Home » মঞ্চ » ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবণা ২য় পর্ব-
fol-webd-8

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবণা ২য় পর্ব-

Share Button

সমকালীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবণা

এস.এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন

২য় পর্ব-

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের প্রায় সবগুলো আঙ্গিকের মধ্যেই রয়েছে নৃত্যের অস্তিত্ব। উক্তি-প্রত্যুক্তি মূলক সংলাপ, নিরেট বর্ণনা আর সঙ্গীতের পাশাপাশি এসকল নাট্যের বি¯তৃত পরিসর জুড়ে আছে নৃত্য। এ নৃত্য সমূহ যথার্থই নাট্যমূলক। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের এসকল  নৃত্যে একই সঙ্গে ধৃত সঙ্গীত, সংলাপ এবং অভিনয়ের অজ¯্র উপাদান। সবকিছুই এখানে অবিচ্ছিন্ন সূত্রে গ্রথিত। আমরা পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষণ করলে দেখবো শাস্ত্রীয় নৃত্যের মত অঙ্গ-উপাঙ্গের নানাবিধ ব্যবহার ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের নৃত্যে খুব একটা দেখা যায় না। অর্থাৎ শাস্ত্রীয় নৃত্য যেখানে শাস্ত্রে নিয়মনীতির নিগড়ে আবদ্ধ ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের নৃত্য সেখানে স্বাধীন স্বতঃস্ফুর্ত। ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের সকল নৃত্যকলায় হাব ও ভাব তাদের নিজস্ব সৃষ্টি। এসকল নৃত্যে পা, কোমর, নিতম্ব এবং হাতের ব্যবহার তাদের স্বতঃস্ফুর্ত ভাব চেতনার ফসল। আমরা আধুনিক থিয়েটার চর্চায় যদি ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যেকে উপস্থাপন করতে চাই তাহলে বাঙালির এই স্বকীয় নৃত্য ভঙ্গিমা উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের অভিনয় ক্রিয়ায় আধুনিক কালের শাস্ত্রে শিক্ষিত অভিনেতা-অভিনেত্রীর ন্যায় গ্রামীণ শিল্পীরাও শারীরিক ও মানসিকভাবে আপন আপন ভ্যক্তি সত্ত্বায় নাট্যে উল্লেখিত চরিত্রের ব্যক্তিত্ব আরোপ করার প্রস্তুতি নিয়েই মঞ্চে উত্তীর্ণ হন। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শিক্ষিত নাট্যকর্মীর মত এসকল গ্রামীণ শিল্পীদেও নেই নাট্যকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অথচ তারাও গীত-নৃত্য সহযোগে কাহিনী উপস্থাপনের নিমিত্তে চরিত্রের মত করে এবং চরিত্রের মত হয়ে অভিনয় সম্পন্ন করে দর্শংক শ্রোতার চিত্তে রসের সঞ্চার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। অভিনেতা-অভিনেত্রীগণ নৃত্য-গীত-সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রের সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে এক ধরণের ভাব সৃষ্টি করেন এবং দর্শক শ্রোতার সম্মুখে তার প্রকাশ ঘটান শাস্ত্রেও কোন প্রয়োগ কৌশলের অনুকরণে নয় বরং নিজস্ব সহজাত অভিনয় ক্রিয়া এবং শারীরিক ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও চলনে।

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের উপস্থাপনে দোহারগণের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি এ নাট্যের পরিবেশনাশৈলীতে রয়েছে নৃত্য,গীত এবং কথা বা বর্ণনার সমাহার। গীত নির্ভর কাহিনীকে উপস্থাপন করার নিমিত্তে অভিনেতা-অভিনেত্রীদেও সহযোগীতায় মঞ্চের একপাশে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসে দোহারগণ। যথাযথ তাল লয়ের সৃষ্টি এবং গানের অংশ বিশেষ গাওয়ার মধ্য দিয়ে দোহারগণ অভিনয় ক্রিয়াকে তরান্বিত কওে এগিয়ে নিয়ে যায়। অভিনেতা বা অভিনেত্রী মঞ্চে যে বর্ণনাত্মক গীত শুরু করেন তারই একটি অংশ ‘ধূয়া’র মধ্য দিয়ে দোহারগণ বা বাদ্যযন্ত্রী একটি আলাদা মাত্রা দিয়ে থাকেন।

ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের পরিবেশনা পাশ্চাত্যের প্রসেনিয়াম মঞ্চ কিংবা শহুওে কলাকৌশল সমৃদ্ধ নানাবিধ মঞ্চে সম্পন্ন হয় না। এ ধরণের নাট্য যেহেতু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাই এই নাট্য উপস্থাপিত হয় লোকজ ভক্ত রসিক জনের আসরে। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্য বা আখ্যান পালা পরিবেশিত হয়আসর কেন্দ্রিক। গ্রামীণ পরিবেশ, কখনো ভুমি সমতল চৌকোণ খোলা মঞ্চ, কখনো মন্দির সম্মুখ, কখনো নাট মন্দিও বা মন্দিরের চাতাল, কখনো গৃহস্থ বাড়ির উঠান বা কখনো গ্রামের হাট-বাজারের বটতলা নদীর পাড়ে ভুমি সমতল মঞ্চ অথবা বাঁশ বা কাঠ দিয়ে নির্মিত চৌকোণ খোলা মঞ্চে এ ধরণের ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের পরিবেশনা হয়ে থাকে। ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের অনেক আঙ্গিকই কৃত্য নির্ভর নাট্য হিসেবে বিবেচ্য। নিরাভরণ মঞ্চ এবং নিরাভরণ পরিবেশের মধ্যে ভক্ত রসিক জনের সম্মুখে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের পরিবেশনা করা হয়। যেখানে দর্শক শহুরে থিয়েটার দর্শকের মত সুশৃঙ্খলভাবে কোন চেয়ারে বসে টিকেট কেটে অন্ধকারে নাটক দর্শন করতে হয় না। ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের ভুমি সমতল আসরে দর্শকগণ একই সাথে ভক্ত ও দর্শক হিসেবে আবির্ভূত হয়। ঘাস, মাদুর বা খড় বিছিয়ে মঞ্চের চতুর্দিক ঘিরে ভক্ত দর্শকগণ আসন গ্রহন করেন। পাশ্চাত্যেও নাট্যতত্ত্বের ত্রি-ঐক্যের মত ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের স্থান-কালের কোন ঐক্য দেখা যায় না। এখানে একই সাথে গৃহস্থ বাড়ির উঠান কখনো রাজ প্রাসাদ, বন, বেহুলার ভাসানের নদীর চিত্রকল্প গায়েনের গীত নৃত্য বর্ণনার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সমকালীন থিয়েটার চর্চা প্রসঙ্গে বলা যায়, সহ¯্র বছর ধরেই এই উপমহাদেশের লোকায়ত সংস্কৃতিতে নাট্যমাধ্যম একটা প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। অনেক ভাঙ্গাগড়ার পর মধ্যবিত্তের প্রয়োজনে এবং মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক একটা নাট্যচর্চা গড়ে ওঠেছিল কোলকাতাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু তখনও পূর্ববঙ্গে অনিয়মিত এবং নিয়মিত নাট্যচর্চা হয়েছে। পালা-পর্বণ-উৎসবে এই নাট্য ধারা চলে আসছে। নাট-মন্দির ও বিভিন্ন শহরের প্রাচীন মঞ্চগুলোতে সে নিদর্শন রয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর এই ধারা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ঢাকায় মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে একটা পেশাদার নাট্যচর্চার সূচনা দেখা যায়। কিন্তু নানা কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ড্রামা সার্কেলের নাট্য উদ্যোগটাও ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু বিক্ষিপ্ত নাট্যচর্চা আমাদের নাট্যসংস্কৃতির এ বহমান ধারাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ষাটের দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাটককে গণমানুষের একটা হাতিয়ার হিসেবে দাঁড় করাবার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তারপর আসে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধেও চেতনা ও সামাজিক কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ কিছু নাটকপ্রিয় তরুণ-তরুণীর প্রচেষ্টায় ক্রমে বিভিন্ন নাট্যদল গড়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে গ্র“প-থিয়েটার চর্চার সূত্রপাত হয়। ক্রমশ এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলোতে। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আজ বাংলাদেশে শতাধিক নাটকের  দল তাদের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে বেগবান রাখার জন্য  নিয়মিতভাবে নাটক মঞ্চস্থ করে যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের সমকালীন থিয়েটার চর্চায় আরো কিছু ধারা প্রবহমান-১. পেশাজীবি নাট্যচর্চা, ২. পথনাটক চর্চা, ৩.মুক্ত নাটক, ৪. উন্নয়ন নাট্য চর্চা, ৫. গ্রাম থিয়েটার চর্চা।

Check Also

rajar chithi

ভারতের উৎসবে রাজার চিঠি

মিডিয়া খবর:- জাগরণী থিয়েটারের ১৫তম প্রযোজনা ‘রাজার চিঠি’ ভারতের নাট্যোৎসবে ৪টি প্রদর্শনী হবে। এ উদ্দেশ্যে …

paicho

হাসির নাটক পাইচো চোরের কিচ্ছার ৫০তম প্রদর্শনী

মিডিয়া খবর :- আগামী ১৭ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares