Home » নিউজ » একাই ছুটে গিয়েছিলাম যুদ্ধে – পর্ব-১
১৯৭১ সালে গেরিলা যোদ্ধাদের ব্যবহৃত একটি জীপ। ছবি-সংগৃহীত

একাই ছুটে গিয়েছিলাম যুদ্ধে – পর্ব-১

মিডিয়া খবরঃ-    -ঃ সজল রহমান ঃ-

দেশের অবস্থা তেমন ভালো না। চারদিক থেকে যা শোনা যাচ্ছে তা থেকে বুঝেছি এবার কিছু একটা হবেই। বেশ চিন্তা হচ্ছিল, তবু আশাবাদী ছিলাম আমি। ১৯৭০ সালে দেশে প্রচণ্ড রাজনৈতিক অশান্ত পরিবেশে করাচী থেকে ঢাকা ফিরে এলাম। আমাদের বাসা তখন বাসবো। নিজ মহল্লায় ফিরেই খোঁজ নিলাম এলাকার বন্ধু, বড় ভাইদের। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও  প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া, সেই সঙ্গে  প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার  কথা প্রকাশ করলাম। ১৯৭১ এর ১লা মার্চ, ৭ই মার্চ এবং ২৫ই মার্চের ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে  শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যুদ্ধে যাব। তবে সমস্যা হচ্ছে আমি কখনো কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়নি, সেই আমি কিভাবে বর্ডার পার হয়ে ওপারে যাব।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মাশরুকুল হক, ৭ই এপ্রিল ১৯৬৭

ইতমধ্যে কথা বললাম ছোট ভাই (শহীদ মুক্তিযোদ্ধা) মোস্তাকের  সঙ্গে। এরই মাঝে সে দু-বার ওপার (ভারত) থেকে ঘুরে এসেছে। কথা গুলো বলতে গিয়ে একটা দুঃখের চাপা রঙ ছুয়ে দিল চোখে-মুখে। কিছু সময় থেমে থেকে আবার শুরু করলেন ১৯৭১ সালের বীরযোদ্ধা মোহাম্মদ মাশরুকুল হক। আমাকে প্রথমেই বলা হল, খুব কষ্টের জায়গা ওটা, খাবার, থাকা আর ট্রেনিং সব মিলিয়ে অসহ্য। তবে আমাকে ঠিক পথ বলে দিলেন, ছোট ভাই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক (সদস্য ক্রাক প্লাটুন)।

সেই অচেনা-অজানা পথে একাই পা বাড়ালাম। ঢাকা থেকে বাসে করে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত যাবার পর নৌকায় নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে ভাড়ার জীপে চেপে অনেক দূর যাবার পর যখন মেঘনা নদী পার হচ্ছি তখন কেমন জানি কেমন একা একা লাগছিল। অনেকটা ঘাবড়ে যাওয়ার মত। তেমন সাহস পাচ্ছিলাম না। যেহেতু এত দূর চলে এসেছি তাই মনে সাহস নিয়ে নিজেকে বলেছিলাম আর বাড়ি  ফিরে যাওয়া নয়। প্রথম মেঘনা ঘাট পার হবার পর আবার নৌকায় মেঘনা পার হবার সময় একজন বেশ বয়স্কও লোককে দেখলাম নৌকার উপর। পরনে লুঙ্গী গায়ে খাকি পোশাক, হাতে অর্ধেক নোনা ইলিশ টুকরো। দেখেই বোঝা যায় সরকারি অফিসের পিয়ন হবে হয়তো। পোশাক পরে বের হয়েছেন যাতে মিলেটারিরা কিছু না বলে। লোকটাকে দেখে কেন জানি মনে হল ওনাকে সব বলা যায়। কারণ এতদুর অচেনা পথে এসেছি, তবু কারো কাছে কিছু বলিনি।

নদী পার হয়ে নৌকা থেকে নেমে বয়স্ক  লোকটাকে বললাম, আমি ওপারে যাবো। লোকটা আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে আমাকে তাঁর সঙ্গে যেতে বলল। কোন কিছু না ভেবেই লোকটার সাথে উঠে বসলাম একটা ট্যাক্সিতে। গাদাগাদি করে অনেক কষ্টে যেতে যেতে হঠাত লোকটা ট্যাক্সি থেকে নেমে রাস্তা দিয়ে হাটতে শুরু করলো। কোন কথা না বলে আমাকে ইশারা করা হল, তাঁর পিছু নিতে। আমিও পিছু পিছু হাটতে লাগলাম। কিছু দুর যাবার পর লোকটা বড় রাস্তা ছেড়ে নেমে গেল ধান ক্ষেতের সরু আইল ধরে। তখন হালকা বৃষ্টির ফোটা পড়ছে।

মাঠের মাঝে গিয়ে লোকটা জানালো বড় রাস্তায় রাজাকারের দল টহল দিচ্ছিলো। আমি শুধু দেখেছিলাম ঐ সময় বড় রাস্তায়  কয়েকজন  বৃষ্টির থেকে রক্ষা পেতে বস্তা মাথায় দিয়ে হাটছে। কিন্তু বয়স্ক লোকটা ঠিক দেখেছে তাদের কাধের রাইফেলের বেনেট বস্তার বাহিরে বের হয়ে ছিল। আমরা হাটতে হাটতে একটা গ্রামে গিয়ে উঠলাম। আমার কাছে অপরিচিত হলেও ঐ গ্রামেই আমাকে সাহায্য করা বয়স্কও লোকটার বাড়ি। আমাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে রাতে আশ্রয় দিল। তখন দেশের  এমন একটা অবস্থা যে কোন অপরিচিত মানুষকে বাড়িতে আশ্রয় দিলে ভয়ে থাকতে হত। এই বুঝি রাজাকারের দল মিলিটারি নিয়ে এল। আমি খুব অবাক হই এখনো। যে লোকটা হয়তো  টাকার অভাবে আধা টুকরো নোনা ইলিশ কিনে বাড়িতে এল, সেই ব্যক্তিই রাতে আমাকে মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ালো। এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, তবে শেষ হয়ে যায়নি, লোকটা সারা গ্রাম ঘুরে একজন রিক্সা চালককে নিয়ে এল যে বর্ডারের রাস্তা চেনে। আমাকে ওপারে পৌঁছে দিতে পারবে।  রিক্সা চালক ভাড়া চাইলো ২০ টাকা।  কিন্তু হাতে সময় কম। ওপারে যেতেই হবে। ভোরের আলো ফোটার আগেই রিক্সা করে ছুটতে থাকলাম বর্ডারের উদ্দেশ্য। গন্তব্য অজানা। তবু বুকে একটা সাহস ছিল, সেই সাথে তারুণ্যের শক্তি । (চলবে……)

বীরযোদ্ধা মোহাম্মদ মাশরুকুল হক  ( সদস্য ক্রাক প্লাটুন-১৯৭১ ) এর একাত্তরের দিনগুলি থেকে।

Check Also

বাংলার নবান্ন উৎসব জাপানে

মিডিয়া খবর :- এ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ জাপানের বুকে। জাপান প্রবাসী বৃহত্তর খুলনা সমিতি বাংলার …

বাবা শাকিব মা অপু আর আব্রামের লেখাপড়া

মিডিয়া খবর:- বয়স তিন হয়নি এখনো তবু বাবা শাকিব ও মা অপু এখন আব্রামের লেখাপড়া …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *