Home » সাহিত্য » গল্প » মিটসেফ – মোস্তাফিজুর রহমান টিটু

মিটসেফ – মোস্তাফিজুর রহমান টিটু

মিডিয়া খবর:-              -: মোস্তাফিজুর রহমান টিটু :-

মিটসেফ। কাঠের তৈরী এক সেলফ। ঠিক সেলফও না, কারন তারজালির ফ্রেমে আবদ্ধ দুই পাল্লার এক দরজাও থাকতো। আমাদের মত মধ্যবিত্ত পাকঘরের ( কিচেনরুম আর পাকঘর কিন্তু এক না…দুস্তর ব্যবধান ) অতি প্রয়োজনীয় আসবাব। নামটা অবশ্য ভুল। কোরবানীর ঈদের কিছুদিন ছাড়া আমাদের মত মধ্যবিত্ত সংসারে মিট মানে মাংস খুব কমই থাকতো মিটসেফে।

তাহলে কি থাকতো আমাদের মিটসেফে? দশজনের সংসার। হিসাব করা আয়। ফ্রিজ নামক বস্তুর কথা শুনেছি, দেখেছিও…ব্যস ঐ পর্য্যন্তই। তাই মাছের টুকরা কয়েকটা বেশী হলে অল্প হলুদ মরিচ লবন দিয়ে সেদ্ধ করে রাখা হতো মিটসেফে পরেরদিনের জন্য। ভাই বোনদের কারো না কারো এস,এস,সি অথবা এইচ,এস,সি পরীক্ষা। সীমিত সামর্থ্যের মাঝেও তাদের জন্য বরাদ্দ থাকতো এক গ্লাস দুধ। সেই দুধের ঠিকানাও ছিলো মিটসেফ। হঠাৎ হঠাৎ সেমাই পায়েসও থাকতো। আর একটা খাদ্যের কথা বিশেষভাবেই মনে পরে। খাটি বরিশালের ভাষায় হোতলানো চিংড়ি মাছ। অল্প হলুদ মরিচ লবন দিয়ে আধা সেদ্ধ চিংড়ি মাছ। আমাদের বাসায় যা নিয়মিত থাকতো। কখনো কখনো তিন চার দিন পর্য্যন্ত থাকতো। প্রতিদিন অন্তত একবার জ্বাল দেওয়া হতো। তারপর হঠাৎ এক শুভ সকালে মা কিংবা বড় আপা পিয়াজ মরিচ দিয়ে সেই তিন চারদিনের পুরোনো হোতলানো চিংড়ি মাছ ভর্তা করতো। পান্তা ভাত দিয়ে সেই চিংড়ি ভর্তা …আহ …অমৃত।

meatsafeমিটসেফ নিয়ে তিক্ত স্মৃতিও আছে। কোনো কারনে সেদিন বাসায় অনেক বাজার হয়েছে। মিটসেফ ভর্তি কয়েক রকমের মাছ, সামান্য মাংস। দুধের পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে সবে সরটুকু হাতে নিয়েছি এই সময়েই পায়ের আওয়াজ পেলাম। কোনোমতে ঢাকনা বদ্ধ করেই দৌড়। ঘন্টাখানেক পরে পাকঘরে মায়ের চিৎকার শুনে আবার দৌড়ে গেলাম। তাড়াহুড়ায় মিটসেফের দরজা বন্ধ করি নাই। এই সু্যোগে আমার চাইতেও বড় ছোঁচা বিড়াল কাজ সাবাড় করেছে। দশজনের প্রতিবেলার খাবার নিয়ে যাকে চিন্তা করতে হয় সেই মার চোখজুড়ে ছিলো হতাশা। সেই হতাশার মেঘ দ্রুত রাগে ঘনীভুত হয়ে লাঠির বাড়ি আকারে আমার পিঠে নেমে এলো।

কতকিছুইতো আমার-আমাদের জীবন থেকে ঝরে যায়…গেলো। কালির কলম, গানের ক্যাসেট, টু-ইন-ওয়ান রেডিও। আলগোছে মিটসেফও বিদায় নিলো এক সময়। এর অনেক অনেক পরে একটা মিটসেফের দেখা পেয়েছিলাম …

২০০৫ সাল। মিডনাইট কুরিরার নামে বেশ বড়সড় এক আমেরিকান প্রতিষ্ঠানকে কাস্টমার হিসাবে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলো। প্রতিষ্ঠানটা এতটাই বড় যে এক লাফে আমাদের প্রতিষ্ঠানের আয় দ্বিগুণেরও বেশী হয়ে যাবে। তাদের কাজের সমীক্ষার জন্য যে টাকা দিচ্ছে সেটাও বেশ ভালো। এই কাজের জন্যই লসএঞ্জেলেস যেতে হবে। লন্ডন অফিসের দুই বস আর ঢাকা অফিস থেকে আমার যাবার কথা। লন্ডনের দুইজনতো শুধুমাত্র প্লেনের টিকিট কেটেই যাত্রা নিশ্চিত করলো। বঙ্গসন্তানের আমেরিকা যাত্রাতো এত সহজ হতে পারে না। ভিসার জন্য আবেদন করে অপেক্ষা করছি তো করছিই। দুতাবাসে ফোন করলেই বলে তারাও অপেক্ষা করছে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স এর জন্য। অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। প্লেনের টিকিট বুক করে রেখেছিলাম। নির্ধারিত দিনের তিনদিন আগে যখন বুকিং বাতিল করবো ভাবছি ঠিক সেই সময়েই ভিসা পেলাম। মাত্র নয়দিনের সফর। তাই খুব বেশী প্রস্তুতির কিছু ছিলো না।

সময়মতই ঘটনাবিহীন ভাবেই লস এঞ্জেলস পৌছালাম। যদিও আমেরিকান ইমিগ্রেশন নিয়ে অনেক ভীতিকর গল্প শুনেছি এবং সেইমত কিছু মানষিক প্রস্তুতিও ছিলো। ভাগ্যগুনেই হোক বা অন্য কোনো কারনেই হোক সেরকম কোনো অভিজ্ঞতা হোলো না। ম্যানহাটানে ভাড়া করা এপার্টমেন্টে পৌছালাম লন্ডনের বসদের দুই ঘণ্টা আগেই। পরবর্তী সাত দিন কাজ নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এর মাঝেও যা লক্ষ্য করেছি তা হলো আমেরিকার সব কিছুই মনে হয় সাইজে বড়। গাড়ি বড়, বাড়ি বড়, বিশাল রাস্তা এমনকি বার্গারের সাইজও বিশাল। আর মানুষ। আমেরিকার মত দৈর্ঘ্য প্রস্থে এত বিশালাকার মানুষ আমি আর কোথাও দেখি নাই। আমি গড়পড়তা সাধারন মানুষের কথাই বলছি। একটা উদাহরণ দেই। মিডনাইট কুরিয়ার অফিসের রিসেপসনিষ্ট এর নাম ক্রিস। খুব হাসি খুশী যুবক। বিশাল ডেস্কের আড়ালে প্রায়ই দেখতাম মুখ গোল করে শিস বাজাচ্ছে। অফিসের কিচেনটা কোথায় জানি না। ক্রিসকে জিজ্ঞাসা করলাম। ক্রিস ঊঠে দাঁড়ালো আমাকে জায়গাটা দেখিয়ে দেবার জন্য। এই প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্য-প্রস্থের ক্রিসকে দেখলাম। সামনেই ছিলো প্রমান সাইজের এক আয়না। ছেলেবেলায় জনি ওয়েসমুলারের টারজান খুব প্রিয় ছিলো। আয়নায় ক্রিসকে প্যান্ট জামা পড়া টারজানের মতই লাগছিলো আর পাশে আমাকে ঠিক যেন প্যান্ট জামা পড়া শিম্পাঞ্জী চিতা।

শুক্রবার বিকেলেই লন্ডনের দুই বস ফিরে গেলো। আমার ফিরতি ফ্লাইট রোববার সকালে। চায়ের মগটা হাতে নিয়ে এপার্টমেন্টের বারান্দায় দাড়াই। একটু দুরেই প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশি দেখা যায় । ধীরে ধীরে বিকেলের আলো মরে যাচ্ছে, রাস্তার আলো জ্বলে ঊঠছে। এরকম সময়ে, এরকম পরিবেশেই আমাকে ভুতে ধরে। এই এপার্টমেন্টের চাইতেও ছোটো এক বাসায় দশজন মানুষের গাদাগাদি করে থাকা, সাড়ে চারফুট চওড়া গলিতে লাটিম ঘুরানোয় ব্যস্ত এক বালক, কোনোকিছুই ঠিকভাবে করতে না পারা ক্রমাগত হোচটে অতিষ্ঠ এক বোকা কিশোর…সিনেমা দৃশ্যের মতই চোখের সামনে ভাসে …ভাসতে থাকে। মাঝারি চিত্ত আর মাঝারি বিত্ত ছিলো পুঁজি। আর ছিলো ‘আর একটু ভালো থাকার নিরন্তর চেষ্টা’। তবুও ভুতটা কানের কাছে ফিসফিস করে ‘ভুল চরিত্রে ভুলভাল অভিনয় আর কত?’

ভুতের হাত থেকে বাঁচার জন্যই এপার্টমেন্ট থেকে বের হই। আগেই জানতাম লস এঞ্জেলসে পাবলিক বাস ট্রেন খুব অপ্রতুল। তাও এই কয়েকদিনের গবেষণার ফলে পা যুগল আর বাসে করেই পৌছে গেলাম হলিউড বুলেভার্ডের বিখ্যাত ওয়াক ওফ ফেমে। পুরোনো দিনের গ্রেটা গার্বো, অড্রে হেপবার্ণ, মেরিলিন মনরো, পল নিউম্যান থেকে শুরু করে আধুনিক কালের মাইকেল জ্যাকসন, উইল স্মিথ, ব্রুস উইলিস সহ অনেক তারকার হাতের ছাপ দেখতে পেলাম। ট্যুরিস্ট এলাকা। সর্বদাই লোকে লোকারন্য। অনেক হাসি খুশি চেহারার ভীড়ে হাঁটতে ভালোই লাগে। অনেক সময় নিয়ে রাতের খাবারও খেয়ে নিলাম এক ফাঁকে। এই করেই মনে হয় কিছুটা রাত হয়ে গেলো। এপার্টমেন্টে ফিরতে গিয়ে দেখি বাস সার্ভিস আজকের মত শেষ। অগত্যা ট্যাক্সি নিতে হলো।

“ভাই কি বাংলাদেশী?” ট্যাক্সিতে উঠতেই পরিষ্কার বাংলায় প্রশ্ন করলেন ট্যাক্সি ড্রাইভার।
-হ্যা। বুঝলেন কিভাবে? উত্তর দেই।
“বয়স চল্লিশ হয় নাই।তবুও এই রকম একটা খান্দানি টাক। চুলতো আর এমনে এমনে পরে নাইরে ভাই।“ হাসতে হাসতে বলেন ট্যাক্সি ড্রাইভার। অল্প সময়েই আলাপ পরিচয় হয়ে যায়। নাম জালাল। কিছু মানুষ আছে যারা খুব সহজেই আন্তরিকভাবে মানুষের সাথে মিশে যান। জালাল ভাই তেমনই। আপনি থেকে তুমিতে যেতে বেশী সময় নেন না।
“ছোটো ভাই থাকবা কয়দিন?”
-কালকের দিনটাই আছি। পরশু সকালে ফ্লাইট। উত্তর দেই।
“তাহলে ইউনিভার্সাল স্টুডিও আর ডিজনীল্যান্ড ঘুরে যাও।“
-সময় কম আর তাছাড়া টিকিটের খরচওতো বেশ।
“যতটুকু বুঝতে পারছি খরচ দিবেতো তোমার লন্ডনের কোম্পানি। তোমার এত চিন্তা কিসের। “
-তাও ভাই। কোথায় কোথায় বিনা পয়সায় ঘোরা যায় তাই বলেন।
“বুঝছি। কাল সকালে আমিই নিয়ে যাবো।“
-না না ভাই। নিয়ে যেতে হবে না। ঠিকানা দিলেই হবে।
“ভয় পাইও না ছোটো ভাই। তোমার কাছ থেকে ভাড়া না নিলেও আমার ক্ষতি হবে না।“ জালাল ভাই এর উত্তর শুনে আমার বেশ লজ্জা লাগে। আসলেওতো এই কারনেই নিষেধ করেছিলাম। এভাবেই এপার্টমেন্টে পৌছে যাই। ভাড়া মিটাই।
“ছোটো ভাই তোমার টয়লেটটা একটু ব্যাবহার করতে হবে। “
-ঠিক আছে আসেন ভাই। জালাল ভাই টয়লেটে একটু সময় নেন। এই ফাঁকে আমি দ্রুত দুকাপ চা বানিয়ে ফেলি।
“ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সব চাইতে বড় শারীরিক সমস্যা কি জানো?” টয়লেট থেকে বের হয়ে জালাল ভাই বলেন।
-কি ভাই ?
“ব্লাডার প্রেশার। এই জন্য যারা বেশীদিন ক্যাব চালায় তাদের অনেকেরই কিডনী রোগ হয়।“ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে জালাল ভাই।
-আপনি আমেরিকাতে কতদিন?
“আটবছর। এর আগে গ্রীস ইতালিতে ছিলাম পাঁচ বছর। সব মিলিয়ে তের বছর দেশে যাই না।“
-তাই নাকি? আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।
“ছোটো ভাই আমার জীবন কাহিনী সিনেমার মত। কোনোদিন সময় পেলে বলব। চোর, ঠগ, জোচ্চোর এর হাতে পড়েছি, কিছুদিন জেলও খেটেছি। এইবারের কন্ট্যাক্ট ম্যারেজটা ভালো। আশা করছি আগামী বছরের মধ্যেই কাগজ পেয়ে যাবো। কন্ট্যাক্ট ম্যারেজ কি জানোতো?”
-জ্বি শুনেছি কিছুটা।
“হুমম। কাগজের বিয়ে। নিউইয়র্কেও করছিলাম একটা। হারামী ছিলো। কয়েকদিন পর পর টাকার পরিমান বাড়াতে বলতো। কোনোমতে সেই গেরো থেকে মুক্তি পাইছি। এবারেরটা ভালো। মাসের এক তারিখ টাকা নিয়ে যায়। আর কোনো ঝামেলা নাই। বয়স হইয়া যাইতাছে। কাগজ হইলেই দেশে যাবো। বিয়ে শাদী করে সংসারী হবো। “ চা শেষ করেই চলে যান জালাল ভাই।

পরেরদিন সকালেই আবার আসেন জালাল ভাই। আমাকে নিয়ে বেভারলি হিলস, সান্টা মনিকা ঘুরে ভেনিস বিচে নিয়ে আসলো। আমি একরকম জোর করেই ভাড়া দিলাম। ট্যাক্সির মিটার বন্ধ ছিলো। তাই প্রকৃত ভাড়ার অর্ধেকই হয়তো দিতে পারলাম। তবুও ভালো লাগলো।

“এইখানে ঘোরাঘুরি করো। ভালো লাগবে। আমি ঘণ্টাতিনেক পরে এসে নিয়ে যাবো।“ জালাল ভাই বলেন।
-না জালাল ভাই। ঘণ্টা ধরে ঘুরতে আমার ভালো লাগে না। আমি একাই ফিরবো। উত্তর দিলাম। কিছুক্ষণ জোরাজুরির পর রাজী হলো জালাল ভাই। কিন্তু বললো পরেরদিন এয়ারপোর্টে পৌছে দিবে। পুরো ভাড়াই নিতে হবে- এই শর্তে রাজী হলাম।

ভেনিস বিচে ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগলো। রাস্তার যাদুকরদের যাদু দেখলাম, জিমন্যাস্ট দেখলাম, টুকটাক কিছু কেনা কাটাও করলাম। সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে এলাম। সকাল আটটায় ফ্লাইট। সকাল পাঁচটাতেই দেখি জালাল ভাই হাজির। হাতে বার্গার আর কফি।
“ছোটো ভাই খেয়ে নাও। প্লেনের খাবার কখন দিবে তারতো ঠিক নাই। “ অতএব খাবার হাতে নিলাম।
“বাবা মারা গেছে পাঁচ বছর। বড় বোনের অনেক আগেই বিয়ে হয়েছে। ছোটো ভাই আর এক বোনেরও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কত ছোটো দেখে এসেছিলাম ওদের। আর মা। মার হাতের খাবার খাই না কতদিন।“ বলতে বলতে গলা ধরে এলো জালাল ভাইয়ের। আমি এরকম সময় কি বলতে হয় জানি না। তাই বললাম ‘চলেন জালাল ভাই এয়ারপোর্ট যাই।‘
“ছোটো ভাই এখানে কিছু ভিটামিন আছে আম্মার জন্য। প্যাকেটে ঢাকার বাসার ঠিকানা ফোন নম্বর সব আছে। আর এই পাঁচশ ডলার আম্মাকে পৌছে দিলে খুব খুশি হবো।
-জালাল ভাই। ডলারটা না দিলে হয় না। মানে আপনার সাথে দেখা মাত্র দুইদিন আগে…
“আবারো বলছি আমার মাথার চুলতো এমনিতেই পরে নাই। মানুষ চিনি। এই সামান্য কয়েকটা ডলার তোমার হাতে নিশ্চিন্তে দিতে পারি।“ এর পরে আর কথা থাকে না। জালাল ভাইয়ের ডলার আর ওষুধ নিয়েই ঢাকা ফিরি।

সপ্তাহখানেক পরে এক ছুটির দিনে ঠিকানামত বাসায় গেলাম। আগেই ফোন দিয়েছিলাম। দরজা খুললো জালাল ভাইয়ের ছোটো ভাই। দুলাল নামটা জালাল ভাইয়ের কাছ থেকেই শোনা।
“ভাইয়ার সাথে তাহলে আপনার দেখা হয়েছে। শুনেছি মেম বিয়ে করেছে। এই জন্যই আর দেশে আসে না।“ দুলাল দরজার সামনে দাঁড়িয়েই বলে। উত্তরে কি বলবো বুঝতে না পেরে বলি-
-আপনার আম্মার সাথে দেখা করতে পারি।
“ভাইয়ার কাছ থেকে এসেছেন, আম্মার সাথেতো অবশ্যই দেখা করবেন। আমরা কাছে থাকলেও আম্মাতো ভাইয়া বলতে অজ্ঞান। আসুন ভিতরে আসুন।”
সুন্দর সাজানো গোছানো বসার ঘর। শুধু এক কিনারে রাখা একটা মিটসেফই বেশ বেমানান।
“আচ্ছা ভাইয়া কি দেশে আসবে না?” দুলাল জিজ্ঞেস করে।
-অবশ্যই আসবে। আমাকেতো বলল আগামী বছরই আসবে।
“বিশ্বাস করি না। এরকম বহুবার বলেছে। সেতো মনে করে টাকা দিলেই সংসারের সব দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেলো।”
“বাবা তুমিই জালালের কাছ থেকে আসছো।” দুলালের কথার মাঝখানেই এক বয়স্ক মহিলা সোজা এসে নিঃসংকোচে আমার হাত ধরে বলেন।
“বল বাবা আমার বাজান কেমন আছে?” ‘আপনার জন্য একটু চায়ের কথা বলি’ বলে দুলাল চলে যায়। বৃদ্ধা মাকে ডলার আর ওষুধগুলো দেই। আর যতটা সম্ভব তার ছেলের খবর দেই। ‘এদিকে আসো বাবা’ বলে বৃদ্ধা হাত ধরে আমাকে মিটসেফের কাছে নিয়ে যান। মিটসেফটা মনে হয় কয়েকদিন আগেই বার্নিশ করা হয়েছে । গন্ধটা আমার বেশ ভালো লাগে । বৃদ্ধা কাঁপা হাতে দরজা খোলেন মিটসেফের। জালাল ভাইয়ের কয়েকটা ছবি, একজোড়া জুতা, আর অনেক মেডেল-শীল্ড-কাপ দেখতে পাই।
“বাজান আমার খেলাধুলায় খুব ভালো ছিলো। এই মেডেল শীল্ড সব ওর পাওয়া। বাজানের খালি খিদা লাগতো। এই মিটসেফের ভিতর মোয়া, নাড়ু, ক্ষীর যা রাখতাম সব ও খেয়ে ফেলতো। কত মাইর দিছি এই কারনে।“ এতটুকু বলেই মিটসেফের পাশের চেয়ারে বসেন বৃদ্ধা।
“অভাবের সংসারে কোনোদিন একটু আদর-যত্ন করতে পারি নাই বাজানের। এখন ওরই চেষ্টায় অভাব দুর হইছে। কিন্তু বাজানরে আর পাই না। মিটসেফটা আমি জোর কইরা রাখছি। বাজান আসলে আমি নিজ হাতে রান্না করে এই মিটসেফ ভর্তি কইরা খাওন রাখমু…বাজান খাইবো” ঢুকরে কেঁদে উঠেন বৃদ্ধা। কথা শেষ করতে পারেন না।

সেই প্রথম জানলাম -মিটসেফে শুধু বাসী খাবারই থাকে না , সময়-দুরত্বের কাছে অপরাজিত স্নেহ ভালোবাসাও থাকে ।

Check Also

কোথাও লুকানো থাকে কিছু-শায়লা হাফিজ

মিডিয়া খবর:-        -:শায়লা হাফিজ:- ভুলে যাবার মত আমার একটা গোপন করা অসুখ …

moon

তুমি যে আছো বলেই-এ এস মাহমুদ খান

মিডিয়া খবর:-      -:এ এস মাহমুদ খান:- তুমি যে আছো বলেই জোনাকি জ্বালে বাতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *