ১৯৮৩ সালে আগারগাঁওয়ে বেতার ভবন স্থাপন করা হয়। আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা কেন্দ্রটি মূলত ‘জাতীয় বেতার ভবন’। এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেতার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রদান করে জনগণের জীবনমান উন্নীতকরণে শিক্ষাদান, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা, বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা ও শিশু মৃত্যুহার কমানো এবং সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বিনোদন দেয়া, সরকারের নীতি, কার্যক্রম ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে শ্রোতাদের অবহিত করা, জাতীয় উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতন করার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নত করা এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে সেতুবন্ধন স্থাপন করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেতার জনগণের জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমানে দেশের নানা স্থানে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতার প্রতিদিন ২৭৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট অনুষ্ঠান প্রচার করছে। আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ঠাকুরগাঁও, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দারবান ও কুমিল্লা। এছাড়া অনুষ্ঠান প্রচারে ইউনিটগুলো হচ্ছে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস, বহির্বিশ্ব কার্যক্রম, বাণিজ্যিক
কার্যক্রম, কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেল এবং ট্রাফিক সমপ্রচার কার্যক্রম। অন্যদিকে আরও আছে শিক্ষা, সংগীত ও লিয়াজোঁ বিভাগ। বিদেশী শ্রোতাদের জন্য বহির্বিশ্ব কার্যক্রম থেকে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, নেপালি ও আরবি ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। বাংলাদেশ বেতার থেকে অনুষ্ঠান ও সংবাদ প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫টি মিডিয়াম ওয়েব, দুটি শর্ট ওয়েব এবং ৩৩টি এফএম ট্রান্সমিটার। কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থা ও সব আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে মোট ৬০টি বুলেটিন প্রতিদিন প্রচার হয়। উন্নয়নের গতিধারায় বেতারকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করার কার্যক্রমও এগিয়ে চলেছে। প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ সরাসরি অথবা রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রচার করা হয়। এছাড়া মন্ত্রীদের রেকর্ডকৃত কার্যক্রম সংবাদ প্রবাহে প্রচার হয়। ‘বেতার বাংলা’ নামে একটি দ্বিমাসিক ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা রয়েছে। ঢাকার ধামরাইয়ে ১০০০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন ট্রান্সমিটার দ্বারা ঢাকা ‘ক’ সমপ্রচারিত হয়। বাংলাদেশ বেতার একটি পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান। দেশের আপামর জনগণ বা অগণিত বেতার শ্রোতার পছন্দ-অপছন্দ মেনে সুবিধাজনক প্রকরণের মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রগতি, তথ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার
করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বেতার দেশ গড়ার কাজ করছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৬ সালে বাংলাদেশ বেতারকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়। এছাড়া বিদেশে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবিইউ, এআইবিডি, কমনওয়েলথ (সিবিএ), মীনা মিডিয়াসহ এ পর্যন্ত ৩৯টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে। আগামী ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ বেতার ৭৫ বছর  পূর্তিতে ‘হীরক জয়ন্তী’ উদযাপন করবে। এ  উপলক্ষে ১৫ থেকে ১৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাপক ও আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানমালা ১৫ই ডিসেম্বর উদ্বোধনের ব্যাপক প্রস্তুতি এখন চলছে।
লেখক: কবি ও বেতারকর্মী

(courtesy – daily manabjamion, www.mzamin.com)

Check Also

rediobg.24.com-1

পরীক্ষামূলকভাবে চালু হল রেডিওবিজি২৪.কম

মিডিয়া খবর :- বাংলাদেশের সংগীতের যাদুঘর হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছিল রেডিওবিজি২৪.কম। তারপর হঠাৎ ছন্দপতন। দীর্ঘদিন বন্ধ …

bangladesh betar

শুরু হলো বেতারের চারদিনের আয়োজন

মিডিয়া খবর :- হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে চার দিনব্যাপী নানা বর্ণাঢ্য আয়োজন শুরু হল বেতারের,  আজ ৭৫ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares