Home » নিবন্ধ » একুশের চিন্তা-চেতনা ও স্মৃতি (পর্ব-১)

একুশের চিন্তা-চেতনা ও স্মৃতি (পর্ব-১)

মিডিয়া খবর:-

বাংলাদেশি, তথা বাংলা ভাষাভাষী তাবৎ বাঙ্গালীর কাছে স্রেফ ‘একুশে’ শব্দটিই যথেষ্ট –‘ফেব্রুয়ারী’র উল্লেখ ছাড়াই! যদিও আমাদের নিজেদের পঞ্জিকায় এ তারিখটা ‘৮ই ফাল্গুন’, সে কথাও কিন্তু আমরা কেউ খেয়াল করিনা, করার প্রয়োজন বোধ করিনা। শুধু কি বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে?

‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে, ‘একুশে’ ইতোমধ্যে স্বমহিমায়, নিজের গৌরবময় স্থান করে নিয়েছে সারা বিশ্বে। ‘একুশে’ – আমার, আমাদের, এবং আমি বলব, প্লানেটের (প্রায়) ৭০০ কোটি মানুষের, ‘অমর একুশে’! 

‘একুশে’র সেই সার্বজনীন, অভূতপুর্ব, কালবিজয়ী ভাষা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষ বা সরাসরি অংশগ্রহনকারী হিসেবে, এ দিনটি নিয়ে কিছু বলতে, লিখতে বা এ মহান দিনটির একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গেলে, এতই আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ি যে, খেই ও পরম্পরাবোধ হারিয়ে ফেলার সমূহ সম্ভাবনার কথা অস্বীকার করা যায়না।

ফাইল ছবি: প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা, ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২
ফাইল ছবি: প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা, ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২

‘একুশে’ নিয়ে কথা বলতে গেলে আলোচনায় পাকিস্তানের কিছু কথা আসা অপরিহার্য। ভারত (অখন্ড) স্বাধীন করার আন্দোলন অনেক আগে থেকে শুরু হলেও ( সর্বভারতীয় কংগ্রেস গঠিত হয় ২৮শে ডিসেম্বর ১৮৮৫ তারিখে, একজন অভারতীয়ের – ব্রিটিশ বেসামরিক আমলা, স্কচম্যান আলান অক্টাভিয়ান হিউমের –নেতৃত্বে ) ভারতকে ভাগ করে স্বাধীন সার্বভৌম দুটি রাষ্ট্র – ভারত ও পাকিস্তান – প্রতিষ্ঠার দাবী তুলনামূলকভাবে খুবই স্বল্প কালের, যদিও মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মুসলিম লীগ গঠন করা হয় ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে, আমাদের ঢাকায়, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’র নেতৃত্বে এবং যার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন আঃ কাঃ ফজলুল হক ( পরবর্তীতে ‘শের-ই- বাংলা’ উপাধিতে ভূষিত )। প্রকৃত প্রস্তাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জোরালো, সক্রিয় দাবীর সূত্রপাত হয় ১৯৪০ সনের ২৩ শে মার্চ – শের-ই- বাংলা আঃ কাঃ ফজলুল হকের উপস্থাপিত বিখ্যাত “লাহোর প্রস্তাব” এর মাধ্যমে। অতঃপর শুরু হয় পাকিস্তান দাবীর পক্ষে সব রকমের পরিকল্পনা-আলোচনা- আন্দোলন। এক পর্যায়ে তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার মূখ্য মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৯৪৫-১৯৪৬ এর সর্বভারতীয় ‘পাকিস্তান দাবী’ ভিত্তিক গণভোটে শের-ই- বাংলা কে হারিয়ে নির্বাচিত) ১৬ ই আগষ্ট, ১৯৪৬ কে ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ কর্ম-কান্ড দিবস’ হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেন। এ দিনেই শুরু হয় কোলকাতার সেই অবর্ণনীয়, রোমহর্ষক সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গা, যার শিকার হয়েছিল অগণিত মুসলমান ও হিন্দু। দাঙ্গা ছড়িয়ে যায় বিহারে, পাঞ্জাবে, এমন কি কোন, কোন প্রত্যন্ত জিলায় – যেমন নোয়াখালীতে, যেখানে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী তাঁর ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন বেশ কিছু দিনের জন্য।এর আগে, বিহারে অসংখ্য মুসলমান হতাহত হলেও, যে কোন সম্ভাব্য কারণেই হোক, মহাত্মার সেখানে যাবার বা উল্লেখযোগ্য তেমন কোন কর্মকান্ড আরম্ভ করার অবকাশ হয়নি। বাংলাদেশে, ঢাকার ‘জেনেভা ক্যাম্প’ ও অন্যান্য জায়গায় আজও বহু বিহারীদের উপস্থিতি, বিহারের সেই দাঙ্গার সাক্ষ্য বহন করে।

formative 01এটা সর্বজন বিদিত যে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান হোতা ছিলেন মুম্বাইয়ের (জন্ম করাচীতে) তুখোড় ব্যারিস্টার, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (পরবর্তীতে যাঁকে “ক্কায়েদে-আযম” উপাধিতে ভূষিত করা হয়)। পাকিস্তান আন্দোলনের মোক্ষম সময়ে (১৯৪৫–১৯৪৭)আমি বি এম কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের ছাত্র। উল্লেখ্য, এ সময়ই (১৯৪৬) বঙ্গ-বন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ – আমি আই এস সি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও একজন সাধারণ মুসলিম ছাত্র লীগ কর্মী। বরিশালের সে সময়ের একচ্ছত্র মুসলিম লীগ ছাত্রনেতা (পরবর্তীতে ‘বাকশাল’ খ্যাত) মহিউদ্দিন আহমেদ সাহেবও তখন বি এম কলেজের (বেশ কয়েক বছর ধরেই চতুর্থ বৎসর বি এস সি’র) ছাত্র এবং ছাত্র নেতা বাহাউদ্দিন সাহেব (প্রাক্তন ছাত্র)।

সে কালের (যুক্ত) বাংলার প্রখ্যাত, প্রথম কাতারের মুসলিম লীগ ছাত্র নেতাদের মধ্যে, মহিউদ্দিন, বাহাউদ্দিন, (বঙ্গ-বন্ধু) শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, সৈয়দ বদরদ্দোজা এবং ওয়াসেক চৌধুরী্ ছিলেন অন্যতম। তখনকার দিনে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ মুসলমান ছাত্রই মুসলিম লীগ করতেন; এবং, আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ও করেছি পাকিস্তান হাসিল করার জন্য। বঙ্গ-বন্ধু ঐ সময়ে বরিশাল এসেছিলেন। উপরোক্ত ‘ডাইরেক্ট একশন দিবস’ এর পরে পরেই, মুসলিম ছাত্র লীগের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপণা সংক্রান্ত কোন জরুরী ব্যাপারে। ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ যখন তুঙ্গে, তখন আমরা অনেক মজার মজার কান্ড করতাম পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন ও জোরদার করতে।যেমন, আমরা ক্লাসে রোল কলের সময় ‘ইয়েস স্যার’, ‘হিয়ার স্যার’ বা ‘প্রেজেন্ট স্যার’ না বলে বলতাম ‘পাকিস্তান’। অপর দিকে, হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীরা বলতো, ‘জয় হিন্দ’। সেই ১৯৪৪ সন থেকে চিঠি পত্রের (খাম বা অধূনা লুপ্ত পোষ্টকার্ডের)ঠিকানায়, সবশেষে অপ্রয়োজনেও ‘পাকিস্তান’ শব্দটি লিখতাম। প্রায় সবাই ‘জিন্নাহ ক্যাপ’ পরতাম; গান গাইতামঃ ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’, ‘চল, চল, চল, উর্দ্ধে গগনে বাজে মাদল, নীম্নে উতলা ধরণী তল…’ ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু…’ ইত্যাদি; স্কুল-কলেজে, শহরের অলি-গলিতে, পাড়ায়-পাড়ায় চলতো কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীদের নিয়ে সামরিক কুচকাওয়াজের মহড়া (খুব সম্ভব, ‘খাকসার আন্দোলন’ নামে পরিচিত ছিল এটা) বরিশাল এলাকায় যার সার্বিক পরিচালনার নেতা ছিলেন মেহেন্দীগঞ্জের (মরহুম) মাওলানা নূরুজ-জামান।

পাকিস্তান দাবী এতই জনপ্রিয়, সোচ্চার ও জোরালো ছিল যে, পরবর্তীতে জিন্নাহ’র সাথে মতান্তর হওয়ায়, লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক, বারিশালের শের- ই-বাংলাকে আমরা বরিশাইল্লারাই বরিশালের ষ্টীমার ঘাটে কাল পতাকা দেখিয়েছিলাম!কী লজ্জার কথা!! এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, ভোগান্তি, মৃত্যু, দু’দিকে লক্ষ লক্ষ লোকের ঘর-বাড়ী ছেড়ে দেশ পরিবর্তনের ফসল, উপমহাদেশের সকল মুসলমানদের স্বপ্নের ‘পাকিস্তান’ এল ১৪/১৫ ই আগষ্ট, ১৯৪৭ তারিখে। ২০০ বছরের বৃটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা লাভ ও মুসলিম রাষ্ট্র, ‘পাকিস্তান’ প্রাপ্তির সে আন্দোলনের কথা আজও মনের মুকুরে সমুজ্বল, যার একমাত্র তুলনা চলে ঠিক ২৪ বছর পরে ১৬ ই ডিসেম্ব ১৯৭১ এর, সেই স্বপ্নের পাকিস্তান ভেঙ্গে, বাংলাদেশ প্রাপ্তির বিজয়োল্লাসের সাথে। আর কিনা, সেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা সেই একই জিন্নাহ সাহেব নিজেই পাকিস্তানের ভিত্তির উপর মারলেন প্রথম কুঠারাঘাত, প্রথম বোম্বশেল! এমন কি, পাকিস্তানের মাত্র একটি বছর পূর্তির আগেই!!!আঘাত হানলেন একটা জাতির সবচে’ স্পর্শকাতর জায়গায়, তার মূল সংস্কৃতি-কৃষ্টির ধারক-বাহক মাতৃভাষার উপর!এত বড় রাজনীতিবিদ, প্রাজ্ঞ, ক্ষুরধারসম cgmh1বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তি কী করে, করে বসলেন এমন পাহাড় প্রমান, মারাত্মক ভুল? কী? না, নিখুঁত, চোস্ত ইংরেজিতে ঘোষণা করলেন, “The state language of Pakistan shall be Urdu, and Urdu alone” – “পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু, এবং একমাত্র উর্দু”! ১৯৪৮ সনের মার্চ মাসের মাঝা-মাঝি (আমি তখন বরিশালে, বি এস সি’র ছাত্র) উনি প্রথম ও শেষবারের মত আসেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এবং উপরোক্ত ঘোষনা দেন এখানকার, এই দুর্জয় বাংলার, মাটিতে দাড়িয়ে – প্রথমে রেসকোর্স ময়দানে ও পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে। “না, না” প্রতিবাদের ঝড় উঠলো সাথে সাথে – শুধু ছাত্র মহলে না, সর্বত্র! এমন কথাও শুনা যায় (সত্য মিথ্যা জানা নেই) যে, জিন্নাহ সাহেব সেদিন নাকি কার্জন হলের পেছনের দরোজা দিয়ে পালিয়ে ছাত্রদের রোষানল থেকে নিজকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন!

ছবিতে লেখক ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবুল মকসুদ নুরুল আলম
ছবিতে লেখক ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবুল মকসুদ নুরুল আলম

ওনার এই ঔদ্ধত্বপূর্ণ ঘোষণার যুক্তি ও সাহস কোত্থেকে এল, এটা একটি গবেষণার বিষয় বলে আমার ধারণা। তখনকার পাকিস্তানের মোট লোকসংখ্যার শতকরা ৫৫ ভাগ ছিল বাংলা ভাষাভাষী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সব ক’টি প্রধান ভাষা মিলিয়ে – পাঞ্জাবী, সিন্ধী, বেলুচী ও পস্তু ভাষাভাষী লোকের সংখ্যা শতকরা ৪৫ ভাগ মাত্র! পশ্চিম পাকিস্তানের এ চারটি প্রধান ভাষার মধ্যে কোনটিই একটি দেশের রাষ্ট্র ভাষা হবার মত যথেষ্ট উন্নত বা সমৃদ্ধ নয়, যার খুব একটি বড় প্রমান এই যে, স্যার আল্লামা ইকবালের মত অত বড় মাপের কবিও তাঁর নিজের মাতৃ ভাষায় পাঞ্জাবীতে লিখতে পারেন নি অমূল্য তাঁর কাব্য সম্ভার – সাহায্য নিতে হয়েছে উর্দুর। আর, জিন্নাহ সাহেব কী করলেন? না, পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডে নিজস্ব, অতি উন্নত ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা – বাংলা ভাষা – থাকতেও আর এক দেশের একটি প্রাদেশিক ভাষা ধার ক’রে নিয়ে এসে চাপিয়ে দিতে চাইলেন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে। হয়তো মনে করেছিলেন যে, যে দেশের লোক তাদের নিজেদের, শের-ই- বাংলার মত মহান নেতাকে কোন মূল্য না দিয়ে তাঁর (জিন্নাহর) অঙ্গুলী হেলনে সব কিছু করে যাচ্ছে, সে দেশের লোক ভাষার ব্যাপারেও তাঁর অযৌক্তিক কথাও মেনে নিবে বিনা বাধা বা দ্বিধায়। (যক্ষ্মায় আক্রান্ত) জিন্নাহ সাহেব মাত্র ক’য়েক মাস পরে, ১১ ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ তারিখে, করাচীতে মৃত্যু বরণ করেন – ভাষা আন্দোলনের সার্বিক গুরুত্ব, ভয়াবহতা ও বাঙ্গালীর ঈপ্সিত, অনিবার্য ফলাফল না দেখেই। এখানে একটি কথা উল্লেখ করতেই হয়। সব কিছু সত্বেও, পাকিস্তান প্রাপ্তির এক বছরের মধ্যেই জ়িন্নাহ’র মৃত্যু সংবাদে মুষড়ে পড়েছিল সারা দেশ, দেশের বরেণ্য সব নেতা সহ আপামর জনগন। অতি দীর্ঘ শোক মিছিলে দেখেছিলাম সবার চোখে অঝোর অশ্রু।

লেখকঃ-

ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবুল মকসুদ নুরুল আলম

সাবেক অধ্যাপক সরকারি বিএল কলেজ,খুলনা

অবসরপ্রাপ্ত লিগ্যাল অফিসার, ইউনেস্কো,ক্যানাডা

ইমেইলঃ aalam0391@yahoo.ca

Check Also

যশোর মুক্ত দিবস

মিডিয়া খবরঃ-         সাজেদুর রহমানঃ- ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিনেই যশোর …

৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১

 মিডিয়া খবরঃ-        সাজেদুর রহমানঃ- ৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১।   সকাল ৯ টায় মিত্রবাহিনীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *