Home » সাহিত্য » গল্প » অপ্রতিম শিক্ষা – ছোট গল্প
sm shultan painting

অপ্রতিম শিক্ষা – ছোট গল্প

মিডিয়া খবর :-          -: রাজু জবেদ :-

অপ্রস্তুত, অবাঞ্ছিত বা যা এড়িয়ে চলতে চাই ঘুরে ফিরে সেই অবস্থায় সবাইকে কম বেশি পতিত হতে হয়। আমার ক্ষেত্রে তা যেন একটু বেশি হয়। হয়ত টিভিতে বাংলাদেশ-ভারতের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ম্যাচ দেখছি। টান-টান উত্তেজনা, ক্ষণে ক্ষণে খেলায় রং পাল্টাচ্ছে-চরম উত্তেজনাকর অবস্থা ! এমন সময় বুয়া এসে বলল, “ক্যাডা জানি আইছে আপনারে বুলায়।” মেজাজ অসম্ভব বিগড়ে যায়। বাইরে উকি দিলে হয়ত এমন একজনকে দেখা যাবে যার সঙ্গে এক সময় খাতির ছিল। এখন কি বিচিত্র কারণে যেন নেই। তবু হাসির এক ভাব করে উৎসাহের সাথে (আসলে বিরক্ত) বলতে হয়, আরে অনেক দিন পর, তারপর খবর কি ? দিনকাল কেমন চলছে? ইত্যাদি ফরমাল কথাবার্তা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও চালিয়ে যেতে হয়। এক সময় হয়ত এই লোকের সাথে তুই-তোকারি সর্ম্পক ছিল, এখন দূরত্ব বজায় রাখার জন্য ভাববাচ্যে কথা বলতে হচ্ছে। বাংলা ভাষার ভাববাচ্য খুব বেশি উন্নত নয় (আসলে আমার দখলে নেই), দীর্ঘ সময় কথা চালানো যায় না। আজকের ব্যাপারটাই ধরা যাক। অর্পার সাথে টিএসসি’র বারান্দায় বসে আছি। হঠাৎ কোথ্থেকে এক ফেরিওয়ালা এসে হাজির। একে ফেরিওয়ালা না বলে ছোকরা বলাই বাঞ্ছনীয়। বয়স বড়জোর দশ-এগার বছর হবে? “মামা বাদাম দেব ?”
একেতো ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরম, তারপর সেই সকাল থেকে বসে আছি টাকা জমা দেবার জন্য। ব্যাংকের সামনে পিপড়ার সারির মত লাইন জমা হয়ে আছে। শেষ হবার কোন লক্ষণ নেই। এখনই ভার্সিটিতে ভর্তির জন্য যদি এই অবস্থা যদি হয় ভবিষ্যতে কি অবস্থা দাড়াবে? এমনিতেই মেজাজ খারাপ। তারপর কয়েক মাস হলো নিজের বরাদ্দকৃত হলরুম ছাড়তে হয়েছে দলীয় মিছিল এবং সভা-সমাবেশে অংশ না নেবার জন্য। কয়েক বন্ধু মিলে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে চিলাকোঠায় দুটি রুম নিয়েছি। গতকাল বাড়িওয়ালা বেরসিকের মত নোটিশ দিয়েছে আগামী মাস থেকে বাসা ছাড়তে হবে। কোন ব্যাচেলরদেরকে তিনি আর ভাড়া দিবেন না। এমনকি ডাবল ভাড়া দিলেও (!) নয়। বাড়িওয়ালাকে আর কি দোষ দেব? সারা দেশেইতো ব্যাচেলরদেরকে ভাড়াটিয়া হিসাবে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। আমি বুঝিনা ব্যাচেলর হলেই কি জঙ্গি হবে ?! মেজাজ অসম্ভব বিগড়ে আছে ? বললাম,“যা লাগবে না একটু আগেই খেয়েছি।”
মামা আপনি না খান, উনিতো খেতে পারে।
উনি মানে?
আপনার সাথে, মানে বলে একটা মিচকি হাসি দিল। ওর চোরা চাহনি ও ঠোটের কোণের হাসির ভাষা এমন যেন অর্পা আমার ….. ফ্রেন্ড। আমার আপার চেম্বারের ডিগ্রি হু-হু করে বেড়ে যায়। ব্যাটা উজবুক বলে কি? সাথে মেয়ে দেখলেই মনে করে…? ক্লাসমেট হলে না হয় কোন ব্যাপার ছিল না। অর্পা আমার স্টুডেন্ট। উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করার পর অর্পার বাবা-জহের উদ্দীন সাহেব আমাকে ডেকে বললেন, “ বাবা-রোহান ওকেতো তুমি সেই এসএসসি থেকে পড়াচ্ছো। আল্লার রহমতে এবং তোমার চেষ্টায় এইচএসসিতেও ভাল রেজাল্ট করেছে। এবার ভার্সিটিতে ভর্তি করার জন্য একটু চেষ্টা কর-বাবা। আমার তো আর কোন ছেলে নেই। থাকলে তাকেই বলতাম ।” সে জন্যেই মঞ্জুরুল ইসলাম স্যারের (ডিপার্টমেন্ট আমার সবচেয়ে প্রিয়) ইমপর্টেন্ট ক্লাস বাদ দিয়ে এখানে আসা। আর ব্যাটা মুর্খ বলে কিনা…? আমি অগ্নি শর্মা দৃষ্টি নিয়ে বললাম, কি বললি? আমার দৃষ্টিতে এতই তেজ ছিল, হয়ত ও বুঝতে পেরেছিল।

ভুল হয়ে গেছে-স্যার মাফ কইরা দেন…এমন ভুল আর হবে না…

ভুল হয়ে মাফ কইরা দেব ! ব্যাটা উজবুক প্রতিদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবি আর রং হলেই বলবি স্যার মিসটেক হইছে ম্যাফ কইরা দেন। আজকে তোকে আমি এমন শিক্ষা দেব যে, ভুল কত প্রকার ও কি কি তা তোর ঠোটস্থ হয়ে যাবে। আমি রাগে তোতলাতে তোতলাতে ওকে মারলাম এক ধাক্কা। আচমকা ধাক্কায় ও বেসামাল হয়ে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছিল। পতনটা সে কোন মতে বাম হাত দিয়ে ঠেকাল। উরি বাবারে বলে দৌড়ে আমাদের দৃষ্টি সীমার আড়ালে চলে গেল…

অর্পা বলল,“ একি করলেন স্যার এভাবে কেউ ধাক্কা মারে নাকি? না জানি ছেলেটা হাতে ব্যাথা পেয়েছে কিনা?”

ব্যথা পাক। উচিৎ শিক্ষা হবে। দ্বিতীয়বার কারো সাথে এমন করবে না।
বিকালে ম্যাচে ফেরার পর কিছুই ভাল লাগছিল না। আসলেই ছোকরাকে ওভাবে ধাক্কামারাটা আমার উচিৎ হয়নি। সত্যিই যদি সে হাতে ব্যথা পেয়ে থাকে?

কয়েকদিন পর হাকিমের সাথে কলা ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। দেখি অপরাজয়ের পাশের রাস্তায় পরীর মত টুকটুকে একটি মেয়ে গলায় ডালা ঝুলিয়ে কি যেন ফেরি করছে। হাকিমকে বললাম, চলত দেখি-এর আগে এতটুকু মেয়েকে ফেরি করতে দেখিনি। নীচে নেমে এগিয়ে দেখি-মেয়েটি বাদাম ফেরি করছে। আর সেই ছোকরা অর্থাৎ দু’দিন আগে যাকে আমি ধাক্কা দিয়েছিলাম, আমাকে দেখে মেয়েটির পিছনে লুকানোর চেষ্টা করছে। ওর হাত দেখে আমি বড় রকমের একটি ধাক্কা খেলাম। বিবেকের দংশনে- দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছা হল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কোন রকমে বললাম-তোর হাতে ব্যান্ডেজ কেন?

মামা- গত পরশু শাহবাগের গ্যাঞ্জামের ধকল আমার হাতের উপর দিয়ে গেছে।
ওর কথা শুনে আমার বুকের উপর দিয়ে আলগোছে আধমনে একটি পাথর সরে গেল। যাক তাহলে আমার ধাক্কার ফল নয়। একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে বললাম, হ্যারে পরীর মত এই মেয়েটি কে? আর তুই বা তার সাথে ঘুরছিস কেন ? আমার প্রশ্নের ও কোন জবাব দিল না।

মেয়েটি বলল, আমার নাম টুনি। ও আমার ভাই টগর। ভাইয়ার হাত ভেঙ্গে গেছেতো তাই সাথে আমি আইছি বাদাম বেচার জন্যি।
টুনিকে বললাম তোমাদের মা-বাবা নেই। এই বয়সে তো তোমাদের স্কুলে যাবার কথা। স্কুলে না যেয়ে বাদাম ফেরি করতে এসেছ কেন?

টুনি মাথা নিচু করে বলল, এক বছর হলো মা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। আর জ্ঞান হবার পর থেকে বাবাকে দেখিনি, কোথায় আছে জানি না।

টুনির কথা শুনে দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করার ভাষা খুজে পেলাম না। ওর নত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভীষণ মায়া হল। ওকে কাছে ডেকে আদর করতে ইচ্ছে হল। আমার পকেট আজ মোটামুটি গরম-গতকাল টিউশনির টাকা পেয়েছি। আমি পকেট থেকে একহাজার টাকার একটি নোট বের করে ওর হাতে দিয়ে বললাম বাদাম দাও। ও দ্বিধা-বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম আজ ক্লাসে পার্টিথ্রো করেছি। আমরা সবাই মিলে বাদাম দিবস পালন করবো। তোমার সব বাদাম আমি কিনে নিলাম।

সে টাকা ফেরৎ দিয়ে বলল, সব বাদামের দামতো তিনশো বিশ টাকা। আমাদের কাছে ভাংতি নাই, ভাংতি দেন।

আমি হেসে বললাম, ভাংতি লাগবে না, বাকিটা তুমি রেখে দেও। টুনি কাচুমুচু করত লাগলো…আমি টাকাটা একরকম জোর করে ওর কচিঁ হাতে গুঁজে দিলাম।
মেয়েটা গম্ভীর স্বরে বললো, বাদাম দেন । আমি আপনার কাছে বাদাম বেচবো না। এই বলে টাকাটা ফেরৎ দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো।
আমি-অবাক- বিস্ময়ে বললাম কেনরে?!
সে আমার প্রতি অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করে বললো-“আপনি আমাদের ভিক্ষা দিচ্ছেন। আমরা গরিব হতি পারি কিন্তু ভিক্ষা নেই না। বাদাম ফেরি করি-কাজ করে খাই। ভিক্ষুক না।” কথা কটি ঝাজের সাথে বলে ভাইয়ের হাত ধরে হনহন করে চলে গেল।

আমি অবাক-বিস্ময়ে-শূন্য দৃষ্টি দিয়ে কত সময় ওর গমন পথের দিকে তাকিয়ে ছিলাম জানিনা। হাকিমের কথায় হুঁশ পেলাম…

“আমাদের এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি। ওদের থেকে আমাদের শেখা উচিৎ”

Check Also

অমল কান্তি -নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

মিডিয়া খবর   :- অমল কান্তি আমার বন্ধু, ইশকুলে আমরা একসাথে পড়তাম। রোজ দেরী করে ক্লাসে …

কোথাও লুকানো থাকে কিছু-শায়লা হাফিজ

মিডিয়া খবর:-        -:শায়লা হাফিজ:- ভুলে যাবার মত আমার একটা গোপন করা অসুখ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *