Home » নিবন্ধ » উজ্জ্বলতম গৌরবময় ইতিহাসের পাতায় গরুর গাড়ি

উজ্জ্বলতম গৌরবময় ইতিহাসের পাতায় গরুর গাড়ি

মিডিয়া খবরঃ-    – : সাজেদুর রহমান :- 

ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক নগরের মন যখন ক্লান্ত হয়ে ওঠে, তখন কল্পলোকে ঘুরে আসি। ফুল পাখি সবুজ ক্ষেত আর সোনালী এদেশের গ্রামীণ মেঠো পথ ধরে হেটে চলি অনুভাবিত হয়ে। অনেকে আবার এই শহরের উচ্চবিলাস গায়ে মেখে ভুলতে শুরু করেছে নাড়ির কথা, শেকড়ের কথা। গ্রামীন শিল্প সংস্কৃতি, কৃষকগোষ্ঠীর শত কষ্টের মাঝে উঠে দাঁড়াবার কথা। আর এসব কিছুর সাথে মিশে আছে কৃষক পরিবার, গরু-গরুর গাড়ি। আজ আমরা বিজ্ঞানের কল্যাণে সময়ের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছি। তাবত দুনিয়াদারী চষে বেড়াচ্ছি। কিন্তু একবার ইতিহাসকে প্রশ্ন করে দেখুনতো, আমরা এখানে কিভাবে এসেছি! একটু সচেতনতা আপনাকে উত্তর খুঁজে দেবে। 

মানুষ্য সভ্যতার প্রায় উন্মেষকাল থেকেই গরুর গাড়ি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার প্রায় সর্বত্রই ছিল যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যান হিসেবে। সময়ের বিবর্তনে পশ্চিম ইউরোপে দ্রুতগামী ঘোড়ায় টানা গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ও যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে গরুর গাড়ির ব্যবহার কমে আসে। বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ সভ্যতার উন্নয়ন ও পরবর্তীকালে কৃষকের জমিচাষের যন্ত্রচালিত লাঙল ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারসহ নানাবিধ যন্ত্রযানের উদ্ভবের ফলে এখন অনেকটা হারাতে বসেছে গরুর গাড়ি তার নিজ মহিমা। তবে এসব অঞ্চলে গরুর গাড়ির ঐতিহ্য কেবলমাত্র টিকে রয়েছে নানারকম লোকসাংস্কৃতিক মেলা ও অনুষ্ঠানে।

১৯০৪ সালে অঙ্কিত ওলন্দাজ শিল্পী আডলফ ফান ড্যের ভেনা’র চিত্র রাইখে এরনটে (পাকা ফসল) ছবিতে গরুর গাড়ির দৃশ্য

গরুর গাড়ির ইতিহাস সুপ্রাচীন। নব্যপ্রস্তর যুগের সময় থেকেই মানুষ এই যানটি ব্যবহার করে আসছে। ফ্রান্সের ফঁতান অঞ্চলে আল্পস পর্বতের উপত্যকায় একটি গুহায় গরুর গাড়ির যে ছবি পাওয়া যায়, তা থেকে জানতে পারা যায় খ্রিস্টের জন্মের ৩১০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগেও গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল। হরপ্পা সভ্যতাতেও যে গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল তার সপক্ষে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানেও নানা অঞ্চল থেকে এক অক্ষ বিশিষ্ট চাকাওলা নানা খেলনা পাওয়া গেছে। এগুলি থেকে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খ্রিস্টজন্মের ১৬০০ থেকে ১৫০০ বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যগতভাবে গরুর গাড়ি কিছুদিন আগে পর্যন্তও যাতায়াত ও মালবহনের কাজে প্রভূত পরিমানে ব্যবহৃত হত। তবে বর্তমানে নানাধরণের মোটরচালিত যানের আধিক্যের কারণে অপেক্ষাকৃত ধীরগতির এই যানটির ব্যবহার অনেক কমে এসেছে।

আফ্রিকার বহু জায়গায় প্রবল জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিরূপের কারণে সেখানে পথঘাট যেকোনও রকম গাড়ি চালনারই অনুপযুক্ত ছিল। তাই এইসব জায়গার মানুষদের মধ্যে গরুর গাড়ি সংক্রান্ত কোনও ধারণার প্রচলনই ছিল না। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন ওলন্দাজ ঔপনিবেশিকরা প্রবেশ করতে থাকে, বহুক্ষেত্রেই তারা বাহন হিসেবে গরুর গাড়িকে ব্যবহার করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন জনপ্রিয় উপন্যাসেও তাই আমরা দক্ষিণ আফ্রিকায় যাতায়াত ও মালবহনের উপায় হিসেবে গরুর গাড়ির উল্লেখ দেখতে পাই। উদাহরণ স্বরূপ আমরা এক্ষেত্রে এইচ. রাইডার হ্যাগার্ড’এর বিখ্যাত উপন্যাস কিং সলোমনস মাইনস ‘এর উল্লেখ করতে পারি।

cakaএক্ষেত্রে তারা গরুর গাড়ির আরেকটি ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলে। রাত্রিতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বা বিপদে পড়লে তারা প্রায়শই গরুর গাড়িগুলোকে গোল করে সাজিয়ে একধরণের দুর্গ গড়ে তুলে তার মধ্যে আশ্রয় নিত। গরুর বা ঘোড়ার গাড়িকে ব্যবহার করে এইধরণের দুর্গ গড়ে তোলার রেওয়াজ অবশ্য আমরা এর অনেক আগে থেকেই দেখতে পাই। চেঙ্গিজ খানের নাতি বাতু খানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে যে মোঙ্গল আক্রমণ চলে সেখানে তার প্রতিরোধে স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা গরুর গাড়ির এই ধরণের ব্যবহারের কথা আমরা জানতে পারি। বিশেষ করে কালকার যুদ্ধে কিয়েভ রুশেরা এই ধরণের গাড়িনির্মিত চলমান দুর্গ তৈরি করে মঙ্গোল আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ও ভারত  সহ  বহু অংশে এখনও গ্রামীণ মেঠো পথে  মূলত মাল পরিবহনের কাজে গরুর গাড়ির ব্যবহার এখনও প্রচলিত আছে।

তথ্য সুত্রঃ প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও উইকিপিডিয়া। 

 

Check Also

যশোর মুক্ত দিবস

মিডিয়া খবরঃ-         সাজেদুর রহমানঃ- ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিনেই যশোর …

৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১

 মিডিয়া খবরঃ-        সাজেদুর রহমানঃ- ৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১।   সকাল ৯ টায় মিত্রবাহিনীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *